জনবান্ধব প্রশাসনই সর্বদা শক্তিশালী
jugantor
জনবান্ধব প্রশাসনই সর্বদা শক্তিশালী

  মো. ফিরোজ মিয়া  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘সবসময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা সরকারি কর্মচারীর কর্তব্য’। বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং সেবার মানসিকতাসম্পন্ন জনসেবাধর্মী জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সংবিধানে এ মূলমন্ত্র সংযোজন করা হয়েছে।

সংবিধানের এ মূলমন্ত্র অনুসরণ করলে প্রশাসনের জনবান্ধব না হয়ে কর্তৃত্ববাদী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংবিধানের উক্ত মূলমন্ত্রের পরিপন্থীভাবে অনেক সময়ই প্রশাসনকে কর্তৃত্ববাদী হতে দেখা গেছে।

প্রশাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন ভাষা থেকে, যার অর্থ সহায়তা, সাহায্য, সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি। এক কথায় বলতে গেলে প্রশাসন হচ্ছে সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রনিযুক্ত সহায়তাকারী। প্রশাসন রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত হওয়ায় প্রশাসনের কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণ বা জনসেবামূলক কার্যাদিতে সরকারকে সহায়তা করা।

প্রশাসনের দায়িত্ব হল টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা, সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা, অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, ইত্যাদি। সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব প্রশাসনের নয়, জনগণের। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় সময়ই দেখা যায়, প্রশাসন জনসেবার চেয়ে সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়েই রাখার প্রতি অধিক বেশি মনোযোগী।

কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতীতেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে সব কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনই জনগণের জন্য ক্ষতিকর নয়। অনেক সময় কল্যাণকর রাষ্ট্রে বা জনবান্ধব সরকার ব্যবস্থায়ও কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের সৃষ্টি হয়। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন ব্যবস্থার সহায়তায় অনেক অনুন্নত দেশ উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।

তবে এসব দেশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের সৃষ্টি করেনি, করেছে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের। এজন্য গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি স্তরে অনুগত এবং অধিকতর যোগ্য, দক্ষ, সেবার মানসিকতাপূর্ণ সৎব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেছে। ফলে গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকারের জনবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে এসব প্রতিষ্ঠান বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে দেশকে নিয়ে গেছে উন্নয়নের শিখরে।

সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক কিংবা অগণতান্ত্রিক বা কৃত্রিম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের আবির্ভাব ঘটতে পারে। আবার কোনো গণতান্ত্রিক সরকারও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের প্রবর্তন করে থাকে।

অনেক সময় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে অধিকতর সুসংহত করা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সীমিত রাখা, বিরোধী মতামতকে দমন করা, মুক্তচিন্তার সুযোগ সীমিত রাখা, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির অবাধ প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা, শ্যাম নির্বাচন করা ইত্যাদি উদ্দেশ্যেই কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন সৃষ্টি করা হয়।

এছাড়াও দেখা যায়, জনবিচ্ছিন্ন কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে প্রশাসনকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে প্রথমেই তার একান্ত অনুগত এবং অপেক্ষাকৃত অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা বিনষ্ট করে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়, যারা কখনই যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে নিয়োগের দাবিদার নয়। ফলে ওইসব পদে নিয়োগ পাওয়াকে তারা কর্তৃত্ববাদী সরকারের দয়া বা অনুকম্পা মনে করে এবং নিজেদের রাষ্ট্রের কর্মচারী মনে না করে সরকারের কর্মচারী মনে করে।

কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থায় অথবা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থায়ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলা হয় কর্তৃত্ববাদী স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কর্তৃত্ববাদী সরকার তার অনুগত দক্ষ, যোগ্য এবং আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ না দিয়ে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একান্ত অন্ধ, অনুগত এবং অপেক্ষাকৃত অদক্ষ, অযোগ্য এবং আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে থাকে।

কারণ এ প্রকৃতির ব্যক্তিরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে জনসেবামূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে না। তারা তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ অব্যাহত রাখার জন্য সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা প্রয়োগ করে।

জনবান্ধব প্রশাসন সর্বদাই শক্তিশালী প্রশাসন, যারা ব্যর্থতার দায় ও ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের চেষ্টা করে। অপরদিকে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন চিন্তা ও জ্ঞানের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রশাসন। তারা তাদের চিন্তা, জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার ঘাটতি আড়াল করার জন্য কর্তৃত্ববাদী রূপ ধারণ করে। তারা জনকল্যাণমূলক কাজ থেকে মুখ ঘুরিয়ে সরকারের এবং নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।

এ প্রশাসন কখনও সুপরামর্শ গ্রহণ করে না, তারা নিজেদের মতামতকেই সর্বোচ্চ সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করে। তারা অন্যের ভালো মতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল নয়। জনগণের সেবার মনোভাব তাদের থাকে না। তারা জনগণের সেবক না হয়ে জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এ ক্ষমতা প্রয়োগ অনেক সময়ই সুশাসন ও আইনের শাসনের পরিপন্থী হয়ে থাকে। কারণ কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা থাকে কেবল সরকারের প্রতি, জনগণের প্রতি নয়।

এছাড়া কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন কোনো যুক্তি শুনতে চায় না, কোনো যুক্তি মানতে চায় না, গঠনমূলক সমালোচনাও সহ্য করতে পারে না। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনে টিম ওয়ার্কের সুযোগ থাকে না। ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় প্রশাসন পরিচালিত হয়। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন নিজেদের সবজান্তা মনে করে, তারা অধীনস্থদের সঙ্গে পরামর্শ করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না, তারা কেবল নিজেদের সিদ্ধান্ত অধীনস্থদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

অগণতান্ত্রিক বা কৃত্রিম গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় জনসমর্থন না থাকার কারণে সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের সহায়তার প্রয়োজন হয়। এছাড়া কর্তৃত্ববাদী বা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক সরকারও ক্ষমতায় টিকে থাকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করে এবং আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের লক্ষ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনকে ব্যবহার করে।

কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন সরকারের আনুকূল্যে সবসময়ই আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। অনেক সময় তারা নিজেদের সিদ্ধান্তকেই আইন হিসেবে প্রয়োগ করে এবং স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে আইনের শাসনের অবনতি ঘটায়। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন ব্যবস্থায় শুদ্ধাচারও বহাল থাকে না। এজন্য কোনো দেশে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন কোনোক্রমেই কাম্য নয়। সংবিধানের মূলমন্ত্র ধারণ করে, এমন জনপ্রশাসন গড়ে উঠুক, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

মো. ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইন সংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক

জনবান্ধব প্রশাসনই সর্বদা শক্তিশালী

 মো. ফিরোজ মিয়া 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘সবসময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা সরকারি কর্মচারীর কর্তব্য’। বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং সেবার মানসিকতাসম্পন্ন জনসেবাধর্মী জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সংবিধানে এ মূলমন্ত্র সংযোজন করা হয়েছে।

সংবিধানের এ মূলমন্ত্র অনুসরণ করলে প্রশাসনের জনবান্ধব না হয়ে কর্তৃত্ববাদী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংবিধানের উক্ত মূলমন্ত্রের পরিপন্থীভাবে অনেক সময়ই প্রশাসনকে কর্তৃত্ববাদী হতে দেখা গেছে।

প্রশাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন ভাষা থেকে, যার অর্থ সহায়তা, সাহায্য, সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি। এক কথায় বলতে গেলে প্রশাসন হচ্ছে সরকার পরিচালনায় রাষ্ট্রনিযুক্ত সহায়তাকারী। প্রশাসন রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত হওয়ায় প্রশাসনের কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণ বা জনসেবামূলক কার্যাদিতে সরকারকে সহায়তা করা।

প্রশাসনের দায়িত্ব হল টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করা, সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা, অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, ইত্যাদি। সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব প্রশাসনের নয়, জনগণের। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রায় সময়ই দেখা যায়, প্রশাসন জনসেবার চেয়ে সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়েই রাখার প্রতি অধিক বেশি মনোযোগী।

কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতীতেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে সব কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনই জনগণের জন্য ক্ষতিকর নয়। অনেক সময় কল্যাণকর রাষ্ট্রে বা জনবান্ধব সরকার ব্যবস্থায়ও কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের সৃষ্টি হয়। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন ব্যবস্থার সহায়তায় অনেক অনুন্নত দেশ উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।

তবে এসব দেশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের সৃষ্টি করেনি, করেছে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের। এজন্য গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি স্তরে অনুগত এবং অধিকতর যোগ্য, দক্ষ, সেবার মানসিকতাপূর্ণ সৎব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেছে। ফলে গণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকারের জনবান্ধব নীতি বাস্তবায়নে এসব প্রতিষ্ঠান বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে দেশকে নিয়ে গেছে উন্নয়নের শিখরে।

সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক কিংবা অগণতান্ত্রিক বা কৃত্রিম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের আবির্ভাব ঘটতে পারে। আবার কোনো গণতান্ত্রিক সরকারও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের প্রবর্তন করে থাকে।

অনেক সময় ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে অধিকতর সুসংহত করা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সীমিত রাখা, বিরোধী মতামতকে দমন করা, মুক্তচিন্তার সুযোগ সীমিত রাখা, বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির অবাধ প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা, শ্যাম নির্বাচন করা ইত্যাদি উদ্দেশ্যেই কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন সৃষ্টি করা হয়।

এছাড়াও দেখা যায়, জনবিচ্ছিন্ন কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে প্রশাসনকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে প্রথমেই তার একান্ত অনুগত এবং অপেক্ষাকৃত অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা বিনষ্ট করে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়, যারা কখনই যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে নিয়োগের দাবিদার নয়। ফলে ওইসব পদে নিয়োগ পাওয়াকে তারা কর্তৃত্ববাদী সরকারের দয়া বা অনুকম্পা মনে করে এবং নিজেদের রাষ্ট্রের কর্মচারী মনে না করে সরকারের কর্মচারী মনে করে।

কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থায় অথবা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থায়ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তোলা হয় কর্তৃত্ববাদী স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কর্তৃত্ববাদী সরকার তার অনুগত দক্ষ, যোগ্য এবং আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ না দিয়ে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একান্ত অন্ধ, অনুগত এবং অপেক্ষাকৃত অদক্ষ, অযোগ্য এবং আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে থাকে।

কারণ এ প্রকৃতির ব্যক্তিরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে জনসেবামূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে না। তারা তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ অব্যাহত রাখার জন্য সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা প্রয়োগ করে।

জনবান্ধব প্রশাসন সর্বদাই শক্তিশালী প্রশাসন, যারা ব্যর্থতার দায় ও ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের চেষ্টা করে। অপরদিকে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন চিন্তা ও জ্ঞানের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রশাসন। তারা তাদের চিন্তা, জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার ঘাটতি আড়াল করার জন্য কর্তৃত্ববাদী রূপ ধারণ করে। তারা জনকল্যাণমূলক কাজ থেকে মুখ ঘুরিয়ে সরকারের এবং নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।

এ প্রশাসন কখনও সুপরামর্শ গ্রহণ করে না, তারা নিজেদের মতামতকেই সর্বোচ্চ সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করে। তারা অন্যের ভালো মতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল নয়। জনগণের সেবার মনোভাব তাদের থাকে না। তারা জনগণের সেবক না হয়ে জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এ ক্ষমতা প্রয়োগ অনেক সময়ই সুশাসন ও আইনের শাসনের পরিপন্থী হয়ে থাকে। কারণ কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা থাকে কেবল সরকারের প্রতি, জনগণের প্রতি নয়।

এছাড়া কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন কোনো যুক্তি শুনতে চায় না, কোনো যুক্তি মানতে চায় না, গঠনমূলক সমালোচনাও সহ্য করতে পারে না। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনে টিম ওয়ার্কের সুযোগ থাকে না। ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় প্রশাসন পরিচালিত হয়। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন নিজেদের সবজান্তা মনে করে, তারা অধীনস্থদের সঙ্গে পরামর্শ করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না, তারা কেবল নিজেদের সিদ্ধান্ত অধীনস্থদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

অগণতান্ত্রিক বা কৃত্রিম গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় জনসমর্থন না থাকার কারণে সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনের সহায়তার প্রয়োজন হয়। এছাড়া কর্তৃত্ববাদী বা একক ক্ষমতাকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক সরকারও ক্ষমতায় টিকে থাকার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করে এবং আইনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের লক্ষ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসনকে ব্যবহার করে।

কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন সরকারের আনুকূল্যে সবসময়ই আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। অনেক সময় তারা নিজেদের সিদ্ধান্তকেই আইন হিসেবে প্রয়োগ করে এবং স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে আইনের শাসনের অবনতি ঘটায়। কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন ব্যবস্থায় শুদ্ধাচারও বহাল থাকে না। এজন্য কোনো দেশে কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন কোনোক্রমেই কাম্য নয়। সংবিধানের মূলমন্ত্র ধারণ করে, এমন জনপ্রশাসন গড়ে উঠুক, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

মো. ফিরোজ মিয়া : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব, চাকরি ও আইন সংক্রান্ত গ্রন্থের লেখক