ক্যাডারতন্ত্র দিয়ে গণতন্ত্র হয় না
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
ক্যাডারতন্ত্র দিয়ে গণতন্ত্র হয় না

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

০১ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সমাজজীবনে ইদানীং যা ঘটে চলেছে, তাতে মনে হচ্ছে, সর্বত্র আমরা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা থেকে শুরু করে শহরে-বন্দরে-গ্রামে যেসব অঘটন ঘটতে দেখা যাচ্ছে তাতে এমনটিই মনে হচ্ছে। এই সেদিনও রাজধানীর রাজপথে যা ঘটে গেল, নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যে আচরণ করা হল, তা নিতান্তই অনভিপ্রেত।

যদিও বিষয়টি এখন আদালতে বিচার্য এবং আদালতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন; কিন্তু ইতোমধ্যে ঘটনাটি দেশের মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ ঘটনাটির মূল হোতা একজন জনপ্রতিনিধি! তাছাড়া তার পিতা এবং শ্বশুর দুজনই বর্তমান সংসদের সংসদ সদস্য। ঘটনার নায়ক ইরফান সেলিমের পিতা হাজী সেলিম একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং ইরফান সেলিমও রাজধানী ঢাকার একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

আর রাজধানীর একটি সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পদটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঢাকায় বসবাসরত অনেক কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী-ব্যবসায়ীসহ অনেককেই চরিত্র সনদ, নাগরিকত্ব সনদ ইত্যাদির জন্য তার শরণাপন্ন হতে হয়। আর এমন একজন স্বনামধন্য পিতার কমিশনার পুত্রই রাজপথে অপরাধ করার অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে জেলে আছেন। এ ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব, তা বুঝে উঠতে পারছি না। তবে এটি যে এক ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা তথা ভারসাম্যহীনতা তা বলাই বাহুল্য। এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধন-সম্পদ আহরণ করাসহ সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছেন, সে কথাটিও এখন দিবালোকের মতো সত্য।

ফলস্বরূপ তাদের দমন করতে সরকারকেও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে কে কোন দলের লোক বা নেতা, সে বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়েই তা করা হচ্ছে! এককথায় অপকর্ম করে সরকারদলীয় লোকও রক্ষা পাচ্ছেন না; কিন্তু প্রশ্ন হল, এ ধরনের কয়জন ব্যক্তিকে ধরা হচ্ছে বা ধরা সম্ভব হচ্ছে? সেদিন রাজধানীর কলাবাগানের ঘটনায় যদি ইরফান সেলিম ধরা না খেতেন, তাহলে তো তার সম্বন্ধে এত কিছু জানা যেত না।

তিনি যে তার এলাকার একজন ত্রাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তি সে কথাও তো সরকারসহ দেশের মানুষের অজানাই থেকে যেত। এলাকার জনগণ তার সম্পর্কে এখন যেসব কথা বলছেন, যেসব তথ্য দিচ্ছেন, এতদিন তা জানা গেল না কেন, সেটিও কিন্তু একটি বিরাট প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী বলবেন জানি না, তবে ইরফান সেলিম যদি এসব দোষে দুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারেন না। দোকানপাটসহ বাড়িঘর, জায়গা-জমি দখলের সঙ্গে জড়িত ইরফান সেলিমকে এতদিন তারা ছাড় দিয়ে আসছিলেন কেন, সে প্রশ্নেরও উত্তর জানা দরকার। যদি বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই তারা এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাহলে অন্যায় কিছু বলা হবে বলে মনে হয় না। আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, অগ্রণী ব্যাংকের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমিও ইরফান সেলিম গং দখল করে রেখেছিলেন।

এ অবস্থায় দেশের মানুষের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, সারা দেশে আরও ইরফান সেলিম বা তার চেয়েও ভয়ংকর কোনো দখলবাজ, চাঁদাবাজ, জনপ্রতিনিধি আছেন কিনা। কারণ এ ধরনের জনপ্রতিনিধি যদি সারা দেশেই থেকে থাকেন, তাহলে দেশের মানুষেরও তো ভালো থাকার কথা নয়। যদি অগ্রণী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের জমিই দখল করে নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে আইনের শাসন নিয়েও তো প্রশ্ন ওঠে! দেখা গেছে, অনেকে জাল দলিল তৈরি করে কারও সম্পত্তি দখল করে নেয় এবং সেক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধিরা জড়িত থাকেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। যাক সে কথা। ইরফান সেলিমের কথায় ফিরে আসি। হাজী সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিম যে তার এলাকায় রামরাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছিলেন, নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাই যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিলেন। আর সেই সঙ্গে প্রমাণ হল, ‘চোখ থাকতেও আমরা অন্ধ।’

আমার সন্তানতুল্য নৌবাহিনীর কর্তকর্তা ছেলেটিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় যখন বলতে শুনলাম, ‘বইপুস্তক কিনতে এসে তিনি মারধরের শিকার হয়েছেন, এমনকি তার স্ত্রীও লাঞ্ছিত হয়েছেন’, তখন তার প্রতি সহমর্মিতায় আমার হৃদয়ও বিগলিত হয়েছে। আমিও ব্যথিত হয়েছি। অতঃপর ঘটনার নায়ক ইরফান সেলিম সম্পর্কে যা জানা গেল তা আরও দুঃখজনক। একজন এমপিপুত্র যিনি নিজেও একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, তার চলাফেরা, জীবন পদ্ধতি যে একজন দস্যু সরদার অপেক্ষাও খারাপ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সে তথ্যপ্রমাণই দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করায় আমরা এক নব্য দস্যু বনহুরের একটা আস্তানাই যেন দেখতে পেলাম। এসব দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, সারা দেশে না জানি এ ধরনের কতজন দস্যুর আস্তানা আছে। আর দস্যুরূপী এসব ব্যক্তিই বা প্রতিদিন কত শত-সহস্র মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলেছে।

এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাই। বিশ-একুশ বছর আগের ঘটনা। আমি আমার মেডিকেল পড়ুয়া ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে জুমা পড়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছি। এমন সময় বিপরীত দিক থেকে একটি জিপ গাড়ি তার লাইন ছেড়ে আমার লাইনে চলে এলে আমি দ্রুত ব্রেক চেপে থেমে পড়ি। এ অবস্থায় উল্টো দিক থেকে এসে আমার লাইনে ঢুকে পড়া গাড়িটির ড্রাইভিং সিটে বসা সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটি আমাকে গাড়ি পিছিয়ে নিতে বলে। ঝামেলা না বাধিয়ে আমিও ব্যাক করতে যাব, ইতোমধ্যেই সে আমাকে ধমকাধমকি শুরু করে দিলে জবাবে আমি কিছু বলতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সে গালাগালও শুরু করে দিল! আমি আমার ছেলেকে গাড়ি থেকে না নামার নির্দেশ দিয়ে নিজে নেমে বয়সে তরুণ ছেলেটিকে বললাম, ‘এসব হচ্ছেটা কী, বেআইনিভাবে আপনি আমার লাইনে ঢুকে উল্টো আমাকেই গালাগাল করছেন! আপনি ব্যাক করুন।’ তখন সে আমাকে বলল, ‘জানেন আমি সরকারকে বছরে পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকা ট্যাক্স দেই।’

তার কথার জবাবে বললাম, ‘তা দিলে দিন; কিন্তু আপনি বেআইনিভাবে উল্টো পথে আমার গাড়ির সামনে চলে এসেছেন, আপনি ব্যাক করুন।’ এবার সে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গালাগালের মাত্রা বাড়িয়ে তার জিপের পেছনে রাখা শটগান বের করে আমাকে হুমকি দিল! ঘটনাস্থলে ইতোমধ্যে অনেক লোক জড়ো হয়েছে, যাদের অধিকাংশই জুমার মুসল্লি এবং তাদের মধ্যে আমার পরিচিত এক লোকও ছিলেন। তো, এসব দেখে সেই ভদ্রলোক অস্ত্রধারী ছেলেটিকে বললেন, ‘আপনি যাকে অস্ত্র দেখাচ্ছেন, তাকে কি আপনি চেনেন? তিনিও তো লাইসেন্সধারী দুটি অস্ত্রের মালিক। আর এখানে পাশেই আমরা থাকি।’ তার এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত অন্যরাও ছেলেটিকে ভর্ৎসনা শুরু করলে উপায়ান্তর না দেখে সে গাড়ি ব্যাক করে নিয়ে সরে পড়েছিল। আমার পরিচিত ভদ্রলোকটি আমাকে বলেছিলেন, আমি সেদিন ভীষণ ঝুঁকিতে পড়েছিলাম, কারণ ওই ছেলেটি ছিল ঢাকার বিখ্যাত এক দুর্নীতিবাজের পুত্র। আর তারা প্রতিমাসে থানা পুলিশের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করেন বিধায় ধরাকে সরা জ্ঞান করেন! আজ এতদিন পর আবার এখনও শুনতে পাচ্ছি, ইরফান সেলিম গংও ওই একই প্রকৃতির। আর এ গোত্রের মানুষরা টাকার জোরে সবকিছু করতে চায় এবং অনেক কিছু করেও ফেলে। আর এভাবে এ শ্রেণির মানুষ নানাবিধ অসৎ ও অবৈধ পন্থায় অঢেল অর্থের মালিক হয়ে বিভিন্নভাবে সমাজকে কলুষিত করে চলেছে। সুতরাং ইরফান সেলিমসহ এ ধরনের সবাইকে দমন করতে না পারলে দেশ ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে বলে মনে হয় না।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন নিয়েও সরকারের উচ্চমহলকে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে। ভবিষ্যতে উপরিউক্ত শ্রেণির ব্যক্তিরা কোনোভাবেই যেন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হতে পারেন তজ্জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাইকমান্ডকেও ভেবে দেখতে হবে সংসদীয় একটি সিটের জন্য, একটি মেয়র কাউন্সিলর ইত্যাদি পদের জন্য তারা কোনো ‘গোলমাল আলী’কে মনোনয়ন দেবেন কিনা। এখনও সতর্ক না হয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ক্যাডার লালন-পালনকারী অশুভ শক্তির অধিকারী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ব্যক্তি বা নেতা বানালে দেশ ও সমাজে কিন্তু সামাজিক ভারসাম্য বলতে আর অবশিষ্ট কিছু থাকবে না।

এক্ষেত্রে আরও একটু যোগ করে বলতে চাই, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও কিন্তু যথেষ্ট প্রশ্নের সম্মুখীন। একজন পেশাদার ভোট চোর, ভোট ডাকাত ঠেকাতে তারা আজ পর্যন্ত কতটা কী করেছেন বা করতে পেরেছেন সে বিষয়টিও ভেবে দেখার মতো। বড় বড় চেয়ারে বসে সেখানকার কর্তাব্যক্তিরাও রাজনৈতিক নেতাদের মতো সবকিছু ঠিকঠাক চলছে ধরনের মানসিকতায় উজ্জীবিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে বিষয়টিও তারা ভেবে দেখতে পারেন। কারণ দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার ফলে ক্যাডার লালনপালনকারীসহ একশ্রেণির অপরাধী ব্যক্তিও জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।

আর এসব ব্যক্তিই নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে চলেছেন, দেশ রক্ষায় নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তার গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করছেন না! এ অবস্থায় এসব ঘটনায় ইদানীং নির্বাচন কমিশন এবং নৌবাহিনীর কর্মকর্তার পক্ষ থেকে মামলা করায় যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে; কিন্তু প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তি যখন সাধারণ মানুষকে লাঞ্ছিত করেন বা মারধর করেন তখন তাদের পক্ষে কি প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয়? আর এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হল, ‘না’। কারণ সাধারণ একজন মানুষ নিজে যেমন এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস রাখেন না, তেমনি তার পক্ষে এ কাজে কেউ এগিয়েও আসেন না। সুতরাং নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচনের সময় গুণ্ডা-বদমাশদের ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি না ঠেকাতে পারেন, তাহলে ওই শ্রেণির মানুষ নির্বাচিত হতেই থাকবেন আর দেশের মানুষও তাদের হাতে নিগৃহীত হতেই থাকবেন!

লেখাটি আর দীর্ঘায়িত না করে উপসংহার টেনে বলতে চাই, সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ক্যাডারধারী কোনো ব্যক্তিই আর কোনোদিন নির্বাচিত হতে পারবেন না। এক্ষেত্রে ক্যাডার বাহিনীকে মূল্যহীন করে দিতে পারলেই একটা কাজের কাজ হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ক্যাডার বাহিনী ছাড়া ওই শ্রেণির নেতারাও মূল্যহীন। সুতরাং দেশ, সমাজ এবং রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ক্যাডার বাহিনী নির্মূল করাই হবে এখন সময়ের কাজ।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

ক্যাডারতন্ত্র দিয়ে গণতন্ত্র হয় না

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
০১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সমাজজীবনে ইদানীং যা ঘটে চলেছে, তাতে মনে হচ্ছে, সর্বত্র আমরা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা থেকে শুরু করে শহরে-বন্দরে-গ্রামে যেসব অঘটন ঘটতে দেখা যাচ্ছে তাতে এমনটিই মনে হচ্ছে। এই সেদিনও রাজধানীর রাজপথে যা ঘটে গেল, নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যে আচরণ করা হল, তা নিতান্তই অনভিপ্রেত।

যদিও বিষয়টি এখন আদালতে বিচার্য এবং আদালতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন; কিন্তু ইতোমধ্যে ঘটনাটি দেশের মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ ঘটনাটির মূল হোতা একজন জনপ্রতিনিধি! তাছাড়া তার পিতা এবং শ্বশুর দুজনই বর্তমান সংসদের সংসদ সদস্য। ঘটনার নায়ক ইরফান সেলিমের পিতা হাজী সেলিম একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং ইরফান সেলিমও রাজধানী ঢাকার একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

আর রাজধানীর একটি সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর পদটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঢাকায় বসবাসরত অনেক কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী-ব্যবসায়ীসহ অনেককেই চরিত্র সনদ, নাগরিকত্ব সনদ ইত্যাদির জন্য তার শরণাপন্ন হতে হয়। আর এমন একজন স্বনামধন্য পিতার কমিশনার পুত্রই রাজপথে অপরাধ করার অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে জেলে আছেন। এ ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব, তা বুঝে উঠতে পারছি না। তবে এটি যে এক ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা তথা ভারসাম্যহীনতা তা বলাই বাহুল্য। এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধন-সম্পদ আহরণ করাসহ সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছেন, সে কথাটিও এখন দিবালোকের মতো সত্য।

ফলস্বরূপ তাদের দমন করতে সরকারকেও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে কে কোন দলের লোক বা নেতা, সে বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়েই তা করা হচ্ছে! এককথায় অপকর্ম করে সরকারদলীয় লোকও রক্ষা পাচ্ছেন না; কিন্তু প্রশ্ন হল, এ ধরনের কয়জন ব্যক্তিকে ধরা হচ্ছে বা ধরা সম্ভব হচ্ছে? সেদিন রাজধানীর কলাবাগানের ঘটনায় যদি ইরফান সেলিম ধরা না খেতেন, তাহলে তো তার সম্বন্ধে এত কিছু জানা যেত না।

তিনি যে তার এলাকার একজন ত্রাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তি সে কথাও তো সরকারসহ দেশের মানুষের অজানাই থেকে যেত। এলাকার জনগণ তার সম্পর্কে এখন যেসব কথা বলছেন, যেসব তথ্য দিচ্ছেন, এতদিন তা জানা গেল না কেন, সেটিও কিন্তু একটি বিরাট প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী বলবেন জানি না, তবে ইরফান সেলিম যদি এসব দোষে দুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারেন না। দোকানপাটসহ বাড়িঘর, জায়গা-জমি দখলের সঙ্গে জড়িত ইরফান সেলিমকে এতদিন তারা ছাড় দিয়ে আসছিলেন কেন, সে প্রশ্নেরও উত্তর জানা দরকার। যদি বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই তারা এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাহলে অন্যায় কিছু বলা হবে বলে মনে হয় না। আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, অগ্রণী ব্যাংকের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমিও ইরফান সেলিম গং দখল করে রেখেছিলেন।

এ অবস্থায় দেশের মানুষের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, সারা দেশে আরও ইরফান সেলিম বা তার চেয়েও ভয়ংকর কোনো দখলবাজ, চাঁদাবাজ, জনপ্রতিনিধি আছেন কিনা। কারণ এ ধরনের জনপ্রতিনিধি যদি সারা দেশেই থেকে থাকেন, তাহলে দেশের মানুষেরও তো ভালো থাকার কথা নয়। যদি অগ্রণী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের জমিই দখল করে নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে আইনের শাসন নিয়েও তো প্রশ্ন ওঠে! দেখা গেছে, অনেকে জাল দলিল তৈরি করে কারও সম্পত্তি দখল করে নেয় এবং সেক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধিরা জড়িত থাকেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। যাক সে কথা। ইরফান সেলিমের কথায় ফিরে আসি। হাজী সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিম যে তার এলাকায় রামরাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছিলেন, নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাই যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিলেন। আর সেই সঙ্গে প্রমাণ হল, ‘চোখ থাকতেও আমরা অন্ধ।’

আমার সন্তানতুল্য নৌবাহিনীর কর্তকর্তা ছেলেটিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় যখন বলতে শুনলাম, ‘বইপুস্তক কিনতে এসে তিনি মারধরের শিকার হয়েছেন, এমনকি তার স্ত্রীও লাঞ্ছিত হয়েছেন’, তখন তার প্রতি সহমর্মিতায় আমার হৃদয়ও বিগলিত হয়েছে। আমিও ব্যথিত হয়েছি। অতঃপর ঘটনার নায়ক ইরফান সেলিম সম্পর্কে যা জানা গেল তা আরও দুঃখজনক। একজন এমপিপুত্র যিনি নিজেও একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর, তার চলাফেরা, জীবন পদ্ধতি যে একজন দস্যু সরদার অপেক্ষাও খারাপ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সে তথ্যপ্রমাণই দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করায় আমরা এক নব্য দস্যু বনহুরের একটা আস্তানাই যেন দেখতে পেলাম। এসব দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, সারা দেশে না জানি এ ধরনের কতজন দস্যুর আস্তানা আছে। আর দস্যুরূপী এসব ব্যক্তিই বা প্রতিদিন কত শত-সহস্র মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলেছে।

এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাই। বিশ-একুশ বছর আগের ঘটনা। আমি আমার মেডিকেল পড়ুয়া ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে জুমা পড়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছি। এমন সময় বিপরীত দিক থেকে একটি জিপ গাড়ি তার লাইন ছেড়ে আমার লাইনে চলে এলে আমি দ্রুত ব্রেক চেপে থেমে পড়ি। এ অবস্থায় উল্টো দিক থেকে এসে আমার লাইনে ঢুকে পড়া গাড়িটির ড্রাইভিং সিটে বসা সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটি আমাকে গাড়ি পিছিয়ে নিতে বলে। ঝামেলা না বাধিয়ে আমিও ব্যাক করতে যাব, ইতোমধ্যেই সে আমাকে ধমকাধমকি শুরু করে দিলে জবাবে আমি কিছু বলতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সে গালাগালও শুরু করে দিল! আমি আমার ছেলেকে গাড়ি থেকে না নামার নির্দেশ দিয়ে নিজে নেমে বয়সে তরুণ ছেলেটিকে বললাম, ‘এসব হচ্ছেটা কী, বেআইনিভাবে আপনি আমার লাইনে ঢুকে উল্টো আমাকেই গালাগাল করছেন! আপনি ব্যাক করুন।’ তখন সে আমাকে বলল, ‘জানেন আমি সরকারকে বছরে পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকা ট্যাক্স দেই।’

তার কথার জবাবে বললাম, ‘তা দিলে দিন; কিন্তু আপনি বেআইনিভাবে উল্টো পথে আমার গাড়ির সামনে চলে এসেছেন, আপনি ব্যাক করুন।’ এবার সে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গালাগালের মাত্রা বাড়িয়ে তার জিপের পেছনে রাখা শটগান বের করে আমাকে হুমকি দিল! ঘটনাস্থলে ইতোমধ্যে অনেক লোক জড়ো হয়েছে, যাদের অধিকাংশই জুমার মুসল্লি এবং তাদের মধ্যে আমার পরিচিত এক লোকও ছিলেন। তো, এসব দেখে সেই ভদ্রলোক অস্ত্রধারী ছেলেটিকে বললেন, ‘আপনি যাকে অস্ত্র দেখাচ্ছেন, তাকে কি আপনি চেনেন? তিনিও তো লাইসেন্সধারী দুটি অস্ত্রের মালিক। আর এখানে পাশেই আমরা থাকি।’ তার এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত অন্যরাও ছেলেটিকে ভর্ৎসনা শুরু করলে উপায়ান্তর না দেখে সে গাড়ি ব্যাক করে নিয়ে সরে পড়েছিল। আমার পরিচিত ভদ্রলোকটি আমাকে বলেছিলেন, আমি সেদিন ভীষণ ঝুঁকিতে পড়েছিলাম, কারণ ওই ছেলেটি ছিল ঢাকার বিখ্যাত এক দুর্নীতিবাজের পুত্র। আর তারা প্রতিমাসে থানা পুলিশের পেছনে প্রচুর টাকা খরচ করেন বিধায় ধরাকে সরা জ্ঞান করেন! আজ এতদিন পর আবার এখনও শুনতে পাচ্ছি, ইরফান সেলিম গংও ওই একই প্রকৃতির। আর এ গোত্রের মানুষরা টাকার জোরে সবকিছু করতে চায় এবং অনেক কিছু করেও ফেলে। আর এভাবে এ শ্রেণির মানুষ নানাবিধ অসৎ ও অবৈধ পন্থায় অঢেল অর্থের মালিক হয়ে বিভিন্নভাবে সমাজকে কলুষিত করে চলেছে। সুতরাং ইরফান সেলিমসহ এ ধরনের সবাইকে দমন করতে না পারলে দেশ ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে বলে মনে হয় না।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন নিয়েও সরকারের উচ্চমহলকে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে। ভবিষ্যতে উপরিউক্ত শ্রেণির ব্যক্তিরা কোনোভাবেই যেন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হতে পারেন তজ্জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাইকমান্ডকেও ভেবে দেখতে হবে সংসদীয় একটি সিটের জন্য, একটি মেয়র কাউন্সিলর ইত্যাদি পদের জন্য তারা কোনো ‘গোলমাল আলী’কে মনোনয়ন দেবেন কিনা। এখনও সতর্ক না হয়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ক্যাডার লালন-পালনকারী অশুভ শক্তির অধিকারী ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ব্যক্তি বা নেতা বানালে দেশ ও সমাজে কিন্তু সামাজিক ভারসাম্য বলতে আর অবশিষ্ট কিছু থাকবে না।

এক্ষেত্রে আরও একটু যোগ করে বলতে চাই, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও কিন্তু যথেষ্ট প্রশ্নের সম্মুখীন। একজন পেশাদার ভোট চোর, ভোট ডাকাত ঠেকাতে তারা আজ পর্যন্ত কতটা কী করেছেন বা করতে পেরেছেন সে বিষয়টিও ভেবে দেখার মতো। বড় বড় চেয়ারে বসে সেখানকার কর্তাব্যক্তিরাও রাজনৈতিক নেতাদের মতো সবকিছু ঠিকঠাক চলছে ধরনের মানসিকতায় উজ্জীবিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সে বিষয়টিও তারা ভেবে দেখতে পারেন। কারণ দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যার ফলে ক্যাডার লালনপালনকারীসহ একশ্রেণির অপরাধী ব্যক্তিও জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।

আর এসব ব্যক্তিই নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে চলেছেন, দেশ রক্ষায় নিয়োজিত সেনা কর্মকর্তার গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করছেন না! এ অবস্থায় এসব ঘটনায় ইদানীং নির্বাচন কমিশন এবং নৌবাহিনীর কর্মকর্তার পক্ষ থেকে মামলা করায় যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে; কিন্তু প্রশ্ন হল, এসব ব্যক্তি যখন সাধারণ মানুষকে লাঞ্ছিত করেন বা মারধর করেন তখন তাদের পক্ষে কি প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয়? আর এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হল, ‘না’। কারণ সাধারণ একজন মানুষ নিজে যেমন এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস রাখেন না, তেমনি তার পক্ষে এ কাজে কেউ এগিয়েও আসেন না। সুতরাং নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচনের সময় গুণ্ডা-বদমাশদের ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি না ঠেকাতে পারেন, তাহলে ওই শ্রেণির মানুষ নির্বাচিত হতেই থাকবেন আর দেশের মানুষও তাদের হাতে নিগৃহীত হতেই থাকবেন!

লেখাটি আর দীর্ঘায়িত না করে উপসংহার টেনে বলতে চাই, সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ক্যাডারধারী কোনো ব্যক্তিই আর কোনোদিন নির্বাচিত হতে পারবেন না। এক্ষেত্রে ক্যাডার বাহিনীকে মূল্যহীন করে দিতে পারলেই একটা কাজের কাজ হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ক্যাডার বাহিনী ছাড়া ওই শ্রেণির নেতারাও মূল্যহীন। সুতরাং দেশ, সমাজ এবং রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ক্যাডার বাহিনী নির্মূল করাই হবে এখন সময়ের কাজ।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট