সিন্ডিকেট ভাঙতে বাধা কোথায়?
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
সিন্ডিকেট ভাঙতে বাধা কোথায়?

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

২৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘দ্রব্যমূল্য ওঠানামার পেছনে একটি সিন্ডিকেট সব সময়ই কাজ করে।’

তিনি আরও বলেছেন, সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে কাজ করছে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, একটানা প্রায় একযুগ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এ দীর্ঘ সময়ে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট ভাঙতে পারল না কেন? সিন্ডিকেট ভাঙতে বাধা কোথায়?

নিউ অক্সফোর্ড অ্যাডভান্সড লার্নারস ডিকশনারি ‘সিন্ডিকেট’-এর সংজ্ঞা নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছে, সিন্ডিকেট হল একদল ব্যক্তি বা কোম্পানি, যারা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে পরস্পরের স্বার্থ সুরক্ষায় একত্রে কাজ করে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এ দেশের জনসাধারণ সময়ে সময়ে বিভিন্ন দ্রব্য, বিশেষ করে নিত্যপণ্য ক্রয়ে উচ্চমূল্যের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

বিভিন্ন পণ্যের জন্য ব্যবসায়ীদের রয়েছে আলাদা আলাদা সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেশনের ফলে যেসব নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে জনসাধারণ উচ্চমূল্যের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল: চাল, গম, চিনি, ভোজ্য পতল, গুঁড়াদুধ, ইলিশ মাছ, মাংস, ডাল ও শাকসবজি। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোর পেছনেও রয়েছে সিন্ডিকেট।

পণ্যের বাইরে সিন্ডিকেশনের কারণে যেসব খাতে জনগণ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- মানুষের যাতায়াতের জন্য সড়কপথে বাস, সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার, জলপথে স্টিমার ও লঞ্চ এবং স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

আমাদের প্রধান খাদ্য চালের কথায় আসা যাক। দেশের কম-বেশি ৯০ শতাংশ মানুষের শর্করার জোগান দেয় চাল। বাকিটা আসে গম ও ভুট্টা থেকে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তুলনায় জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের কিছুটা বেশি হলেও চাল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। চাল উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি।

কিন্তু চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের গঠিত সিন্ডিকেটের কারণে ধানচাষী ও ভোক্তারা বারবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চাল উৎপাদনে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বোরো ও আমন ধান কাটার মৌসুমে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানে সরকারের স্বল্প পরিমাণ ধান কেনা এবং নানা জটিলতার কারণে সরকারি সংগ্রহ অভিযান দেরিতে শুরু হওয়ার সুযোগ নিয়ে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে ধানচাষীদের, বিশেষ করে ধারদেনা শোধ ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে মৌসুমের শুরুতেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষীদের বাজারে নিয়ে আসা ধান সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে কিনে মজুদ করেন।

মৌসুম শেষে যখন আর কারও কাছে ধান থাকে না, তখন তারা মজুদ ধান চালে রূপান্তর এবং সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করে প্রচুর লাভ করেন। ২০১৭ সাল এবং চলতি সময়ের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের মার্চ মাসে অকাল বন্যায় বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলে সরকারি হিসাবে ১০ লাখ টন বোরো ফসলের ক্ষতি, সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের অসন্তোষজনক মজুদসহ সার্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারি দুর্বলতার সুযোগে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে বাজারে চালের সংকট সৃষ্টি করে।

এতে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ৫২ টাকায় পৌঁছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। মাঝারি ও সরু চালের দাম অনেক বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সরকার চাল আমদানির শুল্ক পুরোপুরি তুলে দিয়ে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির মাধ্যমে অবস্থা সামাল দেয়। ২০১৮-১৯ সালের তুলনায় সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে ৪ লাখ টন চাল কম উৎপাদন, গত অর্থবছরের এ সময়ের তুলনায় বর্তমানে সরকারি গুদামে ৫ লাখ টন কম খাদ্যশস্যের মজুদ, সরকারি খাতে চাল আমদানি না করা এবং চাল আমদানিতে অতি উচ্চহারে শুল্কারোপের ফলে বেসরকারি খাতে মাত্র ৪ হাজার টন চাল আমদানি, চলতি অর্থবছরের চার দফা বন্যায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির আমন ফসল নষ্ট-এসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে মোটা চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। সরকার মৌখিকভাবে সরু ও মাঝারি চালের দাম বেঁধে দিলেও চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। অবস্থা সামাল দিতে সরকার ৫-৬ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি একটি দৈনিকের (প্রথম আলো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ধরা থেকে বিক্রি সিন্ডিকেটের হাতে। এক লাখ ইলিশ ধরা হলে জাল বা ট্রলারের মালিক, সারেং বা মাঝি, ট্রলারের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যরা এবং জেলেরা কে কত অংশ পান-তার বর্ণনা রয়েছে এ প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, জেলেরা পান মাত্র ২ শতাংশ। ইলিশের দাম বেশি হওয়ার পেছনে রয়েছে মাফিয়া চক্রের হাত। জেলেদের জিম্মি করে বছরের পর বছর তারা ইলিশের দাম ঠিক করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

গত বছর ভারতীয় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে এমন একপর্যায়ে নিয়ে আসে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে যে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ৩০-৩৩ টাকায়, ভারতীয় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ হওয়ায় অক্টোবর-নভেম্বরে তা কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ৩০০ টাকায়। চলতি অর্থবছরে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করলে সেপ্টেম্বরে দেশে কেজিপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের দাম সিন্ডিকেশনের কারণে বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি কেজি ১০০ টাকায়।

ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানির ঘোষণা দিলে পণ্যটির দাম কিছুটা কমে আসে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৪০ লাখ টন আলুর চাহিদার বিপরীতে গড়ে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হচ্ছে। সিন্ডিকেশনের কারণে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া আলু দু’সপ্তাহ আগে কেজিপ্রতি ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হয়। সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বর্তমানে পণ্যটির দাম অনেকটা কমে এসেছে।

দেশে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধনকারী বেসরকারি চিনিকলের মালিক ও আমদানিকারকরা, যারা দেশের চিনির চাহিদার সিংহভাগ জোগান দেয়। এর মূলে রয়েছে পাঁচটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যারা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রাপ্ত এক তথ্যে জানা যায়, দেশে মোট ভোজ্য পতলের চাহিদা ৫১ দশমিক ২৭ লাখ টন, যার মধ্যে ৪৬ দশমিক ২১ লাখ টন আমদানি করতে হয়। ভোজ্য তেল আমদানিকারক হাতেগোনা কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে।

দেশে ডালের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণ করতে হয় পণ্যটি আমদানির মাধ্যমে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, বছরে এ আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫-১৬ লাখ টন। ডাল সমাজের নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষের আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের কারণে উচ্চমূল্যের গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী এ আমিষটি কিনতে পারেন না।

শুধু নিত্যপণ্য নয়, সড়কপথে মানুষের যাতায়াতের যানবাহন, বিশেষ করে বাসের ভাড়া মূলত নিয়ন্ত্রণ করে এগুলোর মালিকরা। তারা নানা অজুহাতে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তোলে এবং সরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাড়া বৃদ্ধির দাবি কিছুটা কমিয়ে মেনে নেয়। এর প্রধান কারণ- সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক রাজনীতিক এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের সিন্ডিকেশনের কাছে হেরে যায় সাধারণ মানুষ। তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় নিম্নমানের স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে দেশে গড়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ইত্যাদি। বেসরকারি খাতের কোনো কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিকের সেবার মান উন্নত হলেও চিকিৎসা ব্যয় অত্যধিক। গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারেন না। মূলত উচ্চ মধ্যবিত্তরা এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। আর দেশের উচ্চবিত্তরা সামান্য অসুখে চিকিৎসার জন্য চলে যান বিদেশে। সরকারের উচ্চমহলেও একই প্রবণতা দেখা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটানা দীর্ঘ একযুগ ক্ষমতায় থেকে শাসক দল আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেশন বন্ধ করতে পারছে না কেন? দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে কাজ করছে। এ জন্য একযুগ কি যথেষ্ট সময় নয়? আসলে সমস্যা হচ্ছে, মূলত সরকারি দলের লোকজন এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাই দলীয় স্বার্থের কারণে সরকার সিন্ডিকেট ভাঙার কাজে অগ্রসর হতে পারছে না।

আর যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল- প্রতিযোগিতা কমিশন কী করছে? ২০১২ সালে প্রণীত ও কার্যকর হওয়া প্রতিযোগিতা আইনে বলা হয়েছে: দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ উৎসাহিত করা, নিশ্চিত ও বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি ও ওলিগোপলি অবস্থা, জোটবদ্ধতা অথবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কমিশন সিন্ডিকেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রতিযোগিতা কমিশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, দেশের মানুষের, বিশেষ করে গরিব, নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সরকারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। সড়ক ও জলপথে মানুষের যাতায়াতের ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা হ্রাসে ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এ জন্য এসব খাতে সিন্ডিকেশন ভেঙে ফেলার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকারকে এ কাজটি করতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

স্বদেশ ভাবনা

সিন্ডিকেট ভাঙতে বাধা কোথায়?

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
২৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীর ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘দ্রব্যমূল্য ওঠানামার পেছনে একটি সিন্ডিকেট সব সময়ই কাজ করে।’

তিনি আরও বলেছেন, সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে কাজ করছে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, একটানা প্রায় একযুগ ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এ দীর্ঘ সময়ে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট ভাঙতে পারল না কেন? সিন্ডিকেট ভাঙতে বাধা কোথায়?

নিউ অক্সফোর্ড অ্যাডভান্সড লার্নারস ডিকশনারি ‘সিন্ডিকেট’-এর সংজ্ঞা নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছে, সিন্ডিকেট হল একদল ব্যক্তি বা কোম্পানি, যারা সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে পরস্পরের স্বার্থ সুরক্ষায় একত্রে কাজ করে। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এ দেশের জনসাধারণ সময়ে সময়ে বিভিন্ন দ্রব্য, বিশেষ করে নিত্যপণ্য ক্রয়ে উচ্চমূল্যের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন।

বিভিন্ন পণ্যের জন্য ব্যবসায়ীদের রয়েছে আলাদা আলাদা সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেশনের ফলে যেসব নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে জনসাধারণ উচ্চমূল্যের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন, সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল: চাল, গম, চিনি, ভোজ্য পতল, গুঁড়াদুধ, ইলিশ মাছ, মাংস, ডাল ও শাকসবজি। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোর পেছনেও রয়েছে সিন্ডিকেট।

পণ্যের বাইরে সিন্ডিকেশনের কারণে যেসব খাতে জনগণ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- মানুষের যাতায়াতের জন্য সড়কপথে বাস, সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার, জলপথে স্টিমার ও লঞ্চ এবং স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক।

আমাদের প্রধান খাদ্য চালের কথায় আসা যাক। দেশের কম-বেশি ৯০ শতাংশ মানুষের শর্করার জোগান দেয় চাল। বাকিটা আসে গম ও ভুট্টা থেকে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তুলনায় জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের কিছুটা বেশি হলেও চাল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি। চাল উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি।

কিন্তু চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের গঠিত সিন্ডিকেটের কারণে ধানচাষী ও ভোক্তারা বারবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চাল উৎপাদনে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বোরো ও আমন ধান কাটার মৌসুমে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ অভিযানে সরকারের স্বল্প পরিমাণ ধান কেনা এবং নানা জটিলতার কারণে সরকারি সংগ্রহ অভিযান দেরিতে শুরু হওয়ার সুযোগ নিয়ে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে ধানচাষীদের, বিশেষ করে ধারদেনা শোধ ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে মৌসুমের শুরুতেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষীদের বাজারে নিয়ে আসা ধান সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে কিনে মজুদ করেন।

মৌসুম শেষে যখন আর কারও কাছে ধান থাকে না, তখন তারা মজুদ ধান চালে রূপান্তর এবং সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করে প্রচুর লাভ করেন। ২০১৭ সাল এবং চলতি সময়ের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের মার্চ মাসে অকাল বন্যায় বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলে সরকারি হিসাবে ১০ লাখ টন বোরো ফসলের ক্ষতি, সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের অসন্তোষজনক মজুদসহ সার্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারি দুর্বলতার সুযোগে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে বাজারে চালের সংকট সৃষ্টি করে।

এতে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ৫২ টাকায় পৌঁছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। মাঝারি ও সরু চালের দাম অনেক বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সরকার চাল আমদানির শুল্ক পুরোপুরি তুলে দিয়ে বেসরকারি খাতে চাল আমদানির মাধ্যমে অবস্থা সামাল দেয়। ২০১৮-১৯ সালের তুলনায় সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে ৪ লাখ টন চাল কম উৎপাদন, গত অর্থবছরের এ সময়ের তুলনায় বর্তমানে সরকারি গুদামে ৫ লাখ টন কম খাদ্যশস্যের মজুদ, সরকারি খাতে চাল আমদানি না করা এবং চাল আমদানিতে অতি উচ্চহারে শুল্কারোপের ফলে বেসরকারি খাতে মাত্র ৪ হাজার টন চাল আমদানি, চলতি অর্থবছরের চার দফা বন্যায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমির আমন ফসল নষ্ট-এসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে মোটা চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। সরকার মৌখিকভাবে সরু ও মাঝারি চালের দাম বেঁধে দিলেও চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। অবস্থা সামাল দিতে সরকার ৫-৬ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি একটি দৈনিকের (প্রথম আলো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ধরা থেকে বিক্রি সিন্ডিকেটের হাতে। এক লাখ ইলিশ ধরা হলে জাল বা ট্রলারের মালিক, সারেং বা মাঝি, ট্রলারের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যরা এবং জেলেরা কে কত অংশ পান-তার বর্ণনা রয়েছে এ প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, জেলেরা পান মাত্র ২ শতাংশ। ইলিশের দাম বেশি হওয়ার পেছনে রয়েছে মাফিয়া চক্রের হাত। জেলেদের জিম্মি করে বছরের পর বছর তারা ইলিশের দাম ঠিক করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

গত বছর ভারতীয় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে এমন একপর্যায়ে নিয়ে আসে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে যে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ৩০-৩৩ টাকায়, ভারতীয় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ হওয়ায় অক্টোবর-নভেম্বরে তা কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ৩০০ টাকায়। চলতি অর্থবছরে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করলে সেপ্টেম্বরে দেশে কেজিপ্রতি ৩০-৩৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের দাম সিন্ডিকেশনের কারণে বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি কেজি ১০০ টাকায়।

ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানির ঘোষণা দিলে পণ্যটির দাম কিছুটা কমে আসে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৪০ লাখ টন আলুর চাহিদার বিপরীতে গড়ে প্রায় ৮০ লাখ টন আলু উৎপাদিত হচ্ছে। সিন্ডিকেশনের কারণে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া আলু দু’সপ্তাহ আগে কেজিপ্রতি ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হয়। সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বর্তমানে পণ্যটির দাম অনেকটা কমে এসেছে।

দেশে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধনকারী বেসরকারি চিনিকলের মালিক ও আমদানিকারকরা, যারা দেশের চিনির চাহিদার সিংহভাগ জোগান দেয়। এর মূলে রয়েছে পাঁচটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যারা সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রাপ্ত এক তথ্যে জানা যায়, দেশে মোট ভোজ্য পতলের চাহিদা ৫১ দশমিক ২৭ লাখ টন, যার মধ্যে ৪৬ দশমিক ২১ লাখ টন আমদানি করতে হয়। ভোজ্য তেল আমদানিকারক হাতেগোনা কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে।

দেশে ডালের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণ করতে হয় পণ্যটি আমদানির মাধ্যমে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, বছরে এ আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫-১৬ লাখ টন। ডাল সমাজের নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষের আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের কারণে উচ্চমূল্যের গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী এ আমিষটি কিনতে পারেন না।

শুধু নিত্যপণ্য নয়, সড়কপথে মানুষের যাতায়াতের যানবাহন, বিশেষ করে বাসের ভাড়া মূলত নিয়ন্ত্রণ করে এগুলোর মালিকরা। তারা নানা অজুহাতে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তোলে এবং সরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাড়া বৃদ্ধির দাবি কিছুটা কমিয়ে মেনে নেয়। এর প্রধান কারণ- সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক রাজনীতিক এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের সিন্ডিকেশনের কাছে হেরে যায় সাধারণ মানুষ। তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোয় নিম্নমানের স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে দেশে গড়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ইত্যাদি। বেসরকারি খাতের কোনো কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিকের সেবার মান উন্নত হলেও চিকিৎসা ব্যয় অত্যধিক। গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারেন না। মূলত উচ্চ মধ্যবিত্তরা এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। আর দেশের উচ্চবিত্তরা সামান্য অসুখে চিকিৎসার জন্য চলে যান বিদেশে। সরকারের উচ্চমহলেও একই প্রবণতা দেখা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটানা দীর্ঘ একযুগ ক্ষমতায় থেকে শাসক দল আওয়ামী লীগ সিন্ডিকেশন বন্ধ করতে পারছে না কেন? দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে কাজ করছে। এ জন্য একযুগ কি যথেষ্ট সময় নয়? আসলে সমস্যা হচ্ছে, মূলত সরকারি দলের লোকজন এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাই দলীয় স্বার্থের কারণে সরকার সিন্ডিকেট ভাঙার কাজে অগ্রসর হতে পারছে না।

আর যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল- প্রতিযোগিতা কমিশন কী করছে? ২০১২ সালে প্রণীত ও কার্যকর হওয়া প্রতিযোগিতা আইনে বলা হয়েছে: দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ উৎসাহিত করা, নিশ্চিত ও বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশ, মনোপলি ও ওলিগোপলি অবস্থা, জোটবদ্ধতা অথবা কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার সংক্রান্ত প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূলের লক্ষ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কমিশন সিন্ডিকেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রতিযোগিতা কমিশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, দেশের মানুষের, বিশেষ করে গরিব, নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে সরকারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। সড়ক ও জলপথে মানুষের যাতায়াতের ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা হ্রাসে ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এ জন্য এসব খাতে সিন্ডিকেশন ভেঙে ফেলার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকারকে এ কাজটি করতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]