এমসিসি’র এসিড টেস্ট ও বাংলাদেশ
jugantor
এমসিসি’র এসিড টেস্ট ও বাংলাদেশ

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

৩০ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো ব্যক্তির অনেক টাকা থাকলেও সে টাকা খরচ না করে জমিয়ে রাখতে পারে। অতি ধনী মানুষও খুব সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারে। ওয়ারেন বাফেট আমাদের সামনে এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কি ব্যাপারটা তাই? কোনো রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিকভাবে দারুণ উন্নতি করতে থাকে, তাহলে কি তার জনগণের জীবনাচরণ সেই উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে গরিবি হালেই থাকতে পারে?

এটা একটা স্পষ্ট উত্তর আছে। ব্যক্তি আর রাষ্ট্র একইভাবে চলে না। রাষ্ট্রের সামগ্রিক সম্পদ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে তার একটা স্পষ্ট ছাপ পড়ে সেই রাষ্ট্রের জনগণের জীবনাচরণে। কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ থাকলেও তাদের প্রভাব সামষ্টিক ক্ষেত্রে পড়ে না। জনগণের আয় যেহেতু বাড়ে, তাই জনগণের বাড়ে ভোগও। জনগণের ভোগ বাড়লে সেই ভোগ্যপণ্যের জোগান দেয়ার জন্য কল-কারখানা বাড়ে। আবার কল-কারখানার জন্য প্রয়োজন মেশিনপত্র, কাঁচামালসহ আরও অনেক কিছু; সেগুলোও সব বাড়তে থাকে। তাই একটা দেশের উৎপাদন বা সম্পদ কতটা বাড়ছে সেটার সঠিক হিসাব না জানলেও, সেই দেশের অন্য অনেক নির্দেশক আমাদের সেই আয় বা সম্পদ বৃদ্ধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।

ভারতের বিজেপি সরকারের এক সময়কার প্রধান অর্থ উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান? গত বছরের জুন মাসে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি পেপারে দেখিয়েছেন, ভারতের সরকার তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি অন্তত ২.৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেখায়। তার মতে, ভারত সরকার সেই সময় যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ দাবি করছিল তখন প্রকৃত জিডিপি ছিল সর্বোচ্চ ৪.৫ শতাংশ। তিনি রাষ্ট্রের কিছু সূচক বিশ্লেষণ করে এ দাবিটি করেছিলেন।

সুব্রামানিয়ান যুক্তি দেন, কোনো দেশের সম্পদ এবং উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বেশকিছু বিষয়ে এর হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে- বিদ্যুৎ এবং তরল জ্বালানি; যেমন, পেট্রল-ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ, রেলওয়েতে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ, শিল্পোৎপাদনের পরিমাণ, বিভিন্ন যানবাহন বিশেষত, পণ্য পরিবহনে নিযুক্ত যানবাহন বিক্রি, বিমানের যাত্রী পরিবহনের সংখ্যা, রাষ্ট্রে বিদেশি পর্যটকের আগমনের সংখ্যা, সিমেন্ট স্টিলের মতো নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পরিমাণ, বেসরকারি খাতে বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি, আমদানি-রফতানির পরিমাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি। এগুলো একেকটা লিটমাস পেপার, যেটা দিয়ে পরিমাপ করা যায় জিডিপির প্রবৃদ্ধি আসলেই হয়েছে কিনা, আর হলে সেটা কতটা। সুব্রামানিয়ানের এ তত্ত্ব নিশ্চিতভাবেই কাজে লাগতে পারে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির দাবির ক্ষেত্রেও। কিন্তু না, আমার এ লেখায় আমি সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। এতক্ষণ যা বললাম সেটা আসলে ভিন্ন একটা আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য বলেছি।

একটা ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে কেমন করছে? কিংবা এ দেশের যে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে সেটা আদতে কি এ রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপকারে আসছে, নাকি সেটা হাতেগোনা কিছু মানুষের কাছে পুঞ্জীভূত হচ্ছে? জানি, এসব ক্ষেত্রে সরকারি দলের নানারকম বক্তব্য আছে। সেই বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত কিন্তু আমাদের হাতে আছে। সাম্প্রতিক একটা বিষয় দিয়ে আবার সেটা দেখা যাক।

কিছুদিন আগে ‘ফের রেড জোনে বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি চমৎকার রিপোর্ট করেছে যুগান্তর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশনের (এমসিসি) মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাবনতি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অধিকারসহ ১৩টি সূচকে ফের রেড জোনে (খারাপ অবস্থান) নাম উঠেছে বাংলাদেশের। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্কোর কার্ডে রেড জোনে থাকা বাংলাদেশের সূচকগুলো হচ্ছে- ১. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ২. জমির অধিকার ও প্রাপ্যতা ৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা ৪. বাণিজ্য নীতিমালা ৫. তথ্যের স্বাধীনতা ৬. অর্থনীতিতে নারী ও পুরুষের সমতা ৭. স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ৮. প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি ব্যয় ৯. প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা সূচক ১০. রাজনৈতিক অধিকার ১১. বেসামরিক লোকের স্বাধীনতা ১২. মেয়েশিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার হার এবং? এ বছর নতুন করে গ্রিন থেকে রেডে উঠেছে রাজস্ব নীতি। অর্থাৎ ২০টি সূচকের মধ্যে রেড জোনে আছে ১৩টি। গত বছর ছিল ১২টি আর তার আগের বছর ছিল ১১টি। অর্থাৎ আমরা ক্রমাগত খারাপ অবস্থায় যাচ্ছি। এ বছরে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যে সাত সূচক সবুজ তালিকায় আছে, সেগুলো হচ্ছে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টিকা দেয়ার হার, শিশু স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারের কার্যকারিতা, ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ এবং ব্যবসা শুরুর সূচক।

বাংলাদেশ এ সূচকগুলোতে উন্নতি করতে মরিয়া; কারণ এর সঙ্গে নগদ প্রাপ্তিযোগ আছে। এমসিএফের আওতায় স্টেইট ডিপার্টমেন্ট দুটি কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচিত দেশগুলোকে সহায়তা করে থাকে। এর একটি হচ্ছে থ্রেসহোল্ড কান্ট্রি বা কম অঙ্কের সহায়তার দেশ। এ প্রোগ্রামের আওতায় সাধারণত ১০ থেকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুদান প্রদান করা হয়ে থাকে। অন্যটি হচ্ছে কমপ্যাক্ট অর্থাৎ বড় অঙ্কের সহায়তা। এর আওতায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অনুদান দেয়া হয়ে থাকে। এ ফান্ডের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যুক্ত করতে প্রতি বছর বৈঠক করে মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশন (এমসিসি)।

স্কোর কার্ডের উন্নতির ভিত্তিতে এ ফান্ডে যুক্ত হয় বিভিন্ন দেশের নাম। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে দীর্ঘ কয়েক বছর চেষ্টা করেও এ ফান্ডে যুক্ত হতে পারছে না বাংলাদেশ। এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে- আমাদের প্রতিবেশী নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা নির্দেশকগুলোতে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করে এ ফান্ডের অর্থ পেয়েছে।

কৌতূহলবশত এমসিসির ওয়েবসাইটে ঢুকেছিলাম আলোচ্য স্কোর কার্ডের বিবেচনায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর কী অবস্থা সেটা দেখতে। আবারও স্মরণ করে নেই, মোট ২০টি নির্দেশক আছে। আর বাংলাদেশ রেড জোনে আছে ১৩টি ক্ষেত্রে। রেড জোনে থাকার সংখ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান এমন- ভারত ৮টি, নেপাল ৫টি, শ্রীলংকা ৮টি। আমাদের দেশে নানা কারণে সমালোচিত দেশ পাকিস্তানে মোট ১০টি ক্ষেত্রে রেড? জোনে আছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে, বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর বহিঃশত্রুর আক্রমণে বিপর্যস্ত আফগানিস্তান রেড জোনে আছে মোট ১২টি ক্ষেত্রে; অর্থাৎ আমাদের চেয়ে একটি কম। সাম্প্রতিককালে ট্রোল প্রিয় নেটিজেনরা বাংলাদেশকে নিয়ে বিদ্রুপের ক্ষেত্রে উগান্ডার নাম ব্যবহার করে। যারা এটি করেন তাদের জন্য মজার তথ্য হচ্ছে উগান্ডা রেড জোনে আছে ১০টি ক্ষেত্রে; আমাদের চেয়ে ৩টি কম।

আমরা যদি আবার ওপরে লিখিত নির্দেশকগুলো পড়ে আসি, আবার যদি ভালো করে খেয়াল করি কোন নির্দেশকগুলোতে আমরা গ্রিন আর কোনগুলোতে আমরা আছি রেড জোনে, তাহলে আমাদের এ সংশয় কোনোভাবেই থাকবে না যে, আমাদের রেড জোনে থাকা বিষয়গুলো গ্রিন জোনে থাকা বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রেড জোনে থাকা কোন নির্দেশক আমাদের বলে এ রাষ্ট্রের দুর্নীতির প্রকোপ আর সুশাসনের অভাবের কথা, কোনোটি বলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেশিরভাগ মানুষের কাছে না পৌঁছার কথা, কোনটি বা বলে কাগজে-কলমে সমাজতন্ত্রের কথা সংবিধানে লেখে রাখলেও ক্ষমতাসীন সরকার এমনকি মোটামুটি একটা কল্যাণ অর্থনীতির দিকেও হাঁটতে শুরু করেনি, কোনো নির্দেশক আবার প্রমাণ করে গণতন্ত্রের অত্যন্ত বেসিক কিছু বিষয় চরমভাবে অনুপস্থিত এ রাষ্ট্রে।

আমরা যখন আমাদের দেশের গণতন্ত্র এবং এর সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিয়ে কথা বলব, আমরা যখন দেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলব, তখন অবশ্যই আমরা নিজেদের অবস্থানকে তুলনা করতে চাইব আমাদের কাছাকাছি অবস্থান করা এবং আমাদের সঙ্গে তুলনীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে। অতীতে বহু ক্ষেত্রে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসেবে আমাদের অবস্থান তুলনীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনায় আমাদের অবস্থান খারাপ ছিল। মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশনের (এমসিসি) মূল্যায়ন একই কথা বলছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

এমসিসি’র এসিড টেস্ট ও বাংলাদেশ

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
৩০ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো ব্যক্তির অনেক টাকা থাকলেও সে টাকা খরচ না করে জমিয়ে রাখতে পারে। অতি ধনী মানুষও খুব সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারে। ওয়ারেন বাফেট আমাদের সামনে এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কি ব্যাপারটা তাই? কোনো রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিকভাবে দারুণ উন্নতি করতে থাকে, তাহলে কি তার জনগণের জীবনাচরণ সেই উন্নতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে গরিবি হালেই থাকতে পারে?

এটা একটা স্পষ্ট উত্তর আছে। ব্যক্তি আর রাষ্ট্র একইভাবে চলে না। রাষ্ট্রের সামগ্রিক সম্পদ যদি বাড়তে থাকে, তাহলে তার একটা স্পষ্ট ছাপ পড়ে সেই রাষ্ট্রের জনগণের জীবনাচরণে। কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ থাকলেও তাদের প্রভাব সামষ্টিক ক্ষেত্রে পড়ে না। জনগণের আয় যেহেতু বাড়ে, তাই জনগণের বাড়ে ভোগও। জনগণের ভোগ বাড়লে সেই ভোগ্যপণ্যের জোগান দেয়ার জন্য কল-কারখানা বাড়ে। আবার কল-কারখানার জন্য প্রয়োজন মেশিনপত্র, কাঁচামালসহ আরও অনেক কিছু; সেগুলোও সব বাড়তে থাকে। তাই একটা দেশের উৎপাদন বা সম্পদ কতটা বাড়ছে সেটার সঠিক হিসাব না জানলেও, সেই দেশের অন্য অনেক নির্দেশক আমাদের সেই আয় বা সম্পদ বৃদ্ধি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।

ভারতের বিজেপি সরকারের এক সময়কার প্রধান অর্থ উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান? গত বছরের জুন মাসে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি পেপারে দেখিয়েছেন, ভারতের সরকার তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি অন্তত ২.৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেখায়। তার মতে, ভারত সরকার সেই সময় যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ দাবি করছিল তখন প্রকৃত জিডিপি ছিল সর্বোচ্চ ৪.৫ শতাংশ। তিনি রাষ্ট্রের কিছু সূচক বিশ্লেষণ করে এ দাবিটি করেছিলেন।

সুব্রামানিয়ান যুক্তি দেন, কোনো দেশের সম্পদ এবং উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বেশকিছু বিষয়ে এর হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে- বিদ্যুৎ এবং তরল জ্বালানি; যেমন, পেট্রল-ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ, রেলওয়েতে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ, শিল্পোৎপাদনের পরিমাণ, বিভিন্ন যানবাহন বিশেষত, পণ্য পরিবহনে নিযুক্ত যানবাহন বিক্রি, বিমানের যাত্রী পরিবহনের সংখ্যা, রাষ্ট্রে বিদেশি পর্যটকের আগমনের সংখ্যা, সিমেন্ট স্টিলের মতো নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পরিমাণ, বেসরকারি খাতে বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি, আমদানি-রফতানির পরিমাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি। এগুলো একেকটা লিটমাস পেপার, যেটা দিয়ে পরিমাপ করা যায় জিডিপির প্রবৃদ্ধি আসলেই হয়েছে কিনা, আর হলে সেটা কতটা। সুব্রামানিয়ানের এ তত্ত্ব নিশ্চিতভাবেই কাজে লাগতে পারে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির দাবির ক্ষেত্রেও। কিন্তু না, আমার এ লেখায় আমি সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। এতক্ষণ যা বললাম সেটা আসলে ভিন্ন একটা আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য বলেছি।

একটা ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে কেমন করছে? কিংবা এ দেশের যে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে সেটা আদতে কি এ রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপকারে আসছে, নাকি সেটা হাতেগোনা কিছু মানুষের কাছে পুঞ্জীভূত হচ্ছে? জানি, এসব ক্ষেত্রে সরকারি দলের নানারকম বক্তব্য আছে। সেই বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত কিন্তু আমাদের হাতে আছে। সাম্প্রতিক একটা বিষয় দিয়ে আবার সেটা দেখা যাক।

কিছুদিন আগে ‘ফের রেড জোনে বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি চমৎকার রিপোর্ট করেছে যুগান্তর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশনের (এমসিসি) মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থানের ক্রমাবনতি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অধিকারসহ ১৩টি সূচকে ফের রেড জোনে (খারাপ অবস্থান) নাম উঠেছে বাংলাদেশের। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্কোর কার্ডে রেড জোনে থাকা বাংলাদেশের সূচকগুলো হচ্ছে- ১. দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ২. জমির অধিকার ও প্রাপ্যতা ৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা ৪. বাণিজ্য নীতিমালা ৫. তথ্যের স্বাধীনতা ৬. অর্থনীতিতে নারী ও পুরুষের সমতা ৭. স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ৮. প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি ব্যয় ৯. প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা সূচক ১০. রাজনৈতিক অধিকার ১১. বেসামরিক লোকের স্বাধীনতা ১২. মেয়েশিশুর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার হার এবং? এ বছর নতুন করে গ্রিন থেকে রেডে উঠেছে রাজস্ব নীতি। অর্থাৎ ২০টি সূচকের মধ্যে রেড জোনে আছে ১৩টি। গত বছর ছিল ১২টি আর তার আগের বছর ছিল ১১টি। অর্থাৎ আমরা ক্রমাগত খারাপ অবস্থায় যাচ্ছি। এ বছরে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যে সাত সূচক সবুজ তালিকায় আছে, সেগুলো হচ্ছে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টিকা দেয়ার হার, শিশু স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সরকারের কার্যকারিতা, ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ এবং ব্যবসা শুরুর সূচক।

বাংলাদেশ এ সূচকগুলোতে উন্নতি করতে মরিয়া; কারণ এর সঙ্গে নগদ প্রাপ্তিযোগ আছে। এমসিএফের আওতায় স্টেইট ডিপার্টমেন্ট দুটি কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচিত দেশগুলোকে সহায়তা করে থাকে। এর একটি হচ্ছে থ্রেসহোল্ড কান্ট্রি বা কম অঙ্কের সহায়তার দেশ। এ প্রোগ্রামের আওতায় সাধারণত ১০ থেকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুদান প্রদান করা হয়ে থাকে। অন্যটি হচ্ছে কমপ্যাক্ট অর্থাৎ বড় অঙ্কের সহায়তা। এর আওতায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অনুদান দেয়া হয়ে থাকে। এ ফান্ডের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যুক্ত করতে প্রতি বছর বৈঠক করে মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশন (এমসিসি)।

স্কোর কার্ডের উন্নতির ভিত্তিতে এ ফান্ডে যুক্ত হয় বিভিন্ন দেশের নাম। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে দীর্ঘ কয়েক বছর চেষ্টা করেও এ ফান্ডে যুক্ত হতে পারছে না বাংলাদেশ। এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে- আমাদের প্রতিবেশী নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা নির্দেশকগুলোতে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করে এ ফান্ডের অর্থ পেয়েছে।

কৌতূহলবশত এমসিসির ওয়েবসাইটে ঢুকেছিলাম আলোচ্য স্কোর কার্ডের বিবেচনায় এ অঞ্চলের দেশগুলোর কী অবস্থা সেটা দেখতে। আবারও স্মরণ করে নেই, মোট ২০টি নির্দেশক আছে। আর বাংলাদেশ রেড জোনে আছে ১৩টি ক্ষেত্রে। রেড জোনে থাকার সংখ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান এমন- ভারত ৮টি, নেপাল ৫টি, শ্রীলংকা ৮টি। আমাদের দেশে নানা কারণে সমালোচিত দেশ পাকিস্তানে মোট ১০টি ক্ষেত্রে রেড? জোনে আছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে, বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর বহিঃশত্রুর আক্রমণে বিপর্যস্ত আফগানিস্তান রেড জোনে আছে মোট ১২টি ক্ষেত্রে; অর্থাৎ আমাদের চেয়ে একটি কম। সাম্প্রতিককালে ট্রোল প্রিয় নেটিজেনরা বাংলাদেশকে নিয়ে বিদ্রুপের ক্ষেত্রে উগান্ডার নাম ব্যবহার করে। যারা এটি করেন তাদের জন্য মজার তথ্য হচ্ছে উগান্ডা রেড জোনে আছে ১০টি ক্ষেত্রে; আমাদের চেয়ে ৩টি কম।

আমরা যদি আবার ওপরে লিখিত নির্দেশকগুলো পড়ে আসি, আবার যদি ভালো করে খেয়াল করি কোন নির্দেশকগুলোতে আমরা গ্রিন আর কোনগুলোতে আমরা আছি রেড জোনে, তাহলে আমাদের এ সংশয় কোনোভাবেই থাকবে না যে, আমাদের রেড জোনে থাকা বিষয়গুলো গ্রিন জোনে থাকা বিষয়গুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রেড জোনে থাকা কোন নির্দেশক আমাদের বলে এ রাষ্ট্রের দুর্নীতির প্রকোপ আর সুশাসনের অভাবের কথা, কোনোটি বলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেশিরভাগ মানুষের কাছে না পৌঁছার কথা, কোনটি বা বলে কাগজে-কলমে সমাজতন্ত্রের কথা সংবিধানে লেখে রাখলেও ক্ষমতাসীন সরকার এমনকি মোটামুটি একটা কল্যাণ অর্থনীতির দিকেও হাঁটতে শুরু করেনি, কোনো নির্দেশক আবার প্রমাণ করে গণতন্ত্রের অত্যন্ত বেসিক কিছু বিষয় চরমভাবে অনুপস্থিত এ রাষ্ট্রে।

আমরা যখন আমাদের দেশের গণতন্ত্র এবং এর সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত বাকস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিয়ে কথা বলব, আমরা যখন দেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলব, তখন অবশ্যই আমরা নিজেদের অবস্থানকে তুলনা করতে চাইব আমাদের কাছাকাছি অবস্থান করা এবং আমাদের সঙ্গে তুলনীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্গে। অতীতে বহু ক্ষেত্রে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসেবে আমাদের অবস্থান তুলনীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনায় আমাদের অবস্থান খারাপ ছিল। মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশনের (এমসিসি) মূল্যায়ন একই কথা বলছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট