কর্মবাজার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
jugantor
কর্মবাজার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

  মুঈদ রহমান  

২২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দেয়া ভার্চুয়াল ভাষণে দেশের যুবকদের উদ্দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিগ্রি নিয়ে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই কিছু করব, আরও ১০ জনকে চাকরি দেব, নিজে উদ্যোক্তা হব, নিজেই বস হব-সেই চিন্তা করতে হবে।’ সন্দেহ নেই, সময় এসেছে পেশাগত দিক নিয়ে নতুন করে ভাবার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার যত বড় হচ্ছে, নতুন নতুন কর্মসংস্থানের পথ বের করার ততই প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমেও অনেক আলোচনার সূত্রপাত ঘটছে। তাই আমাদের বর্তমান কর্মবাজারের (জব মার্কেট) অবস্থাটা কী, বিনিয়োগের ধরনটাই বা কেমন এবং কী করে বেকারত্ব দূরীকরণে চেষ্টা চালানো যায়- সেসব বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

পৃথিবীর সব কর্মবাজারই দু’ভাগে বিভক্ত : প্রথমটি হল আনুষ্ঠানিক খাত; দ্বিতীয়টি অনানুষ্ঠানিক খাত। আনুষ্ঠানিক খাতগুলোয় কর্মরতদের নিয়োগপত্র, বেতন স্কেল, অবসরে গেলে পেনশন বা গ্রাচ্যুইটি ইত্যাদি আইনগত ও অধিকারগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অনানুষ্ঠানিক খাতে এর কোনো বালাই নেই। যিনি নিয়োগকর্তা, তার মর্জির ওপর কর্ম নির্ধারিত হবে। বেতন ও সময় নির্ধারিত নয়, নিয়োগপত্রও থাকে না। কৃষিকাজ, দিনমজুরের কাজ; চালকল, ইটভাটা, ছোট ছোট দোকান-রেস্টুরেন্ট, ছোটখাটো ওয়েলডিং মেশিনারিজ, নির্মাণকাজ, বাসাবাড়িতে ধোয়ামোছার কাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক কর্মজীবী দেখা যায়। যেখানে একজন আনুষ্ঠানিক ব্যক্তি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন না, সেখানে একজন অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তিকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে দেখা যায়। একজন আনুষ্ঠানিক ব্যক্তির ন্যূনতম মজুরি ধরা হয়েছে ৮ হাজার টাকা; কিন্তু অনানুষ্ঠানিক খাতে এমন কোনো সীমা নির্ধারণ করা থাকে না। বাস্তবতা হল, এই ঝুলন্ত কর্ম খাতটি দিনকে দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োগ কমছে। ২০০০ সালে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করত মোট কর্মজীবীর ৭৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে তা বেড়ে উন্নীত হয়েছে ৮৯ শতাংশে। বিপরীতে ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করত ২৫ শতাংশ মানুষ, এখন তা ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। তাই যদি হয়, তাহলে বর্তমানে দেশে ৬ কোটি ৮০ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, আর মাত্র ৭৫ লাখ আছে আনুষ্ঠানিক খাতে। সুতরাং বিষয়টি ভাববার মতো।

কারণ সরকারিভাবে এ মুহূর্তে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই কম। আমাদের মোট সরকারি খাতে পদ আছে মাত্র ১৬ লাখ ৭৮ হাজার। এর মধ্যে কাজ করছে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার, যার ২৭ শতাংশ নারী। হিসাবমতে মাত্র ৩ লাখ পদ খালি আছে, যা মোট পদের প্রায় ১৮ শতাংশ। অথচ প্রতি বছর আমাদের শ্রমবাজারে প্রায় ২২ লাখ কর্মপ্রত্যাশী প্রবেশ করে এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৭-৮ লাখ মানুষ বিদেশ পাড়ি দেয়। তাই বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। সরকারি হিসাবমতে করোনাপূর্ব বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ; কিন্তু গবেষকরা বলছেন, দেশে প্রতি দুটি খানার (হাউসহোল্ড) ভেতর একজন করে তরুণ/তরুণী বেকার। আমাদের দেশে খানার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি, সে হিসাবে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৫ লাখে। সরকার ও গবেষকদের দেয়া তথ্যের মধ্যে বিশাল ফারাক থাকলেও আমরা অনুমান করতে পারি, এ দেশে বেকারের সংখ্যা ৫০ লাখের কম নয়। সেই হিসাবে প্রতিটি জেলায় গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বেকার আছে। এত বড় বোঝা আমাদের চিন্তিত করে বৈকি!

বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে- এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার জো নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ সালে মোট জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ পরিমাণ অর্থ দিয়ে আমাদের বিনিয়োগ যাত্রা শুরু। আশির দশকের শুরু পর্যন্ত তা ২০ শতাংশের নিচেই ছিল। ২০০৮ ও ২০১২ সাল ছাড়া এ যাত্রা ঊর্ধ্বমুখীই আছে। বর্তমান সময়ে আমাদের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশে। বিবেচনার বিষয় হল, এই বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশই বেসরকারি বা ব্যক্তি খাতে এবং জিডিপির মাত্র ৮ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ। করোনাপূর্ব সময়ে ২০১৯ সালে আমাদের জিডিপি ছিল ৩০২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৬ লাখ কোটি টাকা)। সে হিসাবে আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা এবং সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ২ লাখ কোটি টাকা। একটা ছোট অঙ্কের বিনিয়োগ হল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। ২০১৮ সালে ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগটি এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। বিনিয়োগের চিত্রটি দেখলেই বোঝা যায়, বিনিয়োগ সম্ভাবনা বেসরকারি খাতেই বেশি হওয়ার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু বাজারবান্ধব, তাই বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণই ঘটবে এবং সেই সঙ্গে সংকুচিত হবে সরকারি খাত।

আগেই বলেছি, কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। আমরা হয়তো ভাবতে পারি বিনিয়োগ করার মতো অর্থ আমাদের আছে কি না। জবাবে বলতে পারি, এখনও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগযোগ্য বা অলস টাকা পড়ে আছে। ২০০৯ সালে এ ধরনের অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকাররাই বলছেন, একসময় অর্থের তারল্যের সংকটের কথা ভাবতাম, এখন অলস টাকার বোঝা বহন করছি।

এতে ব্যাংকের মুনাফাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা বলছেন, আমাদের বিনিয়োগ করার ইচ্ছা আছে, অর্থও আছে; কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হয়। ব্যবসা আর বিনিয়োগ সমার্থক নয়। ব্যবসার ক্ষেত্রে সকাল ১০টায় কারওয়ান বাজার থেকে ১০০ টাকার মাছ কিনে ১১টার মধ্যেই তা মিরপুরে ১১০ টাকায় বিক্রি করে মূলধন ও মুনাফা ঘরে তুলতে পারা যায়। কিন্তু বিনিয়োগ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার; এখানে অনিশ্চয়তার ঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমান সরকার সে বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। নিজেদের স্বাবলম্বী ও ভালো উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টিতে কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখন সময় হল এসব সুবিধাকে কাজে লাগানো।

একজন মানুষ কেন নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ভাবেন না, তার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। শত শত বছরের ঔপনিবেশিক মানসিকতা একটা বড় সমস্যা। আমাদের সন্তান যখন তার স্কুলযাত্রা শুরু করে, তখন থেকেই আমরা ভাবতে অভ্যস্ত যে, আমার সন্তান প্রতিষ্ঠিত কিছু পেশায় নিয়োজিত হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, উকিল, জনপ্রশাসক- এর বাইরে আমরা ভাবতেই পারি না। সেই সন্তান যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় পাবলিক সার্ভিস কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষ থেকেই একজন রসায়নের ছাত্রও বিসিএস প্রস্তুতি নিতে থাকে, আবার একজন বাংলা সাহিত্যের ছাত্রও তাই। নিজের মতো করে কোনো কিছু করার কথা তারা ভাবতেই পারে না। আবার এই ভাবতে না পারাটা শিক্ষার্থীর দুর্বলতা নয়। আমাদের যে পাঠক্রম, তা উদ্যোক্তা তৈরির উপযোগী নয়; নতুন ভাবনার উদ্রেক ঘটায় না।

একজন মানুষকে যদি উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া না যায়, তাহলে তার কাছ থেকে নতুন নতুন উদ্ভাবন আশা করাটা বেমানান। আরেকটি নতুন সমস্যা আমাদের দেশে প্রকট হয়ে উঠেছে। ‘রেন্ট সিকার’ নামে একটি গ্রুপের জন্ম হয়েছে। তারা কোনো ধরনের উৎপাদন কিংবা সেবার সঙ্গে জড়িত থাকে না অথচ টাকা উপার্জন করে। এই শ্রেণিটির আয়ের উৎস হল বিভিন্ন ধরনের কমিশন, দালালি, ভূমি দখল, পারমিট বিক্রি ইত্যাদি। সাধারণত রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভর করেই এই শ্রেণিটি টিকে আছে। এটি যুবকদের মাঝে একটি অন্য ধরনের জীবনের স্বাদ দেয়। এই শ্রেণিটির কার্যকর বিলোপ প্রয়োজন। কারণ এটি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে।

তারপরও যদি কোনো উদ্যোক্তা পাওয়া যায় সেক্ষেত্রেও সমস্যা থেকে যায়। উদ্যোক্তাকে সহযোগিতা করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের কথা আমরা উল্লেখ করেছি। কিন্তু সমস্যা হল, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসায় সহজীকরণের কথা বলে এসেছি। কিছুটা হয়তো হয়েছে; কিন্তু ঋণ সুবিধা সহজীকরণ ষোলো আনা হতে হবে। সেখানে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করতে হবে এবং সুদের হার তুলনামূলকভাবে কমাতে হবে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে (এসএমই) বিশেষ বিবেচনায় নেব। তাদের একটু বেশি সুবিধা দিতে হবে। বড় শিল্পের ক্ষেত্রে হাজারো সুবিধা দিয়েও আমাদের প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করার যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে।

সর্বশেষ যে কথাটি বলতে চাই তা হল, উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া যাবে না। মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে আমাদের তা থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অনুকূলে আছে। ১৫ বছর বয়সী থেকে ৬৪ বছরের মানুষকে আমরা কর্মক্ষম অংশ বলে বিবেচনা করি। এ অংশটি আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে এই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগাতে হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

কর্মবাজার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

 মুঈদ রহমান 
২২ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দেয়া ভার্চুয়াল ভাষণে দেশের যুবকদের উদ্দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিগ্রি নিয়ে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই কিছু করব, আরও ১০ জনকে চাকরি দেব, নিজে উদ্যোক্তা হব, নিজেই বস হব-সেই চিন্তা করতে হবে।’ সন্দেহ নেই, সময় এসেছে পেশাগত দিক নিয়ে নতুন করে ভাবার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার যত বড় হচ্ছে, নতুন নতুন কর্মসংস্থানের পথ বের করার ততই প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমেও অনেক আলোচনার সূত্রপাত ঘটছে। তাই আমাদের বর্তমান কর্মবাজারের (জব মার্কেট) অবস্থাটা কী, বিনিয়োগের ধরনটাই বা কেমন এবং কী করে বেকারত্ব দূরীকরণে চেষ্টা চালানো যায়- সেসব বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

পৃথিবীর সব কর্মবাজারই দু’ভাগে বিভক্ত : প্রথমটি হল আনুষ্ঠানিক খাত; দ্বিতীয়টি অনানুষ্ঠানিক খাত। আনুষ্ঠানিক খাতগুলোয় কর্মরতদের নিয়োগপত্র, বেতন স্কেল, অবসরে গেলে পেনশন বা গ্রাচ্যুইটি ইত্যাদি আইনগত ও অধিকারগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অনানুষ্ঠানিক খাতে এর কোনো বালাই নেই। যিনি নিয়োগকর্তা, তার মর্জির ওপর কর্ম নির্ধারিত হবে। বেতন ও সময় নির্ধারিত নয়, নিয়োগপত্রও থাকে না। কৃষিকাজ, দিনমজুরের কাজ; চালকল, ইটভাটা, ছোট ছোট দোকান-রেস্টুরেন্ট, ছোটখাটো ওয়েলডিং মেশিনারিজ, নির্মাণকাজ, বাসাবাড়িতে ধোয়ামোছার কাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক কর্মজীবী দেখা যায়। যেখানে একজন আনুষ্ঠানিক ব্যক্তি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন না, সেখানে একজন অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তিকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে দেখা যায়। একজন আনুষ্ঠানিক ব্যক্তির ন্যূনতম মজুরি ধরা হয়েছে ৮ হাজার টাকা; কিন্তু অনানুষ্ঠানিক খাতে এমন কোনো সীমা নির্ধারণ করা থাকে না। বাস্তবতা হল, এই ঝুলন্ত কর্ম খাতটি দিনকে দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োগ কমছে। ২০০০ সালে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করত মোট কর্মজীবীর ৭৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে তা বেড়ে উন্নীত হয়েছে ৮৯ শতাংশে। বিপরীতে ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করত ২৫ শতাংশ মানুষ, এখন তা ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। তাই যদি হয়, তাহলে বর্তমানে দেশে ৬ কোটি ৮০ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, আর মাত্র ৭৫ লাখ আছে আনুষ্ঠানিক খাতে। সুতরাং বিষয়টি ভাববার মতো।

কারণ সরকারিভাবে এ মুহূর্তে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই কম। আমাদের মোট সরকারি খাতে পদ আছে মাত্র ১৬ লাখ ৭৮ হাজার। এর মধ্যে কাজ করছে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার, যার ২৭ শতাংশ নারী। হিসাবমতে মাত্র ৩ লাখ পদ খালি আছে, যা মোট পদের প্রায় ১৮ শতাংশ। অথচ প্রতি বছর আমাদের শ্রমবাজারে প্রায় ২২ লাখ কর্মপ্রত্যাশী প্রবেশ করে এবং তাদের মধ্যে মাত্র ৭-৮ লাখ মানুষ বিদেশ পাড়ি দেয়। তাই বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। সরকারি হিসাবমতে করোনাপূর্ব বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ; কিন্তু গবেষকরা বলছেন, দেশে প্রতি দুটি খানার (হাউসহোল্ড) ভেতর একজন করে তরুণ/তরুণী বেকার। আমাদের দেশে খানার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি, সে হিসাবে বেকারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৫ লাখে। সরকার ও গবেষকদের দেয়া তথ্যের মধ্যে বিশাল ফারাক থাকলেও আমরা অনুমান করতে পারি, এ দেশে বেকারের সংখ্যা ৫০ লাখের কম নয়। সেই হিসাবে প্রতিটি জেলায় গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বেকার আছে। এত বড় বোঝা আমাদের চিন্তিত করে বৈকি!

বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে- এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার জো নেই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ সালে মোট জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ পরিমাণ অর্থ দিয়ে আমাদের বিনিয়োগ যাত্রা শুরু। আশির দশকের শুরু পর্যন্ত তা ২০ শতাংশের নিচেই ছিল। ২০০৮ ও ২০১২ সাল ছাড়া এ যাত্রা ঊর্ধ্বমুখীই আছে। বর্তমান সময়ে আমাদের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ৩১ দশমিক ৫৭ শতাংশে। বিবেচনার বিষয় হল, এই বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশই বেসরকারি বা ব্যক্তি খাতে এবং জিডিপির মাত্র ৮ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ। করোনাপূর্ব সময়ে ২০১৯ সালে আমাদের জিডিপি ছিল ৩০২ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৬ লাখ কোটি টাকা)। সে হিসাবে আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা এবং সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ২ লাখ কোটি টাকা। একটা ছোট অঙ্কের বিনিয়োগ হল বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। ২০১৮ সালে ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগটি এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। বিনিয়োগের চিত্রটি দেখলেই বোঝা যায়, বিনিয়োগ সম্ভাবনা বেসরকারি খাতেই বেশি হওয়ার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু বাজারবান্ধব, তাই বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণই ঘটবে এবং সেই সঙ্গে সংকুচিত হবে সরকারি খাত।

আগেই বলেছি, কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। আমরা হয়তো ভাবতে পারি বিনিয়োগ করার মতো অর্থ আমাদের আছে কি না। জবাবে বলতে পারি, এখনও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগযোগ্য বা অলস টাকা পড়ে আছে। ২০০৯ সালে এ ধরনের অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকাররাই বলছেন, একসময় অর্থের তারল্যের সংকটের কথা ভাবতাম, এখন অলস টাকার বোঝা বহন করছি।

এতে ব্যাংকের মুনাফাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। উদ্যোক্তারা বলছেন, আমাদের বিনিয়োগ করার ইচ্ছা আছে, অর্থও আছে; কিন্তু বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হয়। ব্যবসা আর বিনিয়োগ সমার্থক নয়। ব্যবসার ক্ষেত্রে সকাল ১০টায় কারওয়ান বাজার থেকে ১০০ টাকার মাছ কিনে ১১টার মধ্যেই তা মিরপুরে ১১০ টাকায় বিক্রি করে মূলধন ও মুনাফা ঘরে তুলতে পারা যায়। কিন্তু বিনিয়োগ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার; এখানে অনিশ্চয়তার ঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমান সরকার সে বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। নিজেদের স্বাবলম্বী ও ভালো উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টিতে কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখন সময় হল এসব সুবিধাকে কাজে লাগানো।

একজন মানুষ কেন নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ভাবেন না, তার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। শত শত বছরের ঔপনিবেশিক মানসিকতা একটা বড় সমস্যা। আমাদের সন্তান যখন তার স্কুলযাত্রা শুরু করে, তখন থেকেই আমরা ভাবতে অভ্যস্ত যে, আমার সন্তান প্রতিষ্ঠিত কিছু পেশায় নিয়োজিত হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, উকিল, জনপ্রশাসক- এর বাইরে আমরা ভাবতেই পারি না। সেই সন্তান যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তখন তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় পাবলিক সার্ভিস কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমবর্ষ থেকেই একজন রসায়নের ছাত্রও বিসিএস প্রস্তুতি নিতে থাকে, আবার একজন বাংলা সাহিত্যের ছাত্রও তাই। নিজের মতো করে কোনো কিছু করার কথা তারা ভাবতেই পারে না। আবার এই ভাবতে না পারাটা শিক্ষার্থীর দুর্বলতা নয়। আমাদের যে পাঠক্রম, তা উদ্যোক্তা তৈরির উপযোগী নয়; নতুন ভাবনার উদ্রেক ঘটায় না।

একজন মানুষকে যদি উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া না যায়, তাহলে তার কাছ থেকে নতুন নতুন উদ্ভাবন আশা করাটা বেমানান। আরেকটি নতুন সমস্যা আমাদের দেশে প্রকট হয়ে উঠেছে। ‘রেন্ট সিকার’ নামে একটি গ্রুপের জন্ম হয়েছে। তারা কোনো ধরনের উৎপাদন কিংবা সেবার সঙ্গে জড়িত থাকে না অথচ টাকা উপার্জন করে। এই শ্রেণিটির আয়ের উৎস হল বিভিন্ন ধরনের কমিশন, দালালি, ভূমি দখল, পারমিট বিক্রি ইত্যাদি। সাধারণত রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভর করেই এই শ্রেণিটি টিকে আছে। এটি যুবকদের মাঝে একটি অন্য ধরনের জীবনের স্বাদ দেয়। এই শ্রেণিটির কার্যকর বিলোপ প্রয়োজন। কারণ এটি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে।

তারপরও যদি কোনো উদ্যোক্তা পাওয়া যায় সেক্ষেত্রেও সমস্যা থেকে যায়। উদ্যোক্তাকে সহযোগিতা করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের কথা আমরা উল্লেখ করেছি। কিন্তু সমস্যা হল, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসায় সহজীকরণের কথা বলে এসেছি। কিছুটা হয়তো হয়েছে; কিন্তু ঋণ সুবিধা সহজীকরণ ষোলো আনা হতে হবে। সেখানে ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করতে হবে এবং সুদের হার তুলনামূলকভাবে কমাতে হবে। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে (এসএমই) বিশেষ বিবেচনায় নেব। তাদের একটু বেশি সুবিধা দিতে হবে। বড় শিল্পের ক্ষেত্রে হাজারো সুবিধা দিয়েও আমাদের প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করার যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে।

সর্বশেষ যে কথাটি বলতে চাই তা হল, উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া যাবে না। মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে আমাদের তা থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অনুকূলে আছে। ১৫ বছর বয়সী থেকে ৬৪ বছরের মানুষকে আমরা কর্মক্ষম অংশ বলে বিবেচনা করি। এ অংশটি আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে এই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগাতে হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়