স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে

  প্রাণ গোপাল দত্ত ০৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

এপিজে আবদুল কালামের একটি বিখ্যাত উক্তি হল- ‘জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রতিযোগিতার দ্বারা শক্তিশালী। প্রতিযোগিতা জ্ঞান দ্বারা শক্তিশালী। জ্ঞান প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি- এ দুই ক্ষেত্র সামনে রেখে অগ্রসর হওয়া উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণতি লাভের অন্যতম পথ। স্বাস্থ্য খাত হল একমাত্র খাত যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশেষ সম্মিলন ঘটেছে।

আমি প্রায়ই বলে থাকি, ‘শিক্ষা ও চিকিৎসা যদি পণ্য হয়ে যায় তখন তার সঠিক গুণগত মান বজায় থাকে না।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা অর্থাৎ ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক হল এক শান্তির এবং চিকিৎসাসেবার স্বস্তির নীড়।

সরকারের স্বাস্থ্য খাতে শর্তহীন দৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও অন্য অনেক খাতের মতোই মানুষের সন্তুষ্টি বিধানে খুব একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। অথচ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এমন একটি পিরামিডের মতো যেখানে রয়েছে প্রতি ৮ হাজার জনে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, যেখানে ওই ক্লিনিকে কর্মরত কমবেশি ৫ জন কর্মী ইচ্ছা করলে ৮ হাজার লোকের নাম, বয়স শুধু মুখস্থ করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, তাদের সম্পূর্ণ সঠিক ও তথ্যভিত্তিক ডাটাও তৈরি করতে পারেন। অর্থাৎ শুধু সারা দেশের কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মীরা বাংলাদেশের আদমশুমারিও করে দিতে পারেন।

কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীরা স্বাস্থ্য সচেতনতাবিষয়ক মৌলিক তথ্য- স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য, পানীয় সম্পর্কে ধারণা দেয়া ছাড়াও গর্ভবতী মায়ের কী খাওয়া উচিত, কী করা উচিত নয়, কীভাবে নিজের যত্ন নিতে হয়, এমনকি ডেলিভারি সম্পর্কে তথ্য প্রদান, নিরাপদ সন্তান প্রসবের ধারণাটা দিলেও শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার আরও অনেক কমে যাবে।

রাশিয়ান চিকিৎসা শাস্ত্রে ৫টি Early শব্দের বহুল প্রচলন আছে, তা হল Early Suspicion, Early Attention, Early Diagnosis, Early Treatment & Management Ges Early Rehabilitation. Early Suspicion-এর কাজটা কিন্তু একমাত্র মা, কাছের আত্মীয় (যদি পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকে) অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীরা সুচারুরূপে করতে পারেন।

যেমন, নবজাতক শিশুটি কানে শোনে কিনা, নবজাতকের কোনো জন্মগত বৈকল্য বা ত্রুটি আছে কিনা, দৃষ্টিশক্তি আছে কী নেই সহজেই জন্মের পর থেকে ৩ মাসের মধ্যে এসব নিরূপণ করতে পারেন।

তাহলে শিশুটির দ্রুত চিকিৎসা লাভের প্রক্রিয়াটিও সহজ হয়। এ ক্ষেত্রে রোগ নিরূপণ যেমন সঠিক সময়ে সম্ভব তেমনি নিরূপিত রোগের চিকিৎসা হয় সহজ, এমনকি রোগ নিরাময় করা না গেলেও সময়োপযোগী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসনও দ্রুত করা যায়।

অর্থাৎ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের কমিউনিটি ক্লিনিক অসাধ্য সাধনে প্রশংসিত হবে পৃথিবীব্যাপী। ইতিমধ্যে অনেক দেশ এসব ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কেও যথেষ্ট খোঁজ-খবর রাখেন।

এমনকি এ বিষয়ে তার আগ্রহও উল্লেখ করার মতো। ৬-৭ বছরের ব্যবধানে বিশেষ শিশুদের (Child disability) সচেতনতার ব্যাপারে এ দেশ পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মোটামুটি সঠিক সংখ্যাও নিরূপণ করা হয়েছে। তাদের পুনর্বাসন এবং শিক্ষা কার্যক্রম সমানতালে এগিয়ে চলছে। এ ক্ষেত্রে সব কৃতিত্বের অধিকারী ওই সন্তানদের মা-বাবা, শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের উদ্দেশে বা চিকিৎসকদের বিভিন্ন সম্মেলনে যেসব বক্তৃতা ও বিবৃতি দিয়েছেন, সর্বত্রই তিনি গবেষণার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বা ই-গভর্নেন্সের ব্যাপারে তার আগ্রহে অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হলেও সরকারি চিকিৎসা খাতে তা হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। এই অসামঞ্জস্য নিরসনে ৬ বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আ ফ ম রুহুল হক, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, বিসিপিএসের সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদ হাসানসহ আমাকে ডেকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন এফসিপিএস, এমএস ও এমডির মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে।

আমার শত চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কক্ষে ২-৩টি সভা হওয়ার পরও এর কোনো সুরাহা হয়নি। অবশেষে আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য সচিব বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলাম, যা নিয়ে আমার অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে আলোচনা হয়েছিল আমি এ চিঠি লিখতে পারি কিনা।

বাংলাদেশের কোনো কোনো ডাক্তারকে ডিগ্রি অর্জন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ফলে এ নিয়েও রয়েছে এক ধরনের ব্যবসা। তা না হলে সমমর্যাদার এফসিপিএস পাস করে কেন কোনো কোনো ডাক্তার পুনরায় এমডি বা এমএস ডিগ্রি অর্জন নিয়ে ব্যস্ত হবেন।

সর্বশেষ যে ব্রিটিশদের অনুসারী হিসেবে আসল ফেলোশিপ ডিগ্রির উত্তরাধিকার হয়েছিলাম, সে ব্রিটিশরাই তাদের ডিগ্রির আমূল পরিবর্তন করেছেন, যখন বুঝলেন চিকিৎসাবিদ্যার উৎকর্ষের দিক দিয়ে ব্রিটিশরা আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে গেছেন।

অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক; সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter