বায়ুদূষণে ঢাকা এখন এক নম্বরে
jugantor
বায়ুদূষণে ঢাকা এখন এক নম্বরে

  আতাহার খান  

২৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানি পান না করেও বেশ ক’দিন বেঁচে থাকা যায়; কিন্তু বাতাস ছাড়া তিন মিনিটের বেশি বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেই বাতাসই এখন ঢাকায় ভয়াবহ দূষণের শিকার। বায়ুদূষণে এক নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

বিশ্বের অন্য বড় শহরগুলোর তুলনায় তো বটেই, প্রতিবেশী দেশ ভারতের বড় শহরগুলো থেকেও ঢাকায় দূষণের মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান যাচাইয়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়ালে’র বায়ুমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ৩১৫।

কলকাতা তৃতীয় অবস্থানে, তার বায়ু মানের মাত্রা হল ১৮৬, মুম্বাইয়ে ১৬৯, আর দিল্লিতে ১১২। বিশেষজ্ঞরা ঢাকার এ আবহাওয়াকে দুর্যোগপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।

এখনই এ দূষণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শীতকালে অর্থাৎ আগামী তিন মাসে ঢাকার পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। তখন দেখা যেতে পারে কয়েকগুণ বেশি করোনাভাইরাস সংক্রমণের অস্বাভাবিক চিত্র, পাশাপাশি দেখা দেবে নির্বিচারে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি। এসব শঙ্কার কথা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা আরও বলছেন, ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসের সমন্বয়ে ঢাকায় দূষণের মাত্রা সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ পিএম ২.৫-এর কারণেই ঢাকায় দূষণ আগামী তিন মাসে অতিমাত্রায় বেড়ে যাবে- তখন বাড়বে মৃত্যুর হার। ঢাকা মহানগরীর সার্বিক পরিস্থিতি হয়ে পড়বে নাজুক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীবাসী, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে দেখা দেবে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। উল্লিখিত তিন মাস মশারির মতো ক্ষতিকারক ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসে সব চেয়ে বেশি আচ্ছন্ন থাকবে ঢাকার বাতাস।

এভাবে বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করলে অন্যদের পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ (সিওপিডি), চোখের সমস্যা, ডায়াবেটিস, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে বেশি।

ঢাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করার সুবাদে দেখেছি, ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির কয়েকদিনই শুধু ঢাকায় স্বস্তির সঙ্গে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়। তখন বিশুদ্ধ বাতাস এসে জুড়িয়ে দেয় সারা শরীর! মুহূর্তেই মন হয়ে ওঠে তরতাজা। সারা বছরে এ দুই ঈদের মোট ছুটির দিন দশেক ঢাকা থাকে অপেক্ষাকৃত শান্ত, নিরিবিলি আর হই-হট্টগোলমুক্ত।

রাস্তাঘাটসহ সব জায়গা ঘুরে-ফিরে দেখা যাবে ফাঁকা মহানগর, জনমানব নেই বললেই চলে। মনে হবে এটি চেনা শহর নয়। রাস্তায় নেই মানুষের ঢল। যানজট নেই। শূন্য রাস্তা ঘিরে দেখা যাবে বাতাসের নিঃশব্দ চলাচল, পাতা ঝরার শব্দ আর তারই মাঝে দু-একটা ট্যাক্সি, বাসের দ্রুত বেগে ছুটে চলা, রিকশারও চলাচল কম থাকে।

এসব দেখে কী মনে হবে শহরটি আমাদের অতি পরিচিত রাজধানী ঢাকা! অথচ দুই ঈদের ছুটি পার হওয়ার পর ঢাকা আবার ফিরে আসে তার নিজ চেহারায়।

সোয়া দুই কোটির ওপরে মানুষ বসবাস করে এ নগরীতে। পরিবারপ্রতি সদস্য সংখ্যা যদি চারজন করে ধরা হয়, তাহলে কমপক্ষে পঞ্চাশ লাখ পরিবার ঢাকায় বাস করছে এবং প্রতি পরিবারের একজন সদস্য যদি জীবিকার দায়িত্বে থাকেন, তাহলে কম করে হলেও পঞ্চাশ লাখ মানুষকে প্রতিদিন চাকরিস্থলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরোতে হয় রাজপথে। তার ওপর স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া প্রায় আরও পঞ্চাশ লাখ শিক্ষার্থীকে পা রাখতে হয় রাজপথে।

তার মানে প্রায় এক কোটি মানুষ যদি প্রতিদিন বাসা থেকে বের হন, তাহলে সেই নগরীর চেহারা কল্পনা করুন কেমন হতে পারে! এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে থাকবে মারাত্মক ট্রাফিক জ্যাম। ব্যস্ততম সময়ের একটা অংশ এ মহানগরী স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণ, ঢাকা নগরী পরিকল্পিতভাবে বিকশিত হয়নি।

স্বাধীন দেশের রাজধানী মর্যাদা লাভের পর ঢাকার পরিধি বেড়েছে দ্রুত ও এলোমেলোভাবে। ফলে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় সড়ক, লিংক রোড, সার্কুলার রোড, বাইপাস রোড ও খোলা উদ্যান। আরও একটি সমস্যা হল, ঢাকা মহনগরীতে ঢোকার এবং বেরোবার পথ একটাই। অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম প্রধান একটি কারণ এটি।

নগরীর ব্যস্ততম সময়েই সাধারণত ট্রাফিক জ্যাম শুরু হয়। তখন রাজধানীর দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার সড়কপথের পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে; থেমে যায় গতি। পুরো নগরী যেন থমকে দাঁড়ায়। সড়কে আটকে থাকা যানবাহনগুলোর এগজস্ট পাইপ বেয়ে বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়ায় খুব সহজেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারদিক! তখন নিঃশ্বাস নিতেও ভীষণ কষ্ট হয়।

হ্যাঁ, প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, ঢাকার সড়কপথে কতসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে? ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ৩ লাখ যানবাহন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে চলাচল করে অনেক বেশি যানবাহন। বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য, ঢাকার সড়কপথে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক সব ধরনের বাহন মিলে চলাচল করে ২১ লাখ অর্থাৎ ৭ গুণ বেশি।

ভাবুন, অভিশপ্ত এ যানজটের হাতে আমরা এভাবেই বন্দি হয়ে থাকি সারাক্ষণ! সকাল থেকে রাত অবধি গণপরিবহন, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, সিএনজি বেবিট্যাক্সি, ট্রাক, লরি থেকে প্রতিদিন বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়া বাতাসের মানই শুধু খারাপ করছে না, বিষাক্তও করে তুলছে।

ডিজেলচালিত যানবাহনের একটা বড় অংশেরই এগজস্ট পাইপ থাকে ত্রুটিপূর্ণ। এতে বাধাহীনভাবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কালো ধোঁয়া। এ ধোঁয়া বাতাস তো দূষিত করছেই, পরিবেশকেও করে তুলছে হুমকির সম্মুখীন। ডিজেল ও পেট্রোল হল হাইড্রোকার্বন জাতীয় পদার্থ। এটি হাইড্রোজেন ও কার্বনের মিলিতরূপ। এ জ্বালানি পুরো দহন হলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

কিন্তু দহন-কাজ যখন অসম্পূর্ণ থাকে, তখন কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হয় আর জ্বালানির একটা অংশ হাড্রো-কার্বনরূপে সরাসরি বের হয়ে আসে। এভাবেই দিনের পর দিন এ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে। ফলে দ্রুত বাতাস হয়ে পড়ে দূষিত।

বাংলাদেশের বাতাস দূষণমুক্ত- এ দাবি করা এখন অর্থহীন। এখানে বিশুদ্ধ বাতাস বছরের খুব কম সময়েই পাওয়া যায়। বাতাসের মান সবচেয়ে বেশি খারাপ থাকে শীতকালে। তখন বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড ও সালফার অক্সাইড বিরাজ করে। ক্ষতিকর এসব বস্তুকণার উপস্থিতির কারণে বাতাসের মান খুব বেশি খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়।

এর একটা হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি আরবান ল্যাব। ওই সংস্থার মতে, সহনীয় মাত্রা হল, প্রতি মাইক্রোগ্রাম বাতাসে এক থেকে ১২ মাইক্রোমিটার বস্তুকণার উপস্থিতি। কিন্তু শীত মৌসুমে কোনোদিনই প্রতি মাইক্রোগ্রাম বাতাসে ১৫০ থেকে ১৮৪ মাইক্রোমিটার মাত্রার নিচে বস্তুকণা থাকে না; বরং তা বেড়ে ২২৫ মাইক্রোমিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। দুশ্চিন্তার কারণ এখানেই।

গত ত্রিশ বছরের মধ্যে বর্তমান সময়ে ক্ষতিকর বস্তুকণা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নির্গমন মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। এ কারণে আমরা শুধু চিন্তিত নই, রীতিমতো ভীত।

কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাত দিয়ে একটি খবর ছাপায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে যে পাঁচটি দেশে, তার মধ্যে একটি হল বাংলাদেশ।

বায়ুদূষণের একটি কারণ হল ঘনবসতি। ঘনবসতির জন্যই এসব অঞ্চলের মানুষজন শ্বাসনালির রোগে ভোগে বেশি। দেখা দেয় হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর ধূমপান, সড়ক দুর্ঘটনা ও ডায়াবেটিসে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার চেয়ে বেশি মানুষ শ্বাসনালির রোগের জন্য মারা যায়।

আতঙ্কিত হওয়ার মতো আরও একটি খবর- বায়ুদূষণের কারণে দেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়। বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে ধুলাদূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান এখন এক নম্বরে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বাড়ে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এ দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যু হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে ধুলাদূষণে বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে ধুলাজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ। রাস্তার পাশে দোকানের খাবার ধুলায় বিষাক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগজীবাণু মিশ্রিত ধুলা ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও যক্ষ্মাসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। সর্বোপরি শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে ধুলাজনিত রোগবালাইয়ে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ধুলায় পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদের পথচলা রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া ঢাকার চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রায় ১২০০ ইটভাটা। এগুলোর কাজ শুরু হয় নভেম্বর মাস থেকেই। এ সময়ে বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী এ ইটভাটাগুলো। একইসঙ্গে শুরু হয় বেশিরভাগ অবকাঠামোর নির্মাণ ও মেরামতের কাজ।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, রাজধানীর বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা ‘পিএম ২.৫’-এর মানমাত্রা হল প্রতি কিউবিক মিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম। এ ছাড়া ‘পিএম ১০’ বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার মানমাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। শীতকালে এর মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। পিএম ২.৫-এর সারা বছরের গড় থাকে ৮১ মাইক্রোগ্রামের ওপরে আর পিএম ১০-এর বার্ষিক গড় হল ১৫৮ মাইক্রোগ্রামের ওপরে।

হ্যাঁ, ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া উপায় নেই। তাই বলে কি বাতাসে ভাসমান কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর বস্তুকণা মোকাবেলার কোনো উপায় নেই? অবশ্যই আছে। বাতাসের মান যাতে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকে, সেজন্য আমাদের হতে হবে বিশেষ মনোযোগী।

উন্নয়নের নামে বাতাস, ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সরাসরি ক্ষতি হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের থাকতে হবে বিরত। যখন-তখন রাস্তা খুঁড়ে মাসের পর মাস ফেলে রাখা চলবে না। স্থাপনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট কারখানা, ইস্পাত কারখানা, রি-রোলিং মিল, যানবাহন ও ইটভাটা থেকে যাতে ক্ষতিকর বস্তুকণা নির্গত হতে না পারে, সেজন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা জরুরি।

সুখবর হল, বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর গ্যাস আর বস্তুকণার একটা বড় অংশ মাটি, পানি এবং বৃক্ষরাজি শুষে নেয়। আর বাস্তবতা হল, ঢাকা নগরীর ভেতরে এবং বাইরের অধিকাংশ জলাশয়ই ভরাট হয়ে গেছে; সবুজ গাছগাছালিও দিন দিন কমে এসেছে।

এ অবস্থায় আমরা মনে করি, বনায়ন অন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত ঢাকাবাসীকে। তাদের বাড়ি-ঘরের ছাদ ব্যবহার করে এগিয়ে নেয়া যেতে পারে সবুজ শাক-সবজি, নানা ধরনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধুলাদূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ আইন অনুসারে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধুলাদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা প্রয়োজন। দরকার হলে ধুলাদূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ধুলাদূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ আইন অনুসারে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধুলাদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার, আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় সিটি কর্পোরেশনকে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি ধুলাদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে।

ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ সুস্থ রাখার জন্য নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে। আসুন, আমরা নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে হাতে হাত রেখে পথচলা শুরু করি। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই প্রিয় রাজধানী ঢাকাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

আতাহার খান : নির্বাহী সম্পাদক, দেশ; মুক্তিযোদ্ধা, কবি

বায়ুদূষণে ঢাকা এখন এক নম্বরে

 আতাহার খান 
২৬ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পানি পান না করেও বেশ ক’দিন বেঁচে থাকা যায়; কিন্তু বাতাস ছাড়া তিন মিনিটের বেশি বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেই বাতাসই এখন ঢাকায় ভয়াবহ দূষণের শিকার। বায়ুদূষণে এক নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

বিশ্বের অন্য বড় শহরগুলোর তুলনায় তো বটেই, প্রতিবেশী দেশ ভারতের বড় শহরগুলো থেকেও ঢাকায় দূষণের মাত্রা প্রায় দ্বিগুণ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান যাচাইয়ের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়ালে’র বায়ুমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, গত ২১ নভেম্বর ঢাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ৩১৫।

কলকাতা তৃতীয় অবস্থানে, তার বায়ু মানের মাত্রা হল ১৮৬, মুম্বাইয়ে ১৬৯, আর দিল্লিতে ১১২। বিশেষজ্ঞরা ঢাকার এ আবহাওয়াকে দুর্যোগপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।

এখনই এ দূষণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শীতকালে অর্থাৎ আগামী তিন মাসে ঢাকার পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। তখন দেখা যেতে পারে কয়েকগুণ বেশি করোনাভাইরাস সংক্রমণের অস্বাভাবিক চিত্র, পাশাপাশি দেখা দেবে নির্বিচারে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি। এসব শঙ্কার কথা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা আরও বলছেন, ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসের সমন্বয়ে ঢাকায় দূষণের মাত্রা সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ পিএম ২.৫-এর কারণেই ঢাকায় দূষণ আগামী তিন মাসে অতিমাত্রায় বেড়ে যাবে- তখন বাড়বে মৃত্যুর হার। ঢাকা মহানগরীর সার্বিক পরিস্থিতি হয়ে পড়বে নাজুক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীবাসী, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে দেখা দেবে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। উল্লিখিত তিন মাস মশারির মতো ক্ষতিকারক ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসে সব চেয়ে বেশি আচ্ছন্ন থাকবে ঢাকার বাতাস।

এভাবে বায়ুদূষণের মধ্যে বসবাস করলে অন্যদের পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ (সিওপিডি), চোখের সমস্যা, ডায়াবেটিস, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে বেশি।

ঢাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করার সুবাদে দেখেছি, ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির কয়েকদিনই শুধু ঢাকায় স্বস্তির সঙ্গে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া যায়। তখন বিশুদ্ধ বাতাস এসে জুড়িয়ে দেয় সারা শরীর! মুহূর্তেই মন হয়ে ওঠে তরতাজা। সারা বছরে এ দুই ঈদের মোট ছুটির দিন দশেক ঢাকা থাকে অপেক্ষাকৃত শান্ত, নিরিবিলি আর হই-হট্টগোলমুক্ত।

রাস্তাঘাটসহ সব জায়গা ঘুরে-ফিরে দেখা যাবে ফাঁকা মহানগর, জনমানব নেই বললেই চলে। মনে হবে এটি চেনা শহর নয়। রাস্তায় নেই মানুষের ঢল। যানজট নেই। শূন্য রাস্তা ঘিরে দেখা যাবে বাতাসের নিঃশব্দ চলাচল, পাতা ঝরার শব্দ আর তারই মাঝে দু-একটা ট্যাক্সি, বাসের দ্রুত বেগে ছুটে চলা, রিকশারও চলাচল কম থাকে।

এসব দেখে কী মনে হবে শহরটি আমাদের অতি পরিচিত রাজধানী ঢাকা! অথচ দুই ঈদের ছুটি পার হওয়ার পর ঢাকা আবার ফিরে আসে তার নিজ চেহারায়।

সোয়া দুই কোটির ওপরে মানুষ বসবাস করে এ নগরীতে। পরিবারপ্রতি সদস্য সংখ্যা যদি চারজন করে ধরা হয়, তাহলে কমপক্ষে পঞ্চাশ লাখ পরিবার ঢাকায় বাস করছে এবং প্রতি পরিবারের একজন সদস্য যদি জীবিকার দায়িত্বে থাকেন, তাহলে কম করে হলেও পঞ্চাশ লাখ মানুষকে প্রতিদিন চাকরিস্থলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরোতে হয় রাজপথে। তার ওপর স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া প্রায় আরও পঞ্চাশ লাখ শিক্ষার্থীকে পা রাখতে হয় রাজপথে।

তার মানে প্রায় এক কোটি মানুষ যদি প্রতিদিন বাসা থেকে বের হন, তাহলে সেই নগরীর চেহারা কল্পনা করুন কেমন হতে পারে! এর সঙ্গে আরও জড়িয়ে থাকবে মারাত্মক ট্রাফিক জ্যাম। ব্যস্ততম সময়ের একটা অংশ এ মহানগরী স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণ, ঢাকা নগরী পরিকল্পিতভাবে বিকশিত হয়নি।

স্বাধীন দেশের রাজধানী মর্যাদা লাভের পর ঢাকার পরিধি বেড়েছে দ্রুত ও এলোমেলোভাবে। ফলে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় সড়ক, লিংক রোড, সার্কুলার রোড, বাইপাস রোড ও খোলা উদ্যান। আরও একটি সমস্যা হল, ঢাকা মহনগরীতে ঢোকার এবং বেরোবার পথ একটাই। অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম প্রধান একটি কারণ এটি।

নগরীর ব্যস্ততম সময়েই সাধারণত ট্রাফিক জ্যাম শুরু হয়। তখন রাজধানীর দুই হাজার ৬০০ কিলোমিটার সড়কপথের পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে; থেমে যায় গতি। পুরো নগরী যেন থমকে দাঁড়ায়। সড়কে আটকে থাকা যানবাহনগুলোর এগজস্ট পাইপ বেয়ে বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়ায় খুব সহজেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারদিক! তখন নিঃশ্বাস নিতেও ভীষণ কষ্ট হয়।

হ্যাঁ, প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, ঢাকার সড়কপথে কতসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে? ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ৩ লাখ যানবাহন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে চলাচল করে অনেক বেশি যানবাহন। বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য, ঢাকার সড়কপথে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক সব ধরনের বাহন মিলে চলাচল করে ২১ লাখ অর্থাৎ ৭ গুণ বেশি।

ভাবুন, অভিশপ্ত এ যানজটের হাতে আমরা এভাবেই বন্দি হয়ে থাকি সারাক্ষণ! সকাল থেকে রাত অবধি গণপরিবহন, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার, সিএনজি বেবিট্যাক্সি, ট্রাক, লরি থেকে প্রতিদিন বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়া বাতাসের মানই শুধু খারাপ করছে না, বিষাক্তও করে তুলছে।

ডিজেলচালিত যানবাহনের একটা বড় অংশেরই এগজস্ট পাইপ থাকে ত্রুটিপূর্ণ। এতে বাধাহীনভাবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কালো ধোঁয়া। এ ধোঁয়া বাতাস তো দূষিত করছেই, পরিবেশকেও করে তুলছে হুমকির সম্মুখীন। ডিজেল ও পেট্রোল হল হাইড্রোকার্বন জাতীয় পদার্থ। এটি হাইড্রোজেন ও কার্বনের মিলিতরূপ। এ জ্বালানি পুরো দহন হলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়।

কিন্তু দহন-কাজ যখন অসম্পূর্ণ থাকে, তখন কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হয় আর জ্বালানির একটা অংশ হাড্রো-কার্বনরূপে সরাসরি বের হয়ে আসে। এভাবেই দিনের পর দিন এ গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে। ফলে দ্রুত বাতাস হয়ে পড়ে দূষিত।

বাংলাদেশের বাতাস দূষণমুক্ত- এ দাবি করা এখন অর্থহীন। এখানে বিশুদ্ধ বাতাস বছরের খুব কম সময়েই পাওয়া যায়। বাতাসের মান সবচেয়ে বেশি খারাপ থাকে শীতকালে। তখন বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড ও সালফার অক্সাইড বিরাজ করে। ক্ষতিকর এসব বস্তুকণার উপস্থিতির কারণে বাতাসের মান খুব বেশি খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়।

এর একটা হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি আরবান ল্যাব। ওই সংস্থার মতে, সহনীয় মাত্রা হল, প্রতি মাইক্রোগ্রাম বাতাসে এক থেকে ১২ মাইক্রোমিটার বস্তুকণার উপস্থিতি। কিন্তু শীত মৌসুমে কোনোদিনই প্রতি মাইক্রোগ্রাম বাতাসে ১৫০ থেকে ১৮৪ মাইক্রোমিটার মাত্রার নিচে বস্তুকণা থাকে না; বরং তা বেড়ে ২২৫ মাইক্রোমিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। দুশ্চিন্তার কারণ এখানেই।

গত ত্রিশ বছরের মধ্যে বর্তমান সময়ে ক্ষতিকর বস্তুকণা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নির্গমন মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। এ কারণে আমরা শুধু চিন্তিত নই, রীতিমতো ভীত।

কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাত দিয়ে একটি খবর ছাপায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে যে পাঁচটি দেশে, তার মধ্যে একটি হল বাংলাদেশ।

বায়ুদূষণের একটি কারণ হল ঘনবসতি। ঘনবসতির জন্যই এসব অঞ্চলের মানুষজন শ্বাসনালির রোগে ভোগে বেশি। দেখা দেয় হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর ধূমপান, সড়ক দুর্ঘটনা ও ডায়াবেটিসে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার চেয়ে বেশি মানুষ শ্বাসনালির রোগের জন্য মারা যায়।

আতঙ্কিত হওয়ার মতো আরও একটি খবর- বায়ুদূষণের কারণে দেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়। বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে ধুলাদূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান এখন এক নম্বরে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বাড়ে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এ দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যু হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে ধুলাদূষণে বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে ধুলাজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ। রাস্তার পাশে দোকানের খাবার ধুলায় বিষাক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগজীবাণু মিশ্রিত ধুলা ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও যক্ষ্মাসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করছে। আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। সর্বোপরি শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে ধুলাজনিত রোগবালাইয়ে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ধুলায় পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদের পথচলা রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া ঢাকার চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রায় ১২০০ ইটভাটা। এগুলোর কাজ শুরু হয় নভেম্বর মাস থেকেই। এ সময়ে বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী এ ইটভাটাগুলো। একইসঙ্গে শুরু হয় বেশিরভাগ অবকাঠামোর নির্মাণ ও মেরামতের কাজ।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, রাজধানীর বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা ‘পিএম ২.৫’-এর মানমাত্রা হল প্রতি কিউবিক মিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম। এ ছাড়া ‘পিএম ১০’ বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার মানমাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। শীতকালে এর মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। পিএম ২.৫-এর সারা বছরের গড় থাকে ৮১ মাইক্রোগ্রামের ওপরে আর পিএম ১০-এর বার্ষিক গড় হল ১৫৮ মাইক্রোগ্রামের ওপরে।

হ্যাঁ, ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া উপায় নেই। তাই বলে কি বাতাসে ভাসমান কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর বস্তুকণা মোকাবেলার কোনো উপায় নেই? অবশ্যই আছে। বাতাসের মান যাতে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থাকে, সেজন্য আমাদের হতে হবে বিশেষ মনোযোগী।

উন্নয়নের নামে বাতাস, ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সরাসরি ক্ষতি হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের থাকতে হবে বিরত। যখন-তখন রাস্তা খুঁড়ে মাসের পর মাস ফেলে রাখা চলবে না। স্থাপনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট কারখানা, ইস্পাত কারখানা, রি-রোলিং মিল, যানবাহন ও ইটভাটা থেকে যাতে ক্ষতিকর বস্তুকণা নির্গত হতে না পারে, সেজন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা জরুরি।

সুখবর হল, বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর গ্যাস আর বস্তুকণার একটা বড় অংশ মাটি, পানি এবং বৃক্ষরাজি শুষে নেয়। আর বাস্তবতা হল, ঢাকা নগরীর ভেতরে এবং বাইরের অধিকাংশ জলাশয়ই ভরাট হয়ে গেছে; সবুজ গাছগাছালিও দিন দিন কমে এসেছে।

এ অবস্থায় আমরা মনে করি, বনায়ন অন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত ঢাকাবাসীকে। তাদের বাড়ি-ঘরের ছাদ ব্যবহার করে এগিয়ে নেয়া যেতে পারে সবুজ শাক-সবজি, নানা ধরনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধুলাদূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ আইন অনুসারে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধুলাদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা প্রয়োজন। দরকার হলে ধুলাদূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ধুলাদূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ আইন অনুসারে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধুলাদূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার, আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় সিটি কর্পোরেশনকে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি ধুলাদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে।

ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ সুস্থ রাখার জন্য নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে। আসুন, আমরা নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে হাতে হাত রেখে পথচলা শুরু করি। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই প্রিয় রাজধানী ঢাকাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

আতাহার খান : নির্বাহী সম্পাদক, দেশ; মুক্তিযোদ্ধা, কবি