করোনার ভ্যাকসিন বাণিজ্য নিয়ে ক্ষমতা ও পুঁজির প্রতিদ্বন্দ্বিতা
jugantor
করোনার ভ্যাকসিন বাণিজ্য নিয়ে ক্ষমতা ও পুঁজির প্রতিদ্বন্দ্বিতা

  খন্দকার হাসনাত করিম  

২৫ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট GlaxoSmithKline সম্প্রতি করোনার ভ্যাকসিন গবেষণা, পরীক্ষা-পর্যালোচনা (Clinical Trial) ও উৎপাদন সম্পর্কিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছে, ‘কোভিড-১৯ ভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলা ঠিক নয়।’

তবে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানটি যা বলেছে, বিশ্ববাজারে ভ্যাকসিন রাজনীতির প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ‘সরবরাহ চেইন’ প্রতিষ্ঠার আগেই যেভাবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতা ও বৃহৎ পুঁজির রাজনীতি শুরু হয়েছে তাতে ভ্যাকসিনের জগতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে না, এ কথা বললে সত্যের অপলাপই হবে।

ভ্যাকসিন বাজারে আসা শুরু হল না অথচ এখন থেকেই তার পেটেন্ট-অধিকার বা সর্বস্বত্ব নিয়ে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শুরু হয়নি; বিশ্বের জাঁদরেল অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সংঘাতের প্রবণতাও চোখে পড়ছে। ওষুধ-রাজনীতি যে অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার রাজনীতিরই প্রতিফলন, এ কথারই প্রমাণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপানের মতো নেতৃস্থানীয় ওষুধ শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো।

ফাইজার ও বায়োনটেক ওষুধ জায়ান্ট গোষ্ঠী দাবি করছে, তাদের ভ্যাকসিন শতকরা ৯৫ ভাগ কার্যকরভাবে ফলপ্রসূ। রোগীদের দেহে প্রয়োগের পর অবশ্য ৯৪ ভাগ কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ তাদের এমারজেন্সি ইউজ অথরাইজেশনের (ইইউএ) পর্যবেক্ষণের পর ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার ধাপগুলো চিহ্নিত করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পথ ধরে সেদেশের ওষুধশিল্প মহারথীরাও বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা উৎপাদনে নেতৃত্বের অবস্থান দাবি করছে।

তারা বলছে, তারা মার্কিন মালিকানায় এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে অংশীদারি উদ্যোগে মোট ৩৯টি ভ্যাকসিন গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। অপরদিকে চীনে চলছে ২০টি অনুরূপ প্রকল্প। অথচ চীন পাঁচ ধরনের এবং যুক্তরাষ্ট্র তিন ধরনের ভ্যাকসিন বানিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কার্যকারিতা নিরূপণ করে উৎপাদনের নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন কিংবা কাজাখস্তান থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত এক হিসাবে ৩০টির মতো দেশ করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। এ মহামারী নিয়ে কোনো সক্ষম বা সুবিধাসম্পন্ন দেশই কার্যত বসে নেই। সবার এ উদ্বেগ প্রশংসনীয় বটে, তবে শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক বৈদ্যরা এ টিকা বানিয়ে নিজ দেশে প্রয়োগ ও বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে লক্ষ-কোটি ডলারের বণিক স্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করছে বলে এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সব উদ্যমী গবেষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, ওষুধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ল্যাবের অধীনে গত জুন নাগাদ মোট ১৩৩ ধরনের সম্ভাব্য প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা কাজ চালিয়েছেন। এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত ফর্মুলার মধ্যে অগ্রগণ্য মানের ভ্যাকসিনের দাবি করছে ব্রিটিশ-মালিকানার AstraZeneca কোম্পানি। CNBC গত সেপ্টেম্বরে এ তথ্য জাহির করেছিল।

মে মাস নাগাদ ‘ল্যানসেট’ চিকিৎসা পত্রিকা খবর দেয়, চীনা প্রতিরক্ষা বাহিনীর রোগতত্ত্ববিদরা তাদের উদ্ভাবনার বেশ উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছিল। ওই দলের নেতা মেজর জেনারেল চেন উই অবশ্য সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘Immume response বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা অর্জনের মানে এই নয় যে, সেই টিকা মানুষকে কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পারবে।’

পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করা হয়ে গেছে অথবা তহবিল ছাড়করণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে করোনার টিকা আবিষ্কারের কাজে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে ২.৩৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ খরচ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে ৮.১ বিলিয়ন ডলার, কোনো রোগ গবেষণার সমন্বিত কার্যক্রমে যা নজিরবিহীন।

গত জুলাই পর্যন্ত পৃথিবীর বহু সরকার, সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও দানবীর ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত হয়েছে আরও ৮.৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল।

শেষোক্ত তহবিল দেয়া হবে বিশ্বজুড়ে শিশুদের জন্য করোনার টিকা দেয়ার কাজে এবং তা পরিচালনা করবে GAVI (Global Alliance for Vaccines & Immunization) সংগঠন। আমেরিকার আরেকটি ফেডারেল সংস্থা USBARD (US Biomedical Advanced Research & Development Authority) এজন্য তাদের তরফে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিল গেট্স্ একাই দিচ্ছেন ১.৬ বিলিয়ন ডলার।

ভাইরাসটির মারণ ক্ষমতা এবং হামলার হিংস তা এতই ভয়ংকর, বিচিত্র, পরিবর্তনশীল ও চাতুর্যপূর্ণ যে তা মোকাবেলায় এ পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ২২০ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক রোগ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান The Milken Institute।

ভ্যাকসিনের প্রয়োগ মাত্রা, যৌগিক কাঠামো, মিশ্রণ বা ‘ডোজেজ ফরম্যাটে’ বৈচিত্র্য ও রকমফের থাকলেও করোনা চিকিৎসায় মূল যে ওষুধগুলোর কথা বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত সুপারিশ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, রেমডেসিভির ও আইবুপ্রোফেন (এ ছাড়াও আরও কয়েকটি মূল বা জেনেরিক ওষুধ থাকা স্বাভাবিক বলেই সাধারণ মানুষ ধরে নিতে পারেন এবং সেখানেই হচ্ছে এই বৈশ্বিক ওষুধ-বাণিজ্যের ‘গুমর’।

এগুলোর মধ্যে প্রথমটি সাধারণত প্রয়োগ করা হয় ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে (এটা দিয়ে নাকি সেরে উঠেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প); দ্বিতীয়টি প্রয়োগ করা হয় ‘ইবোলা’ প্রতিষেধক হিসেবে; তৃতীয়টির নামই বলে দিচ্ছে এটা বেদনানাশক ড্রাগ (অবশ্য লন্ডনের একটি হাসপাতালের গবেষকদের জবানী উদ্বৃত করে স্কাই নিউজ খবর দিয়েছে, বেদনানাশক করোনা সারার বদলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ করে দিতে পারে (যেটা সেখানে ঘটেছে)।

করোনার মূল ভাইরাস সার্স-কোভ-২ কার্যকরভাবে প্রতিরোধে ভ্যাকসিন ছাড়া এখনও পর্যন্ত অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলছেন না বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা। ফলে গোটা পৃথিবীর নজর যখন সেই ভ্যাকসিনের দিকে, পুঁজিবাদীদেরও নজর ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যে আধিপত্য এবং এক ধরনের ভ্যাকসিন-জাতীয়তাবাদের অহংকারী প্রতিযোগিতায়।

এ রোগের মতোই আরেক ‘মহাব্যাধি’ আসতে চলেছে ভ্যাকসিন গবেষণা, ট্রায়াল, উৎপাদন, বিতরণ, পরিবহন ও সংরক্ষণের বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলোর প্রধান নির্বাহীদের ডাক পড়েছে ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস কিংবা বেইজিংয়ে। এ তলবের উদ্দেশ্য-ফিকির বুঝতে কষ্ট হয় না।

এ ভ্যাকসিনগুলো তৈরির রাসায়নিক কাঁচামাল, প্রযুক্তি, পেটেন্ট-স্বত্ব- এগুলোও কোটি কোটি ডলারের বিশ্ববাণিজ্যের অংশ। ফলে বিশ্বমানবতার এখন দাবি যেখানে সহমর্মিতাপ্রসূত সহযোগিতা, সেখানে পুঁজি ও ক্ষমতার পাল্লা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাসই ফুটে উঠছে বেশি। নামকরা ওষুধ কোম্পানি Merk-এর সিইও জিম রবিনসন বলেই ফেলেছেন, ভ্যাকসিন তৈরি করা দেশগুলো সবার আগে তাদের নিজ নিজ দেশের চাহিদা মেটাবে, বাঁচলে রফতানি। সেই অর্থে WHO, GAVI, COVAX-এর মতো বৈশ্বিক ড্রাগ/হেলথকেয়ার এলায়েন্সগুলোর সদুপদেশে তারা কর্ণপাত করছে বা করবে বলে মনে হয় না।

যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করে ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। ট্রাম্প সেটা রটিয়েছেন, অন্যরা মুখে না বললেও কাজে করবেন। তাদের নিজ দেশের পরই দ্বিতীয় সুযোগ পাবে তাদের ‘প্যাথোলজিক্যাল মিত্র’ যুক্তরাজ্য।

এর পর ইউরোপ, তারও পর অন্যান্য ধনী দেশ। তলানিতে তৃতীয় বিশ্ব। তবে গণচীন তো আর পুঁজিবাদী দেশ নয়। কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত সেই চীন যখন ইতোমধ্যেই পৃথিবীর দ্বিতীয় এবং হবু প্রধান শক্তি, তখন বিশ্বমানবতার ডাকে সাড়া দিতে দেশটি যে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসবে তার প্রমাণ তারা দিয়ে চলেছে একের পর এক। তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের পর পৃথিবী কাঁপানো বাণিজ্যবলয় এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীর নতুন বাণিজ্য ব্লক (RCEP) ইতোমধ্যেই সব ব্যাপারে পাশ্চাত্যের দিকে তাকানোর দৃষ্টি ঘুরিরে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির এক নতুন দিনের ঊষালোক দেখাতে শুরু করেছে।

সেই চীন বিশ্বব্যাপী ‘করোনাভাইরাস’ মোকাবেলায় ২ বিলিয়ন ডলার নিঃশর্ত অনুদান দিচ্ছে। চীনকে সহায়তা দেবে এমন বহু উন্নত দেশও মুখিয়ে আছে। কারণ আমেরিকার মোড়লিপনায় অনেকেই নাখোশ ও হতাশ।

দেখা গেছে, ‘ইবোলা’ ছড়াল আফ্রিকায়, ভ্যাকসিন গবেষণায় সফল হল কানাডা। লাইসেন্স পেল অমেরিকা। আমেরিকান কোম্পানিটির পার্টনার হল জার্মানির এক বিশ্ববিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি।

এ রকম অজস বহুজাতিক সহযোগিতার নজির কোভিড-ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি ও বাণিজ্যের উত্তম পথনির্দেশ দিতে পারে। মূল লক্ষ্য যদি হয় ‘কল্যাণ’, তাহলে সহযোগিতা আসবেই আর লক্ষ্য যদি হয় ‘মুনাফা’ ও ‘অহংকার’, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বন্দ্ব কল্যাণের অগ্রযাত্রার পথ রোধ করে দাঁড়াবে, এটাই তো ‘স্বাভাবিক।

খন্দকার হাসনাত করিম : সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

[email protected]

করোনার ভ্যাকসিন বাণিজ্য নিয়ে ক্ষমতা ও পুঁজির প্রতিদ্বন্দ্বিতা

 খন্দকার হাসনাত করিম 
২৫ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট GlaxoSmithKline সম্প্রতি করোনার ভ্যাকসিন গবেষণা, পরীক্ষা-পর্যালোচনা (Clinical Trial) ও উৎপাদন সম্পর্কিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছে, ‘কোভিড-১৯ ভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলছে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলা ঠিক নয়।’

তবে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানটি যা বলেছে, বিশ্ববাজারে ভ্যাকসিন রাজনীতির প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ‘সরবরাহ চেইন’ প্রতিষ্ঠার আগেই যেভাবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতা ও বৃহৎ পুঁজির রাজনীতি শুরু হয়েছে তাতে ভ্যাকসিনের জগতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে না, এ কথা বললে সত্যের অপলাপই হবে।

ভ্যাকসিন বাজারে আসা শুরু হল না অথচ এখন থেকেই তার পেটেন্ট-অধিকার বা সর্বস্বত্ব নিয়ে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই শুরু হয়নি; বিশ্বের জাঁদরেল অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সংঘাতের প্রবণতাও চোখে পড়ছে। ওষুধ-রাজনীতি যে অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার রাজনীতিরই প্রতিফলন, এ কথারই প্রমাণ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপানের মতো নেতৃস্থানীয় ওষুধ শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো।

ফাইজার ও বায়োনটেক ওষুধ জায়ান্ট গোষ্ঠী দাবি করছে, তাদের ভ্যাকসিন শতকরা ৯৫ ভাগ কার্যকরভাবে ফলপ্রসূ। রোগীদের দেহে প্রয়োগের পর অবশ্য ৯৪ ভাগ কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ তাদের এমারজেন্সি ইউজ অথরাইজেশনের (ইইউএ) পর্যবেক্ষণের পর ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার ধাপগুলো চিহ্নিত করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পথ ধরে সেদেশের ওষুধশিল্প মহারথীরাও বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা উৎপাদনে নেতৃত্বের অবস্থান দাবি করছে।

তারা বলছে, তারা মার্কিন মালিকানায় এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে অংশীদারি উদ্যোগে মোট ৩৯টি ভ্যাকসিন গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। অপরদিকে চীনে চলছে ২০টি অনুরূপ প্রকল্প। অথচ চীন পাঁচ ধরনের এবং যুক্তরাষ্ট্র তিন ধরনের ভ্যাকসিন বানিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কার্যকারিতা নিরূপণ করে উৎপাদনের নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীন কিংবা কাজাখস্তান থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত এক হিসাবে ৩০টির মতো দেশ করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। এ মহামারী নিয়ে কোনো সক্ষম বা সুবিধাসম্পন্ন দেশই কার্যত বসে নেই। সবার এ উদ্বেগ প্রশংসনীয় বটে, তবে শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক বৈদ্যরা এ টিকা বানিয়ে নিজ দেশে প্রয়োগ ও বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে লক্ষ-কোটি ডলারের বণিক স্বার্থের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করছে বলে এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সব উদ্যমী গবেষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, ওষুধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ল্যাবের অধীনে গত জুন নাগাদ মোট ১৩৩ ধরনের সম্ভাব্য প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণা কাজ চালিয়েছেন। এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত ফর্মুলার মধ্যে অগ্রগণ্য মানের ভ্যাকসিনের দাবি করছে ব্রিটিশ-মালিকানার AstraZeneca কোম্পানি। CNBC গত সেপ্টেম্বরে এ তথ্য জাহির করেছিল।

মে মাস নাগাদ ‘ল্যানসেট’ চিকিৎসা পত্রিকা খবর দেয়, চীনা প্রতিরক্ষা বাহিনীর রোগতত্ত্ববিদরা তাদের উদ্ভাবনার বেশ উৎসাহব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছিল। ওই দলের নেতা মেজর জেনারেল চেন উই অবশ্য সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘Immume response বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা অর্জনের মানে এই নয় যে, সেই টিকা মানুষকে কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পারবে।’

পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করা হয়ে গেছে অথবা তহবিল ছাড়করণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে করোনার টিকা আবিষ্কারের কাজে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে ২.৩৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ খরচ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে ৮.১ বিলিয়ন ডলার, কোনো রোগ গবেষণার সমন্বিত কার্যক্রমে যা নজিরবিহীন।

গত জুলাই পর্যন্ত পৃথিবীর বহু সরকার, সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও দানবীর ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত হয়েছে আরও ৮.৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল।

শেষোক্ত তহবিল দেয়া হবে বিশ্বজুড়ে শিশুদের জন্য করোনার টিকা দেয়ার কাজে এবং তা পরিচালনা করবে GAVI (Global Alliance for Vaccines & Immunization) সংগঠন। আমেরিকার আরেকটি ফেডারেল সংস্থা USBARD (US Biomedical Advanced Research & Development Authority) এজন্য তাদের তরফে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিল গেট্স্ একাই দিচ্ছেন ১.৬ বিলিয়ন ডলার।

ভাইরাসটির মারণ ক্ষমতা এবং হামলার হিংস তা এতই ভয়ংকর, বিচিত্র, পরিবর্তনশীল ও চাতুর্যপূর্ণ যে তা মোকাবেলায় এ পর্যন্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ২২০ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক রোগ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান The Milken Institute।

ভ্যাকসিনের প্রয়োগ মাত্রা, যৌগিক কাঠামো, মিশ্রণ বা ‘ডোজেজ ফরম্যাটে’ বৈচিত্র্য ও রকমফের থাকলেও করোনা চিকিৎসায় মূল যে ওষুধগুলোর কথা বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত সুপারিশ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, রেমডেসিভির ও আইবুপ্রোফেন (এ ছাড়াও আরও কয়েকটি মূল বা জেনেরিক ওষুধ থাকা স্বাভাবিক বলেই সাধারণ মানুষ ধরে নিতে পারেন এবং সেখানেই হচ্ছে এই বৈশ্বিক ওষুধ-বাণিজ্যের ‘গুমর’।

এগুলোর মধ্যে প্রথমটি সাধারণত প্রয়োগ করা হয় ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে (এটা দিয়ে নাকি সেরে উঠেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প); দ্বিতীয়টি প্রয়োগ করা হয় ‘ইবোলা’ প্রতিষেধক হিসেবে; তৃতীয়টির নামই বলে দিচ্ছে এটা বেদনানাশক ড্রাগ (অবশ্য লন্ডনের একটি হাসপাতালের গবেষকদের জবানী উদ্বৃত করে স্কাই নিউজ খবর দিয়েছে, বেদনানাশক করোনা সারার বদলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ করে দিতে পারে (যেটা সেখানে ঘটেছে)।

করোনার মূল ভাইরাস সার্স-কোভ-২ কার্যকরভাবে প্রতিরোধে ভ্যাকসিন ছাড়া এখনও পর্যন্ত অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতির কথা বলছেন না বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা। ফলে গোটা পৃথিবীর নজর যখন সেই ভ্যাকসিনের দিকে, পুঁজিবাদীদেরও নজর ভ্যাকসিন সাম্রাজ্যে আধিপত্য এবং এক ধরনের ভ্যাকসিন-জাতীয়তাবাদের অহংকারী প্রতিযোগিতায়।

এ রোগের মতোই আরেক ‘মহাব্যাধি’ আসতে চলেছে ভ্যাকসিন গবেষণা, ট্রায়াল, উৎপাদন, বিতরণ, পরিবহন ও সংরক্ষণের বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলোর প্রধান নির্বাহীদের ডাক পড়েছে ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস কিংবা বেইজিংয়ে। এ তলবের উদ্দেশ্য-ফিকির বুঝতে কষ্ট হয় না।

এ ভ্যাকসিনগুলো তৈরির রাসায়নিক কাঁচামাল, প্রযুক্তি, পেটেন্ট-স্বত্ব- এগুলোও কোটি কোটি ডলারের বিশ্ববাণিজ্যের অংশ। ফলে বিশ্বমানবতার এখন দাবি যেখানে সহমর্মিতাপ্রসূত সহযোগিতা, সেখানে পুঁজি ও ক্ষমতার পাল্লা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাসই ফুটে উঠছে বেশি। নামকরা ওষুধ কোম্পানি Merk-এর সিইও জিম রবিনসন বলেই ফেলেছেন, ভ্যাকসিন তৈরি করা দেশগুলো সবার আগে তাদের নিজ নিজ দেশের চাহিদা মেটাবে, বাঁচলে রফতানি। সেই অর্থে WHO, GAVI, COVAX-এর মতো বৈশ্বিক ড্রাগ/হেলথকেয়ার এলায়েন্সগুলোর সদুপদেশে তারা কর্ণপাত করছে বা করবে বলে মনে হয় না।

যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করে ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। ট্রাম্প সেটা রটিয়েছেন, অন্যরা মুখে না বললেও কাজে করবেন। তাদের নিজ দেশের পরই দ্বিতীয় সুযোগ পাবে তাদের ‘প্যাথোলজিক্যাল মিত্র’ যুক্তরাজ্য।

এর পর ইউরোপ, তারও পর অন্যান্য ধনী দেশ। তলানিতে তৃতীয় বিশ্ব। তবে গণচীন তো আর পুঁজিবাদী দেশ নয়। কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত সেই চীন যখন ইতোমধ্যেই পৃথিবীর দ্বিতীয় এবং হবু প্রধান শক্তি, তখন বিশ্বমানবতার ডাকে সাড়া দিতে দেশটি যে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসবে তার প্রমাণ তারা দিয়ে চলেছে একের পর এক। তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের পর পৃথিবী কাঁপানো বাণিজ্যবলয় এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীর নতুন বাণিজ্য ব্লক (RCEP) ইতোমধ্যেই সব ব্যাপারে পাশ্চাত্যের দিকে তাকানোর দৃষ্টি ঘুরিরে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির এক নতুন দিনের ঊষালোক দেখাতে শুরু করেছে।

সেই চীন বিশ্বব্যাপী ‘করোনাভাইরাস’ মোকাবেলায় ২ বিলিয়ন ডলার নিঃশর্ত অনুদান দিচ্ছে। চীনকে সহায়তা দেবে এমন বহু উন্নত দেশও মুখিয়ে আছে। কারণ আমেরিকার মোড়লিপনায় অনেকেই নাখোশ ও হতাশ।

দেখা গেছে, ‘ইবোলা’ ছড়াল আফ্রিকায়, ভ্যাকসিন গবেষণায় সফল হল কানাডা। লাইসেন্স পেল অমেরিকা। আমেরিকান কোম্পানিটির পার্টনার হল জার্মানির এক বিশ্ববিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি।

এ রকম অজস বহুজাতিক সহযোগিতার নজির কোভিড-ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরি ও বাণিজ্যের উত্তম পথনির্দেশ দিতে পারে। মূল লক্ষ্য যদি হয় ‘কল্যাণ’, তাহলে সহযোগিতা আসবেই আর লক্ষ্য যদি হয় ‘মুনাফা’ ও ‘অহংকার’, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দ্বন্দ্ব কল্যাণের অগ্রযাত্রার পথ রোধ করে দাঁড়াবে, এটাই তো ‘স্বাভাবিক।

খন্দকার হাসনাত করিম : সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

[email protected]