করোনা সংক্রমণের পরিসংখ্যান বিভ্রান্তি
jugantor
করোনা সংক্রমণের পরিসংখ্যান বিভ্রান্তি

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

১৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ রিপোর্ট (২ অক্টোবর ২০২০) অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৫ হাজার ৮৬০। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৮ হাজার ৪১০ জন। ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩.৬০ শতাংশ। এ হার কমে গিয়ে ২.১ শতাংশ হলেও ২০৩৫ সালে এর জনসংখ্যা ৩ কোটি ১৫ লাখে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হয়েছে।

১৯৫৯ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬০ এবং ২০১৬ সালে এ সংখ্যা গিয়ে পৌঁছায় ১ কোটি ৮০ লাখের কোঠায়। এ বছর ২ কোটি পার হওয়ার অর্থ হল- প্রতি বছর ৫ লাখ নতুন মানুষ ঢাকার মোট জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভাসমান মানুষের সংখ্যা এ হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।

গত ১২ অক্টোবর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএইড এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন কর্তৃক আর্থিক সহায়তায় করা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের দেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবির)-এর যৌথভাবে করা এক গবেষণা অনুযায়ী, অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় পাওয়া গেছে ঢাকার ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ঢাকার বস্তিগুলোতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪ শতাংশ মানুষ। ঢাকার সংক্রমণ দিল্লির চেয়ে বেশি। কারণ, দিল্লিতে ৩৩ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।

গবেষণার জন্য রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৫টিকে বেছে নেয়া হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি মহল্লা বাছাই করে ১২০টি বাড়িকে এ জরিপে নেয়া হয়। জরিপ চলে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত। গবেষকরা বলেছেন, এ গবেষণা করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগীদের চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন দেয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।

এ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ করোনায় আক্রান্ত। তাহলে তারা সংখ্যায় মোট কতজন? তারা মোট ১ কোটি ২ হাজার ৯৩০ জন। অর্থাৎ, গত মার্চ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ঢাকায় কম-বেশি ১ কোটির অধিক মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন! আমাদের সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত জানানো হয়েছে- দেশে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত করোনা রোগীর মোট সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ জন। তার মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ২ লাখ ৯৯ হাজার ২২৯ জন। মারা গেছেন ৫ হাজার ৬০৮ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা বিশ্বে মারা গেছেন ১১ লাখ ৩ হাজার ৩৮০ এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৩ কোটি ৯২ লাখ ৭ হাজার ৫৮৪ মানুষ। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান, এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০ কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বহু মানুষ আক্রান্ত হয়ে নানা কুসংস্কারের ভয়ে নিজেদের গোপন রেখেছেন।

অনেকে অজান্তে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে আরোগ্য লাভ করলেও নানা জটিলতায় ভুগছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়- করোনা সংক্রমণের তথ্যে ব্যাপক গরমিল সব জায়গায়। এ রোগ সম্পর্কিত তথ্যপ্রবাহের ওপর কোথাও সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। অথবা করোনার প্রভাবে সবাই নানাভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখছে। দেশে-বিদেশে করোনার তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করার বদনাম সেই শুরু থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি আর তাদেরই অনুমান, এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০ কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন! কেন এত বিভ্রাট? কেন এত বৈপরীত্য?

সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ আর আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী শুধু ঢাকা শহরেই ১ কোটির অধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত!

আমরা এখন কোথায় যাব? করোনা তার কারিশমায় সারা পৃথিবীটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে। অথচ মানুষ সেই সংবাদটির সঠিক তথ্য আজও সঠিকভাবে প্রকাশ করতে জানে না! জানলেও ভুল জানে। অথবা প্রকাশ করলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক নয়। প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার আশরাফুল মাখলুকাত মারা যাচ্ছে বলে যে সংবাদ বের হচ্ছে সেটিও তাহলে সঠিক নয়, প্রকৃত সংখ্যা এর ঢের বেশি। কারণ, করোনায় মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করার জ্ঞান ও বাস্তবতা মানুষের ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বলে উপরিউক্ত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এ গবেষণার মাঠ তথ্য (খানা) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ তথা গবেষণাকাল ছিল- মধ্য এপ্রিল থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত। গবেষণাকাল শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর যখন সাধারণ মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে তখন এ তথ্য প্রকাশিত হল। বিশেষ করে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর আগে তা প্রকাশিত হলে মানুষ সতর্ক হতো।

অথচ এ তথ্য প্রকাশিত হল এ আন্দোলন চলার উত্তাল সময়ে, যখন সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমে আসায় মানুষের করোনাভীতি আপাতত কেটে যাচ্ছে। তাই এ মুহূর্তের সামাজিক বাস্তবতায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে।

এছাড়া ওই গবেষণার তথ্য প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, দেশ কি হার্ড ইমিউনিটির (গণরোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা) পথে? আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরি বলেন, হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠার কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। সংক্রমিত ব্যক্তিদের শরীরে কতদিন অ্যান্টিবডি থাকবে, তাও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না (প্রথম আলো, ১৩.১০.২০২০)।

করোনায় মানুষের ভ্রমের ঘোরটাও দখল হয়ে গেছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিকাশ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে বড়াই করে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যে লাফালাফি করছে, সেক্ষেত্রেও কোনো কার্যকর সুফল নেই। রোবটকে আইকিউ দিয়ে চাবি টিপে দিয়ে দিলেও ও শিখে দেয়া বুলি অনুযায়ী কিছু সীমাবদ্ধ কাজ করতে পারে মাত্র। কারণ, ওর তো কোনো রক্ত নেই, নার্ভ নেই। ও কাউকে খাঁমচাতে পারলেও নিজে প্রাকৃতিক আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। নাচতে পারলেও মাতাল হয়ে কাউকে ধর্ষণের জন্য আক্রমণ করতে অপারগ।

রোবট মানুষের নিঃসঙ্গতার সাথী হয়েছে বলে বেকুব মানুষ প্রচার শুরু করে দিলেও সে কি বিয়ে করতে পারে? ওদের বাস্তবতা ও প্রাকৃতিক জ্ঞান নেই। ওরা এখনও বিয়ে বা প্রাকৃতিক কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। যেদিন তা করবে সেদিন হয়তো ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা শুরু হয়ে যাবে। তখন সমাজে আর কোনো মাদক থাকবে না, ধর্ষণকারী থাকবে না, কোনো অপরাধীও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

পৃথিবীব্যাপী এই ঘোরপ্যাঁচটা তাহলে ধূর্ত মানুষেরাই তৈরি করেছে। প্রতিনিয়ত চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, বেঈমানি করে এমন এক বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছে তারা যে তা থেকে এখন মুক্তি খুঁজতে গিয়েও নাকাল হতে হচ্ছে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

করোনা সংক্রমণের পরিসংখ্যান বিভ্রান্তি

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
১৭ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ রিপোর্ট (২ অক্টোবর ২০২০) অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৫ হাজার ৮৬০। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৮ হাজার ৪১০ জন। ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩.৬০ শতাংশ। এ হার কমে গিয়ে ২.১ শতাংশ হলেও ২০৩৫ সালে এর জনসংখ্যা ৩ কোটি ১৫ লাখে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হয়েছে।

১৯৫৯ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬০ এবং ২০১৬ সালে এ সংখ্যা গিয়ে পৌঁছায় ১ কোটি ৮০ লাখের কোঠায়। এ বছর ২ কোটি পার হওয়ার অর্থ হল- প্রতি বছর ৫ লাখ নতুন মানুষ ঢাকার মোট জনসংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভাসমান মানুষের সংখ্যা এ হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।

গত ১২ অক্টোবর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএইড এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন কর্তৃক আর্থিক সহায়তায় করা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের দেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবির)-এর যৌথভাবে করা এক গবেষণা অনুযায়ী, অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় পাওয়া গেছে ঢাকার ৪৫ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ঢাকার বস্তিগুলোতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪ শতাংশ মানুষ। ঢাকার সংক্রমণ দিল্লির চেয়ে বেশি। কারণ, দিল্লিতে ৩৩ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।

গবেষণার জন্য রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৫টিকে বেছে নেয়া হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি মহল্লা বাছাই করে ১২০টি বাড়িকে এ জরিপে নেয়া হয়। জরিপ চলে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত। গবেষকরা বলেছেন, এ গবেষণা করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগীদের চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন দেয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।

এ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ করোনায় আক্রান্ত। তাহলে তারা সংখ্যায় মোট কতজন? তারা মোট ১ কোটি ২ হাজার ৯৩০ জন। অর্থাৎ, গত মার্চ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ঢাকায় কম-বেশি ১ কোটির অধিক মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়েছেন! আমাদের সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত জানানো হয়েছে- দেশে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত করোনা রোগীর মোট সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ জন। তার মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ২ লাখ ৯৯ হাজার ২২৯ জন। মারা গেছেন ৫ হাজার ৬০৮ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা বিশ্বে মারা গেছেন ১১ লাখ ৩ হাজার ৩৮০ এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৩ কোটি ৯২ লাখ ৭ হাজার ৫৮৪ মানুষ। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান, এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০ কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বহু মানুষ আক্রান্ত হয়ে নানা কুসংস্কারের ভয়ে নিজেদের গোপন রেখেছেন।

অনেকে অজান্তে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে আরোগ্য লাভ করলেও নানা জটিলতায় ভুগছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়- করোনা সংক্রমণের তথ্যে ব্যাপক গরমিল সব জায়গায়। এ রোগ সম্পর্কিত তথ্যপ্রবাহের ওপর কোথাও সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। অথবা করোনার প্রভাবে সবাই নানাভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখছে। দেশে-বিদেশে করোনার তথ্য নিয়ে লুকোচুরি করার বদনাম সেই শুরু থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি আর তাদেরই অনুমান, এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০ কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন! কেন এত বিভ্রাট? কেন এত বৈপরীত্য?

সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ আর আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী শুধু ঢাকা শহরেই ১ কোটির অধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত!

আমরা এখন কোথায় যাব? করোনা তার কারিশমায় সারা পৃথিবীটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে। অথচ মানুষ সেই সংবাদটির সঠিক তথ্য আজও সঠিকভাবে প্রকাশ করতে জানে না! জানলেও ভুল জানে। অথবা প্রকাশ করলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক নয়। প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার আশরাফুল মাখলুকাত মারা যাচ্ছে বলে যে সংবাদ বের হচ্ছে সেটিও তাহলে সঠিক নয়, প্রকৃত সংখ্যা এর ঢের বেশি। কারণ, করোনায় মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করার জ্ঞান ও বাস্তবতা মানুষের ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বলে উপরিউক্ত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।

এ গবেষণার মাঠ তথ্য (খানা) সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ তথা গবেষণাকাল ছিল- মধ্য এপ্রিল থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত। গবেষণাকাল শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর যখন সাধারণ মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে তখন এ তথ্য প্রকাশিত হল। বিশেষ করে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর আগে তা প্রকাশিত হলে মানুষ সতর্ক হতো।

অথচ এ তথ্য প্রকাশিত হল এ আন্দোলন চলার উত্তাল সময়ে, যখন সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমে আসায় মানুষের করোনাভীতি আপাতত কেটে যাচ্ছে। তাই এ মুহূর্তের সামাজিক বাস্তবতায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে।

এছাড়া ওই গবেষণার তথ্য প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, দেশ কি হার্ড ইমিউনিটির (গণরোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা) পথে? আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরি বলেন, হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠার কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। সংক্রমিত ব্যক্তিদের শরীরে কতদিন অ্যান্টিবডি থাকবে, তাও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না (প্রথম আলো, ১৩.১০.২০২০)।

করোনায় মানুষের ভ্রমের ঘোরটাও দখল হয়ে গেছে। বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বিকাশ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নিয়ে বড়াই করে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যে লাফালাফি করছে, সেক্ষেত্রেও কোনো কার্যকর সুফল নেই। রোবটকে আইকিউ দিয়ে চাবি টিপে দিয়ে দিলেও ও শিখে দেয়া বুলি অনুযায়ী কিছু সীমাবদ্ধ কাজ করতে পারে মাত্র। কারণ, ওর তো কোনো রক্ত নেই, নার্ভ নেই। ও কাউকে খাঁমচাতে পারলেও নিজে প্রাকৃতিক আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। নাচতে পারলেও মাতাল হয়ে কাউকে ধর্ষণের জন্য আক্রমণ করতে অপারগ।

রোবট মানুষের নিঃসঙ্গতার সাথী হয়েছে বলে বেকুব মানুষ প্রচার শুরু করে দিলেও সে কি বিয়ে করতে পারে? ওদের বাস্তবতা ও প্রাকৃতিক জ্ঞান নেই। ওরা এখনও বিয়ে বা প্রাকৃতিক কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। যেদিন তা করবে সেদিন হয়তো ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা শুরু হয়ে যাবে। তখন সমাজে আর কোনো মাদক থাকবে না, ধর্ষণকারী থাকবে না, কোনো অপরাধীও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

পৃথিবীব্যাপী এই ঘোরপ্যাঁচটা তাহলে ধূর্ত মানুষেরাই তৈরি করেছে। প্রতিনিয়ত চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি, বেঈমানি করে এমন এক বৈরী পরিবেশ তৈরি করেছে তারা যে তা থেকে এখন মুক্তি খুঁজতে গিয়েও নাকাল হতে হচ্ছে।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]