পূর্বাভাস কি সত্যে পরিণত হবে?
jugantor
পূর্বাভাস কি সত্যে পরিণত হবে?

  মুঈদ রহমান  

০১ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সামনে দুই রাত ঘুমোনোর পর মঙ্গলবার সকালেই দেখতে পাবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান দলের ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রত্যাশী প্রেসিডেন্ট ডেমোক্র্যাট দলের জো বাইডেন। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তি এবং সেদেশের সরকারের গৃহীত অনেক নীতি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে, তাই মার্কিন মুল্লুকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের তাবৎ মানুষের কম-বেশি আগ্রহ আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ থাকলেও দেশটির ভাবমূর্তি অর্থাৎ দেশটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। ইউরোপের দৃষ্টিতেও তাই।

ব্রিটেনের মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে; ফ্রান্সের ৩০ শতাংশ মানুষের ধারণা ইতিবাচক, আর জার্মানির মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ভালো মনে করে। সারা বিশ্বের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ মনে করে, করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্র ভালো ভূমিকা রাখতে পেরেছে। রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার-বিবেচনা যাই হোক, বিশ্বনেতা হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা খুবই নাজুক। সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায় কাজ করার ক্ষেত্রে বিশ্বসমাজের সবচেয়ে বেশি আস্থার জায়গাটি তৈরি করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তার ওপর ৭৬ শতাংশ মানুষের আস্থা আছে; যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ৪৮ শতাংশ আস্থা পেয়েছেন; রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর আস্থা আছে ২৩ শতাংশ আর মর্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আস্থা আছে মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষের। ট্রাম্পকে পছন্দ করার ক্ষেত্রে যত শতাংশই উল্লেখ করা হোক না কেন, তাকে নিয়ে আলোচনার শতাংশটা ১০০ হতে দোষ নেই। আমার ১৪ বছরের কন্যাকেও ট্রাম্পকে নিয়ে মন্তব্য করতে শুনেছি।

বিশ্ববাসীর কাছে ছোট-বড় অনেক সমালোচনারই পাত্র হয়েছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, দায়িত্ব গ্রহণের ৬ মাসের মধ্যেই তিনি আমেরিকাকে জলবায়ু সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে বের করে আনেন। প্রায় ২০০টি দেশ ওই চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ২ ডিগ্রির নিচে রাখার বিষয়ে অঙ্গীকার করে। অথচ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে চীন শীর্ষে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে দ্বিতীয়। আসছে নির্বাচনের পরদিন থেকেই তা কার্যকর হওয়ার কথা। অভিবাসন নীতি নিয়েও তিনি সমালোচিত। তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই বিশ্বের সাতটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে দেন। অভিবাসী ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে সুবিশাল দেয়াল তুলে দেন। এ বছরের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার দেয়াল নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিগত এক যুগের মধ্যে ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি মেক্সিকানকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে আটক করা হয়।

করোনা মহামারীতে সারা বিশ্ব যখন আক্রান্ত, এমনকি ভীষণভাবে আক্রান্ত খোদ যুক্তরাষ্ট্র, তখনও তিনি আমাদের এক হতাশার বাণী শোনালেন- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থাকবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেন করোনার কারণ হিসেবে চীনকে সরাসরি দায়ী করছে না, এটি হল তার অভিমান; যা ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটিকে ২৩৭ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি) অনুদান দিয়েছিল, যা সংস্থাটির মোট বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ। চীনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের যে বৈরিতা তার প্রতিফলন করোনাকালে ঘটানোকে অনেকেই অবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করেন।

তবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে খোদ আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অনেক সময়ই মেলে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জর্জ ওয়াশিংটন দুই মেয়াদে, ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৭ পর্যন্ত; ৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘আনএফিলিয়েটেড’। তৃতীয় মেয়াদে তিনি নিজে থেকেই হতে চাননি। অবশ্য এখন আইনগতভাবেই কেউ পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। সেই হিসাবে ট্রাম্পের জন্য এটি শেষবার। আমরা যদি গত ৩০ বছর সময়কালকে বিবেচনা করি, তাহলে একটি লক্ষণীয় চিত্র দেখতে পাব। ১৯৯৩ সালে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বিল ক্লিন্টন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি পরপর দু’বার নির্বাচিত হওয়ার পর জর্জ ডব্লিও বুশ (জুনিয়র) ২০০১-এর নির্বাচনে জয়লাভ করেন; তিনি রিপাবলিকান। বুশ পরপর দু’বার নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে রিপাবলিকানদের হারিয়ে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বারাক ওবামা নির্বাচিত হন। তিনিও পরপর দু’বার নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে ডেমোক্র্যাটদের বিদায় করে রিপালিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তিকে পরপর দু’বার নির্বাচিত করার পর দলসহ বিদায় নিতে হয়েছে। এ প্রবণতা বজায় থাকলে ট্রাম্প আবারও নির্বাচিত হওয়ার আশা করতেই পরেন। তবে এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়।

হ্যাঁ, আমেরিকার নির্বাচনের একটি বৈশিষ্ট্য হল সেখানে কখনও কখনও ব্যাটে-বলে এক না-ও হতে পারে। সাধারণ ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন না-ও ঘটতে পারে। গত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের চেয়ে ৩০ লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হতে পারেননি। এর জন্য নির্বাচন পদ্ধতিই দায়ী। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাধারণ মানুষের সমর্থন পরোক্ষভাবে কাজ করে। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে ইলেক্টরাল ভোট। যে রাজ্যে যে প্রার্থী জয়ী হবেন সে রাজ্যের সব ইলেক্টরাল ভোট তার। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মোট ইলেক্টরাল ভোট ৫৩৫টি। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি (ডিস্ট্রিক অব কলাম্বিয়া) কোনো অঙ্গরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারপরও তার তিনটি ইলেক্টরাল ভোট আছে। সব মিলিয়ে ইলেক্টরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। তাই কোনো প্রার্থীকে জয়ী হতে হলে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেক্টরাল ভোটের প্রয়োজন পড়ে। কোনো কোনো রাজ্য হল কোনো কোনো দলের ঘাঁটি। বাংলাদেশে আমরা মনে করি, গোপালগঞ্জ হল আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, আবার বগুড়া হল বিএনপির। তেমনি আমেরিকাতেও রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটি হিসেবে অঙ্গরাজ্য আছে। সে রাজ্যগুলো নিয়ে মাথাব্যথা কম। কিন্তু ১২টি রাজ্য আছে যাদের ভোটারদের ‘সুইং ভোটার’ বলা হয়। এদের ভোট কখনও রিপাবলিকান আবার কখনও ডেমোক্র্যাটদের ঘরে যায়। এ ভোটগুলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়ায়। এ রাজ্যগুলোতে ১৯০টি ইলেক্টরাল ভোট আছে। সুতরাং ২৭০টি ভোটের জন্য সবচেয়ে বেশি ঘাম ঝরাতে হয় এ রাজ্যগুলোতে।

এবারের নির্বাচনে আরেকটি বিবেচনায় নেয়ার মতো বিষয় হল আগাম ভোট। প্রতিবারই আগাম ভোট পড়ে, তবে হয়তো করোনার কথা মাথায় রেখে এবারে আগাম ভোট সবচেয়ে বেশি পড়েছে। দেশটির মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ কোটি। ১৭৮৯ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নির্বাচিত হন তখন ভোট পড়েছিল মাত্র ৬ শতাংশ। এ বছর সে হার ৬৫ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। সেই হিসাবে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। তার মধ্যে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত আগাম ভোট পড়েছে প্রায় ৭ কোটি এবং ২ নভেম্বর পর্যন্ত তা ১০ কোটি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সুইং রাজ্যগুলোতে আগাম ভোটের হিসাবে জো বাইডেন এগিয়ে আছেন। অ্যারিজোনায় ২ দশমিক ৭, ফ্লোরিডায় ১ দশমিক ৯, জর্জিয়ায় ০ দশমিক ৫, লোয়ায় ১ দশমিক ১, মিশিগানে ৭ দশমিক ৮, মিনেসোটায় ৭ দশমিক ১, নেভাদায় ৫ দশমিক ৮, নর্থ ক্যারোলিনায় ১ দশমিক ৯, পেনসিলভানিয়ায় ৫ দশমিক ৪, উইসকনসিনে ৫ দশমিক ৭ পয়েন্টে আগাম ভোটে জো বাইডেন এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে ওহাইয়োতে ১ এবং টেক্সাসে ১ দশমিক ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন মাধ্যমের আগাম জরিপে দেখা যাচ্ছে, জো বাইডেন ১১-১৫ শতাংশ বেশি ভোট পাবেন।

একটা অপ্রিয় সত্য হল, রাষ্ট্রীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ না থাকলেও আমেরিকান সমাজে বর্ণবাদের উপস্থিতি আছে। তবে নিশ্চয়ই সবাই নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ উসকে দেয়ার অভিযোগ আছে। রিপাবলিকানদের অনেকেই এ বর্ণবাদের চর্চা করে থাকেন। আর কালো কিংবা তামাটে মানুষ ডেমোক্র্যাটদের পছন্দ করেন। আমেরিকান সমাজের ৬৭ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ। তবে সব শ্বেতাঙ্গ রিপাবলিকান নয়। আবার শ্বেতাঙ্গ হলেও ট্রাম্পকে ব্যক্তি হিসেবে অনেকে পছন্দ করেন না। তাছাড়া নির্বাচনের আগে ট্রাম্প-বাইডেনের যে তিনটি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতেও বাইডেন এগিয়ে আছেন। সব মিলিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের বেশির ভাগই জো বাইডেনের পক্ষে। এখন দেখা যাক, আমেরিকাবাসীর পছন্দের সঙ্গে তাবৎ পৃথিবীর মানুষের মিল হয় কিনা।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্বাভাস কি সত্যে পরিণত হবে?

 মুঈদ রহমান 
০১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সামনে দুই রাত ঘুমোনোর পর মঙ্গলবার সকালেই দেখতে পাবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান দলের ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রত্যাশী প্রেসিডেন্ট ডেমোক্র্যাট দলের জো বাইডেন। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তি এবং সেদেশের সরকারের গৃহীত অনেক নীতি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে, তাই মার্কিন মুল্লুকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের তাবৎ মানুষের কম-বেশি আগ্রহ আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ থাকলেও দেশটির ভাবমূর্তি অর্থাৎ দেশটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। ইউরোপের দৃষ্টিতেও তাই।

ব্রিটেনের মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করে; ফ্রান্সের ৩০ শতাংশ মানুষের ধারণা ইতিবাচক, আর জার্মানির মাত্র ২৬ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ভালো মনে করে। সারা বিশ্বের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ মনে করে, করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্র ভালো ভূমিকা রাখতে পেরেছে। রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার-বিবেচনা যাই হোক, বিশ্বনেতা হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা খুবই নাজুক। সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায় কাজ করার ক্ষেত্রে বিশ্বসমাজের সবচেয়ে বেশি আস্থার জায়গাটি তৈরি করেছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল। তার ওপর ৭৬ শতাংশ মানুষের আস্থা আছে; যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ৪৮ শতাংশ আস্থা পেয়েছেন; রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর আস্থা আছে ২৩ শতাংশ আর মর্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আস্থা আছে মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষের। ট্রাম্পকে পছন্দ করার ক্ষেত্রে যত শতাংশই উল্লেখ করা হোক না কেন, তাকে নিয়ে আলোচনার শতাংশটা ১০০ হতে দোষ নেই। আমার ১৪ বছরের কন্যাকেও ট্রাম্পকে নিয়ে মন্তব্য করতে শুনেছি।

বিশ্ববাসীর কাছে ছোট-বড় অনেক সমালোচনারই পাত্র হয়েছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, দায়িত্ব গ্রহণের ৬ মাসের মধ্যেই তিনি আমেরিকাকে জলবায়ু সংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে বের করে আনেন। প্রায় ২০০টি দেশ ওই চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ২ ডিগ্রির নিচে রাখার বিষয়ে অঙ্গীকার করে। অথচ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে চীন শীর্ষে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে দ্বিতীয়। আসছে নির্বাচনের পরদিন থেকেই তা কার্যকর হওয়ার কথা। অভিবাসন নীতি নিয়েও তিনি সমালোচিত। তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই বিশ্বের সাতটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করে দেন। অভিবাসী ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে সুবিশাল দেয়াল তুলে দেন। এ বছরের ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার দেয়াল নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিগত এক যুগের মধ্যে ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি মেক্সিকানকে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে আটক করা হয়।

করোনা মহামারীতে সারা বিশ্ব যখন আক্রান্ত, এমনকি ভীষণভাবে আক্রান্ত খোদ যুক্তরাষ্ট্র, তখনও তিনি আমাদের এক হতাশার বাণী শোনালেন- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্র থাকবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কেন করোনার কারণ হিসেবে চীনকে সরাসরি দায়ী করছে না, এটি হল তার অভিমান; যা ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের অনুদানের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটিকে ২৩৭ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি) অনুদান দিয়েছিল, যা সংস্থাটির মোট বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ। চীনের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের যে বৈরিতা তার প্রতিফলন করোনাকালে ঘটানোকে অনেকেই অবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করেন।

তবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে খোদ আমেরিকানদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অনেক সময়ই মেলে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জর্জ ওয়াশিংটন দুই মেয়াদে, ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৭ পর্যন্ত; ৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘আনএফিলিয়েটেড’। তৃতীয় মেয়াদে তিনি নিজে থেকেই হতে চাননি। অবশ্য এখন আইনগতভাবেই কেউ পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। সেই হিসাবে ট্রাম্পের জন্য এটি শেষবার। আমরা যদি গত ৩০ বছর সময়কালকে বিবেচনা করি, তাহলে একটি লক্ষণীয় চিত্র দেখতে পাব। ১৯৯৩ সালে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বিল ক্লিন্টন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি পরপর দু’বার নির্বাচিত হওয়ার পর জর্জ ডব্লিও বুশ (জুনিয়র) ২০০১-এর নির্বাচনে জয়লাভ করেন; তিনি রিপাবলিকান। বুশ পরপর দু’বার নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে রিপাবলিকানদের হারিয়ে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী বারাক ওবামা নির্বাচিত হন। তিনিও পরপর দু’বার নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালে ডেমোক্র্যাটদের বিদায় করে রিপালিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসেন। এখানে দেখা যাচ্ছে, এক ব্যক্তিকে পরপর দু’বার নির্বাচিত করার পর দলসহ বিদায় নিতে হয়েছে। এ প্রবণতা বজায় থাকলে ট্রাম্প আবারও নির্বাচিত হওয়ার আশা করতেই পরেন। তবে এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়।

হ্যাঁ, আমেরিকার নির্বাচনের একটি বৈশিষ্ট্য হল সেখানে কখনও কখনও ব্যাটে-বলে এক না-ও হতে পারে। সাধারণ ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন না-ও ঘটতে পারে। গত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের চেয়ে ৩০ লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হতে পারেননি। এর জন্য নির্বাচন পদ্ধতিই দায়ী। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাধারণ মানুষের সমর্থন পরোক্ষভাবে কাজ করে। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে ইলেক্টরাল ভোট। যে রাজ্যে যে প্রার্থী জয়ী হবেন সে রাজ্যের সব ইলেক্টরাল ভোট তার। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মোট ইলেক্টরাল ভোট ৫৩৫টি। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি (ডিস্ট্রিক অব কলাম্বিয়া) কোনো অঙ্গরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারপরও তার তিনটি ইলেক্টরাল ভোট আছে। সব মিলিয়ে ইলেক্টরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। তাই কোনো প্রার্থীকে জয়ী হতে হলে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেক্টরাল ভোটের প্রয়োজন পড়ে। কোনো কোনো রাজ্য হল কোনো কোনো দলের ঘাঁটি। বাংলাদেশে আমরা মনে করি, গোপালগঞ্জ হল আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, আবার বগুড়া হল বিএনপির। তেমনি আমেরিকাতেও রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটি হিসেবে অঙ্গরাজ্য আছে। সে রাজ্যগুলো নিয়ে মাথাব্যথা কম। কিন্তু ১২টি রাজ্য আছে যাদের ভোটারদের ‘সুইং ভোটার’ বলা হয়। এদের ভোট কখনও রিপাবলিকান আবার কখনও ডেমোক্র্যাটদের ঘরে যায়। এ ভোটগুলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়ায়। এ রাজ্যগুলোতে ১৯০টি ইলেক্টরাল ভোট আছে। সুতরাং ২৭০টি ভোটের জন্য সবচেয়ে বেশি ঘাম ঝরাতে হয় এ রাজ্যগুলোতে।

এবারের নির্বাচনে আরেকটি বিবেচনায় নেয়ার মতো বিষয় হল আগাম ভোট। প্রতিবারই আগাম ভোট পড়ে, তবে হয়তো করোনার কথা মাথায় রেখে এবারে আগাম ভোট সবচেয়ে বেশি পড়েছে। দেশটির মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ কোটি। ১৭৮৯ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন নির্বাচিত হন তখন ভোট পড়েছিল মাত্র ৬ শতাংশ। এ বছর সে হার ৬৫ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। সেই হিসাবে মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। তার মধ্যে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত আগাম ভোট পড়েছে প্রায় ৭ কোটি এবং ২ নভেম্বর পর্যন্ত তা ১০ কোটি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সুইং রাজ্যগুলোতে আগাম ভোটের হিসাবে জো বাইডেন এগিয়ে আছেন। অ্যারিজোনায় ২ দশমিক ৭, ফ্লোরিডায় ১ দশমিক ৯, জর্জিয়ায় ০ দশমিক ৫, লোয়ায় ১ দশমিক ১, মিশিগানে ৭ দশমিক ৮, মিনেসোটায় ৭ দশমিক ১, নেভাদায় ৫ দশমিক ৮, নর্থ ক্যারোলিনায় ১ দশমিক ৯, পেনসিলভানিয়ায় ৫ দশমিক ৪, উইসকনসিনে ৫ দশমিক ৭ পয়েন্টে আগাম ভোটে জো বাইডেন এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে ওহাইয়োতে ১ এবং টেক্সাসে ১ দশমিক ৭ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন মাধ্যমের আগাম জরিপে দেখা যাচ্ছে, জো বাইডেন ১১-১৫ শতাংশ বেশি ভোট পাবেন।

একটা অপ্রিয় সত্য হল, রাষ্ট্রীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ না থাকলেও আমেরিকান সমাজে বর্ণবাদের উপস্থিতি আছে। তবে নিশ্চয়ই সবাই নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ উসকে দেয়ার অভিযোগ আছে। রিপাবলিকানদের অনেকেই এ বর্ণবাদের চর্চা করে থাকেন। আর কালো কিংবা তামাটে মানুষ ডেমোক্র্যাটদের পছন্দ করেন। আমেরিকান সমাজের ৬৭ শতাংশই শ্বেতাঙ্গ। তবে সব শ্বেতাঙ্গ রিপাবলিকান নয়। আবার শ্বেতাঙ্গ হলেও ট্রাম্পকে ব্যক্তি হিসেবে অনেকে পছন্দ করেন না। তাছাড়া নির্বাচনের আগে ট্রাম্প-বাইডেনের যে তিনটি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতেও বাইডেন এগিয়ে আছেন। সব মিলিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষের বেশির ভাগই জো বাইডেনের পক্ষে। এখন দেখা যাক, আমেরিকাবাসীর পছন্দের সঙ্গে তাবৎ পৃথিবীর মানুষের মিল হয় কিনা।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়