পুরো অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে পাকিস্তান
jugantor
পুরো অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে পাকিস্তান

  বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক  

২৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২৬ নভেম্বর এই অঞ্চলের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে একটি ঘৃণ্য অক্ষরের দিন। ২০০৮ সালের এই দিনে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা নামের এক চরমপন্থী জঙ্গি গ্রুপ ভারতের মুম্বাই নগরীর কয়েকটি হোটেলে আক্রমণ চালিয়ে ১৭০ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে এবং ৩০৪ জনকে মারাত্মক জখম করে, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ছাড়াও ছিলেন ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং অন্যান্য কয়েক দেশের নাগরিক।

তবে এই ঘটনার উল্লেখযোগ্য দিক হল এই যে, সেই আক্রমণ পরিকল্পনাটির নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী, আইএসআই এবং আইএসআই’র মেজর ইকবাল এই অভিযানের সব পরিকল্পনা তদারকি করেন।

পুরো অভিযানের জন্য অর্থের জোগান দেয় পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই। একই সময়ে মোট দুটি হোটেল- তাজমহল হোটেল, ওবেরি ট্রাইডেন্ট হোটেল এবং আরও চারটি স্থানে যথা- কামা হাসপাতাল, লিওপোন্ড ক্যাফে, চাবাদ হাউস ও সিবাজি টারমিনাসে একই সঙ্গে আক্রমণ চালানো হয়।

এই আক্রমণের পর মুম্বাই পুলিশ তদন্ত করে যে অভিযোগপত্র দাখিল করে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তাতে এ কথা ফুটে আসে যে, ৩৪ জন পাকিস্তানি জঙ্গি এই নৃশংস পঙ্কিলতাপূর্ণ আক্রমণ চালায়। আইএসআই’র পরিকল্পনাক্রমে এবং অর্থায়নে এদের মধ্যে ৯ জন জঙ্গি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ৩৫ জঙ্গি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, যাদের পাকিস্তান আশ্রয় দিচ্ছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। যাদের গ্রেফতার করে বিচারে তোলা হয়েছে, তাদের নাম : আজমল কাসাব, ইউসুফ আনসারি ও সাব্বির আহমেদ শেখ।

এদের মধ্যে আজমল কাসাব ছিল একমাত্র জীবন্ত জঙ্গি, যাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। তার জবানবন্দি থেকে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। যাতে ছিল তার দলের অন্য সদস্যদের নাম, আইএসআই’র ভূমিকা ইত্যাদি। ২০১২ সালের নভেম্বরে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের আপিলের রায় অনুযায়ী তার ফাঁসির নির্দেশ কার্যকর করা হয়।

আনসারি ও সাহাবুদ্দিন নামে যে দু’জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তারা আদালতে বেকসুর খালাস পায়। তদন্তে জানা যায়, ডেভিড কোলমেন হেডলি নামে এক তৈয়বা সদস্য, যে পাকিস্তানি বংশধর মার্কিন নাগরিক, ২০০৬ সাল থেকে মুম্বাই আক্রমণের জন্য আইএসআই’র নির্দেশ এবং পরামর্শক্রমে পুরো এলাকা এবং টার্গেটগুলো জরিপ করার দায়িত্বে ছিল। আমেরিকান আদালত তাকে ৩৫ বছর কারাদণ্ড দেন।

মুম্বাই আক্রমণের পৈশাচিক ঘটনা সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিশ্বনেতারা পাকিস্তানের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেন। জাতিসংঘও এই ঘটনার নিন্দা করে। আক্রমণের ১৫ দিনের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদ হাফিজ এবং তার সহ-অপরাধীদের নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করে। আমেরিকান আদালত তাকে ৩৫ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেন।

এই নির্মম জঙ্গি ঘটনার মূল খলনায়ক ছিল লস্কর-ই-তৈয়বার প্রধান হাফিজ সাঈদ। সে যে পাকিস্তানে জামাই আদরে ১২ বছর ধরে লালিত হচ্ছে, তা সব তথ্য-উপাত্ত থেকেই জানা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানে এক সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে কারাদণ্ড দেয়ার কথা যে নেহাতই চোখধোলাই, তা জানতে বেশিদূর যাওয়ার দরকার হয় না।

সে ব্যক্তি আদালতে আসতেন লিমুজিন গাড়ি দিয়ে, যে গাড়িটি পাকিস্তান সরকার তাকে দিয়েছে। পাকিস্তান সরকার তাকে মুম্বাই আক্রমণের পর অঢেল অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে বলে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

হাফিজের লোকদেখানো সাজা বর্তমানে অবস্থা সামলানোর জন্য মাত্র। অদূর ভবিষ্যতে তাকে ছেড়ে দেয়া হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। হাফিজের ব্যাপারে সব তথ্য-উপাত্ত পাকিস্তানকে দিয়েছে ভারত। শাস্তি সন্ত্রাস অর্থ জোগানোর জন্য, তা-ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) আরোপিত ধূসর তালিকা থেকে পাকিস্তানের নাম কর্তনের পন্থা হিসেবে। আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাভুক্ত করে।

অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একজন জঙ্গিকে সাজা দেয়া হয়নি ষড়যন্ত্র এবং আক্রমণের জন্য। হাফিজকে তথাকথিত গ্রেফতারের পর তাকে জেলের নামে সুসজ্জিত আশ্রয়ে রাখা হয়। আরেক জঙ্গি জাকিউর রহমান লাকভির বিরুদ্ধে দুর্বল অভিযোগনামা দায়ের করার কারণে সে খালাস পায় এবং খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়নি।

ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থার পরবর্তী সভায় পাকিস্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে। যার পরিণতিতে পাকিস্তানের ওপর আর্থিক অবরোধ আরোপিত হতে পারে। সেই ভয়েই পাকিস্তান তড়িঘড়ি করে সাইদ হাফিজের বিচারের নামে প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করে।

তার বিরুদ্ধে মুম্বাই হত্যাকাণ্ড বা তা ঘটানোর ষড়যন্ত্রের কোনো অভিযোগ আনা হয়নি, যা হলে তার সর্বনিম্ন সাজা হতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বরং তার বিরুদ্ধে আনা হয় জঙ্গিদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের, যার জন্য তার সাজা হয় ১১ বছর। এর মধ্যে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) যে তালিকা প্রণয়ন করেছে, এফএটিএফের সন্তুষ্টির জন্য তাতে মুম্বাই আক্রমণকারী কারোরই নাম নেই।

উপরের ঘটনাগুলো ভারতে ঘটলেও এর থেকে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার, সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলেই মুম্বাই ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করা হল- যাতে আমাদের জনগণ এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ধারণা নিতে পারেন।

কয়েক বছর আগে ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের এক কূটনীতিক আমাদের দেশের বেশকিছু জঙ্গি, ধর্মান্ধকে নিয়ে তাদের দূতাবাসের ভেতরেই সভা করলে তা আমাদের দক্ষ গোয়েন্দাদের নজরে এলে সেই কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আমাদের পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ২০০০ সালে পাকিস্তান দূতাবাসের উপরাষ্ট্রদূত ইরফান রাজা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করে কথা বলায় তাকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলেও সে দেশ না ছাড়ার জন্য বহু টালবাহানা করতে থাকে। তবে পরে অবশ্য দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

পাকিস্তান দূতাবাসের পাশ দিয়ে যে সড়কটি রয়েছে, সেটির নামকরণ করা হয়েছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত তা সহ্য করতে না পেরে ২০০৮ সালে খোদ আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নামটি তুলে দেয়ার মতো ধৃষ্টতাপূর্ণ আবদার করতে দ্বিধাবোধ করেনি, যেটি কিনা ১৯৬৪ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ খেলাপ।

পাকিস্তান ১৯৭১ সালে তাদের পরাজয়ের গ্লানি যে ভুলে যেতে পারছে না, এগুলো তারই প্রমাণ। আরও প্রমাণ হল- যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হওয়ার পর পাকিস্তান পার্লামেন্টের ধৃষ্টতাপূর্ণ নিন্দা প্রস্তাব। এছাড়া ২০০০ সালের নির্বাচনের জন্য পাকিস্তান দূতাবাস বিএনপি-জামায়াতকে প্রচুর পয়সা দিয়েছিল, সে কথা আইএসআই’র সে সময়ের প্রধান পাকিস্তানের আদালতে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় যে পাকিস্তানি হাত ছিল, সেটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার।

২১ আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণে যেসব গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়, তা থেকে এটা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সেই আক্রমণেও পাকিস্তান সম্পৃক্ত ছিল। তদুপরি পাকিস্তানের কুখ্যাত জঙ্গি দাউদ ইব্রাহিম যে লন্ডনে তারেক জিয়ার সঙ্গে প্রায়ই বৈঠক করে, তার সমর্থনেও কিন্তু শক্তিশালী তথ্য রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি শাসনামলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য যে ১১ ট্রাক অস্ত্র পাঠানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল, তাতেও পাকিস্তানের হাত ছিল।

কয়েক বছর আগে ঢাকাস্থ হলি আর্টিজান বেকারিতে যে ধরনের জঙ্গি আক্রমণ হয়, তার সঙ্গে মুম্বাই আক্রমণের মিল থাকায় হলি আর্টিজান আক্রমণেও পাকিস্তানি আইএসআই’র সম্পৃক্ততা থাকতে পারে ভাবাটি খুবই যুক্তিসঙ্গত। তাছাড়া পাকিস্তানি আইএসআই যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার ফিরে না যেতে পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের বিভিন্ন অপরাধ কাজে উদ্বুদ্ধ করছে, তা-ও প্রমাণিত।

পাকিস্তান পুরো অঞ্চলটিতে জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সেখানে কর্মরত লস্কর-ই-তৈয়বা এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্প্রতি প্রকাশিত তার বইয়ে অকপটেই প্রকাশ করেছেন পাকিস্তান সরকার লাদেনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল। যার কারণে লাদেনকে হত্যা করা হয় পাকিস্তানকে না জানিয়ে, কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে।

এ কথা প্রমাণ করছে, পাকিস্তান জঙ্গিদের আশ্রয় দেয়া একটি দেশ। পাকিস্তান কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রফতানির ব্যাপারে মার্কিন ডাইরেক্টর অব ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স এই মর্মে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে যে, সন্ত্রাসমূলক মৌলবাদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো ফেলবে না, কিন্তু এর ফলে ওই অঞ্চলের স্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

যখন আফজল কাসাবের ফাঁসি হয়, তখন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব জুরিস্টের অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার জন্য আমি দিল্লি গিয়েছিলাম। আমি কাসাবের ফাঁসির আদেশের পক্ষে সেদিন যে ভাষণ দিয়েছিলাম, তা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলোয় প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানি প্রধান বিচারপতির অনুষ্ঠানে যোগদান না করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। পাকিস্তানি প্রধান বিচারপতির অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত যাননি।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

পুরো অঞ্চলে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে পাকিস্তান

 বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক 
২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২৬ নভেম্বর এই অঞ্চলের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে একটি ঘৃণ্য অক্ষরের দিন। ২০০৮ সালের এই দিনে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা নামের এক চরমপন্থী জঙ্গি গ্রুপ ভারতের মুম্বাই নগরীর কয়েকটি হোটেলে আক্রমণ চালিয়ে ১৭০ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে এবং ৩০৪ জনকে মারাত্মক জখম করে, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ছাড়াও ছিলেন ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং অন্যান্য কয়েক দেশের নাগরিক।

তবে এই ঘটনার উল্লেখযোগ্য দিক হল এই যে, সেই আক্রমণ পরিকল্পনাটির নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী, আইএসআই এবং আইএসআই’র মেজর ইকবাল এই অভিযানের সব পরিকল্পনা তদারকি করেন।

পুরো অভিযানের জন্য অর্থের জোগান দেয় পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআই। একই সময়ে মোট দুটি হোটেল- তাজমহল হোটেল, ওবেরি ট্রাইডেন্ট হোটেল এবং আরও চারটি স্থানে যথা- কামা হাসপাতাল, লিওপোন্ড ক্যাফে, চাবাদ হাউস ও সিবাজি টারমিনাসে একই সঙ্গে আক্রমণ চালানো হয়।

এই আক্রমণের পর মুম্বাই পুলিশ তদন্ত করে যে অভিযোগপত্র দাখিল করে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তাতে এ কথা ফুটে আসে যে, ৩৪ জন পাকিস্তানি জঙ্গি এই নৃশংস পঙ্কিলতাপূর্ণ আক্রমণ চালায়। আইএসআই’র পরিকল্পনাক্রমে এবং অর্থায়নে এদের মধ্যে ৯ জন জঙ্গি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। ৩৫ জঙ্গি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, যাদের পাকিস্তান আশ্রয় দিচ্ছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। যাদের গ্রেফতার করে বিচারে তোলা হয়েছে, তাদের নাম : আজমল কাসাব, ইউসুফ আনসারি ও সাব্বির আহমেদ শেখ।

এদের মধ্যে আজমল কাসাব ছিল একমাত্র জীবন্ত জঙ্গি, যাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল। তার জবানবন্দি থেকে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। যাতে ছিল তার দলের অন্য সদস্যদের নাম, আইএসআই’র ভূমিকা ইত্যাদি। ২০১২ সালের নভেম্বরে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের আপিলের রায় অনুযায়ী তার ফাঁসির নির্দেশ কার্যকর করা হয়।

আনসারি ও সাহাবুদ্দিন নামে যে দু’জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তারা আদালতে বেকসুর খালাস পায়। তদন্তে জানা যায়, ডেভিড কোলমেন হেডলি নামে এক তৈয়বা সদস্য, যে পাকিস্তানি বংশধর মার্কিন নাগরিক, ২০০৬ সাল থেকে মুম্বাই আক্রমণের জন্য আইএসআই’র নির্দেশ এবং পরামর্শক্রমে পুরো এলাকা এবং টার্গেটগুলো জরিপ করার দায়িত্বে ছিল। আমেরিকান আদালত তাকে ৩৫ বছর কারাদণ্ড দেন।

মুম্বাই আক্রমণের পৈশাচিক ঘটনা সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বিশ্বনেতারা পাকিস্তানের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেন। জাতিসংঘও এই ঘটনার নিন্দা করে। আক্রমণের ১৫ দিনের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদ হাফিজ এবং তার সহ-অপরাধীদের নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করে। আমেরিকান আদালত তাকে ৩৫ বছরের জন্য কারাদণ্ড দেন।

এই নির্মম জঙ্গি ঘটনার মূল খলনায়ক ছিল লস্কর-ই-তৈয়বার প্রধান হাফিজ সাঈদ। সে যে পাকিস্তানে জামাই আদরে ১২ বছর ধরে লালিত হচ্ছে, তা সব তথ্য-উপাত্ত থেকেই জানা যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানে এক সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে কারাদণ্ড দেয়ার কথা যে নেহাতই চোখধোলাই, তা জানতে বেশিদূর যাওয়ার দরকার হয় না।

সে ব্যক্তি আদালতে আসতেন লিমুজিন গাড়ি দিয়ে, যে গাড়িটি পাকিস্তান সরকার তাকে দিয়েছে। পাকিস্তান সরকার তাকে মুম্বাই আক্রমণের পর অঢেল অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করেছে বলে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

হাফিজের লোকদেখানো সাজা বর্তমানে অবস্থা সামলানোর জন্য মাত্র। অদূর ভবিষ্যতে তাকে ছেড়ে দেয়া হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। হাফিজের ব্যাপারে সব তথ্য-উপাত্ত পাকিস্তানকে দিয়েছে ভারত। শাস্তি সন্ত্রাস অর্থ জোগানোর জন্য, তা-ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) আরোপিত ধূসর তালিকা থেকে পাকিস্তানের নাম কর্তনের পন্থা হিসেবে। আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাভুক্ত করে।

অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একজন জঙ্গিকে সাজা দেয়া হয়নি ষড়যন্ত্র এবং আক্রমণের জন্য। হাফিজকে তথাকথিত গ্রেফতারের পর তাকে জেলের নামে সুসজ্জিত আশ্রয়ে রাখা হয়। আরেক জঙ্গি জাকিউর রহমান লাকভির বিরুদ্ধে দুর্বল অভিযোগনামা দায়ের করার কারণে সে খালাস পায় এবং খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়নি।

ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থার পরবর্তী সভায় পাকিস্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে। যার পরিণতিতে পাকিস্তানের ওপর আর্থিক অবরোধ আরোপিত হতে পারে। সেই ভয়েই পাকিস্তান তড়িঘড়ি করে সাইদ হাফিজের বিচারের নামে প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করে।

তার বিরুদ্ধে মুম্বাই হত্যাকাণ্ড বা তা ঘটানোর ষড়যন্ত্রের কোনো অভিযোগ আনা হয়নি, যা হলে তার সর্বনিম্ন সাজা হতো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বরং তার বিরুদ্ধে আনা হয় জঙ্গিদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের, যার জন্য তার সাজা হয় ১১ বছর। এর মধ্যে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) যে তালিকা প্রণয়ন করেছে, এফএটিএফের সন্তুষ্টির জন্য তাতে মুম্বাই আক্রমণকারী কারোরই নাম নেই।

উপরের ঘটনাগুলো ভারতে ঘটলেও এর থেকে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার, সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলেই মুম্বাই ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করা হল- যাতে আমাদের জনগণ এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ধারণা নিতে পারেন।

কয়েক বছর আগে ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের এক কূটনীতিক আমাদের দেশের বেশকিছু জঙ্গি, ধর্মান্ধকে নিয়ে তাদের দূতাবাসের ভেতরেই সভা করলে তা আমাদের দক্ষ গোয়েন্দাদের নজরে এলে সেই কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আমাদের পবিত্র ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। ২০০০ সালে পাকিস্তান দূতাবাসের উপরাষ্ট্রদূত ইরফান রাজা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করে কথা বলায় তাকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হলেও সে দেশ না ছাড়ার জন্য বহু টালবাহানা করতে থাকে। তবে পরে অবশ্য দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

পাকিস্তান দূতাবাসের পাশ দিয়ে যে সড়কটি রয়েছে, সেটির নামকরণ করা হয়েছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত তা সহ্য করতে না পেরে ২০০৮ সালে খোদ আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে নামটি তুলে দেয়ার মতো ধৃষ্টতাপূর্ণ আবদার করতে দ্বিধাবোধ করেনি, যেটি কিনা ১৯৬৪ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ খেলাপ।

পাকিস্তান ১৯৭১ সালে তাদের পরাজয়ের গ্লানি যে ভুলে যেতে পারছে না, এগুলো তারই প্রমাণ। আরও প্রমাণ হল- যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হওয়ার পর পাকিস্তান পার্লামেন্টের ধৃষ্টতাপূর্ণ নিন্দা প্রস্তাব। এছাড়া ২০০০ সালের নির্বাচনের জন্য পাকিস্তান দূতাবাস বিএনপি-জামায়াতকে প্রচুর পয়সা দিয়েছিল, সে কথা আইএসআই’র সে সময়ের প্রধান পাকিস্তানের আদালতে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় যে পাকিস্তানি হাত ছিল, সেটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার।

২১ আগস্ট গ্রেনেড আক্রমণে যেসব গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়, তা থেকে এটা সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সেই আক্রমণেও পাকিস্তান সম্পৃক্ত ছিল। তদুপরি পাকিস্তানের কুখ্যাত জঙ্গি দাউদ ইব্রাহিম যে লন্ডনে তারেক জিয়ার সঙ্গে প্রায়ই বৈঠক করে, তার সমর্থনেও কিন্তু শক্তিশালী তথ্য রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি শাসনামলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য যে ১১ ট্রাক অস্ত্র পাঠানোর ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছিল, তাতেও পাকিস্তানের হাত ছিল।

কয়েক বছর আগে ঢাকাস্থ হলি আর্টিজান বেকারিতে যে ধরনের জঙ্গি আক্রমণ হয়, তার সঙ্গে মুম্বাই আক্রমণের মিল থাকায় হলি আর্টিজান আক্রমণেও পাকিস্তানি আইএসআই’র সম্পৃক্ততা থাকতে পারে ভাবাটি খুবই যুক্তিসঙ্গত। তাছাড়া পাকিস্তানি আইএসআই যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মিয়ানমার ফিরে না যেতে পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের বিভিন্ন অপরাধ কাজে উদ্বুদ্ধ করছে, তা-ও প্রমাণিত।

পাকিস্তান পুরো অঞ্চলটিতে জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সেখানে কর্মরত লস্কর-ই-তৈয়বা এবং অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনকে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সম্প্রতি প্রকাশিত তার বইয়ে অকপটেই প্রকাশ করেছেন পাকিস্তান সরকার লাদেনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল। যার কারণে লাদেনকে হত্যা করা হয় পাকিস্তানকে না জানিয়ে, কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে।

এ কথা প্রমাণ করছে, পাকিস্তান জঙ্গিদের আশ্রয় দেয়া একটি দেশ। পাকিস্তান কর্তৃক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রফতানির ব্যাপারে মার্কিন ডাইরেক্টর অব ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স এই মর্মে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে যে, সন্ত্রাসমূলক মৌলবাদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো ফেলবে না, কিন্তু এর ফলে ওই অঞ্চলের স্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

যখন আফজল কাসাবের ফাঁসি হয়, তখন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব জুরিস্টের অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার জন্য আমি দিল্লি গিয়েছিলাম। আমি কাসাবের ফাঁসির আদেশের পক্ষে সেদিন যে ভাষণ দিয়েছিলাম, তা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলোয় প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। একই সঙ্গে পাকিস্তানি প্রধান বিচারপতির অনুষ্ঠানে যোগদান না করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। পাকিস্তানি প্রধান বিচারপতির অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত যাননি।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি