দুটি মন খারাপ করা ছবি
jugantor
দুটি মন খারাপ করা ছবি

  রুমিন ফারহানা  

১৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি ছবিগুলো দেখেছি। আমার মাথায় কষ্ট হয়েছে, আমি অসুস্থ বোধ করেছি; কিন্তু তারপরও গভীর মনোযোগে প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। কী অবলীলায় নির্যাতন করা যায়! রায়হানের কোনো অপরাধ ছিল না। তাকে বিনা অপরাধে কোনো মামলা ছাড়াই রাস্তা থেকে উঠিয়ে থানায় নেয় পুলিশ। তারপর মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য চলে বর্বরতম অত্যাচার। প্লায়ার্স দিয়ে হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। এমন নখ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে পচতে শুরু করা মৃতদেহের হাতের কথা, যে হাতগুলো হরর মুভিতে কখনও কখনও দেখানো হয়। আমার চোখে ভাসছে রায়হানের পিটিয়ে থেঁতলে দেয়া পায়ের ছবি, যাকে আবার সেলাই করে পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে। রায়হানের একটি দুই মাসের বাচ্চা আছে। আছে স্ত্রী, পরিবার। আচ্ছা, একটি অচেনা-অজানা মানুষের কেবল হাত আর পায়ের ছবি যদি আমাকে এত কষ্ট দেয়, কেমন লেগেছে রায়হানের পরিবারের?

রায়হানের ঘটনাটি অতি সাম্প্রতিক বলে উল্লেখ করলাম। কিন্তু এরকম ঘটনা কি আমাদের চারপাশে হরহামেশা ঘটছে না? আলোচিত না হলে সেই খবর তো আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে না। আপনারা কি জানেন, কোন ঘটনাগুলো আলোচিত হয়? যে ঘটনায় মৃত্যু জড়িয়ে থাকে। আবার সব মৃত্যুর ঘটনাই আলোচিত হওয়ার মতো ভাগ্যবান হয় না। গুটিকয়েক মৃত্যুর ঘটনা বাদ দিলে তার বহুগুণ বেশি মৃত্যু, আর যদি তা না-ও হয়, অন্তত চিরকাল পঙ্গু থাকার মতো ঘটনা আমাদের চোখের আড়ালেই ঘটে যায়। আর যেসব ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার মানুষগুলো পুরোপুরি সেরে ওঠে, সেসব তো আমরা একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যেই আনি না। আমাদের চোখ-মন-মগজ এখন চরমতম বীভৎসতা দেখে অভ্যস্ত।

আইন পেশায় থাকার সুবাদে জানি, তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম ঘটনা কিংবা বিনা ঘটনায়ও পুলিশ যদি কাউকে ধরে আনে তাহলে কোনোদিনই সংবিধান বা আইন মেনে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে হাজির করা হয় না। তিন-চার দিন চলে নির্যাতন। এ নির্যাতন চলে স্রেফ টাকার জন্য। টাকা পেলে অনেক সময় আদালতে না নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। আদালতে তোলার পর প্রথম যে আবেদন করে পুলিশ, তা হল রিমান্ড। রিমান্ডের সাদা বাংলা হল জিজ্ঞাসাবাদ অর্থাৎ এ সময়ে পুলিশ মামলার তদন্ত এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করে অভিযোগ সম্পর্কে তথ্য নেবে। না পেনাল কোড, না সিআরপিসি কোথাও কোনো আইনে পুলিশকে অভিযুক্তের কেশাগ্রও স্পর্শ করার অনুমতি দেয়া হয়নি, নির্যাতন তো বহু দূরের কথা।

এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অনেক দেরিতে হলেও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ পাস করে। আইনটির প্রস্তাবনা এরকম- ‘যেহেতু ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদ স্বাক্ষরিত হইয়াছে; এবং যেহেতু ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর স্বাক্ষরিত দলিলের মাধ্যমে উক্ত সনদে বাংলাদেশও অংশীদার হইয়াছে; এবং যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করিয়াছে; এবং যেহেতু জাতিসংঘ সনদের ২(১) ও ৪ অনুচ্ছেদ নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করিয়া নিজ নিজ দেশে আইন প্রণয়নের দাবি করে; এবং যেহেতু বাংলাদেশে উপরিউক্ত সনদে বর্ণিত অঙ্গীকারসমূহের কার্যকারিতা প্রদানে আইনি বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়’। এখানে সংবিধানের উল্লেখ আসলে একটা ‘সৌজন্য’; এ আইনটি করতে সরকারকে আসলে বাধ্য হতে হয়েছে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে। এটাকে পেছাতে পেছাতে সরকার তারপরও অনেক দূরে, ২০১৩ সালে নিয়ে এসেছে। প্রস্তাবনাতেই উল্লেখ আছে, জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদ সরকার স্বাক্ষর করেছিল ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর।

মূলত নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতার জন্য এ আইন হয়। এতে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাসহ ২০টি ধারা আছে। যাতে মূলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। এমনকি ভয়ভীতি দেখানোও এ আইনের অধীনে নির্যাতন বলে গণ্য হয়েছে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় ৫ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন পর্যন্ত রাখা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় যদিও পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, সিআইডি, বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, আনসার ভিডিপি ও কোস্টগার্ডসহ দেশে আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী সব সরকারি সংস্থাকেই ধরা হয়েছে; কিন্তু মজার বিষয় হল ২০১৩ সালে আইন প্রণয়নের পর ২০১৫ সালে কেবল পুলিশের পক্ষ থেকেই আইনের ১৪টি ধারা ও উপধারা সংশোধন চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। প্রস্তাবে আইনটির ৭টি ধারা বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়। পরবর্তী সময়ে আবার ২০১৭ সালের পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের পর আইনটি বাতিলের দাবি তোলা হয়েছিল। তাদের সে দাবি নাকচের পর আইনটি সংশোধনের দাবি জোরালো হয়। অর্থাৎ শুরু থেকেই পুলিশ এ আইনের বিরোধিতা করে আসছে।

অন্তত দুটি ক্ষেত্রে হেফাজতে নির্যাতনের (এমনকি মৃত্যু বা বিকলাঙ্গতা না হলেও) ভয়ংকর প্রভাব আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অলিখিতভাবে নির্যাতনের ক্ষমতা রেখে দেয়াটা এ বাহিনীগুলোকে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ার প্ররোচনা দেয়। সিলেটের ঘটনাটিতে আমরা জানি, রায়হানকে শেষবার তার চাচার সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়েছিল; চাচা শুনেছিলেন রায়হানের আকুতি- ‘টাকা নিয়ে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আসো, আমাকে বাঁচাও।’ না, রায়হান বাঁচতে পারেনি; কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান কিংবা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন অনেকেই। নির্যাতন করে পুলিশের টাকা উপার্জন এ দেশের অতি সাধারণ ঘটনা। হ্যাঁ, এটি ‘বাঘে ছুঁলে ১৮ ঘা, আর পুলিশ ছুঁলে ৩৬ ঘা’ প্রবচনের দেশ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে মানুষকে হেফাজতে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ক্ষমতা পুলিশ তার হাতে রাখতে চায়। কোনো অপরাধ ঘটলে সেটার সন্দেহভাজনকে ধরে নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়াতে পারলে পুলিশের প্রাথমিক কর্তব্য শেষ হয়। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক দ্রুত তদন্ত শেষ হয়ে যায়। অথচ এ পদ্ধতির কারণেই যে কোনো ফৌজদারি ঘটনার গ্রহণযোগ্য তদন্ত অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। ফৌজদারি মামলার বিচারের প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন অনেক অভিযুক্ত মানুষ তার ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তাদের পাশে থাকে খুব শক্ত যুক্তি যে তাদের নির্যাতন করে এ স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছে। পুলিশের হেফাজতে নির্যাতনের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল বিচারকরা অনেক ক্ষেত্রেই এ আবেদন মঞ্জুর করে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি বাতিল করেন।

কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার একটি ঘটনা এ তথাকথিত জবানবন্দির অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ হয়ে আসে আমাদের সামনে। ওই এলাকার ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। খোঁজ করে মেয়ের সন্ধান না পেয়ে এক মাস পর ৬ আগস্ট থানায় অপহরণ মামলা করেন কিশোরীর বাবা। এ ঘটনায় কিশোরীর মায়ের মোবাইল ফোনের কল লিস্টের সূত্র ধরে ৭ ও ৮ আগস্ট পুলিশ একই এলাকার তিনজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তিন আসামি দুই দফা রিমান্ড শেষে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করে ৯ আগস্ট আদালতে জবানবন্দি দেয়। মজার ব্যাপার হল, ‘নিখোঁজ’ কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ৫১ দিনের মাথায় ফিরে আসে। ফিরে আসার পর ওই কিশোরী আদালতে বলেছে, বিয়ে করে সংসার পেতেছিল সে। পরে আদালতের আদেশে মুক্তি পেয়ে অভিযুক্তরা তাদের বর্বর নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের কথা জানায়।

নির্যাতন এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়নের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলার রায় হল কিছুদিন আগে। ২০১৪ সালে পুলিশের হেফাজতে মোহাম্মদ জনি নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনের যাবজ্জীবন এবং অপর দুইজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এ রায় একটা মাইলফলক; কিন্তু এর উল্টো দিকে আছে হতাশাও। আইনটি পাস হওয়ার পর দীর্ঘ ৬ বছরে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ আইনে মামলা হয়েছে ১৮টি। এর ১৪টিতেই পুলিশ ‘তথ্যগত ভুল’ বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিক মামলাকারীদের সঙ্গে আলাপ করে দেখিয়েছে মামলা করেও ভয়ে প্রায় সবাই আপস করে ফেলেছে।

এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় আছে বলে আমি মনে করি। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কি বর্তমান বাংলাদেশের পুলিশের থাকা উচিত? পুলিশ তদন্ত করলে হয়তো রায় হওয়া মামলাটিরও বিচার হতে পারত না বলে আমার বিশ্বাস। ওই মামলায় বাদী পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয় এবং পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ আইনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় তদন্ত না হলে আইনটি আদৌ ফলপ্রসূ হবে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রজাতন্ত্রের আর সব কর্মচারীর চাইতে আলাদা। এ বাহিনীগুলোর হাতে অস্ত্র আছে, আছে বলপ্রয়োগ করার ক্ষমতা। এদের হাতে মানুষ নির্যাতিত হতে পারে, আজীবনের জন্য পঙ্গু হতে পারে, এমনকি হারাতে পারে প্রাণও। দীর্ঘমেয়াদে এ বাহিনীগুলোর বুঝতে হবে তার ওপর অর্পিত ক্ষমতা কত বড় আমানত, আর সেটি রক্ষা করা কত বড় কর্তব্য তাদের। তবে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩’-এর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ বার্তা দিতে হবে যে, এ রাষ্ট্রে কোনো প্রাণীকে নির্যাতন করাও অপরাধ, মানুষ তো দূরেই থাকুক।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য

দুটি মন খারাপ করা ছবি

 রুমিন ফারহানা 
১৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি ছবিগুলো দেখেছি। আমার মাথায় কষ্ট হয়েছে, আমি অসুস্থ বোধ করেছি; কিন্তু তারপরও গভীর মনোযোগে প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। কী অবলীলায় নির্যাতন করা যায়! রায়হানের কোনো অপরাধ ছিল না। তাকে বিনা অপরাধে কোনো মামলা ছাড়াই রাস্তা থেকে উঠিয়ে থানায় নেয় পুলিশ। তারপর মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য চলে বর্বরতম অত্যাচার। প্লায়ার্স দিয়ে হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। এমন নখ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে পচতে শুরু করা মৃতদেহের হাতের কথা, যে হাতগুলো হরর মুভিতে কখনও কখনও দেখানো হয়। আমার চোখে ভাসছে রায়হানের পিটিয়ে থেঁতলে দেয়া পায়ের ছবি, যাকে আবার সেলাই করে পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে। রায়হানের একটি দুই মাসের বাচ্চা আছে। আছে স্ত্রী, পরিবার। আচ্ছা, একটি অচেনা-অজানা মানুষের কেবল হাত আর পায়ের ছবি যদি আমাকে এত কষ্ট দেয়, কেমন লেগেছে রায়হানের পরিবারের?

রায়হানের ঘটনাটি অতি সাম্প্রতিক বলে উল্লেখ করলাম। কিন্তু এরকম ঘটনা কি আমাদের চারপাশে হরহামেশা ঘটছে না? আলোচিত না হলে সেই খবর তো আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছে না। আপনারা কি জানেন, কোন ঘটনাগুলো আলোচিত হয়? যে ঘটনায় মৃত্যু জড়িয়ে থাকে। আবার সব মৃত্যুর ঘটনাই আলোচিত হওয়ার মতো ভাগ্যবান হয় না। গুটিকয়েক মৃত্যুর ঘটনা বাদ দিলে তার বহুগুণ বেশি মৃত্যু, আর যদি তা না-ও হয়, অন্তত চিরকাল পঙ্গু থাকার মতো ঘটনা আমাদের চোখের আড়ালেই ঘটে যায়। আর যেসব ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার মানুষগুলো পুরোপুরি সেরে ওঠে, সেসব তো আমরা একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যেই আনি না। আমাদের চোখ-মন-মগজ এখন চরমতম বীভৎসতা দেখে অভ্যস্ত।

আইন পেশায় থাকার সুবাদে জানি, তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম ঘটনা কিংবা বিনা ঘটনায়ও পুলিশ যদি কাউকে ধরে আনে তাহলে কোনোদিনই সংবিধান বা আইন মেনে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে হাজির করা হয় না। তিন-চার দিন চলে নির্যাতন। এ নির্যাতন চলে স্রেফ টাকার জন্য। টাকা পেলে অনেক সময় আদালতে না নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। আদালতে তোলার পর প্রথম যে আবেদন করে পুলিশ, তা হল রিমান্ড। রিমান্ডের সাদা বাংলা হল জিজ্ঞাসাবাদ অর্থাৎ এ সময়ে পুলিশ মামলার তদন্ত এগিয়ে নেয়ার স্বার্থে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করে অভিযোগ সম্পর্কে তথ্য নেবে। না পেনাল কোড, না সিআরপিসি কোথাও কোনো আইনে পুলিশকে অভিযুক্তের কেশাগ্রও স্পর্শ করার অনুমতি দেয়া হয়নি, নির্যাতন তো বহু দূরের কথা।

এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অনেক দেরিতে হলেও ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ পাস করে। আইনটির প্রস্তাবনা এরকম- ‘যেহেতু ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদ স্বাক্ষরিত হইয়াছে; এবং যেহেতু ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর স্বাক্ষরিত দলিলের মাধ্যমে উক্ত সনদে বাংলাদেশও অংশীদার হইয়াছে; এবং যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক, লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করিয়াছে; এবং যেহেতু জাতিসংঘ সনদের ২(১) ও ৪ অনুচ্ছেদ নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর ব্যবহার ও দণ্ড অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করিয়া নিজ নিজ দেশে আইন প্রণয়নের দাবি করে; এবং যেহেতু বাংলাদেশে উপরিউক্ত সনদে বর্ণিত অঙ্গীকারসমূহের কার্যকারিতা প্রদানে আইনি বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়’। এখানে সংবিধানের উল্লেখ আসলে একটা ‘সৌজন্য’; এ আইনটি করতে সরকারকে আসলে বাধ্য হতে হয়েছে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে। এটাকে পেছাতে পেছাতে সরকার তারপরও অনেক দূরে, ২০১৩ সালে নিয়ে এসেছে। প্রস্তাবনাতেই উল্লেখ আছে, জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদ সরকার স্বাক্ষর করেছিল ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর।

মূলত নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতার জন্য এ আইন হয়। এতে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাসহ ২০টি ধারা আছে। যাতে মূলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। এমনকি ভয়ভীতি দেখানোও এ আইনের অধীনে নির্যাতন বলে গণ্য হয়েছে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় ৫ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন পর্যন্ত রাখা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় যদিও পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, সিআইডি, বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, আনসার ভিডিপি ও কোস্টগার্ডসহ দেশে আইন প্রয়োগ ও বলবৎকারী সব সরকারি সংস্থাকেই ধরা হয়েছে; কিন্তু মজার বিষয় হল ২০১৩ সালে আইন প্রণয়নের পর ২০১৫ সালে কেবল পুলিশের পক্ষ থেকেই আইনের ১৪টি ধারা ও উপধারা সংশোধন চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। প্রস্তাবে আইনটির ৭টি ধারা বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়। পরবর্তী সময়ে আবার ২০১৭ সালের পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের পর আইনটি বাতিলের দাবি তোলা হয়েছিল। তাদের সে দাবি নাকচের পর আইনটি সংশোধনের দাবি জোরালো হয়। অর্থাৎ শুরু থেকেই পুলিশ এ আইনের বিরোধিতা করে আসছে।

অন্তত দুটি ক্ষেত্রে হেফাজতে নির্যাতনের (এমনকি মৃত্যু বা বিকলাঙ্গতা না হলেও) ভয়ংকর প্রভাব আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অলিখিতভাবে নির্যাতনের ক্ষমতা রেখে দেয়াটা এ বাহিনীগুলোকে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ার প্ররোচনা দেয়। সিলেটের ঘটনাটিতে আমরা জানি, রায়হানকে শেষবার তার চাচার সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়েছিল; চাচা শুনেছিলেন রায়হানের আকুতি- ‘টাকা নিয়ে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আসো, আমাকে বাঁচাও।’ না, রায়হান বাঁচতে পারেনি; কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান কিংবা নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন অনেকেই। নির্যাতন করে পুলিশের টাকা উপার্জন এ দেশের অতি সাধারণ ঘটনা। হ্যাঁ, এটি ‘বাঘে ছুঁলে ১৮ ঘা, আর পুলিশ ছুঁলে ৩৬ ঘা’ প্রবচনের দেশ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে মানুষকে হেফাজতে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ক্ষমতা পুলিশ তার হাতে রাখতে চায়। কোনো অপরাধ ঘটলে সেটার সন্দেহভাজনকে ধরে নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়াতে পারলে পুলিশের প্রাথমিক কর্তব্য শেষ হয়। অনেক কম পরিশ্রমে অনেক দ্রুত তদন্ত শেষ হয়ে যায়। অথচ এ পদ্ধতির কারণেই যে কোনো ফৌজদারি ঘটনার গ্রহণযোগ্য তদন্ত অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। ফৌজদারি মামলার বিচারের প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন অনেক অভিযুক্ত মানুষ তার ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তাদের পাশে থাকে খুব শক্ত যুক্তি যে তাদের নির্যাতন করে এ স্বীকারোক্তি নেয়া হয়েছে। পুলিশের হেফাজতে নির্যাতনের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল বিচারকরা অনেক ক্ষেত্রেই এ আবেদন মঞ্জুর করে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি বাতিল করেন।

কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার একটি ঘটনা এ তথাকথিত জবানবন্দির অন্তঃসারশূন্যতার প্রমাণ হয়ে আসে আমাদের সামনে। ওই এলাকার ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। খোঁজ করে মেয়ের সন্ধান না পেয়ে এক মাস পর ৬ আগস্ট থানায় অপহরণ মামলা করেন কিশোরীর বাবা। এ ঘটনায় কিশোরীর মায়ের মোবাইল ফোনের কল লিস্টের সূত্র ধরে ৭ ও ৮ আগস্ট পুলিশ একই এলাকার তিনজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তিন আসামি দুই দফা রিমান্ড শেষে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করে ৯ আগস্ট আদালতে জবানবন্দি দেয়। মজার ব্যাপার হল, ‘নিখোঁজ’ কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ৫১ দিনের মাথায় ফিরে আসে। ফিরে আসার পর ওই কিশোরী আদালতে বলেছে, বিয়ে করে সংসার পেতেছিল সে। পরে আদালতের আদেশে মুক্তি পেয়ে অভিযুক্তরা তাদের বর্বর নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের কথা জানায়।

নির্যাতন এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন প্রণয়নের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলার রায় হল কিছুদিন আগে। ২০১৪ সালে পুলিশের হেফাজতে মোহাম্মদ জনি নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় ৯ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজনের যাবজ্জীবন এবং অপর দুইজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এ রায় একটা মাইলফলক; কিন্তু এর উল্টো দিকে আছে হতাশাও। আইনটি পাস হওয়ার পর দীর্ঘ ৬ বছরে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ আইনে মামলা হয়েছে ১৮টি। এর ১৪টিতেই পুলিশ ‘তথ্যগত ভুল’ বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিক মামলাকারীদের সঙ্গে আলাপ করে দেখিয়েছে মামলা করেও ভয়ে প্রায় সবাই আপস করে ফেলেছে।

এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় আছে বলে আমি মনে করি। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত কি বর্তমান বাংলাদেশের পুলিশের থাকা উচিত? পুলিশ তদন্ত করলে হয়তো রায় হওয়া মামলাটিরও বিচার হতে পারত না বলে আমার বিশ্বাস। ওই মামলায় বাদী পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয় এবং পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ আইনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় তদন্ত না হলে আইনটি আদৌ ফলপ্রসূ হবে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রজাতন্ত্রের আর সব কর্মচারীর চাইতে আলাদা। এ বাহিনীগুলোর হাতে অস্ত্র আছে, আছে বলপ্রয়োগ করার ক্ষমতা। এদের হাতে মানুষ নির্যাতিত হতে পারে, আজীবনের জন্য পঙ্গু হতে পারে, এমনকি হারাতে পারে প্রাণও। দীর্ঘমেয়াদে এ বাহিনীগুলোর বুঝতে হবে তার ওপর অর্পিত ক্ষমতা কত বড় আমানত, আর সেটি রক্ষা করা কত বড় কর্তব্য তাদের। তবে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩’-এর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ বার্তা দিতে হবে যে, এ রাষ্ট্রে কোনো প্রাণীকে নির্যাতন করাও অপরাধ, মানুষ তো দূরেই থাকুক।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য