গ্রামে কেন স্কুল বন্ধ?
jugantor
গ্রামে কেন স্কুল বন্ধ?

  ড. মো. ফখরুল ইসলাম  

০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্কুল

১৭ মাস পর হঠাৎ সেদিন গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হল। আপনজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সঙ্গে গ্রামের অনেক শিশু-কিশোর-যুবক শিক্ষার্থীর সঙ্গেও দেখা হল। সেই সুবাদে ওদের পড়াশোনা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নানা কথা জানতে পারলাম। কৌতূহলবশত আমাদের গ্রামের বর্তমান শিক্ষা পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রামের অবস্থা কেমন তা সেলফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কিছুটা জানার চেষ্টা করলাম।

গ্রামের শিশুরা কেউ গৃহবন্দি নয়, শুধু শুধু ওদের স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনাকালে ওদের ওপর কোনোরকম বিধিনিষেধও কার্যকর নেই। সারাদিন ঘরের বাইরে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ মাছ ধরছে, কেউ কৃষিকাজ করছে। অতি দরিদ্র ঘরের কোনো কোনো শিশু ধানের শীষ কুড়াচ্ছে, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে গোলার ধান সংগ্রহ করছে, শীতের দিনে আগুন তাপানোর জন্য পরিত্যক্ত আমন ধানের শুকনো নাড়া কেটে বাড়িতে পিল দিয়ে রাখছে। আমনের মাঠে ইঁদুরের গর্তে ধানের গোলা পেলে একসঙ্গে অনেক ধান খুঁজে পাওয়া যায়। সেটা দিয়ে শীত নিবারণের গরম কাপড় কেনে অনেকে। কেউ আবার ফেরিওয়ালার কাছ থেকে তিলের খাজা, কটকটি ও হাওয়াই মিঠাই কিনে খায়। নিজেদের পরিবারের কাজ থেকে একটু ফুরসত পেলেই ওরা দলবেঁধে খেলে ঠুস, দাঁড়িয়াবান্ধা অথবা গোল্লাছুট। কেউ বাইসাইকেলে, কেউ অভিভাবকের অটোরিকশায় উঠে হাটের দিনে সাহায্য করতে গভীর রাত পর্যন্ত জনসমুদ্রে থেকে বাড়িতে ফেরে। করোনার আগে হাটবারের দুই দিন কেউ কেউ স্কুলে যেত না। এখন সারা সপ্তাহেই ছুটি; স্কুলে যেতে হয় না বলে বাবা বেজায় খুশি। গ্রামের সচ্ছল পরিবারের শিশুরাও তাদের জীবনের মূল্যবান সময়কে অবহেলায় অপচয় করে দিন কাটাচ্ছে। কেউ দলবেঁধে রাতভর মাইক বাজিয়ে বিলের মাঝে পিকনিক করছে, মাজারে গান করছে, কেউ বা আত্মীয় বাড়ির নামে নিকটস্থ শহর-বন্দরে গিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। অথচ আগে দিনেরবেলা স্কুল থাকায় যেতে পারত না।

কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর, চিলমারীর জোড়গাছ, লালমনিরহাট সদরের সিন্দুরমতি, কুর্শামারী, হাতিবান্ধার গড্ডিমারী, নীলফামারীর জলঢাকার বালাগ্রাম, ডিমলার খগা খড়িবাড়ি, সিলেটের জৈন্তাপুরের মানিকপাড়া, বরগুনার আমতলীর কুকুয়া- কোথাও শিশুরা ঘরে বসে নেই। করোনাকালে কখনই তারা ঘরবন্দি হয়ে থাকেনি। তাদের গ্রামে করোনা রোগ নেই। অনেকে এ রোগের নাম শুনেছে আগে। তখন মনে মনে ভয় করত। এখন কেউ সেটা নিয়ে ভয়-ডর করে না।

প্রায় এক বছর ধরে স্কুলগুলো বন্ধ। দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার। বেসরকারি স্কুল ১৭ হাজার। কলেজ প্রায় ২ হাজার ৫০০। এগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। করোনার প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় এদের অনেকে লেখাপড়া ভুলে যেতে বসেছে এবং জীবিকার তাগিদে ভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ায় ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তাদের সবার বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। পড়াশোনা তাদের জন্য খুব সহজ ব্যাপার নয়। অনেকে সূর্য ডুবলে ঘুমায়, উঠলে জেগে ওঠে। অভিভাবকদের কর্মহীনতায় দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ায় বহু দিনমজুর পরিবারের শিশুরা করোনাকালীন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। অপুষ্টিতে ভুগে ওরা লড়াই করছে জীবনের সঙ্গে। অনেকে আগে স্কুলে গেলে খাবার পেত, এখন সেটাও বন্ধ। স্কুল যাওয়ার তাগিদ না থাকায় এবং শীত শুরু হওয়ার পর অনেক অবহেলিত পরিবারের শিশুরা নিয়মিত গোসলও করে না বলে জানা গেছে।

ওদের অনেকের মোবাইল ফোন আছে, তবে স্মার্টফোন নেই। ওদের শিশুরা অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে পরিচিত নয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া রয়েছে কিছু পরিবারে। তারা কিছুদিন পরপর অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা চায়- মেগা না কী যেন কিনবে বলে। অনেক অভিভাবক এ নিয়ে বিস্মিত। ওদের এত টাকা লাগে কেন? ফসল বেচে এত টাকা দিতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে না খেয়ে মরতে হবে বলে জানিয়েছেন কোনো কোনো অভিভাবক।

এদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরুর দিকে নানা সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলা হলেও গ্রামের কোনো শিক্ষার্থীই সে ধরনের সাহায্য না পেয়ে তাদের হতাশার কথা ব্যক্ত করেছে। অনলাইন ক্লাস শুরুর দিকে তাদের অনেক আগ্রহ থাকলেও এখন গ্রামাঞ্চলের শতকরা ১৫ ভাগ শিক্ষার্থীকেও উপস্থিত রাখা যাচ্ছে না। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা দুটোই হ্রাস পেয়েছে। ফলে তারা অনেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব হতাশ। অনেকে আবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিনদেশি অপসংস্কৃতি ও অনাচারে আসক্ত হয়ে বিপজ্জনক পরিণতির মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এমন কিছু অভিযোগ করেছে তাদের বন্ধু ও আপনজনরা।

করোনার প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় বাড়ন্ত মেয়েশিশুদের বেশি সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্কুলগামী বাড়ন্ত মেয়েরা বাড়িতে অলস সময় পার করায় করোনার প্রভাবে সামাজিক কুসংস্কারের শিকার হচ্ছে; ফলে গোপনে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ থাকায় ওদের জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে। সহপাঠীদের অনেকের নানা পারিবারিক সমস্যার সঙ্গে নিজেদেরও বিয়ে হয়ে যেতে পারে- এ আশঙ্কায় অজানা চিন্তায় ভুগছে অনেকে।

দেশে সবকিছু খোলা। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কেন? এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুব কঠিন মনে হলেও গ্রামের মানুষ বলছেন- করোনা আমাদের অসুখ নয়। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের সারা দিন কাটে রোদে, জলে, ঘামে ভিজে। আমরা ঘুমাই ভাঙা বেড়ার ঘরে। প্রতিদিন আমরা কাশি দিই, হুঁক্কা খাই। সকাল হলেই কাজে যাই। রাতে নাক ডেকে ঘুমাই। যারা পায়রার খুপরির মতো বন্ধ দালান ঘরে ঘুমায়, জানালা বন্ধ গাড়িতে চড়ে আর গায়ের ঘাম বের করে না- সেসব বড়লোকের অসুখ ওটা! আমাদের গ্রামে কতজনের জ্বর-কাশি হল। ওসব অসুখে এখনও কেউ মরেছে বলে শুনিনি। সবাই সব জায়গায় যাচ্ছি, সবকিছু করছি, শুধু স্কুল-কলেজ বন্ধ। খালি খালি গ্রামের ছাওয়ালদের স্কুল বন্ধ করে ভবিষ্যৎ জীবনটা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে।

আসলেই আমরা আমাদের গ্রামগুলোর সঙ্গে রাজধানী অথবা বড় বড় শহরের পার্থক্যকে অস্বীকার করে চলেছি। প্রতিদিন করোনার আপডেট তথ্য শুধু শহরের ১১৭টি করোনা চিহ্নিতকরণ কেন্দ্রকেন্দ্রিক। সেখানে গ্রাম থেকে আগত কতজন রোগী এলো-গেল তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। শহরের শিশুরা ঘরে বসে অনলাইনে পড়াশোনা করছে। গ্রামের শিশুরা অনলাইন কী তা শুনলেও তাতে তাদের একসেস্ নেই। তারা বাড়িতেও পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়াও বন্ধ। তাই শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে অন্ধকারে দিন গুজরান করছে। সুস্থ-সুন্দর পরিবেশে সম্ভাবনাময় কোটি কোটি গ্রামীণ শিশু-কিশোরকে অজ্ঞানতার গহিন আঁধারে ঠেলে দিয়েছি আমরা। গ্রামের করোনা সংক্রমণহীন পরিবেশে ঘরের বাইরে ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়ানো মাটির সন্তানরা পড়ালেখা ভুলে শুধু কি অজ্ঞ, অশিক্ষিত হয়েই থাকবে?

রাজধানী তথা শহরে বসে মৃত্যুভয় সামনে রেখে নিজেদের শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা দিয়ে পাঠদান করাচ্ছি, অথচ গ্রামে করোনার প্রকোপ না থাকা সত্ত্বেও শিশুদের জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে পড়ালেখার সুবিধাবঞ্চিত রেখে এ কোন অসম উন্নয়ন ঘটাচ্ছি আমরা? শিক্ষায় শহর ও গ্রামের মধ্যে এহেন আঞ্চলিক বৈষম্য ও বৈপরীত্য আমাদের ভবিষ্যৎ পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ প্রজন্ম কি কখনও ক্ষমা করতে পারবে?

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd

গ্রামে কেন স্কুল বন্ধ?

 ড. মো. ফখরুল ইসলাম 
০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
স্কুল
ফাইল ছবি

১৭ মাস পর হঠাৎ সেদিন গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হল। আপনজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সঙ্গে গ্রামের অনেক শিশু-কিশোর-যুবক শিক্ষার্থীর সঙ্গেও দেখা হল। সেই সুবাদে ওদের পড়াশোনা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নানা কথা জানতে পারলাম। কৌতূহলবশত আমাদের গ্রামের বর্তমান শিক্ষা পরিস্থিতির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রামের অবস্থা কেমন তা সেলফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কিছুটা জানার চেষ্টা করলাম।

গ্রামের শিশুরা কেউ গৃহবন্দি নয়, শুধু শুধু ওদের স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনাকালে ওদের ওপর কোনোরকম বিধিনিষেধও কার্যকর নেই। সারাদিন ঘরের বাইরে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ মাছ ধরছে, কেউ কৃষিকাজ করছে। অতি দরিদ্র ঘরের কোনো কোনো শিশু ধানের শীষ কুড়াচ্ছে, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে গোলার ধান সংগ্রহ করছে, শীতের দিনে আগুন তাপানোর জন্য পরিত্যক্ত আমন ধানের শুকনো নাড়া কেটে বাড়িতে পিল দিয়ে রাখছে। আমনের মাঠে ইঁদুরের গর্তে ধানের গোলা পেলে একসঙ্গে অনেক ধান খুঁজে পাওয়া যায়। সেটা দিয়ে শীত নিবারণের গরম কাপড় কেনে অনেকে। কেউ আবার ফেরিওয়ালার কাছ থেকে তিলের খাজা, কটকটি ও হাওয়াই মিঠাই কিনে খায়। নিজেদের পরিবারের কাজ থেকে একটু ফুরসত পেলেই ওরা দলবেঁধে খেলে ঠুস, দাঁড়িয়াবান্ধা অথবা গোল্লাছুট। কেউ বাইসাইকেলে, কেউ অভিভাবকের অটোরিকশায় উঠে হাটের দিনে সাহায্য করতে গভীর রাত পর্যন্ত জনসমুদ্রে থেকে বাড়িতে ফেরে। করোনার আগে হাটবারের দুই দিন কেউ কেউ স্কুলে যেত না। এখন সারা সপ্তাহেই ছুটি; স্কুলে যেতে হয় না বলে বাবা বেজায় খুশি। গ্রামের সচ্ছল পরিবারের শিশুরাও তাদের জীবনের মূল্যবান সময়কে অবহেলায় অপচয় করে দিন কাটাচ্ছে। কেউ দলবেঁধে রাতভর মাইক বাজিয়ে বিলের মাঝে পিকনিক করছে, মাজারে গান করছে, কেউ বা আত্মীয় বাড়ির নামে নিকটস্থ শহর-বন্দরে গিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। অথচ আগে দিনেরবেলা স্কুল থাকায় যেতে পারত না।

কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর, চিলমারীর জোড়গাছ, লালমনিরহাট সদরের সিন্দুরমতি, কুর্শামারী, হাতিবান্ধার গড্ডিমারী, নীলফামারীর জলঢাকার বালাগ্রাম, ডিমলার খগা খড়িবাড়ি, সিলেটের জৈন্তাপুরের মানিকপাড়া, বরগুনার আমতলীর কুকুয়া- কোথাও শিশুরা ঘরে বসে নেই। করোনাকালে কখনই তারা ঘরবন্দি হয়ে থাকেনি। তাদের গ্রামে করোনা রোগ নেই। অনেকে এ রোগের নাম শুনেছে আগে। তখন মনে মনে ভয় করত। এখন কেউ সেটা নিয়ে ভয়-ডর করে না।

প্রায় এক বছর ধরে স্কুলগুলো বন্ধ। দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার। বেসরকারি স্কুল ১৭ হাজার। কলেজ প্রায় ২ হাজার ৫০০। এগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। করোনার প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় এদের অনেকে লেখাপড়া ভুলে যেতে বসেছে এবং জীবিকার তাগিদে ভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়ায় ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তাদের সবার বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। পড়াশোনা তাদের জন্য খুব সহজ ব্যাপার নয়। অনেকে সূর্য ডুবলে ঘুমায়, উঠলে জেগে ওঠে। অভিভাবকদের কর্মহীনতায় দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ায় বহু দিনমজুর পরিবারের শিশুরা করোনাকালীন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। অপুষ্টিতে ভুগে ওরা লড়াই করছে জীবনের সঙ্গে। অনেকে আগে স্কুলে গেলে খাবার পেত, এখন সেটাও বন্ধ। স্কুল যাওয়ার তাগিদ না থাকায় এবং শীত শুরু হওয়ার পর অনেক অবহেলিত পরিবারের শিশুরা নিয়মিত গোসলও করে না বলে জানা গেছে।

ওদের অনেকের মোবাইল ফোন আছে, তবে স্মার্টফোন নেই। ওদের শিশুরা অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে পরিচিত নয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া রয়েছে কিছু পরিবারে। তারা কিছুদিন পরপর অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা চায়- মেগা না কী যেন কিনবে বলে। অনেক অভিভাবক এ নিয়ে বিস্মিত। ওদের এত টাকা লাগে কেন? ফসল বেচে এত টাকা দিতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে না খেয়ে মরতে হবে বলে জানিয়েছেন কোনো কোনো অভিভাবক।

এদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরুর দিকে নানা সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলা হলেও গ্রামের কোনো শিক্ষার্থীই সে ধরনের সাহায্য না পেয়ে তাদের হতাশার কথা ব্যক্ত করেছে। অনলাইন ক্লাস শুরুর দিকে তাদের অনেক আগ্রহ থাকলেও এখন গ্রামাঞ্চলের শতকরা ১৫ ভাগ শিক্ষার্থীকেও উপস্থিত রাখা যাচ্ছে না। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা দুটোই হ্রাস পেয়েছে। ফলে তারা অনেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব হতাশ। অনেকে আবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিনদেশি অপসংস্কৃতি ও অনাচারে আসক্ত হয়ে বিপজ্জনক পরিণতির মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। এমন কিছু অভিযোগ করেছে তাদের বন্ধু ও আপনজনরা।

করোনার প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় বাড়ন্ত মেয়েশিশুদের বেশি সমস্যা তৈরি হয়েছে। স্কুলগামী বাড়ন্ত মেয়েরা বাড়িতে অলস সময় পার করায় করোনার প্রভাবে সামাজিক কুসংস্কারের শিকার হচ্ছে; ফলে গোপনে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ থাকায় ওদের জীবনের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে গেছে। সহপাঠীদের অনেকের নানা পারিবারিক সমস্যার সঙ্গে নিজেদেরও বিয়ে হয়ে যেতে পারে- এ আশঙ্কায় অজানা চিন্তায় ভুগছে অনেকে।

দেশে সবকিছু খোলা। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কেন? এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুব কঠিন মনে হলেও গ্রামের মানুষ বলছেন- করোনা আমাদের অসুখ নয়। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের সারা দিন কাটে রোদে, জলে, ঘামে ভিজে। আমরা ঘুমাই ভাঙা বেড়ার ঘরে। প্রতিদিন আমরা কাশি দিই, হুঁক্কা খাই। সকাল হলেই কাজে যাই। রাতে নাক ডেকে ঘুমাই। যারা পায়রার খুপরির মতো বন্ধ দালান ঘরে ঘুমায়, জানালা বন্ধ গাড়িতে চড়ে আর গায়ের ঘাম বের করে না- সেসব বড়লোকের অসুখ ওটা! আমাদের গ্রামে কতজনের জ্বর-কাশি হল। ওসব অসুখে এখনও কেউ মরেছে বলে শুনিনি। সবাই সব জায়গায় যাচ্ছি, সবকিছু করছি, শুধু স্কুল-কলেজ বন্ধ। খালি খালি গ্রামের ছাওয়ালদের স্কুল বন্ধ করে ভবিষ্যৎ জীবনটা নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে।

আসলেই আমরা আমাদের গ্রামগুলোর সঙ্গে রাজধানী অথবা বড় বড় শহরের পার্থক্যকে অস্বীকার করে চলেছি। প্রতিদিন করোনার আপডেট তথ্য শুধু শহরের ১১৭টি করোনা চিহ্নিতকরণ কেন্দ্রকেন্দ্রিক। সেখানে গ্রাম থেকে আগত কতজন রোগী এলো-গেল তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। শহরের শিশুরা ঘরে বসে অনলাইনে পড়াশোনা করছে। গ্রামের শিশুরা অনলাইন কী তা শুনলেও তাতে তাদের একসেস্ নেই। তারা বাড়িতেও পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়াও বন্ধ। তাই শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে অন্ধকারে দিন গুজরান করছে। সুস্থ-সুন্দর পরিবেশে সম্ভাবনাময় কোটি কোটি গ্রামীণ শিশু-কিশোরকে অজ্ঞানতার গহিন আঁধারে ঠেলে দিয়েছি আমরা। গ্রামের করোনা সংক্রমণহীন পরিবেশে ঘরের বাইরে ঘুরঘুর করে ঘুরে বেড়ানো মাটির সন্তানরা পড়ালেখা ভুলে শুধু কি অজ্ঞ, অশিক্ষিত হয়েই থাকবে?

রাজধানী তথা শহরে বসে মৃত্যুভয় সামনে রেখে নিজেদের শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা দিয়ে পাঠদান করাচ্ছি, অথচ গ্রামে করোনার প্রকোপ না থাকা সত্ত্বেও শিশুদের জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে পড়ালেখার সুবিধাবঞ্চিত রেখে এ কোন অসম উন্নয়ন ঘটাচ্ছি আমরা? শিক্ষায় শহর ও গ্রামের মধ্যে এহেন আঞ্চলিক বৈষম্য ও বৈপরীত্য আমাদের ভবিষ্যৎ পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ প্রজন্ম কি কখনও ক্ষমা করতে পারবে?

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd