বিজয়ের মাস সামনে রেখে
jugantor
বিজয়ের মাস সামনে রেখে

  মুঈদ রহমান  

২৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুদিন বাদেই শুরু হতে যাচ্ছে মহান বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সারা বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান ও ২ লাখ বা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল লাল-সবুজ পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবার প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

দেশে প্রতিবছরই ডিসেম্বর মাসে, বিশেষ করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনগুলো অতিবাহিত করা হয়। কিন্তু এ বছর বৈশ্বিক করোনা মহামারীর কারণে তা অনেকখানি সংকুচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। তারপরও শিহরণ জাগানিয়া মাসটি আমরা অন্তর দিয়ে অনুভব করব এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যে কোনো আয়োজন-অনুষ্ঠান-উদযাপনের দুটি দিক থাকে। একটি হল দিনটির তাৎপর্য ও পটভূমি বর্ণনা, অপরটি হল কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পর্যালোচনা। তা না হলে দিবসটির মাহাত্ম্য মলিন হয়ে যাবে।

১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে সমগ্র ভারত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। পূর্ব ও পশ্চিম দুটি পৃথক ভূখণ্ড নিয়ে মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে তৈরি হয় পাকিস্তান। মাঝখানে বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারত, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়াকে অনেকে মনে করেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভুল। আমার কাছে তা মনে হয় না।

তাহলে তো আমরা ভুল স্বীকার করে আবারও ভারত হয়ে যেতাম। কিন্তু আমরা তো সৃষ্টি করেছি বাংলাদেশ। তার মানে হল, বাঙালির মনে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে প্রকাশিত, বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাসনা জাগ্রত হয়েছিল। হ্যাঁ, দ্বিজাতিতত্ত্বে ভুলটা ছিল জাতির সংজ্ঞা নিরূপণে। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে কোনো জাতি তৈরি হতে পারে না। তার জন্য চাই ভাষা, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক পরিবেশ, সামাজিক আচার ও দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি খাদ্যাভ্যাসও।

সেদিক বিবেচনা করলে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। এর প্রমাণ আমাদের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিরাই বেশি দিয়েছেন। পুরো ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালের আগে যেমন ব্রিটিশদের কলোনি ছিল, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানিরাও ভেবেছিল পূর্ব পাকিস্তানকে তার কলোনি করে রাখবে। পুরো পাকিস্তান চলবে পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে।

এর প্রমাণ হিসেবে আমরা পাই পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশটির রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে তৎকালীন বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা দেন, ‘উর্দু শ্যাল বি, উইল বি অ্যান্ড মাস্ট বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ এর মাধ্যমে তিনি বাঙালি সত্তা বিকাশের পথ প্রথমেই রুদ্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। অথচ সে সময়ের ভাষাভাষীর পরিসংখ্যানটি দেখলে বিস্মিত হতে হয়।

সে সময় সমগ্র পাকিস্তানি নাগরিকদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল বাংলা ভাষাভাষী; ২৮ দশমিক ০৪ শতাংশ পাঞ্জাবি, উর্দুভাষী ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ, ৭ দশমিক ১ শতাংশ পশতু, ৫ দশমিক ৮ শতাংশ সিন্ধি এবং ১ দশমিক ৮ শতাংশ ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষাভাষী (মোট ১০৫.৫৪ শতাংশ হওয়ার কারণ হল অনেকে নিজেদের দ্বিভাষী পরিচয় দিয়েছেন)। সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের জাতি তো দূরে থাক, একজন নাগরিকের অধিকার দিতেও নারাজ ছিল। আমরা তাদের এ আচরণ রক্ত দিয়ে প্রতিহত করেছি, সৃষ্টি করেছি অমর একুশে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল অনেক। তৎকালীন মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও তার আয়ু ছিল মাত্র দু’বছর। পূর্ব পাকিস্তানের একটি বড় অংশই মনে করত, মুসলিম লীগের শাসকগোষ্ঠী প্রো-পিপল নয়। তারা ইউরোপের জীবনযাত্রাকে আকর্ষণীয় মনে করতেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকরা তা ভালোভাবেই অনুভব করতে পেরেছিলেন।

তাই ১৯৪৯ সালেই তারা আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ) নামে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেন। দলের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)। ধর্মীয় আবেগের পরিবর্তে মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়কে সামনে রেখে তৈরি হওয়া এই নতুন দলটি চূড়ান্ত সাফল্য পায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। দলটি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে নির্বাচনে অংশ নেয়।

পূর্ব পাকিস্তানের ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট আদায় করে নেয় ২১৫টি আর মুসলিম লীগের বরাতে জোটে মোটে ৯টি আসন। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় বাংলার মানুষ ভাত-কাপড়ের রাজনীতি চায়।

১৯৫৪ সালের মে মাসে গঠিত হয় ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা। এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হন এবং শেখ মুজিবুর রহমান দায়িত্ব পান কৃষি, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের। এই মন্ত্রিপরিষদের স্থায়িত্ব ছিল শপথ নেয়া পর্যন্তই। যেহেতেু যুক্তফ্রন্টকে কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নিতে পারেনি, তাই নানা অজুহাতে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ৯২(ক) ধারা ক্ষমতাবলে বরখাস্ত করা হয় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে।

শুধু তা-ই নয়, দমন-নিপীড়নও চালানো হয়। এ কে ফজলুল হককে গৃহে অন্তরীণ করা হয়, মওলানা ভাসানীকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু নেতাকর্মীকে জেলে পাঠানো হয়। সে সময়কার শাসকগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক মানসিকতা ছিল শূন্যের কোঠায়। পরবর্তী সময়ে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, জেনারেল ইয়াহিয়া খানসহ সামরিক জান্তারাই দেশ পরিচালনা করেছে।

এই সামরিক ছায়া ২০২০ সালের পাকিস্তানকেও ছেড়ে যায়নি। আমরা ওই সামরিক শাসনের ভেতর দিয়েই তৈরি করেছি ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ নানা আন্দোলন, হারাতে হয়েছে হাজারও প্রাণ। তারপরও আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরিতে বিশ্বাসী ছিলাম। আমরা আশাও করেছিলাম একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের এবং সে সময়টা এসেও গেল ১৯৭০ সালে।

দুর্বার আন্দোলনের ফলে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান তৎকালীন সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে ইয়াহিয়া সমগ্র পাকিস্তানে একটি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। আমরা এই দিনটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকারের। সে সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩১৩।

যে কোনো দলকে ক্ষমতায় যেতে হলে তাকে কমপক্ষে ১৫৭টি আসনে জয়লাভ করতে হবে। ১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় মাত্র ৮৮টি আসন। সুতরাং আওয়ামী লীগের দ্বারাই যে পাকিস্তানের সরকার গঠিত হবে- গণতান্ত্রিক ধারা ও রীতি তা-ই বলে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ধারা যা বলে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ধারা তা বলে না। তাই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা হল এবং জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হল।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করল। সংসদ অধিবেশনের তারিখ বিনা কারণেই পরিবর্তিত হতে লাগল। বাংলার মানুষের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ইয়াহিয়া সরকার বঙ্গবন্ধুর হাতে কোনোমতেই ক্ষমতা দেবে না। দিনকে দিন বাঙালি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে লাগল। ঠিক এমনই সময়ে উপস্থিত হল ৭ মার্চ। জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে বিবেচনায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু উত্থাপন করলেন ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। বক্তব্যের শেষটা ছিল, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন, এ ভাষণের ভেতর দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

এই ভাষণের উপসংহার প্রমাণ করে, বাঙালির সামনে স্বাধীন জাতি হিসেবে জেগে ওঠার সেটাই ছিল প্রকৃত সময় এবং এর কোনো বিকল্প ছিল না। ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এর সমাধান হিসেবে একটি নির্মম ও বর্বরোচিত পথ বেছে নেয়। তারাও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়েই বাঙালিকে দমন করা হবে।

তাই ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকাসহ সারা দেশে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় হাজারও নিরস্ত্র বাঙালিকে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। এ অবস্থায় আমাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ ছিল না। ১০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার।

শুরু হয়ে যায় পৃথিবীর অন্যতম সুসজ্জিত-প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লুঙ্গি-গেঞ্জিসংবলিত দৃঢ়প্রত্যয়ী বঙালির মরণযুদ্ধ।

দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই সশস্ত্র সংগ্রাম। কত নির্যাতন, কত নিপীড়ন! এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নেন। ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারান। রাস্তা-ঘাট-কালভার্ট সব মিলিয়ে একটি বিপর্যস্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা ১ মিনিটে পাকিস্তানিরা ৯৩ হাজার সৈন্যসমেত আত্মসমর্পণ করে। বাংলার মাটিতে সগৌরবে উড়তে থাকে লাল-সবুজ পতাকা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যে বঞ্চনার বিপরীতে যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে কি? জবাবে বলা যায়, আমাদের আর্থিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি হলেও শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও গণবিমুখতার অবসান আজও ঘটেনি। ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে মাত্র।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

বিজয়ের মাস সামনে রেখে

 মুঈদ রহমান 
২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুদিন বাদেই শুরু হতে যাচ্ছে মহান বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সারা বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান ও ২ লাখ বা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল লাল-সবুজ পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবার প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

দেশে প্রতিবছরই ডিসেম্বর মাসে, বিশেষ করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিনগুলো অতিবাহিত করা হয়। কিন্তু এ বছর বৈশ্বিক করোনা মহামারীর কারণে তা অনেকখানি সংকুচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। তারপরও শিহরণ জাগানিয়া মাসটি আমরা অন্তর দিয়ে অনুভব করব এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যে কোনো আয়োজন-অনুষ্ঠান-উদযাপনের দুটি দিক থাকে। একটি হল দিনটির তাৎপর্য ও পটভূমি বর্ণনা, অপরটি হল কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পর্যালোচনা। তা না হলে দিবসটির মাহাত্ম্য মলিন হয়ে যাবে।

১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে সমগ্র ভারত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। পূর্ব ও পশ্চিম দুটি পৃথক ভূখণ্ড নিয়ে মুসলমানদের আবাসভূমি হিসেবে তৈরি হয় পাকিস্তান। মাঝখানে বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারত, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হওয়াকে অনেকে মনে করেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভুল। আমার কাছে তা মনে হয় না।

তাহলে তো আমরা ভুল স্বীকার করে আবারও ভারত হয়ে যেতাম। কিন্তু আমরা তো সৃষ্টি করেছি বাংলাদেশ। তার মানে হল, বাঙালির মনে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে প্রকাশিত, বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাসনা জাগ্রত হয়েছিল। হ্যাঁ, দ্বিজাতিতত্ত্বে ভুলটা ছিল জাতির সংজ্ঞা নিরূপণে। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে কোনো জাতি তৈরি হতে পারে না। তার জন্য চাই ভাষা, সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক পরিবেশ, সামাজিক আচার ও দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি খাদ্যাভ্যাসও।

সেদিক বিবেচনা করলে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। এর প্রমাণ আমাদের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিরাই বেশি দিয়েছেন। পুরো ভারতবর্ষ ১৯৪৭ সালের আগে যেমন ব্রিটিশদের কলোনি ছিল, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানিরাও ভেবেছিল পূর্ব পাকিস্তানকে তার কলোনি করে রাখবে। পুরো পাকিস্তান চলবে পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ভাষা নিয়ে।

এর প্রমাণ হিসেবে আমরা পাই পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশটির রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে তৎকালীন বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা দেন, ‘উর্দু শ্যাল বি, উইল বি অ্যান্ড মাস্ট বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ এর মাধ্যমে তিনি বাঙালি সত্তা বিকাশের পথ প্রথমেই রুদ্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। অথচ সে সময়ের ভাষাভাষীর পরিসংখ্যানটি দেখলে বিস্মিত হতে হয়।

সে সময় সমগ্র পাকিস্তানি নাগরিকদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল বাংলা ভাষাভাষী; ২৮ দশমিক ০৪ শতাংশ পাঞ্জাবি, উর্দুভাষী ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ, ৭ দশমিক ১ শতাংশ পশতু, ৫ দশমিক ৮ শতাংশ সিন্ধি এবং ১ দশমিক ৮ শতাংশ ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষাভাষী (মোট ১০৫.৫৪ শতাংশ হওয়ার কারণ হল অনেকে নিজেদের দ্বিভাষী পরিচয় দিয়েছেন)। সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের জাতি তো দূরে থাক, একজন নাগরিকের অধিকার দিতেও নারাজ ছিল। আমরা তাদের এ আচরণ রক্ত দিয়ে প্রতিহত করেছি, সৃষ্টি করেছি অমর একুশে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য ছিল অনেক। তৎকালীন মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও তার আয়ু ছিল মাত্র দু’বছর। পূর্ব পাকিস্তানের একটি বড় অংশই মনে করত, মুসলিম লীগের শাসকগোষ্ঠী প্রো-পিপল নয়। তারা ইউরোপের জীবনযাত্রাকে আকর্ষণীয় মনে করতেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকরা তা ভালোভাবেই অনুভব করতে পেরেছিলেন।

তাই ১৯৪৯ সালেই তারা আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ) নামে নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেন। দলের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)। ধর্মীয় আবেগের পরিবর্তে মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়কে সামনে রেখে তৈরি হওয়া এই নতুন দলটি চূড়ান্ত সাফল্য পায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। দলটি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নামে নির্বাচনে অংশ নেয়।

পূর্ব পাকিস্তানের ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট আদায় করে নেয় ২১৫টি আর মুসলিম লীগের বরাতে জোটে মোটে ৯টি আসন। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় বাংলার মানুষ ভাত-কাপড়ের রাজনীতি চায়।

১৯৫৪ সালের মে মাসে গঠিত হয় ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা। এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হন এবং শেখ মুজিবুর রহমান দায়িত্ব পান কৃষি, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের। এই মন্ত্রিপরিষদের স্থায়িত্ব ছিল শপথ নেয়া পর্যন্তই। যেহেতেু যুক্তফ্রন্টকে কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নিতে পারেনি, তাই নানা অজুহাতে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ৯২(ক) ধারা ক্ষমতাবলে বরখাস্ত করা হয় যুক্তফ্রন্ট সরকারকে।

শুধু তা-ই নয়, দমন-নিপীড়নও চালানো হয়। এ কে ফজলুল হককে গৃহে অন্তরীণ করা হয়, মওলানা ভাসানীকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু নেতাকর্মীকে জেলে পাঠানো হয়। সে সময়কার শাসকগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক মানসিকতা ছিল শূন্যের কোঠায়। পরবর্তী সময়ে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, জেনারেল ইয়াহিয়া খানসহ সামরিক জান্তারাই দেশ পরিচালনা করেছে।

এই সামরিক ছায়া ২০২০ সালের পাকিস্তানকেও ছেড়ে যায়নি। আমরা ওই সামরিক শাসনের ভেতর দিয়েই তৈরি করেছি ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ নানা আন্দোলন, হারাতে হয়েছে হাজারও প্রাণ। তারপরও আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরিতে বিশ্বাসী ছিলাম। আমরা আশাও করেছিলাম একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের এবং সে সময়টা এসেও গেল ১৯৭০ সালে।

দুর্বার আন্দোলনের ফলে ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান তৎকালীন সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে ইয়াহিয়া সমগ্র পাকিস্তানে একটি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। আমরা এই দিনটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকারের। সে সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট আসন সংখ্যা ছিল ৩১৩।

যে কোনো দলকে ক্ষমতায় যেতে হলে তাকে কমপক্ষে ১৫৭টি আসনে জয়লাভ করতে হবে। ১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় মাত্র ৮৮টি আসন। সুতরাং আওয়ামী লীগের দ্বারাই যে পাকিস্তানের সরকার গঠিত হবে- গণতান্ত্রিক ধারা ও রীতি তা-ই বলে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ধারা যা বলে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ধারা তা বলে না। তাই জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হলেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা হল এবং জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হল।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে টালবাহানা শুরু করল। সংসদ অধিবেশনের তারিখ বিনা কারণেই পরিবর্তিত হতে লাগল। বাংলার মানুষের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ইয়াহিয়া সরকার বঙ্গবন্ধুর হাতে কোনোমতেই ক্ষমতা দেবে না। দিনকে দিন বাঙালি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে লাগল। ঠিক এমনই সময়ে উপস্থিত হল ৭ মার্চ। জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে বিবেচনায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু উত্থাপন করলেন ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। বক্তব্যের শেষটা ছিল, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন, এ ভাষণের ভেতর দিয়েই সৃষ্টি হয়েছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

এই ভাষণের উপসংহার প্রমাণ করে, বাঙালির সামনে স্বাধীন জাতি হিসেবে জেগে ওঠার সেটাই ছিল প্রকৃত সময় এবং এর কোনো বিকল্প ছিল না। ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এর সমাধান হিসেবে একটি নির্মম ও বর্বরোচিত পথ বেছে নেয়। তারাও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়েই বাঙালিকে দমন করা হবে।

তাই ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকাসহ সারা দেশে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় হাজারও নিরস্ত্র বাঙালিকে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। এ অবস্থায় আমাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো পথ ছিল না। ১০ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার।

শুরু হয়ে যায় পৃথিবীর অন্যতম সুসজ্জিত-প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লুঙ্গি-গেঞ্জিসংবলিত দৃঢ়প্রত্যয়ী বঙালির মরণযুদ্ধ।

দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই সশস্ত্র সংগ্রাম। কত নির্যাতন, কত নিপীড়ন! এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নেন। ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান, ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারান। রাস্তা-ঘাট-কালভার্ট সব মিলিয়ে একটি বিপর্যস্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা ১ মিনিটে পাকিস্তানিরা ৯৩ হাজার সৈন্যসমেত আত্মসমর্পণ করে। বাংলার মাটিতে সগৌরবে উড়তে থাকে লাল-সবুজ পতাকা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, যে বঞ্চনার বিপরীতে যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে কি? জবাবে বলা যায়, আমাদের আর্থিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি হলেও শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও গণবিমুখতার অবসান আজও ঘটেনি। ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে মাত্র।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়