কতিপয় নির্দেশনা ও প্রসঙ্গ কথা
jugantor
কতিপয় নির্দেশনা ও প্রসঙ্গ কথা

  মুঈদ রহমান  

১৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একজন মানুষ অপরজনের মতো নয়। প্রত্যেক মানুষের মানসিক গঠন আলাদা। তাই মানুষের ভাবনার জগতে ভিন্নতা আছে বা থাকবে। একই সঙ্গে মানুষ আবার সামাজিক জীবও। দৈনন্দিন জীবনে একজন মানুষ অন্যজনের ওপর নির্ভরশীল। একজনের শ্রম আরেকজনের জীবন বাঁচায়, আবার আরেকজনের দেয়া পারিশ্রমিক দিয়ে অপরজন জীবননির্বাহ করে। তাই এই ভিন্ন মানসিকতার মানুষ যখন সমাজবদ্ধ হয়, তখন প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সমঝোতায় আসে। অলিখিত কিছু চুক্তির ভেতর দিয়ে তারা জীবনযাপন করে। এরকম হাজারো সমাজ নিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। সেই রাষ্ট্রের আকার বড় হওয়ায় সে কিছু লিখিত আইন-নিয়ম-কানুন তৈরি করে, যাতে রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থাকে কোনো একক ব্যক্তি ইচ্ছামতো আঘাত করে ভেঙেচুরে একাকার করে দিতে না পারে।

সামন্ত সমাজে এরকম আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখতেন রাজা। তিনি যেহেতু রাষ্ট্রের মালিক ছিলেন, তাই আইন আদেশের একক ক্ষমতাধারী ছিলেন। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কোনো একক মালিকানা নেই, মালিক সমগ্র জনগণ। জনগণ ভোটের মাধ্যমেই তাদের পছন্দসই সরকার নির্ধারণ করবেন। আমাদের প্রায় সাড়ে দশ কোটি ভোটারের ভোটের মধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাগে রয়েছে মাত্র একটি ভোট এবং আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের ভোটও একটি। তাই সরকারকে যে কোনো নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথাটি মাথায় রাখতে হবে। খুব গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে, যে আইনটি করা হচ্ছে তা কি সমাজের মানুষের কল্যাণে করা হচ্ছে, নাকি দলীয় স্বার্থে অপরকে হুমকির মুখে রাখার উদ্দেশ্যে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদ, যাকে বলে আইনসভা। যে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা যত বেশি, সেদেশে আইনের যুক্তিতর্ক হয় তত বেশি। শত আলোচনার পর আইনটি পাস হয়। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ যতক্ষণ চলে তার মাত্র ৯ শতাংশ সময় ব্যয় হয় আইন প্রণয়নের বেলায়। আলোচনা খুব একটা হয় না। আমাদের জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস করতে সময় লাগে মাত্র ৩২ মিনিট আর ভারতে লাগে ১৮৬ মিনিট।

কিন্তু যখন সংসদের কার্যক্রম স্থগিত থাকে, তখন জরুরি ভিত্তিতে কিছু কিছু আইন জারি অথবা সংশোধন করে অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। ক’দিন আগে সারা দেশে প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দফতর তার কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে কিছু নির্দেশনা জারি করে থাকে। ৭ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) শিক্ষার্থীদের যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছয়টি নির্দেশনা জারি করেছে। যে কোনো আইন বা নির্দেশনা যেন সমাজকে সংহত রাখার জন্য হয়, আতঙ্কিত করার জন্য নয়। কিন্তু মাউশির নির্দেশনাগুলোয় শঙ্কিত হওয়ার মতো উপাদান রয়েছে। এর অপব্যাখ্যা বা অপব্যবহার যে কারও জীবন বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। এ নিয়ে দু’দিন আগে কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আমি তার আদলে আরও কিছু সংযোজন করতে চাই।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তার অনেকটাই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে উল্লেখ আছে। তাই অনেকে এগুলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাবলেও ভুলের কিছু থাকবে না। এখানে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্তমান সমাজ বিকাশে এবং আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাকে অনস্বীকার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর তা ব্যবহারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে : প্রথমত, ‘সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সার্ভিস বা পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পোস্ট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।’ এখানে সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে গড়ে ওঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দেশে এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪১, অনিবন্ধিত দল আছে ১৫টি এবং জোট আছে ৬টি। এদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ সরকার গঠন করে। তাই সরকার নিয়ে একেকজনের একেক মতামত থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সবার, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।

এবার ভাবমূর্তির কথায় আসা যাক। কেউ কারও ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে না, যদি না সে নিজে ভাবমূর্তি নষ্ট করে। সরকারের জনস্বার্থবিরোধী যে কোনো সিদ্ধান্ত তার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে; আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়ে যে কেউ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই অপরের সমালোচনার দিকে তীর না ছুড়ে নিজের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার প্রতি দৃষ্টি দিলে তা অধিকতর কার্যকর হবে। ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান’ ধারণাটি আপেক্ষিক। সাধারণভাবে ব্যবহার হলে তেমন সমস্যা নয়। কিন্তু যদি আইনগত ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হয় তাহলে তা আরও সুনির্দিষ্ট করা জরুরি। কত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, তাদের সমালোচনা করা কি অপরাধ?

দ্বিতীয় নির্দেশনায় বলা আছে, ‘জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনো রকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে।’ যে কোনো চেতনার উদ্ভব হয় শিক্ষা থেকে। আমাদের শিশুদের আমরা চার ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাই- প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ইংলিশ ভার্সন ও ইংলিশ মিডিয়াম। চারটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি চর্চা করে আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে। তাদের এ চারটি ধারায় বিভক্ত করে কী ধরনের ঐক্যবদ্ধ জাতি আশা করা যায়? আমরা বহুকাল ধরেই বলে এসেছি একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার কথা। সে কথায় কান না দিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতি প্রত্যাশা করা কি সমীচীন? আর এ নিয়ে দু’কথা বললেই শিক্ষার্থীরা অপরাধী হয়ে যাবে? আরেকটি অংশে আছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি পরিপন্থী কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না।’ এটি ভালো কথাই বলা হয়েছে। যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কী প্রয়োজন আছে অন্যের বিশ্বাসকে নিয়ে কটাক্ষ করার? সমাজের প্রত্যেক মানুষেরই একে অপরকে সমীহ করা উচিত। পৃথিবীতে খ্রিস্টান আছেন প্রায় ২৫০ কোটি, মুসলিম প্রায় ২০০ কোটি, হিন্দু ১৩০ কোটি আর বৌদ্ধ আছেন ৫৩ কোটি। তাদের অনুভূতিকে আমরা অবশ্যই সম্মান করব। কিন্তু ১২০ কোটি মানুষ আছেন যারা বিশ্বের ৪ হাজার ৩০০টি ধর্মের কোনোটিতেই বিশ্বাস করেন না। তাদেরকে আমরা ‘জাগতিক’ বলি। তারাও কিন্তু সমাজ বিকাশ ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। আমি একাধিক ধর্মসভা শুনেছি যেখানে তাদের হেয় করে আপত্তিকর উক্তি করা হয়েছে, এমনকি ঘৃণার সঙ্গে ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটি উচ্চারণ করা হয়েছে। অনুভূতির কথাই যদি বলি, তাহলে পৃথিবীর সব মানুষের অনুভূতির দিকটি বিবেচনা করা সঙ্গত। আর ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতের কথা বলছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলেই তো এদেশে টেকা দায়! ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যত সহজ, বাস্তবে তার সমন্বয় করা তত সহজ নয়।

তৃতীয় নির্দেশনাটি দায়সারা ও প্রথাগত। যে কোনো শাসকগোষ্ঠী এটি তাদের সুবিধার্থে করে থাকে। ‘জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো বিষয় লেখা, অডিও বা ভিডিও প্রকাশ বা শেয়ার করা ... বিরত থাকতে হবে।’ অসন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে তো মানুষ সংক্ষুব্ধ হবেই। গত সপ্তাহজুড়ে সারা দেশে ধর্ষণের প্রতিবাদে এবং ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবিতে রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। মন্ত্রিপরিষদ দ্রুত সময়ের মধ্যে বৈঠকে বসে। সেখানে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর শেষে তা অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশ পায়। এই সংশোধন তো এসেছে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ফল হিসেবে। এভাবে কোনো সামাজিক অপরাধের প্রতিবাদ করলে একজন শিক্ষার্থীর শাস্তি হবে কেন?

মানুষের মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, ‘নার্স দ্য বেবি, প্রটেক্ট দ্য চাইল্ড অ্যান্ড ফ্রি দ্য ম্যান’। এখন তো দেখছি মুক্তকথা বলার সময়টাকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা নিশ্চয়ই ‘স্বাধীনতা’ শব্দের অর্থ বুঝি; অপরের স্বাধীনতা নষ্ট না করে নিজে স্বাধীনভাবে বলা-চলা। শিক্ষার্থীদের ওপর এর চেয়ে বেশি কিছু চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে কি?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

কতিপয় নির্দেশনা ও প্রসঙ্গ কথা

 মুঈদ রহমান 
১৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একজন মানুষ অপরজনের মতো নয়। প্রত্যেক মানুষের মানসিক গঠন আলাদা। তাই মানুষের ভাবনার জগতে ভিন্নতা আছে বা থাকবে। একই সঙ্গে মানুষ আবার সামাজিক জীবও। দৈনন্দিন জীবনে একজন মানুষ অন্যজনের ওপর নির্ভরশীল। একজনের শ্রম আরেকজনের জীবন বাঁচায়, আবার আরেকজনের দেয়া পারিশ্রমিক দিয়ে অপরজন জীবননির্বাহ করে। তাই এই ভিন্ন মানসিকতার মানুষ যখন সমাজবদ্ধ হয়, তখন প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সমঝোতায় আসে। অলিখিত কিছু চুক্তির ভেতর দিয়ে তারা জীবনযাপন করে। এরকম হাজারো সমাজ নিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। সেই রাষ্ট্রের আকার বড় হওয়ায় সে কিছু লিখিত আইন-নিয়ম-কানুন তৈরি করে, যাতে রাষ্ট্র বা সমাজব্যবস্থাকে কোনো একক ব্যক্তি ইচ্ছামতো আঘাত করে ভেঙেচুরে একাকার করে দিতে না পারে।

সামন্ত সমাজে এরকম আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাখতেন রাজা। তিনি যেহেতু রাষ্ট্রের মালিক ছিলেন, তাই আইন আদেশের একক ক্ষমতাধারী ছিলেন। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কোনো একক মালিকানা নেই, মালিক সমগ্র জনগণ। জনগণ ভোটের মাধ্যমেই তাদের পছন্দসই সরকার নির্ধারণ করবেন। আমাদের প্রায় সাড়ে দশ কোটি ভোটারের ভোটের মধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাগে রয়েছে মাত্র একটি ভোট এবং আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের ভোটও একটি। তাই সরকারকে যে কোনো নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথাটি মাথায় রাখতে হবে। খুব গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে, যে আইনটি করা হচ্ছে তা কি সমাজের মানুষের কল্যাণে করা হচ্ছে, নাকি দলীয় স্বার্থে অপরকে হুমকির মুখে রাখার উদ্দেশ্যে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদ, যাকে বলে আইনসভা। যে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা যত বেশি, সেদেশে আইনের যুক্তিতর্ক হয় তত বেশি। শত আলোচনার পর আইনটি পাস হয়। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ যতক্ষণ চলে তার মাত্র ৯ শতাংশ সময় ব্যয় হয় আইন প্রণয়নের বেলায়। আলোচনা খুব একটা হয় না। আমাদের জাতীয় সংসদে একটি আইন পাস করতে সময় লাগে মাত্র ৩২ মিনিট আর ভারতে লাগে ১৮৬ মিনিট।

কিন্তু যখন সংসদের কার্যক্রম স্থগিত থাকে, তখন জরুরি ভিত্তিতে কিছু কিছু আইন জারি অথবা সংশোধন করে অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। ক’দিন আগে সারা দেশে প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। এছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দফতর তার কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে কিছু নির্দেশনা জারি করে থাকে। ৭ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) শিক্ষার্থীদের যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছয়টি নির্দেশনা জারি করেছে। যে কোনো আইন বা নির্দেশনা যেন সমাজকে সংহত রাখার জন্য হয়, আতঙ্কিত করার জন্য নয়। কিন্তু মাউশির নির্দেশনাগুলোয় শঙ্কিত হওয়ার মতো উপাদান রয়েছে। এর অপব্যাখ্যা বা অপব্যবহার যে কারও জীবন বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। এ নিয়ে দু’দিন আগে কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। আমি তার আদলে আরও কিছু সংযোজন করতে চাই।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তার অনেকটাই তথ্যপ্রযুক্তি আইনে উল্লেখ আছে। তাই অনেকে এগুলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাবলেও ভুলের কিছু থাকবে না। এখানে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্তমান সমাজ বিকাশে এবং আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাকে অনস্বীকার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর তা ব্যবহারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে : প্রথমত, ‘সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক, শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সার্ভিস বা পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পোস্ট দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।’ এখানে সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থেকে গড়ে ওঠে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। দেশে এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪১, অনিবন্ধিত দল আছে ১৫টি এবং জোট আছে ৬টি। এদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ সরকার গঠন করে। তাই সরকার নিয়ে একেকজনের একেক মতামত থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সবার, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।

এবার ভাবমূর্তির কথায় আসা যাক। কেউ কারও ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে না, যদি না সে নিজে ভাবমূর্তি নষ্ট করে। সরকারের জনস্বার্থবিরোধী যে কোনো সিদ্ধান্ত তার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে; আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়ে যে কেউ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই অপরের সমালোচনার দিকে তীর না ছুড়ে নিজের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার প্রতি দৃষ্টি দিলে তা অধিকতর কার্যকর হবে। ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান’ ধারণাটি আপেক্ষিক। সাধারণভাবে ব্যবহার হলে তেমন সমস্যা নয়। কিন্তু যদি আইনগত ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হয় তাহলে তা আরও সুনির্দিষ্ট করা জরুরি। কত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, তাদের সমালোচনা করা কি অপরাধ?

দ্বিতীয় নির্দেশনায় বলা আছে, ‘জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনো রকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে।’ যে কোনো চেতনার উদ্ভব হয় শিক্ষা থেকে। আমাদের শিশুদের আমরা চার ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাই- প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ইংলিশ ভার্সন ও ইংলিশ মিডিয়াম। চারটি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি চর্চা করে আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে। তাদের এ চারটি ধারায় বিভক্ত করে কী ধরনের ঐক্যবদ্ধ জাতি আশা করা যায়? আমরা বহুকাল ধরেই বলে এসেছি একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার কথা। সে কথায় কান না দিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতি প্রত্যাশা করা কি সমীচীন? আর এ নিয়ে দু’কথা বললেই শিক্ষার্থীরা অপরাধী হয়ে যাবে? আরেকটি অংশে আছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে বা ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি পরিপন্থী কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না।’ এটি ভালো কথাই বলা হয়েছে। যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কী প্রয়োজন আছে অন্যের বিশ্বাসকে নিয়ে কটাক্ষ করার? সমাজের প্রত্যেক মানুষেরই একে অপরকে সমীহ করা উচিত। পৃথিবীতে খ্রিস্টান আছেন প্রায় ২৫০ কোটি, মুসলিম প্রায় ২০০ কোটি, হিন্দু ১৩০ কোটি আর বৌদ্ধ আছেন ৫৩ কোটি। তাদের অনুভূতিকে আমরা অবশ্যই সম্মান করব। কিন্তু ১২০ কোটি মানুষ আছেন যারা বিশ্বের ৪ হাজার ৩০০টি ধর্মের কোনোটিতেই বিশ্বাস করেন না। তাদেরকে আমরা ‘জাগতিক’ বলি। তারাও কিন্তু সমাজ বিকাশ ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। আমি একাধিক ধর্মসভা শুনেছি যেখানে তাদের হেয় করে আপত্তিকর উক্তি করা হয়েছে, এমনকি ঘৃণার সঙ্গে ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটি উচ্চারণ করা হয়েছে। অনুভূতির কথাই যদি বলি, তাহলে পৃথিবীর সব মানুষের অনুভূতির দিকটি বিবেচনা করা সঙ্গত। আর ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতের কথা বলছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলেই তো এদেশে টেকা দায়! ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বলা যত সহজ, বাস্তবে তার সমন্বয় করা তত সহজ নয়।

তৃতীয় নির্দেশনাটি দায়সারা ও প্রথাগত। যে কোনো শাসকগোষ্ঠী এটি তাদের সুবিধার্থে করে থাকে। ‘জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো বিষয় লেখা, অডিও বা ভিডিও প্রকাশ বা শেয়ার করা ... বিরত থাকতে হবে।’ অসন্তুষ্ট হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে তো মানুষ সংক্ষুব্ধ হবেই। গত সপ্তাহজুড়ে সারা দেশে ধর্ষণের প্রতিবাদে এবং ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবিতে রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। মন্ত্রিপরিষদ দ্রুত সময়ের মধ্যে বৈঠকে বসে। সেখানে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর শেষে তা অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশ পায়। এই সংশোধন তো এসেছে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ফল হিসেবে। এভাবে কোনো সামাজিক অপরাধের প্রতিবাদ করলে একজন শিক্ষার্থীর শাস্তি হবে কেন?

মানুষের মানসিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি, ‘নার্স দ্য বেবি, প্রটেক্ট দ্য চাইল্ড অ্যান্ড ফ্রি দ্য ম্যান’। এখন তো দেখছি মুক্তকথা বলার সময়টাকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা নিশ্চয়ই ‘স্বাধীনতা’ শব্দের অর্থ বুঝি; অপরের স্বাধীনতা নষ্ট না করে নিজে স্বাধীনভাবে বলা-চলা। শিক্ষার্থীদের ওপর এর চেয়ে বেশি কিছু চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে কি?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়