গ্লোবাল কর্পোরেট প্রযুক্তির পথপরিক্রমা
jugantor
গ্লোবাল কর্পোরেট প্রযুক্তির পথপরিক্রমা

  মেজর (অব.) সুধীর সাহা  

২২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর ইতিহাসে ২০০৭ সাল ছিল বিশেষভাবে মনে রাখার মতো একটি বছর। ওই বছর আমেরিকার মার্ক জুকারবার্গ তার স্থানীয় একটি অনলাইন প্ল্যাটফরমকে গ্লোবাল মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তার এ প্ল্যাটফরমের নাম ‘ফেসবুক’। একই বছর জ্যাক ডরসি একটি অনলাইন মিডিয়ার জন্ম দিয়েছিলেন। নাম ‘টুইটার’।

২০০৭ সালেই গুগল ক্রয় করে নেয় একটি ভিডিও কোম্পানি। নাম ‘ইউটিউব’। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জেফ বেজোসের ‘অ্যামাজন’। ‘পাবলিক ক্লাউড’ নামের প্রযুক্তি জনপ্রিয় হলে জেফ বেজোস ২০০৭ সালে অনলাইন ব্যবসার ধরন বদলে ফেলে বিশ্বের সবার জন্য অ্যামাজনের দরজা খুলে দেন। ২০০৭ সালে আইবিএম একটি বিশেষ প্রজেক্ট শুরু করেছিল, যা আজকের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিজনেস মডেলের পথিকৃৎ। নাম ‘ওয়াটসন’। ২০০৬ সালে আমেরিকার স্টিভ জবস গল্পছলে তার বন্ধুকে পকেট থেকে একটি মোবাইল ফোন বের করে বলেছিলেন- এটাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। কয়েক মাস পর ২০০৭ সালে সেই ফোন অফিসিয়ালি প্রকাশ পেয়েছিল। নাম ‘আইফোন’।

২০০৭ সালে গুগল একটি বিশেষ অপারেটিং সিস্টেম শুরু করেছিল। নাম ‘অ্যান্ড্রয়েড’। ২০০৭ সালের অক্টোবরে আমেরিকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনার্স সোসাইটি সানফ্রান্সিসকোতে একটি কনফারেন্স আয়োজন করে। এ কনফারেন্স উপলক্ষে সানফ্রান্সিসকোর সব হোটেল রুম বুক হয়ে যায়। ব্রায়ান চেস্কি এবং জো গোবিয়ার পক্ষে তাদের অ্যাপার্টমেন্টের মাসিক ভাড়া দিতে কষ্ট হচ্ছিল। তারা সম্মেলনে আগত অতিথিদের কাছে তাদের রুম ভাড়া দিতে মনস্থ করলেন। তারা তিনটি এয়ারম্যাট্রেস কিনে নিয়ে এলেন এবং প্রচার করলেন ভাড়া দেয়া হবে এয়ারবেড ও ব্রেকফাস্ট। প্রথম রাতে তারা তিনজন গেস্ট পেলেন। সেই থেকে ব্রায়ানের মাথায় প্রবেশ করে নতুন ভাবনা। তিনি তার লিভিংরুম থেকে ২০০৭ সালে একটি হোটেল বুকিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কোম্পানির নাম ‘এয়ার বিএনবি’। এ কোম্পানি বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর অনলাইন হোটেল বুকিং সংস্থা। এসব প্রযুক্তির সবটাই ২০০৭ সালের আবিষ্কার ছিল। তাই মানবসভ্যতায় ২০০৭ সালটি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, যা আজও পৃথিবীর মানুষকে প্রযুক্তিগত বিশ্বের সঙ্গে বিশেষভাবে সমন্বয় করে যাচ্ছে। বস্তুত ২০০৭ সালই গ্লোবাল কর্পোরেট দুনিয়াকে বদলে দিয়েছিল।

আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন পিএইচডি ছাত্র ল্যারি পেজ এবং সার্জি ব্রাইন ১৯৯৮ সালে তৈরি করেছিলেন একটি অনলাইন সার্চ ইঞ্জিন। সারা পৃথিবীতে হইচই পড়ে গিয়েছিল। শব্দভাণ্ডার, সংস্কৃতি, শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি, জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া আমাদের মাইন্ডসেট, থট প্রসেস সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছিল এ পদ্ধতি। নাম ‘গুগল’। গুগলের উদ্যোগ আমাদের এগিয়ে নিয়েছিল সামনের দিকে। মোবাইল হাতে আছে, তাই আমাদের আর কারও ফোন নম্বর মনে রাখার প্রয়োজন নেই- সব মনে রেখেছে গুগল। মোবাইল হারিয়ে গেলে কী হবে? কোনো সমস্যা নেই। গুগল ক্লাউডে সব সংরক্ষিত আছে। গুগল পে আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সব তথ্য মুখস্থ করে রাখে। আমাদের ই-মেইলের আদানপ্রদান, চাকরি, ব্যবসা, ব্যক্তিগত বার্তা- সবকিছু কার কাছে গচ্ছিত থাকে? জি-মেইলের কাছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফরমে স্থান পায় রাজনীতি, ধর্মীয় বিষয়াদি, বর্ণবাদ, ব্যক্তিগত কমেন্ট, প্রতিবাদ, ঝগড়া-সবকিছু। সোশ্যাল প্ল্যাটফরমে মানুষের আসক্তি, আবেগ, রাগ, প্রতিবাদ, ক্ষোভ, ভালোবাসা ইত্যাদি বাস্তবতা প্রদান করে ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ আর ইনস্টাগ্রাম। এ চারটি কোম্পানিই গোটা দুনিয়ার সিংহভাগ দেশের মানুষের মন পরিচালনা করছে এবং বিনিময়ে সবার মনোভাবও জেনে যাচ্ছে। এ চারটি কোম্পানির মালিক দু’জন- মার্ক জুকারবার্গ এবং জ্যাক ডরসি। এ দু’জন মানুষ সিংহভাগ বিশ্ববাসীর আবেগ-অনুভূতি নিয়ে ব্যবসা করছেন এবং মনোযোগ লুফে নিচ্ছে বিজ্ঞাপনদাতারা।

এটি গ্লোবালাইজেশনের যুগ। ই-কমার্সের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করে চলছে আমেরিকান তিন কোম্পানি- ফেসবুক, অ্যামাজন, ওয়ালমার্ট। শুধু আমেরিকা নয়, তারা দখল করে আছে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ প্রায় গোটা দুনিয়া। এ দুনিয়ার নাম কর্পোরেট দুনিয়া। এ কর্পোরেট দুনিয়ার অস্তিত্ব ছিল সব সময়ই। কয়লা, কৃষি, অটোমোবাইল, যন্ত্রাংশ, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং-সর্বত্রই ছিল কর্পোরেট দুনিয়ার বাহাদুরি। মূলত এসব কর্তৃত্ব করত আমেরিকান কোম্পানিগুলোই।

কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে এ কর্পোরেট দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় প্রযুক্তি। আর সেখানে প্রায় একচ্ছত্র বিচরণ আমেরিকান উদ্ভাবকদের। মাইক্রোসফট, ওরাকল, ফেসবুক, গুগল, ø্যাপচ্যাট, গিটহাব, এয়ার বিএনবি, ইনস্টাগ্রাম, ড্রপবক্স, স্পেসএক্স, নেটফ্লিক্স ইত্যাদি সব প্রযুক্তির মাঠে আমেরিকার উদ্ভাবকরা এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আছেন। খুব ধীর পায়ে রাশিয়া, সুইডেন, কানাডা, চীন ও ভারতের উদ্ভাবকরা কিছুটা হাঁটলেও হিসাবের বিচারে তা খুবই অপ্রতুল। তবে চীনের বাইট ড্যান্স, রয়্যাল, কুয়াইশো, টেনসেন্ট, আলিবাবা, ই-কমার্স, ড্রোনের এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। রাশিয়ার রয়েছে স্ট্রাইপ, টেলিগ্রাম মেসেঞ্জার, রিভল্ট-এ। অন্যদিকে ফ্লিপকার্ট, শিক্ষা টেকনোলজি বাইজুসে আছে ভারতের উদ্ভাবকদের আধিপত্য। চীন ও ভারত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টেও অনেকখানি এগিয়ে আছে। ভারত অন্য একদিকেও এগিয়ে আছে। আউটসোর্সিংয়ে ভারত পৃথিবীর অন্যতম ভরসা, বিশেষ করে আমেরিকায়। প্রতিদিন ভারতীয় নারী আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ফোন করে তুখোড় আমেরিকান অ্যাকসেন্টে জানতে চায়- ‘মাই নেম ইজ্ ...।

আপনার সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরের লাস্ট চারটি ডিজিট বলুন।’ কখনও কাস্টমার কেয়ার হিসেবে বলে- ‘আমাদের ব্রাঞ্চ আছে লেক্সিংটনে সেকেন্ড এভিনিউর সেভেন্থ ফ্লোরে।’ সাধারণ আমেরিকানদের বড় একটি অংশই হয়তো জানেন না, এ গোটা সেবাটাই তারা আসলে পাচ্ছেন সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের বেঙ্গালুরু অথবা নয়ডার মিডল ক্লাস একটি মেয়ের কাছ থেকে। ভারতের অবশ্য আত্মতৃপ্তির আরও একটি জায়গা আছে। গুগলের সিইও’র নাম সুন্দর পিচাই অর্থাৎ ভারতীয়, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা, নোকিয়ার রাজীব সুরি, মোটোরোলার সঞ্জয় কুমার ঝা, অ্যাডরের শান্তনু নারায়ণ। সব নাম বড় বড় কোম্পানির কর্তাব্যক্তির। তারা আমেরিকায় বসবাস করলেও ভারতীয় হিসেবে তাদের নিয়ে গর্ব করার একটি অবকাশ ভারতের থেকেই যাচ্ছে। শুধু কি তাই?

ভারতের গর্ব করার মতো আরও কিছু আছে। সম্প্রতি আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সারা বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় নাম রয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৮৩ জনের। তাদের মধ্যে ভারতীয় বিজ্ঞানী ১ হাজার ৪৯২ জন। তালিকাটির প্রথম ১০০ জনের মধ্যেও কয়েকজন ভারতীয় বিজ্ঞানীর নাম রয়েছে।

গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে আমেরিকা বিশেষভাবে প্রযুক্তির বিষয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাশিয়া, চীন, ভারত ছিটেফোঁটা অবদান রাখলেও প্রযুক্তিনির্ভর কর্পোরেট জগতের একচ্ছত্র বাদশা আমেরিকাই। তবে চীনের ড্রোন আবিষ্কার এবং ভারতের বাইজুস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইচ্ছা ও উদ্যম থাকলে যে কোনো দেশের মেধাবী অংশই হাঁটতে পারে গ্লোবাল প্রযুক্তির এ পথপরিক্রমায়।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

[email protected]

গ্লোবাল কর্পোরেট প্রযুক্তির পথপরিক্রমা

 মেজর (অব.) সুধীর সাহা 
২২ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর ইতিহাসে ২০০৭ সাল ছিল বিশেষভাবে মনে রাখার মতো একটি বছর। ওই বছর আমেরিকার মার্ক জুকারবার্গ তার স্থানীয় একটি অনলাইন প্ল্যাটফরমকে গ্লোবাল মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তার এ প্ল্যাটফরমের নাম ‘ফেসবুক’। একই বছর জ্যাক ডরসি একটি অনলাইন মিডিয়ার জন্ম দিয়েছিলেন। নাম ‘টুইটার’।

২০০৭ সালেই গুগল ক্রয় করে নেয় একটি ভিডিও কোম্পানি। নাম ‘ইউটিউব’। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জেফ বেজোসের ‘অ্যামাজন’। ‘পাবলিক ক্লাউড’ নামের প্রযুক্তি জনপ্রিয় হলে জেফ বেজোস ২০০৭ সালে অনলাইন ব্যবসার ধরন বদলে ফেলে বিশ্বের সবার জন্য অ্যামাজনের দরজা খুলে দেন। ২০০৭ সালে আইবিএম একটি বিশেষ প্রজেক্ট শুরু করেছিল, যা আজকের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিজনেস মডেলের পথিকৃৎ। নাম ‘ওয়াটসন’। ২০০৬ সালে আমেরিকার স্টিভ জবস গল্পছলে তার বন্ধুকে পকেট থেকে একটি মোবাইল ফোন বের করে বলেছিলেন- এটাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বিপ্লব। কয়েক মাস পর ২০০৭ সালে সেই ফোন অফিসিয়ালি প্রকাশ পেয়েছিল। নাম ‘আইফোন’।

২০০৭ সালে গুগল একটি বিশেষ অপারেটিং সিস্টেম শুরু করেছিল। নাম ‘অ্যান্ড্রয়েড’। ২০০৭ সালের অক্টোবরে আমেরিকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনার্স সোসাইটি সানফ্রান্সিসকোতে একটি কনফারেন্স আয়োজন করে। এ কনফারেন্স উপলক্ষে সানফ্রান্সিসকোর সব হোটেল রুম বুক হয়ে যায়। ব্রায়ান চেস্কি এবং জো গোবিয়ার পক্ষে তাদের অ্যাপার্টমেন্টের মাসিক ভাড়া দিতে কষ্ট হচ্ছিল। তারা সম্মেলনে আগত অতিথিদের কাছে তাদের রুম ভাড়া দিতে মনস্থ করলেন। তারা তিনটি এয়ারম্যাট্রেস কিনে নিয়ে এলেন এবং প্রচার করলেন ভাড়া দেয়া হবে এয়ারবেড ও ব্রেকফাস্ট। প্রথম রাতে তারা তিনজন গেস্ট পেলেন। সেই থেকে ব্রায়ানের মাথায় প্রবেশ করে নতুন ভাবনা। তিনি তার লিভিংরুম থেকে ২০০৭ সালে একটি হোটেল বুকিং ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কোম্পানির নাম ‘এয়ার বিএনবি’। এ কোম্পানি বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর অনলাইন হোটেল বুকিং সংস্থা। এসব প্রযুক্তির সবটাই ২০০৭ সালের আবিষ্কার ছিল। তাই মানবসভ্যতায় ২০০৭ সালটি একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, যা আজও পৃথিবীর মানুষকে প্রযুক্তিগত বিশ্বের সঙ্গে বিশেষভাবে সমন্বয় করে যাচ্ছে। বস্তুত ২০০৭ সালই গ্লোবাল কর্পোরেট দুনিয়াকে বদলে দিয়েছিল।

আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন পিএইচডি ছাত্র ল্যারি পেজ এবং সার্জি ব্রাইন ১৯৯৮ সালে তৈরি করেছিলেন একটি অনলাইন সার্চ ইঞ্জিন। সারা পৃথিবীতে হইচই পড়ে গিয়েছিল। শব্দভাণ্ডার, সংস্কৃতি, শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি, জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া আমাদের মাইন্ডসেট, থট প্রসেস সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছিল এ পদ্ধতি। নাম ‘গুগল’। গুগলের উদ্যোগ আমাদের এগিয়ে নিয়েছিল সামনের দিকে। মোবাইল হাতে আছে, তাই আমাদের আর কারও ফোন নম্বর মনে রাখার প্রয়োজন নেই- সব মনে রেখেছে গুগল। মোবাইল হারিয়ে গেলে কী হবে? কোনো সমস্যা নেই। গুগল ক্লাউডে সব সংরক্ষিত আছে। গুগল পে আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সব তথ্য মুখস্থ করে রাখে। আমাদের ই-মেইলের আদানপ্রদান, চাকরি, ব্যবসা, ব্যক্তিগত বার্তা- সবকিছু কার কাছে গচ্ছিত থাকে? জি-মেইলের কাছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফরমে স্থান পায় রাজনীতি, ধর্মীয় বিষয়াদি, বর্ণবাদ, ব্যক্তিগত কমেন্ট, প্রতিবাদ, ঝগড়া-সবকিছু। সোশ্যাল প্ল্যাটফরমে মানুষের আসক্তি, আবেগ, রাগ, প্রতিবাদ, ক্ষোভ, ভালোবাসা ইত্যাদি বাস্তবতা প্রদান করে ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ আর ইনস্টাগ্রাম। এ চারটি কোম্পানিই গোটা দুনিয়ার সিংহভাগ দেশের মানুষের মন পরিচালনা করছে এবং বিনিময়ে সবার মনোভাবও জেনে যাচ্ছে। এ চারটি কোম্পানির মালিক দু’জন- মার্ক জুকারবার্গ এবং জ্যাক ডরসি। এ দু’জন মানুষ সিংহভাগ বিশ্ববাসীর আবেগ-অনুভূতি নিয়ে ব্যবসা করছেন এবং মনোযোগ লুফে নিচ্ছে বিজ্ঞাপনদাতারা।

এটি গ্লোবালাইজেশনের যুগ। ই-কমার্সের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করে চলছে আমেরিকান তিন কোম্পানি- ফেসবুক, অ্যামাজন, ওয়ালমার্ট। শুধু আমেরিকা নয়, তারা দখল করে আছে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ প্রায় গোটা দুনিয়া। এ দুনিয়ার নাম কর্পোরেট দুনিয়া। এ কর্পোরেট দুনিয়ার অস্তিত্ব ছিল সব সময়ই। কয়লা, কৃষি, অটোমোবাইল, যন্ত্রাংশ, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং-সর্বত্রই ছিল কর্পোরেট দুনিয়ার বাহাদুরি। মূলত এসব কর্তৃত্ব করত আমেরিকান কোম্পানিগুলোই।

কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে এ কর্পোরেট দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় প্রযুক্তি। আর সেখানে প্রায় একচ্ছত্র বিচরণ আমেরিকান উদ্ভাবকদের। মাইক্রোসফট, ওরাকল, ফেসবুক, গুগল, ø্যাপচ্যাট, গিটহাব, এয়ার বিএনবি, ইনস্টাগ্রাম, ড্রপবক্স, স্পেসএক্স, নেটফ্লিক্স ইত্যাদি সব প্রযুক্তির মাঠে আমেরিকার উদ্ভাবকরা এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আছেন। খুব ধীর পায়ে রাশিয়া, সুইডেন, কানাডা, চীন ও ভারতের উদ্ভাবকরা কিছুটা হাঁটলেও হিসাবের বিচারে তা খুবই অপ্রতুল। তবে চীনের বাইট ড্যান্স, রয়্যাল, কুয়াইশো, টেনসেন্ট, আলিবাবা, ই-কমার্স, ড্রোনের এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। রাশিয়ার রয়েছে স্ট্রাইপ, টেলিগ্রাম মেসেঞ্জার, রিভল্ট-এ। অন্যদিকে ফ্লিপকার্ট, শিক্ষা টেকনোলজি বাইজুসে আছে ভারতের উদ্ভাবকদের আধিপত্য। চীন ও ভারত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টেও অনেকখানি এগিয়ে আছে। ভারত অন্য একদিকেও এগিয়ে আছে। আউটসোর্সিংয়ে ভারত পৃথিবীর অন্যতম ভরসা, বিশেষ করে আমেরিকায়। প্রতিদিন ভারতীয় নারী আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ফোন করে তুখোড় আমেরিকান অ্যাকসেন্টে জানতে চায়- ‘মাই নেম ইজ্ ...।

আপনার সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরের লাস্ট চারটি ডিজিট বলুন।’ কখনও কাস্টমার কেয়ার হিসেবে বলে- ‘আমাদের ব্রাঞ্চ আছে লেক্সিংটনে সেকেন্ড এভিনিউর সেভেন্থ ফ্লোরে।’ সাধারণ আমেরিকানদের বড় একটি অংশই হয়তো জানেন না, এ গোটা সেবাটাই তারা আসলে পাচ্ছেন সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের বেঙ্গালুরু অথবা নয়ডার মিডল ক্লাস একটি মেয়ের কাছ থেকে। ভারতের অবশ্য আত্মতৃপ্তির আরও একটি জায়গা আছে। গুগলের সিইও’র নাম সুন্দর পিচাই অর্থাৎ ভারতীয়, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা, নোকিয়ার রাজীব সুরি, মোটোরোলার সঞ্জয় কুমার ঝা, অ্যাডরের শান্তনু নারায়ণ। সব নাম বড় বড় কোম্পানির কর্তাব্যক্তির। তারা আমেরিকায় বসবাস করলেও ভারতীয় হিসেবে তাদের নিয়ে গর্ব করার একটি অবকাশ ভারতের থেকেই যাচ্ছে। শুধু কি তাই?

ভারতের গর্ব করার মতো আরও কিছু আছে। সম্প্রতি আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সারা বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় নাম রয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৮৩ জনের। তাদের মধ্যে ভারতীয় বিজ্ঞানী ১ হাজার ৪৯২ জন। তালিকাটির প্রথম ১০০ জনের মধ্যেও কয়েকজন ভারতীয় বিজ্ঞানীর নাম রয়েছে।

গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে আমেরিকা বিশেষভাবে প্রযুক্তির বিষয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাশিয়া, চীন, ভারত ছিটেফোঁটা অবদান রাখলেও প্রযুক্তিনির্ভর কর্পোরেট জগতের একচ্ছত্র বাদশা আমেরিকাই। তবে চীনের ড্রোন আবিষ্কার এবং ভারতের বাইজুস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইচ্ছা ও উদ্যম থাকলে যে কোনো দেশের মেধাবী অংশই হাঁটতে পারে গ্লোবাল প্রযুক্তির এ পথপরিক্রমায়।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

[email protected]