তোষামোদকারীরাই যত নষ্টের মূল
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
তোষামোদকারীরাই যত নষ্টের মূল

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

১৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তোষামোদকারী

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্পর্কে অটোমান সম্রাট সুলতান ওসমান খানের একটি মন্তব্য ছিল, ‘ক্ষমতা একটা মোহ, একটা মাদকতা’! অল্প বয়সে বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সময় তিনি উপরোক্ত মন্তব্যটি করেন।

প্রায় এক যুগ আগে একবার আমেরিকা যাওয়ার পথে আমি ইস্তাম্বুলে কয়েকদিন অবস্থান করে অটোমান সম্রাটদের নির্মিত তোপকাপি প্রাসাদ, সুলতান আহমেদ মসজিদ, মিউজিয়াম ইত্যাদিসহ তাদের কীর্তিকলাপের প্রচুর নিদর্শন দেখে এসেছিলাম। পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম রাজতন্ত্রশাসিত সাম্রাজ্যের অটোমান রাজতন্ত্র ৬০০ বছরের বেশি সময় টিকে ছিল। আর ১৩ শতকের শেষদিকে একজন তুর্কি উপজাতীয় নেতা (ওসমান-১) আনাতোলিয়া শহরে বসে সাম্রাজ্যটির গোড়াপত্তন করেছিলেন।

অটোমান সাম্রাজ্যের এ দীর্ঘ সময়কালীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বেশ ক’জন মহীয়সী নারীকেও এ বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে দেখা যায়, যাদের অন্যতম হলেন হুররম সুলতান এবং কোসেম সুলতান। হুররম সুলতানকে সুলতানাদের সুলতানা বলা হতো। আর কোসেম সুলতান, সুলতান সোলায়মান কোসেম উপাধি লাভ করেছিলেন। তার স্বামী সুলতান আহমেদকে সুলতানের পিতামহী সাফিয়া সুলতান কর্তৃক বিষ প্রয়োগে হত্যার পর কোসেম সুলতান যখন কয়েকজন অল্পবয়সী সন্তান নিয়ে ভীষণ বিপাকে, সেই মুহূর্তে তিনি তার বুদ্ধি এবং চাতুর্যের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে সতিনপুত্র ওসমানকে সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত করে চমক সৃষ্টি করেন।

কারণ প্রায় একই বয়সী তার নিজ গর্ভজাতপুত্রকে তিনি মসনদে না বসিয়ে, বয়সে সামান্য বড় সতিনপুত্রকে সিংহাসন প্রদান করে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! যদিও অল্পবয়সী সুলতান ওসমানের পাশে থেকে কোসেম সুলতান নিজে সাম্রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন; কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেক্ষেত্রে সুলতান ওসমান বাগড়া দেয়া শুরু করায় তাদের দুজনের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়।

আর ঠিক সেই সময়ে জেনিসেরি সেনাদের একটি গ্রুপ বিশ্বাস ভঙ্গ করে সুলতান ওসমান খানের পিতার সৎমা হালিমে সুলতানের চক্রান্তে তাকে গ্রেফতার করে একটি দুর্গে নিয়ে হত্যা করেন। আর এ হত্যাকাণ্ডে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র জড়িত থাকায় কোসেম সুলতান শত চেষ্টা করেও সুলতান ওসমান খানের প্রাণ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন! কারণ সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী অংশটিকে অর্থের লোভ দেখিয়ে আগেই বিপথগামী এবং উচ্ছৃঙ্খল করে তোলা হয়েছিল। আর এভাবে সুদূর অতীত থেকেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় থেকে বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়ে বিপর্যয় ডেকে এনেছেন।

অতঃপর আজ থেকে একশ’ বছর আগে ১৯২০ সালে অটোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে এশিয়া মাইনর (আনাতোলিয়া) এবং ইউরোপের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত কামাল পাশার নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হলে গত এক শতকেও সেখানে বহু প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হয়েছে। আর এভাবে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ক্ষমতা তথা রাজনীতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে শত শত বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে; বিশেষ করে পৃথিবীর মুসলিম রাষ্ট্রগুলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের একেকটি আখড়া।

আমাদের বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকেও অনেক বাধা-বিপত্তি-ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে পথ চলতে হচ্ছে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদসহ এ নিয়ে তিনি চারবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যে একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ পলিটিশিয়ান সে কথাটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু একইসঙ্গে তিনি যে কতিপয় তোষামোদকারী ব্যক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত এ কথাটিও ঠিক। আর সুবিধাবাদী এ শ্রেণির তোষামোদকারী আমলা-মন্ত্রীসহ অন্যদের নিয়েই যত সমস্যা। কারণ এ শ্রেণির তোষামোদকারীরা কখনও দেশের আসল চেহারা বা ঘটনা প্রধানমন্ত্রীকে জানতে বা বুঝতে দেন না। বরং তাদের মন্ত্রণালয় বা সংসদীয় এলাকার আসল ঘটনা বা সমস্যা সরকারপ্রধান জেনে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়ে মন্ত্রিত্ব, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব চলে যাবে এই ভয়ে তারা সবসময় সেগুলো আড়াল করে রাখেন।

ফলে দিনে দিনে সেসব সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে একদিন ঠিকই তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়! আর আমাদের দেশে এসব ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। কারণ যেভাবেই হোক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে চলে যায়! আর এসব ব্যক্তি তার অপব্যহারও করেন। সারাজীবন রাজনীতি করে জীবনে একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে বিশেষ কেউ নিজকে সামলে নিয়ে সঠিক পথে চলে দলীয় আদর্শ সমুন্নত রাখলেও অনেকেই এসবের তোয়াক্কা না করে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন! দল বা দলীয় নেতার আদর্শে অনুপ্রাণিত না হয়ে তারা নিজ নিজ এজেন্ডা নিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে নেমে পড়েন।

এ শ্রেণির রাজনীতিকদের দেশের মানুষ ‘রাজনীতি করিয়া খাওয়া’ ব্যক্তি হিসেবে জানেন বা চেনেন। আর এ ‘রাজনীতি করিয়া খাওয়া’ ব্যক্তিদের কারণেই সময়ে সময়ে এক একটি দলে বিপর্যয় দেখা দেয়। যেমনটি হয়েছিল বিএনপির ক্ষেত্রে। এমনও কাউকে মন্ত্রী করা হয়েছিল, একমাত্র তোষামোদি ছাড়া যার অন্য কোনো যোগ্যতাই ছিল না! উদাহরণস্বরূপ লুৎফুজ্জামান বাবরের নামটি বলাই যায়। কাউকে ছোট করার জন্য নয়, আলোচনার জন্যই এখানে কথাটি বলা হল। যাক সে কথা।

এখন প্রশ্ন হল, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলে অযোগ্য কোনো ব্যক্তি নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব মন্ত্রিত্বে আছেন কিনা? যদি নাই থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন বেহাল দশা হল কেমন করে? জিকে শামীম, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরীনাই বা সৃষ্টি হল কেমন করে? জানি না এসব প্রশ্নের উত্তর কারও জানা আছে কিনা। তবে আমরা মনে করি, সরকারদলীয় যেসব নেতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা যাচাই-বাছাই করে অযোগ্যদের এখনই সরিয়ে দেয়া উচিত!

কারণ সরকারি আমলাদের সঙ্গে এখনই যে সংঘাত বা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে কিন্তু প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে- বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা ইত্যাদিতে একশ্রেণির নেতা আমলাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছেন না। ফলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথে যেতে হচ্ছে। তাছাড়া সরকারি আমলারাও এখন আর আগের মতো রাজনৈতিক নির্দেশ মান্য করছেন বলে মনে হয় না। কারণ রাজনীতি নিজেই এখন রুগ্ন ও দুর্বল! এ অবস্থায় সরকারি আমলারাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন।

একশ্রেণির নেতাদের দুর্নীতি-দুর্বলতা দেখে তারাও এখন নিজেদের চেহারা প্রকাশ করে চলেছেন। অনেক অফিসেই এখন বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। একই নথি ছাড় করাতে বারবার ঘুষ দাবির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, আগে একবার যে ঘুষ গ্রহণ করেছেন, বুক ফুলিয়ে সে কথা অস্বীকার করে তা প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে।

এ অবস্থায়, সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া মামলা করা যাবে না মর্মে সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাদের অনেকেই এখন আরও বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন! তাদের অনেকেরই ধারণা, বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে তাদের শক্তির ওপর নির্ভরশীল! রাজনৈতিক শক্তিতে যে সরকার পরিচালিত হয় বা হচ্ছে এমন চিন্তা-চেতনা তারা মন থেকে মুছে ফেলেছেন, সরকারের জন্য যা একটি অশনিসংকেতও বটে।

সুতরাং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দেশ, জাতি, সরকারসহ সবার জন্যই তা কল্যাণকর হবে। আর আমাদের লেখালেখি করাও সার্থক হবে। তা না করে যদি মনে করা হয়, এসব লেখালেখির কোনো মূল্য নেই, সেক্ষেত্রে আমাদেরও বলার কিছু নেই। কারণ আমাদের কাজ হল কোনো অন্যায়, অসঙ্গতি, অনাচার সরকারের সামনে তুলে ধরা। দেশের মানুষের চিন্তা-ভাবনার সঠিক প্রতিফলন ঘটানো। আর লেখার মাধ্যমে আমরা তেমনটাই করে থাকি। সমাজ বিনির্মাণে চেষ্টা চালাই।

সুধী পাঠক, অটোমান সম্রাট ওসমান খানের একটি বক্তব্য দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা একটা মোহ, একটা মাদকতা’। সেই অটোমান সাম্রাজ্য শতবর্ষ আগে বিলীন হলেও ক্ষমতার সেই মোহ, সেই মাদকতা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, তথা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে কি বিলীন হয়েছে?

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

তোষামোদকারীরাই যত নষ্টের মূল

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
১৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
তোষামোদকারী
প্রতীকী ছবি (সংগৃহীত)

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্পর্কে অটোমান সম্রাট সুলতান ওসমান খানের একটি মন্তব্য ছিল, ‘ক্ষমতা একটা মোহ, একটা মাদকতা’! অল্প বয়সে বিশাল অটোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়ে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সময় তিনি উপরোক্ত মন্তব্যটি করেন।

প্রায় এক যুগ আগে একবার আমেরিকা যাওয়ার পথে আমি ইস্তাম্বুলে কয়েকদিন অবস্থান করে অটোমান সম্রাটদের নির্মিত তোপকাপি প্রাসাদ, সুলতান আহমেদ মসজিদ, মিউজিয়াম ইত্যাদিসহ তাদের কীর্তিকলাপের প্রচুর নিদর্শন দেখে এসেছিলাম। পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম রাজতন্ত্রশাসিত সাম্রাজ্যের অটোমান রাজতন্ত্র ৬০০ বছরের বেশি সময় টিকে ছিল। আর ১৩ শতকের শেষদিকে একজন তুর্কি উপজাতীয় নেতা (ওসমান-১) আনাতোলিয়া শহরে বসে সাম্রাজ্যটির গোড়াপত্তন করেছিলেন।

অটোমান সাম্রাজ্যের এ দীর্ঘ সময়কালীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বেশ ক’জন মহীয়সী নারীকেও এ বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে দেখা যায়, যাদের অন্যতম হলেন হুররম সুলতান এবং কোসেম সুলতান। হুররম সুলতানকে সুলতানাদের সুলতানা বলা হতো। আর কোসেম সুলতান, সুলতান সোলায়মান কোসেম উপাধি লাভ করেছিলেন। তার স্বামী সুলতান আহমেদকে সুলতানের পিতামহী সাফিয়া সুলতান কর্তৃক বিষ প্রয়োগে হত্যার পর কোসেম সুলতান যখন কয়েকজন অল্পবয়সী সন্তান নিয়ে ভীষণ বিপাকে, সেই মুহূর্তে তিনি তার বুদ্ধি এবং চাতুর্যের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে সতিনপুত্র ওসমানকে সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত করে চমক সৃষ্টি করেন।

কারণ প্রায় একই বয়সী তার নিজ গর্ভজাতপুত্রকে তিনি মসনদে না বসিয়ে, বয়সে সামান্য বড় সতিনপুত্রকে সিংহাসন প্রদান করে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন! যদিও অল্পবয়সী সুলতান ওসমানের পাশে থেকে কোসেম সুলতান নিজে সাম্রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন; কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সেক্ষেত্রে সুলতান ওসমান বাগড়া দেয়া শুরু করায় তাদের দুজনের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়।

আর ঠিক সেই সময়ে জেনিসেরি সেনাদের একটি গ্রুপ বিশ্বাস ভঙ্গ করে সুলতান ওসমান খানের পিতার সৎমা হালিমে সুলতানের চক্রান্তে তাকে গ্রেফতার করে একটি দুর্গে নিয়ে হত্যা করেন। আর এ হত্যাকাণ্ডে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র জড়িত থাকায় কোসেম সুলতান শত চেষ্টা করেও সুলতান ওসমান খানের প্রাণ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন! কারণ সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী অংশটিকে অর্থের লোভ দেখিয়ে আগেই বিপথগামী এবং উচ্ছৃঙ্খল করে তোলা হয়েছিল। আর এভাবে সুদূর অতীত থেকেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় থেকে বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়ে বিপর্যয় ডেকে এনেছেন।

অতঃপর আজ থেকে একশ’ বছর আগে ১৯২০ সালে অটোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে এশিয়া মাইনর (আনাতোলিয়া) এবং ইউরোপের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত কামাল পাশার নেতৃত্বে আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরু হলে গত এক শতকেও সেখানে বহু প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হয়েছে। আর এভাবে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ক্ষমতা তথা রাজনীতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে শত শত বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে; বিশেষ করে পৃথিবীর মুসলিম রাষ্ট্রগুলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের একেকটি আখড়া।

আমাদের বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকেও অনেক বাধা-বিপত্তি-ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে পথ চলতে হচ্ছে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদসহ এ নিয়ে তিনি চারবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যে একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ পলিটিশিয়ান সে কথাটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু একইসঙ্গে তিনি যে কতিপয় তোষামোদকারী ব্যক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত এ কথাটিও ঠিক। আর সুবিধাবাদী এ শ্রেণির তোষামোদকারী আমলা-মন্ত্রীসহ অন্যদের নিয়েই যত সমস্যা। কারণ এ শ্রেণির তোষামোদকারীরা কখনও দেশের আসল চেহারা বা ঘটনা প্রধানমন্ত্রীকে জানতে বা বুঝতে দেন না। বরং তাদের মন্ত্রণালয় বা সংসদীয় এলাকার আসল ঘটনা বা সমস্যা সরকারপ্রধান জেনে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়ে মন্ত্রিত্ব, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব চলে যাবে এই ভয়ে তারা সবসময় সেগুলো আড়াল করে রাখেন।

ফলে দিনে দিনে সেসব সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে একদিন ঠিকই তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়! আর আমাদের দেশে এসব ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। কারণ যেভাবেই হোক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্তৃত্ব, নেতৃত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে চলে যায়! আর এসব ব্যক্তি তার অপব্যহারও করেন। সারাজীবন রাজনীতি করে জীবনে একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে বিশেষ কেউ নিজকে সামলে নিয়ে সঠিক পথে চলে দলীয় আদর্শ সমুন্নত রাখলেও অনেকেই এসবের তোয়াক্কা না করে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন! দল বা দলীয় নেতার আদর্শে অনুপ্রাণিত না হয়ে তারা নিজ নিজ এজেন্ডা নিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে নেমে পড়েন।

এ শ্রেণির রাজনীতিকদের দেশের মানুষ ‘রাজনীতি করিয়া খাওয়া’ ব্যক্তি হিসেবে জানেন বা চেনেন। আর এ ‘রাজনীতি করিয়া খাওয়া’ ব্যক্তিদের কারণেই সময়ে সময়ে এক একটি দলে বিপর্যয় দেখা দেয়। যেমনটি হয়েছিল বিএনপির ক্ষেত্রে। এমনও কাউকে মন্ত্রী করা হয়েছিল, একমাত্র তোষামোদি ছাড়া যার অন্য কোনো যোগ্যতাই ছিল না! উদাহরণস্বরূপ লুৎফুজ্জামান বাবরের নামটি বলাই যায়। কাউকে ছোট করার জন্য নয়, আলোচনার জন্যই এখানে কথাটি বলা হল। যাক সে কথা।

এখন প্রশ্ন হল, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলে অযোগ্য কোনো ব্যক্তি নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব মন্ত্রিত্বে আছেন কিনা? যদি নাই থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন বেহাল দশা হল কেমন করে? জিকে শামীম, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরীনাই বা সৃষ্টি হল কেমন করে? জানি না এসব প্রশ্নের উত্তর কারও জানা আছে কিনা। তবে আমরা মনে করি, সরকারদলীয় যেসব নেতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা যাচাই-বাছাই করে অযোগ্যদের এখনই সরিয়ে দেয়া উচিত!

কারণ সরকারি আমলাদের সঙ্গে এখনই যে সংঘাত বা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে কিন্তু প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে- বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা ইত্যাদিতে একশ্রেণির নেতা আমলাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছেন না। ফলে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পথে যেতে হচ্ছে। তাছাড়া সরকারি আমলারাও এখন আর আগের মতো রাজনৈতিক নির্দেশ মান্য করছেন বলে মনে হয় না। কারণ রাজনীতি নিজেই এখন রুগ্ন ও দুর্বল! এ অবস্থায় সরকারি আমলারাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন।

একশ্রেণির নেতাদের দুর্নীতি-দুর্বলতা দেখে তারাও এখন নিজেদের চেহারা প্রকাশ করে চলেছেন। অনেক অফিসেই এখন বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। একই নথি ছাড় করাতে বারবার ঘুষ দাবির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, আগে একবার যে ঘুষ গ্রহণ করেছেন, বুক ফুলিয়ে সে কথা অস্বীকার করে তা প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে।

এ অবস্থায়, সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে সরকারের পূর্ব অনুমতি ছাড়া মামলা করা যাবে না মর্মে সিদ্ধান্ত হওয়ায় তাদের অনেকেই এখন আরও বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন! তাদের অনেকেরই ধারণা, বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে তাদের শক্তির ওপর নির্ভরশীল! রাজনৈতিক শক্তিতে যে সরকার পরিচালিত হয় বা হচ্ছে এমন চিন্তা-চেতনা তারা মন থেকে মুছে ফেলেছেন, সরকারের জন্য যা একটি অশনিসংকেতও বটে।

সুতরাং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে দেশ, জাতি, সরকারসহ সবার জন্যই তা কল্যাণকর হবে। আর আমাদের লেখালেখি করাও সার্থক হবে। তা না করে যদি মনে করা হয়, এসব লেখালেখির কোনো মূল্য নেই, সেক্ষেত্রে আমাদেরও বলার কিছু নেই। কারণ আমাদের কাজ হল কোনো অন্যায়, অসঙ্গতি, অনাচার সরকারের সামনে তুলে ধরা। দেশের মানুষের চিন্তা-ভাবনার সঠিক প্রতিফলন ঘটানো। আর লেখার মাধ্যমে আমরা তেমনটাই করে থাকি। সমাজ বিনির্মাণে চেষ্টা চালাই।

সুধী পাঠক, অটোমান সম্রাট ওসমান খানের একটি বক্তব্য দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা একটা মোহ, একটা মাদকতা’। সেই অটোমান সাম্রাজ্য শতবর্ষ আগে বিলীন হলেও ক্ষমতার সেই মোহ, সেই মাদকতা আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, তথা রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে কি বিলীন হয়েছে?

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট