অটোপাস একটি সাময়িক ব্যবস্থা
jugantor
অটোপাস একটি সাময়িক ব্যবস্থা

  কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন  

২৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার কারণে সারা দুনিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফ্রান্স ২১২ বছরের ইতিহাসে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করেছে। নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি ইত্যাদি দেশ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।

জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড় ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত সৃষ্টি হয়েছে সমাজের বিভিন্ন অংশে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবীদের ফল উচ্চতম গ্রেডে (জিপিএ-৫) থাকবে। তাই এ অংশ ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের চিন্তা পরবর্তী স্তরে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে।

এর পরের অংশটি মেধাবী, তবে তারা পূর্ববতী দুটি পরীক্ষার কোনো একটিতে জিপিএ-৫ পেতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ প্রত্যাশী, আবার কেউ হয়তো জেএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনের প্রত্যাশী। এ অংশটি পরীক্ষা নিয়ে মাথা ঘামায় এবং এ ধরনের ফলাফলে সন্তুষ্ট নয়।

আরেকটি অংশ রয়েছে, যারা পাস-ফেলের মধ্যবর্তী অবস্থানে। তারা সরকারি সিদ্ধান্তে উৎফুল্ল। সব শেষে একটি অংশ রয়েছে, যারা নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি অথবা নির্বাচনী পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি অথবা আর্থিক কারণে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরম পূরণ করতে পারেনি। এ অংশটি সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে এবং তাদের ফলাফল প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার প্রত্যাশী।

সচেতন জনসাধারণ পক্ষ-বিপক্ষ দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বা সরকারের এ অবস্থায় কী করণীয়, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, সেটাকে একটা বিপর্যয় বলতে হবে। বিপর্যয় দু’ভাবে হতে পারে: ১. প্রাকৃতিক বিপর্য, ২. কৃত্রিম বিপর্যয়। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা প্রাকৃতিক অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি কারণে যে বিপর্যয় কোনো স্থানে ঘটে থাকে তাকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলা যায়।

এগুলো স্বল্পস্থায়ী বা ক্ষণস্থায়ী। আবার যুদ্ধবিগ্রহ বা রোগ ছড়িয়ে পড়ার ফলে মহামারী সৃষ্টি ইত্যাদি কারণে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তা হল কৃত্রিম বিপর্যয়। এগুলো দীর্ঘস্থায়ী। এ ধরনের বিপর্যয়ে দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এ বিপর্যয়ের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য প্রকল্প (Hypothesis) প্রণয়ন করতে হয়। প্রকল্প হল কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ওই সংক্রান্ত পূর্ববর্তী ধারণা ও বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক ধারণা করে এগিয়ে যাওয়া।

এ ধরনের প্রকল্পের একটি হল কাজ চালানো প্রকল্প বা সাময়িক প্রকল্প (Working Hypothesis or Tentative Hypothesis)। যে কোনো জটিল পরিস্থিতিতে কোনো সমস্যা সমাধানকল্পে প্রাথমিক ধারণা করে (প্রকল্প) সাময়িক অগ্রসর হতে হয়। সাময়িক অগ্রসরের মাধ্যমে গৃহীত এ পদক্ষেপ হল কাজ চালানো প্রকল্প।

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রদান সংক্রান্ত সরকারের এ সিদ্ধান্ত একটি কাজ চালানো প্রকল্প। পরে অপেক্ষাকৃত ভালো কোনো সমাধান পেলে তা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে।

কিন্তু কথা হল, কীভাবে জেএসসি ও এসএসসি নম্বরের গড় করে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করা হবে? জিপিএ-র ভিত্তিতে যদি ফলাফল তৈরি করা হয়, তাহলে বিষয়ভিত্তিক জিপি (গ্রেড পয়েন্ট) প্রদান সম্ভব হবে না; কিন্তু ক্ষমতার জোরে কর্তৃপক্ষ যদি তা করে থাকে তাহলে তা হবে এ ব্যাচের সব শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য বিপর্যয়। পরবর্তীকালে চাকরির ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ সার্কুলার জারি করতে হবে। তবে বিদেশে শিক্ষার জন্য তারা অনুপযুক্ত হবে।

আবার কর্তৃপক্ষ যদি বিষয়ভিত্তিক নম্বর (জিপি) প্রদান করে ফলাফল তৈরি করার চেষ্টা করে, তাহলে সেখানেও সমস্যা তৈরি হবে। কারণ, জেএসসিতে সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা নেয়া হয় এবং এসএসসিতে প্রতিটি বিভাগে ১০টি বিষয়ের ১০০০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া হয়, যেখানে এইচএসসিতে পরীক্ষা নেয়া হয় ১৩০০ নম্বরের। প্রশ্ন হল, সাতটি বিষয়ের নম্বর এবং ১০টি বিষয়ের নম্বর কীভাবে গড় করে ১৩টি বিষয়ের নম্বর প্রদান করা হবে? এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। তবে বিতর্ক চলছে।

বর্তমান সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন বিষয়ে আগের পরীক্ষাগুলোয় অর্জিত নম্বর থেকে ধারণা নিয়ে এইচএসসি পর্যায়ে অমিল বিষয়গুলোয় নম্বর প্রদান করা যায়। আর যে বিষয়গুলোয় মিল রয়েছে সেগুলোয় গড় নম্বর প্রদান করা যাবে।

বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে গড় ভিত্তিতে নম্বর দেয়া যাবে। বাংলায় কোনো শিক্ষার্থী যদি জেএসসিতে ৮০ নম্বর আর এসএসসিতে ৭৮ নম্বর অর্জন করে, তাহলে মোট নম্বর হবে ১৫৮। গড় নম্বর হবে ৭৯। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর গ্রেড পয়েন্ট হবে ‘এ’ (৭০-৭৯)। কর্তৃপক্ষ এই নম্বরকে ৮০ প্রদান করে ‘এ+’ গ্রেড প্রদান করতে পারে। কিন্তু যে বিষয়গুলো জেএসসি বা এসএসসি পর্যায়ে রয়েছে অথচ এইচএসসি পর্যায়ে নেই, সেগুলোয় ধারণা করে নম্বর প্রদান ছাড়া কোনো উপায় নেই।

যেমন: পরিসংখ্যান, মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় জেএসসি বা এসএসসিতে নেই, কিন্তু এইচএসসিতে রয়েছে। সে জন্য শিক্ষার্থীদের মানবিক-বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় বিষয়গুলো বিভক্ত করতে হবে। ফলে কোনো বিষয় উচ্চমাধ্যমিকে না থাকলেও গ্রুপের একটি বিষয়ে অর্জিত নম্বর বা গড় নম্বর করে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রদান করতে হবে।

‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ (বাওবিপ) বিষয়টি জেএসসিতে আবশ্যিক হিসেবে পড়ানো হয় আর এসএসসিতে পড়ানো হয় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এ বিষয়টি পড়ানো হয় না। তাই ‘বাওবিপ’-কে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার বিষয় হিসেবে ধরে নিয়ে এখানে অর্জিত নম্বরকে ওই দুই শাখার অমিল বিষয়ে প্রদান করে ফলাফল তৈরির কাজ সমাপ্ত করতে হবে।

এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর মিল রয়েছে বলে এ ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না। জেএসসি পর্যায়ের বিজ্ঞানের অর্জিত নম্বরকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান হিসেবে ধরে নিয়ে ফলাফল তৈরি করতে হবে।

কোনো শিক্ষার্থী যদি জেএসসিতে বিজ্ঞানে ৮৪ নম্বর অর্জন করে এবং এসএসসিতে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে যথাক্রমে ৭৮, ৭৯, ৮০ নম্বর অর্জন করে, তাহলে তার পদার্থবিজ্ঞানে অর্জিত নম্বর হবে ৮৪ ও ৭৮-এর যোগফল ১৬২-এর গড় ৮১ নম্বর। রসায়নে অর্জিত নম্বর ৮৪ ও ৭৯-এর যোগফল ১৬৩-এর গড় ৮১.৫ নম্বর।

জীববিজ্ঞানে অর্জিত নম্বর হবে ৮৪ ও ৮০-এর গড় ৮২ নম্বর। বিষয়গুলোর গ্রেড পয়েন্ট হবে (জিপি) এ+ (৮০-১০০)। এখানে এসএসসি পর্যায়ে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রকৃত নম্বর হিসাব করা হলেও জেএসসিতে এ বিষয়গুলো নেই বলে শুধু বিজ্ঞানের নম্বর তিন বিষয়ের নম্বর হিসেবে ধরে গড় করা হয়েছে। আর এভাবেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।

এখন স্বাভাবিক অবস্থা নেই বলে এভাবে প্রাথমিক ধারণা (প্রকল্প) তৈরি করে বা কাজ চালানো প্রকল্প (Working Hypothesis) প্রণয়নের মাধ্যমে ফলাফল তৈরি করা বিজ্ঞানসম্মত। আর এ পদ্ধতির নাম দিতে হবে Disaster Education Management in Bangladesh (DEMB)। শিক্ষার্থীদের অর্জিত সনদে DEMB-এর জলছাপ থাকবে এবং DEMB-এর পূর্ণ মান থাকবে। অথবা HSC (DEMB) Result 2020 লেখা থাকবে।

এভাবে ২০২০ সালের এইচএসসি সনদ প্রদানের কাজ শেষ করতে হবে এবং পরের পরীক্ষাগুলোয় যদি একই অবস্থা বিরাজ করে, তাহলে ব্যাপক সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সরাসরি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন : শিক্ষা বিশ্লেষক

[email protected]

অটোপাস একটি সাময়িক ব্যবস্থা

 কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন 
২৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার কারণে সারা দুনিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফ্রান্স ২১২ বছরের ইতিহাসে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করেছে। নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি ইত্যাদি দেশ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।

জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড় ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত সৃষ্টি হয়েছে সমাজের বিভিন্ন অংশে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবীদের ফল উচ্চতম গ্রেডে (জিপিএ-৫) থাকবে। তাই এ অংশ ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের চিন্তা পরবর্তী স্তরে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে।

এর পরের অংশটি মেধাবী, তবে তারা পূর্ববতী দুটি পরীক্ষার কোনো একটিতে জিপিএ-৫ পেতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ প্রত্যাশী, আবার কেউ হয়তো জেএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনের প্রত্যাশী। এ অংশটি পরীক্ষা নিয়ে মাথা ঘামায় এবং এ ধরনের ফলাফলে সন্তুষ্ট নয়।

আরেকটি অংশ রয়েছে, যারা পাস-ফেলের মধ্যবর্তী অবস্থানে। তারা সরকারি সিদ্ধান্তে উৎফুল্ল। সব শেষে একটি অংশ রয়েছে, যারা নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি অথবা নির্বাচনী পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করতে পারেনি অথবা আর্থিক কারণে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ফরম পূরণ করতে পারেনি। এ অংশটি সরকারি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে এবং তাদের ফলাফল প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার প্রত্যাশী।

সচেতন জনসাধারণ পক্ষ-বিপক্ষ দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বা সরকারের এ অবস্থায় কী করণীয়, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে যে সমস্যাটি তৈরি হয়েছে, সেটাকে একটা বিপর্যয় বলতে হবে। বিপর্যয় দু’ভাবে হতে পারে: ১. প্রাকৃতিক বিপর্য, ২. কৃত্রিম বিপর্যয়। জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা প্রাকৃতিক অগ্ন্যুৎপাত ইত্যাদি কারণে যে বিপর্যয় কোনো স্থানে ঘটে থাকে তাকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলা যায়।

এগুলো স্বল্পস্থায়ী বা ক্ষণস্থায়ী। আবার যুদ্ধবিগ্রহ বা রোগ ছড়িয়ে পড়ার ফলে মহামারী সৃষ্টি ইত্যাদি কারণে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তা হল কৃত্রিম বিপর্যয়। এগুলো দীর্ঘস্থায়ী। এ ধরনের বিপর্যয়ে দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এ বিপর্যয়ের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য প্রকল্প (Hypothesis) প্রণয়ন করতে হয়। প্রকল্প হল কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ওই সংক্রান্ত পূর্ববর্তী ধারণা ও বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে একটি প্রাথমিক ধারণা করে এগিয়ে যাওয়া।

এ ধরনের প্রকল্পের একটি হল কাজ চালানো প্রকল্প বা সাময়িক প্রকল্প (Working Hypothesis or Tentative Hypothesis)। যে কোনো জটিল পরিস্থিতিতে কোনো সমস্যা সমাধানকল্পে প্রাথমিক ধারণা করে (প্রকল্প) সাময়িক অগ্রসর হতে হয়। সাময়িক অগ্রসরের মাধ্যমে গৃহীত এ পদক্ষেপ হল কাজ চালানো প্রকল্প।

এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রদান সংক্রান্ত সরকারের এ সিদ্ধান্ত একটি কাজ চালানো প্রকল্প। পরে অপেক্ষাকৃত ভালো কোনো সমাধান পেলে তা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে।

কিন্তু কথা হল, কীভাবে জেএসসি ও এসএসসি নম্বরের গড় করে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করা হবে? জিপিএ-র ভিত্তিতে যদি ফলাফল তৈরি করা হয়, তাহলে বিষয়ভিত্তিক জিপি (গ্রেড পয়েন্ট) প্রদান সম্ভব হবে না; কিন্তু ক্ষমতার জোরে কর্তৃপক্ষ যদি তা করে থাকে তাহলে তা হবে এ ব্যাচের সব শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য বিপর্যয়। পরবর্তীকালে চাকরির ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ সার্কুলার জারি করতে হবে। তবে বিদেশে শিক্ষার জন্য তারা অনুপযুক্ত হবে।

আবার কর্তৃপক্ষ যদি বিষয়ভিত্তিক নম্বর (জিপি) প্রদান করে ফলাফল তৈরি করার চেষ্টা করে, তাহলে সেখানেও সমস্যা তৈরি হবে। কারণ, জেএসসিতে সাতটি বিষয়ের পরীক্ষা নেয়া হয় এবং এসএসসিতে প্রতিটি বিভাগে ১০টি বিষয়ের ১০০০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া হয়, যেখানে এইচএসসিতে পরীক্ষা নেয়া হয় ১৩০০ নম্বরের। প্রশ্ন হল, সাতটি বিষয়ের নম্বর এবং ১০টি বিষয়ের নম্বর কীভাবে গড় করে ১৩টি বিষয়ের নম্বর প্রদান করা হবে? এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট কোনো ধারণা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করেনি। তবে বিতর্ক চলছে।

বর্তমান সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন বিষয়ে আগের পরীক্ষাগুলোয় অর্জিত নম্বর থেকে ধারণা নিয়ে এইচএসসি পর্যায়ে অমিল বিষয়গুলোয় নম্বর প্রদান করা যায়। আর যে বিষয়গুলোয় মিল রয়েছে সেগুলোয় গড় নম্বর প্রদান করা যাবে।

বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে গড় ভিত্তিতে নম্বর দেয়া যাবে। বাংলায় কোনো শিক্ষার্থী যদি জেএসসিতে ৮০ নম্বর আর এসএসসিতে ৭৮ নম্বর অর্জন করে, তাহলে মোট নম্বর হবে ১৫৮। গড় নম্বর হবে ৭৯। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর গ্রেড পয়েন্ট হবে ‘এ’ (৭০-৭৯)। কর্তৃপক্ষ এই নম্বরকে ৮০ প্রদান করে ‘এ+’ গ্রেড প্রদান করতে পারে। কিন্তু যে বিষয়গুলো জেএসসি বা এসএসসি পর্যায়ে রয়েছে অথচ এইচএসসি পর্যায়ে নেই, সেগুলোয় ধারণা করে নম্বর প্রদান ছাড়া কোনো উপায় নেই।

যেমন: পরিসংখ্যান, মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় জেএসসি বা এসএসসিতে নেই, কিন্তু এইচএসসিতে রয়েছে। সে জন্য শিক্ষার্থীদের মানবিক-বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় বিষয়গুলো বিভক্ত করতে হবে। ফলে কোনো বিষয় উচ্চমাধ্যমিকে না থাকলেও গ্রুপের একটি বিষয়ে অর্জিত নম্বর বা গড় নম্বর করে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রদান করতে হবে।

‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ (বাওবিপ) বিষয়টি জেএসসিতে আবশ্যিক হিসেবে পড়ানো হয় আর এসএসসিতে পড়ানো হয় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এ বিষয়টি পড়ানো হয় না। তাই ‘বাওবিপ’-কে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার বিষয় হিসেবে ধরে নিয়ে এখানে অর্জিত নম্বরকে ওই দুই শাখার অমিল বিষয়ে প্রদান করে ফলাফল তৈরির কাজ সমাপ্ত করতে হবে।

এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর মিল রয়েছে বলে এ ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না। জেএসসি পর্যায়ের বিজ্ঞানের অর্জিত নম্বরকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান হিসেবে ধরে নিয়ে ফলাফল তৈরি করতে হবে।

কোনো শিক্ষার্থী যদি জেএসসিতে বিজ্ঞানে ৮৪ নম্বর অর্জন করে এবং এসএসসিতে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে যথাক্রমে ৭৮, ৭৯, ৮০ নম্বর অর্জন করে, তাহলে তার পদার্থবিজ্ঞানে অর্জিত নম্বর হবে ৮৪ ও ৭৮-এর যোগফল ১৬২-এর গড় ৮১ নম্বর। রসায়নে অর্জিত নম্বর ৮৪ ও ৭৯-এর যোগফল ১৬৩-এর গড় ৮১.৫ নম্বর।

জীববিজ্ঞানে অর্জিত নম্বর হবে ৮৪ ও ৮০-এর গড় ৮২ নম্বর। বিষয়গুলোর গ্রেড পয়েন্ট হবে (জিপি) এ+ (৮০-১০০)। এখানে এসএসসি পর্যায়ে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রকৃত নম্বর হিসাব করা হলেও জেএসসিতে এ বিষয়গুলো নেই বলে শুধু বিজ্ঞানের নম্বর তিন বিষয়ের নম্বর হিসেবে ধরে গড় করা হয়েছে। আর এভাবেই এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল তৈরি করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।

এখন স্বাভাবিক অবস্থা নেই বলে এভাবে প্রাথমিক ধারণা (প্রকল্প) তৈরি করে বা কাজ চালানো প্রকল্প (Working Hypothesis) প্রণয়নের মাধ্যমে ফলাফল তৈরি করা বিজ্ঞানসম্মত। আর এ পদ্ধতির নাম দিতে হবে Disaster Education Management in Bangladesh (DEMB)। শিক্ষার্থীদের অর্জিত সনদে DEMB-এর জলছাপ থাকবে এবং DEMB-এর পূর্ণ মান থাকবে। অথবা HSC (DEMB) Result 2020 লেখা থাকবে।

এভাবে ২০২০ সালের এইচএসসি সনদ প্রদানের কাজ শেষ করতে হবে এবং পরের পরীক্ষাগুলোয় যদি একই অবস্থা বিরাজ করে, তাহলে ব্যাপক সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সরাসরি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাইন উদ্দীন : শিক্ষা বিশ্লেষক

[email protected]