কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর অবদান
jugantor
কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর অবদান

  ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম  

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৪০.৬ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। যদিও শিল্প-কারখানার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, তবুও কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের রূপরেখায় কৃষি ও পরিবেশের উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব রয়েছে।

উন্নয়নের মডেল অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২১ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের, ২০৩০ সালে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ২০০৬ সালে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৭০১৭.১০ মিলিয়ন টাকা। আশা করা যাচ্ছে, ২০২০ সালে জিডিপিতে কৃষির অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ১০৯০০ মিলিয়ন টাকা। প্রধানমন্ত্রীর দক্ষ নেতৃত্বে আগের তুলনায় বর্তমান অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

জিডিপিতে কৃষির অবদান বৃদ্ধির পেছনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানও অনস্বীকার্য। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু কৃষক ও কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

তিনি ১৯৭৩ সালে প্রকৃতিকন্যা নামে স্বীকৃত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দেয়া হল।’ দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে কৃষিতে ভর্তুকি প্রদান ও গবেষণাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশের মানচিত্র বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন।

আজ শেখ হাসিনার মেধা ও যোগ্যতার উপহার হল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। দেশের মানুষ আজ তিনবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারে। প্রত্যেক মানুষের আয় বেড়েছে এবং বেড়েছে স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রের ব্যাপক সুযোগ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জমির বহু খণ্ডন হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কম জমিতে বেশি ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের প্রতিটি গ্রাম হবে শহর। ফলস্বরূপ, আজ করোনা মহামারীতেও প্রতিটি গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিবান্ধব সরকার। কৃষিকে অগ্রসর করতে এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চতকরণে ধান, চাল ও গম ক্রয় অব্যাহত রেখেছে সরকার।

অন্যদিকে সমুদ্রে মৎস্য আহরণকারীদের মৎস্য শিকার নিষিদ্ধের সময় যাতে খাদ্যের অভাব না হয়, সেজন্য তাদের প্রণোদনা হিসেবে খাদ্য সরবরাহের সিদ্ধান্তটিও চমক সৃষ্টি করেছে।

পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুগোপযোগী বহু প্রকল্পের বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিবিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিকে খাপ খাওয়ানোর জন্য ক্রমাগত খরা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের কৃষিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাচ্ছেন। কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমে পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীরা বদ্ধপরিকর।

তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের প্রতিরোধক হিসেবে বিভিন্ন অণুজীবের (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক) ওপর গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় ক্লাইমেট রিফিউজিদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করেছেন। ইতোমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৬০০ মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহিষ্ণু কৃষি গবেষণার গুরুত্ব বিবেচনায় নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি বিভাগ চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলস্বরূপ, হাজারও শিক্ষার্থী কৃষিবিজ্ঞানের ওপর স্নাতক ডিগ্রি লাভ করছে।

তাছাড়া পরিবেশের বিপর্যয় সংরক্ষণে শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পটিও চলমান। ওই প্রকল্পের আওতায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ আধুনিক পদ্ধতিতে অর্গানিক শাকসবজি, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষাবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রখেছে। প্রধানমন্ত্রী ওই প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি মানুষকে দিয়েছেন প্রকৃতির স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ। ফলে গ্রামীণ পরিবেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ স্বাস্থ্যসম্মত বাস্তুসংস্থান করোনা মহামারীতেও দৃশ্যমান। দেশের কৃষকরা ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলাসহ কৃষির উন্নয়নে বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্রতিবছর খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য খরা, জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা সহিষ্ণু বিভিন্ন ধরনের ধান ও সবজি উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে পরিবেশবান্ধব কৃষি ফসলের চাষাবাদ অব্যাহত রেখে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখার জন্য কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনার মহামারীতেও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যের সরবরাহেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু কৃষিক্ষেত্রে নয়, শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিল্প-কারখানাগুলোয়ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্টরা কাজ করে যাচ্ছেন।

মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কৃষি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ও পরিবেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা মাহামারীতে সরকারের সহযোগিতায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

করোনা মহামারী মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী ৫০০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যেখানে কৃষকরা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষক স্বল্প সুদে কৃষিঋণ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন। দুর্যোগের সময় কৃষির উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী থাইল্যান্ড ও ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষর করেছেন। সম্প্রতি তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশবাসীকে বলেছেন, করোনা মহামারীর সময় কৃষির উৎপাদন ও সংরক্ষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় তথা বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, লবণাক্ততাসহ সব দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ও পরিবেশের বিপর্যয়কে প্রাধান্য দিয়েই শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রাধান্য দিয়েই বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১ কোটির বেশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য ইতোমধ্যে তিনি ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ পুরস্কারও গ্রহণ করেছেন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশে গ্লোবাল সেন্টার অব অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধন করেন। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গ্লোবাল ইস্যু। জিসিএ’র আওতায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, জিসিএ দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০০৯ সালে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট গঠন করা হয়। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে বলা যেতে পারে, আগের দশকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৭০ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতা থেকে শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী ১০০ বছরের জন্য ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ গঠন করেন। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ‘ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সামিট’ এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কংগ্রেস কোপ-২৬ পরিচালনায় বাংলাদেশ থেকে জিসিএ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। আশা করা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে। বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গ্রহণ করবেন বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর অবদান

 ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম 
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের ৪০.৬ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। যদিও শিল্প-কারখানার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, তবুও কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের রূপরেখায় কৃষি ও পরিবেশের উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব রয়েছে।

উন্নয়নের মডেল অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২১ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের, ২০৩০ সালে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ২০০৬ সালে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৭০১৭.১০ মিলিয়ন টাকা। আশা করা যাচ্ছে, ২০২০ সালে জিডিপিতে কৃষির অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ১০৯০০ মিলিয়ন টাকা। প্রধানমন্ত্রীর দক্ষ নেতৃত্বে আগের তুলনায় বর্তমান অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

জিডিপিতে কৃষির অবদান বৃদ্ধির পেছনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানও অনস্বীকার্য। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু কৃষক ও কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

তিনি ১৯৭৩ সালে প্রকৃতিকন্যা নামে স্বীকৃত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দেয়া হল।’ দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে কৃষিতে ভর্তুকি প্রদান ও গবেষণাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশের মানচিত্র বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন।

আজ শেখ হাসিনার মেধা ও যোগ্যতার উপহার হল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। দেশের মানুষ আজ তিনবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারে। প্রত্যেক মানুষের আয় বেড়েছে এবং বেড়েছে স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রের ব্যাপক সুযোগ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জমির বহু খণ্ডন হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কম জমিতে বেশি ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী দেশের প্রতিটি গ্রাম হবে শহর। ফলস্বরূপ, আজ করোনা মহামারীতেও প্রতিটি গ্রামে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিবান্ধব সরকার। কৃষিকে অগ্রসর করতে এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চতকরণে ধান, চাল ও গম ক্রয় অব্যাহত রেখেছে সরকার।

অন্যদিকে সমুদ্রে মৎস্য আহরণকারীদের মৎস্য শিকার নিষিদ্ধের সময় যাতে খাদ্যের অভাব না হয়, সেজন্য তাদের প্রণোদনা হিসেবে খাদ্য সরবরাহের সিদ্ধান্তটিও চমক সৃষ্টি করেছে।

পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুগোপযোগী বহু প্রকল্পের বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিবিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিকে খাপ খাওয়ানোর জন্য ক্রমাগত খরা, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের কৃষিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাচ্ছেন। কৃষিবিপ্লবের মাধ্যমে পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলা করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীরা বদ্ধপরিকর।

তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের প্রতিরোধক হিসেবে বিভিন্ন অণুজীবের (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক) ওপর গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় ক্লাইমেট রিফিউজিদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করেছেন। ইতোমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করার জন্য আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৬০০ মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহিষ্ণু কৃষি গবেষণার গুরুত্ব বিবেচনায় নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি বিভাগ চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলস্বরূপ, হাজারও শিক্ষার্থী কৃষিবিজ্ঞানের ওপর স্নাতক ডিগ্রি লাভ করছে।

তাছাড়া পরিবেশের বিপর্যয় সংরক্ষণে শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পটিও চলমান। ওই প্রকল্পের আওতায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ আধুনিক পদ্ধতিতে অর্গানিক শাকসবজি, হাঁস-মুরগি ও মাছ চাষাবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রখেছে। প্রধানমন্ত্রী ওই প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি মানুষকে দিয়েছেন প্রকৃতির স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ। ফলে গ্রামীণ পরিবেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষাসহ স্বাস্থ্যসম্মত বাস্তুসংস্থান করোনা মহামারীতেও দৃশ্যমান। দেশের কৃষকরা ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলাসহ কৃষির উন্নয়নে বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্রতিবছর খরা, বন্যা ও জলাবদ্ধতাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য খরা, জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা সহিষ্ণু বিভিন্ন ধরনের ধান ও সবজি উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে পরিবেশবান্ধব কৃষি ফসলের চাষাবাদ অব্যাহত রেখে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখার জন্য কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনার মহামারীতেও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যের সরবরাহেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু কৃষিক্ষেত্রে নয়, শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিল্প-কারখানাগুলোয়ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্টরা কাজ করে যাচ্ছেন।

মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কৃষি ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ও পরিবেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা মাহামারীতে সরকারের সহযোগিতায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন ও পরিবেশের বিপর্যয় মোকাবেলায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

করোনা মহামারী মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী ৫০০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যেখানে কৃষকরা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষক স্বল্প সুদে কৃষিঋণ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছেন। দুর্যোগের সময় কৃষির উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী থাইল্যান্ড ও ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষর করেছেন। সম্প্রতি তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশবাসীকে বলেছেন, করোনা মহামারীর সময় কৃষির উৎপাদন ও সংরক্ষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় তথা বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, লবণাক্ততাসহ সব দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ও পরিবেশের বিপর্যয়কে প্রাধান্য দিয়েই শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রাধান্য দিয়েই বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি মুজিববর্ষ উপলক্ষে ১ কোটির বেশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়নস অব দি আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদানের জন্য ইতোমধ্যে তিনি ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ পুরস্কারও গ্রহণ করেছেন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশে গ্লোবাল সেন্টার অব অ্যাডাপটেশনের (জিসিএ) দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধন করেন। তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি গ্লোবাল ইস্যু। জিসিএ’র আওতায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, জিসিএ দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০০৯ সালে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট গঠন করা হয়। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে বলা যেতে পারে, আগের দশকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৭০ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। ওই অভিজ্ঞতা থেকে শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী ১০০ বছরের জন্য ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ গঠন করেন। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ‘ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন সামিট’ এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত কংগ্রেস কোপ-২৬ পরিচালনায় বাংলাদেশ থেকে জিসিএ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। আশা করা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে। বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে গ্রহণ করবেন বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]