গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দায় কার?
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দায় কার?

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

২৫ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে ১০ নভেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে নূর হোসেন চত্বরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গণতন্ত্র আজ মুক্তি পেয়েছে।

কিন্তু গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে, ৩০ লাখ শহীদের আকাক্সক্ষার অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে সত্যিকারের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।

গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পথে বিএনপি প্রধান অন্তরায়’ (যুগান্তর, ১১ নভেম্বর)। মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ভাবাদর্শকে ধারণ করে যে রাজনৈতিক দলের জন্ম, তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা শোভা পায় না।

তাদের কাছে গণতন্ত্র ছিল ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোটের গণতন্ত্র। যে ভোটে ‘না’ বাক্স ছিলই না।’ রাজনীতির ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসার জন্য তিনি বিএনপিকে আহ্বান জানান।

স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশকে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ার জন্য মন্ত্রী বিএনপিকে এককভাবে দায়ী করেছেন। তার এ অভিযোগ কতটা সত্য এবং তার নিজ দল আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত একুশ বছরের শাসনামলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কতটা আন্তরিক ভূমিকা রেখেছে, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

স্বাধীনতার পর থেকে মূলত তিনটি রাজনৈতিক দল দেশ শাসন করে আসছে; এগুলো হল আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় পাঁচ মেয়াদে ২১ বছর দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। দলটি বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি চার মেয়াদে ১৪ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে।

১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করেছে ৫ বছর। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া এ তিনটি রাজনৈতিক দলের কোনোটিই দেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আন্তরিক হয়নি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের (যা মূল সংবিধান নামে পরিচিত) প্রস্তাবনায় বলা হয়, রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিতে সংবিধানে এরূপ সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সংবিধান গৃহীত হওয়ার তিন বছর পার হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘ষষ্ঠ-ক বিভাগ’ সংযোজন করে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রে বহুদলীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় সরকারব্যবস্থা চালু করে।

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে ‘প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ’ অংশটুকু বাদ দেয়া হয়। ৪৪ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে হারানো মৌলিক অধিকার ফিরে পেতে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। সংবিধানের ৯৫, ৯৬(২), ৯৮ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ এবং অধস্তন আদালতে বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে তাদের ওপর নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৭৫ সালের জুনে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা চারটি সংবাদপত্র বাদে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের সংবিধান প্রণেতারা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রচলন, বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদানের যে বিধান করেছিলেন, তা মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়।

প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, একদলীয় শাসনের প্রতি জনগণের অসন্তোষ ইত্যাদির সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব এবং তার পরিবারের উপস্থিত সব সদস্যকে হত্যা করে। মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন এবং দেশে সামরিক আইন জারি করেন।

তার মন্ত্রিসভায় যারা স্থান পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভার সদস্য। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে ৮৩ দিনের মাথায় ৫ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হয় মোশতাক সরকার। পদত্যাগে বাধ্য করাসহ গৃহবন্দি করা হয় চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ঘটা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।

৮ নভেম্বর এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। অতঃপর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য তিন বাহিনীর প্রধান- মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তোয়াব ও রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর বিচারপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন।

অভিযোগ রয়েছে, জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বিচারপতি সায়েমকে বাধ্য করেন। ওই বছরের ৩০ মে জিয়ার রাষ্ট্রপতি পদে আস্থা গণভোটের আয়োজন করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ফলাফল ছিল ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ১.১ শতাংশ ‘না’ ভোট।

জিয়াউর রহমানের একটি বড় অবদান তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে আনা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে প্রবর্তিত একদলীয় (বাকশাল) শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে এ পদে নিয়মিত হন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এইচএম এরশাদ সামরিক আইন জারি করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরে তার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক শাসনকে বৈধতা দানের জন্য এইচএম এরশাদও গণভোট আয়োজন করেছিলেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪.৫ শতাংশ।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের বড় অবদান স্থানীয় প্রশাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। তিনি উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন এবং মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করেন। ১৯৮৬ সালের ১ জনুয়ারি তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এইচএম এরশাদ ১৫ বছর সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে দেশ শাসন করেন। তাদের শাসনামলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণআন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সরকারের পতনের পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ১৬ বছর ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অনেকটা পালাক্রমে দেশ শাসন করে। এ সময়কালে এ দু’দলের কোনোটিই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগ নেয়নি।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং পরবর্তী দুই প্রশ্নবিদ্ধ সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা ১২ বছর ধরে দেশ শাসন করছে। এ সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে। উদ্যোগ নেয়া হয়নি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে। অথচ সরকারি দল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দোষ চাপাচ্ছে বিরোধী দলের ওপর।

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশকে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আবার এসব নির্বাচনের মধ্যে চতুর্থ, ষষ্ঠ, দশম নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না।

সর্বশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, গত এক দশকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনেও অনিয়ম হয়েছে। মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজন সুশাসন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ।

গত দুই দশকে প্রশাসনকে দলীয়করণ করার ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

সবশেষে বলতে চাই, একটানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা শোভনীয় নয়। সরকারের উচিত হবে অতীতের ভুলভ্রান্তি শুধরিয়ে নিয়ে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে মনোযোগী হওয়া।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

স্বদেশ ভাবনা

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দায় কার?

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
২৫ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে ১০ নভেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে নূর হোসেন চত্বরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গণতন্ত্র আজ মুক্তি পেয়েছে।

কিন্তু গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে, ৩০ লাখ শহীদের আকাক্সক্ষার অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে সত্যিকারের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করা যাবে না।

গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পথে বিএনপি প্রধান অন্তরায়’ (যুগান্তর, ১১ নভেম্বর)। মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ভাবাদর্শকে ধারণ করে যে রাজনৈতিক দলের জন্ম, তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা শোভা পায় না।

তাদের কাছে গণতন্ত্র ছিল ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোটের গণতন্ত্র। যে ভোটে ‘না’ বাক্স ছিলই না।’ রাজনীতির ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসার জন্য তিনি বিএনপিকে আহ্বান জানান।

স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশকে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ার জন্য মন্ত্রী বিএনপিকে এককভাবে দায়ী করেছেন। তার এ অভিযোগ কতটা সত্য এবং তার নিজ দল আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত একুশ বছরের শাসনামলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কতটা আন্তরিক ভূমিকা রেখেছে, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

স্বাধীনতার পর থেকে মূলত তিনটি রাজনৈতিক দল দেশ শাসন করে আসছে; এগুলো হল আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি। এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় পাঁচ মেয়াদে ২১ বছর দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। দলটি বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি চার মেয়াদে ১৪ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে।

১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করেছে ৫ বছর। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া এ তিনটি রাজনৈতিক দলের কোনোটিই দেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে আন্তরিক হয়নি।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের (যা মূল সংবিধান নামে পরিচিত) প্রস্তাবনায় বলা হয়, রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিতে সংবিধানে এরূপ সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সংবিধান গৃহীত হওয়ার তিন বছর পার হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘ষষ্ঠ-ক বিভাগ’ সংযোজন করে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রে বহুদলীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় সরকারব্যবস্থা চালু করে।

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে ‘প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ’ অংশটুকু বাদ দেয়া হয়। ৪৪ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে হারানো মৌলিক অধিকার ফিরে পেতে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। সংবিধানের ৯৫, ৯৬(২), ৯৮ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ এবং অধস্তন আদালতে বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে তাদের ওপর নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৭৫ সালের জুনে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা চারটি সংবাদপত্র বাদে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের সংবিধান প্রণেতারা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রচলন, বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদানের যে বিধান করেছিলেন, তা মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়।

প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, একদলীয় শাসনের প্রতি জনগণের অসন্তোষ ইত্যাদির সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব এবং তার পরিবারের উপস্থিত সব সদস্যকে হত্যা করে। মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন এবং দেশে সামরিক আইন জারি করেন।

তার মন্ত্রিসভায় যারা স্থান পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভার সদস্য। ওই বছরের ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালে ৮৩ দিনের মাথায় ৫ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হয় মোশতাক সরকার। পদত্যাগে বাধ্য করাসহ গৃহবন্দি করা হয় চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে।

৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ৭ নভেম্বর ঘটা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে চিফ অব আর্মি স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।

৮ নভেম্বর এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বাতিল করেন। অতঃপর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য তিন বাহিনীর প্রধান- মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তোয়াব ও রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খানকে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর বিচারপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন।

অভিযোগ রয়েছে, জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বিচারপতি সায়েমকে বাধ্য করেন। ওই বছরের ৩০ মে জিয়ার রাষ্ট্রপতি পদে আস্থা গণভোটের আয়োজন করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ফলাফল ছিল ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এবং ১.১ শতাংশ ‘না’ ভোট।

জিয়াউর রহমানের একটি বড় অবদান তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে আনা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে প্রবর্তিত একদলীয় (বাকশাল) শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হলে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং পরে নির্বাচনের মাধ্যমে এ পদে নিয়মিত হন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এইচএম এরশাদ সামরিক আইন জারি করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং পরে তার নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামরিক শাসনকে বৈধতা দানের জন্য এইচএম এরশাদও গণভোট আয়োজন করেছিলেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪.৫ শতাংশ।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের বড় অবদান স্থানীয় প্রশাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। তিনি উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন এবং মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করেন। ১৯৮৬ সালের ১ জনুয়ারি তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এইচএম এরশাদ ১৫ বছর সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে দেশ শাসন করেন। তাদের শাসনামলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণআন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সরকারের পতনের পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ১৬ বছর ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অনেকটা পালাক্রমে দেশ শাসন করে। এ সময়কালে এ দু’দলের কোনোটিই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগ নেয়নি।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং পরবর্তী দুই প্রশ্নবিদ্ধ সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা ১২ বছর ধরে দেশ শাসন করছে। এ সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে। উদ্যোগ নেয়া হয়নি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে। অথচ সরকারি দল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দোষ চাপাচ্ছে বিরোধী দলের ওপর।

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশকে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আবার এসব নির্বাচনের মধ্যে চতুর্থ, ষষ্ঠ, দশম নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না।

সর্বশেষ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, গত এক দশকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনেও অনিয়ম হয়েছে। মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজন সুশাসন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ।

গত দুই দশকে প্রশাসনকে দলীয়করণ করার ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

সবশেষে বলতে চাই, একটানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারার দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা শোভনীয় নয়। সরকারের উচিত হবে অতীতের ভুলভ্রান্তি শুধরিয়ে নিয়ে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে মনোযোগী হওয়া।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected].com