জীবনকে ভালোবাসতে শেখাতে হবে
jugantor
জীবনকে ভালোবাসতে শেখাতে হবে

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী  

০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আত্মহত্যা

বেশ কিছুদিন থেকে আত্মহত্যা আমাদের সংবাদ প্রবাহের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সুশীল সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে তরুণ-তরুণীর ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যার ঘটনা তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। কোনটা রেখে কোনটা উল্লেখ করব তা ভেবে খেই হারাতে হচ্ছে। বছরদুয়েক আগে ভিকারুননিসা স্কুলের অরিত্রী নামের এক ছাত্রীকে টিসি প্রদান ও বাবা-মাকে তার সামনে অপমানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা দেশের মানুষের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

উইকপিডিয়া বলছে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। তুচ্ছ কারণে এর প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণত পারিবারিক ও বৈবাহিক সমস্যা, স্বামীর নির্যাতন, পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক ও গর্ভধারণ, প্রেমে ব্যর্থতা এবং আর্থিক অনটন থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। কেউ কেউ পরিবারের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ অন্যদের হত্যা করে নিজে সুইসাইড করছে। অবসাদগ্রস্ততা, তা যে কারণেই হোক, আত্মহত্যা সংঘটনে বড় ভূমিকা রাখছে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের ৯০-৯৫ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত।

আত্মহত্যার ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন রোমে আত্মহত্যা প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত থাকলেও পরে এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ ও পাপ হিসেবে অভিহিত হয়। ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের সময় আত্মহত্যাকারীর শরীর রাস্তায় টেনে আবর্জনা দিয়ে আবৃত করা হতো এবং সব সম্পত্তি জব্দ করা হতো। ধর্ষণের ফলে লজ্জা, রোগে শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটত। বর্তমানে কোনো কোনো পশ্চিমা দেশে আত্মহত্যা অপরাধ নয়। আমেরিকার কিছু অঞ্চলে চিকিৎসকের সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের আত্মহত্যা বৈধ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যা মানুষের মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ। এখানে গড়ে প্রতিদিন ১৩৩ জন এবং বছরে ৪৮-৫০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে। আর আত্মহত্যা করার কথা ভাবে বছরে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ। জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুসারে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রাথমিক থেকে হাইস্কুলের ২৫০ জন শিশু আত্মহত্যা করে যা সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলেছিল। এদের অধিকাংশ হাইস্কুল পর্যায়ের এবং ১৮ বছরের কম বয়সের। আত্মহত্যার আগে ওইসব শিশু তাদের পারিবারিক সমস্যা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং বন্ধুদের কাছ থেকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ ব্যবহারে বিমর্ষ ছিল। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১২৩ জন এবং এর আগের বছরও প্রায় সমসংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে।

প্রতি বছর বিশ্বে আত্মহত্যা করে ১০ লাখ মানুষ। আর বাংলাদেশে এ সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। অর্থাৎ আমাদের দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৭ জন আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যাকারীদের বেশির ভাগের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়ায় আত্মহত্যার হার বেশি। বিশ্বে আত্মহত্যার তালিকায় পুরুষ বেশি হলেও বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা বেশি। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার কারণ আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি। বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের জনৈক অধ্যাপক বলেছেন, আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে পরিকল্পিতভাবে ও আবেগতাড়িত হয়ে। আমাদের দেশে অধিকাংশ আত্মহত্যা আবেগতাড়িত হয়ে ঘটে থাকে। এ কারণে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আত্মহত্যা করে।

শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতে নিজেকে সামলে নিতে না পেরে অথবা ঠুনকো আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকে জীবন বিসর্জন দিয়ে থাকে। এ ধরনের অঘটনগুলোতে কোনোভাবে মনকে প্রবোধ দেয়া যায় না। আমাদের কাজ করতে হবে এ জায়গাটিতেই। সামান্য অভিমান থেকে শুরু করে পর্বতসম সমস্যা, লাঞ্ছনা-গঞ্জন- এসবের কোনোটির প্রতিষেধক আত্মহত্যা হতে পারে না। জীবনের ব্যাপ্তি, মর্যাদা, দায়িত্ব ও মাহাত্ম্য অনেক বেশি। কারও প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, অন্যায়, অনাচার ও বঞ্চনার কারণে আত্মহত্যা কখনই যৌক্তিক হয় না।

যে আত্মহত্যা করে, সে নিজে হয়তো নিষ্কৃতি চায়। কিন্তু তার এ নিষ্কৃতি পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নিয়ে আসে গ্লানি, যন্ত্রণা ও লজ্জা। ওই পরিবারের সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে ঠিকভাবে মিশতে পারে না, মানুষ বাঁকা চোখে দেখে। সমাজে অনেক ক্ষেত্রে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যেতে হয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে অনেকেই ওই পরিবারের কারও সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চায় না। অর্থাৎ যে চলে যায়, সে তো যায়ই; কিন্তু পরিবারের অন্যদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করে যায়, যা আত্মহত্যাকারীর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, নিকটজনদের জন্য অন্তহীন অমানিশার সূচনা মাত্র। এ ধরনের অঘটন যে বহুমাত্রিক সমস্যা তৈরি করে তা সমাজের প্রত্যেককে জানাতে ও বোঝাতে হবে। কারও হঠকারী সিদ্ধান্তে নিকটজনরা যে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা সবার স্মরণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য আমাদের যেসব কাজ ও আয়োজন যথাযথ নয়, তা থেকে সরে আসতে হবে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের কেউই নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়। আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সাধারণত ১৬-১৭ থেকে ৪০-৪৫ বছরের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর বয়সের এ ধাপটিই হল মানুষের জীবন গঠন এবং জীবনের মোড় ঘোরানোর উপযুক্ত সময়।

আমাদের দেশে যত ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তার বেশিরভাগই ঘটে থাকে সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে। কঠিন বিপদে অবিচল থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রথম ও প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্র হল পরিবার। আমাদের পরিবারগুলোকে দৃঢ় মানসিক স্বাস্থ্য সংবলিত সন্তান ও সদস্য গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের মানসিকভাবে ম্যাচিউরড ও শক্তিশালী করার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ঘরেই করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, নৈতিকতার পাঠগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবী যে দু-চারজন মানুষ নিয়েই নয় এটাও তাদের বোঝাতে হবে, যেন তারা ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়গুলোকে অতিক্রম করতে পারে। পরিবারের যখন কোনো সদস্য মানসিক সমস্যায় ভোগে তখন অনেক ক্ষেত্রে তার বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করা হয় না, বা অন্যরা অনেক সময় বুঝতে পারে না বা বুঝলেও গুরুত্ব দেয় না; ফলে বিপদের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পরিবারের যখন কোনো সদস্য এ ধরনের সমস্যায় ভোগে তখন কালবিলম্ব না করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

আমাদের পরিবারগুলোতে ক’জন পিতা-মাতা সন্তান-সন্ততিকে পর্যাপ্ত সময় দেন? যথাযথ খোঁজখবর রাখেন? সন্তানের মধ্যে নৈতিকতা সৃষ্টির জন্য ভালো উপদেশ, বড় বড় মানুষের সাফল্যগাথা তাদের শোনাতে হবে। ধর্মীয় নীতিকথা, জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং জীবনের ব্যাপক বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। পৃথিবীতে অনেক সন্তান আছে, যারা ওসব তো দূরের কথা, তাদের কাছ থেকে কখনও কোনো স্নেহ-ভালোবাসা পায়নি। মা-বাবার কাছে আবদার করে কিছু পাওয়া যায় এ ধরনের স্মৃতি তাদের মাঝে নেই। সাধ্যের মধ্যে সন্তানের চাওয়া-পাওয়া সমন্বয়ের চেষ্টা করতে হবে। আদর্শ পিতামাতা হতে হলে সন্তানকে বুঝতে হবে। তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। পরিবারে সবার সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক অনটন, স্বামী/স্ত্রী পরস্পরের মান-অভিমান ও শারীরিক অসুস্থতা থেকে যে মৃত্যুগুলো হয় সেগুলো শুধু মোটিভেশনাল ওয়ার্কের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব। ইতিবাচক চিন্তা, ধর্মচর্চা, কর্মে নিয়োজিত থাকা, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আত্মহত্যার চিন্তা থেকে দূরে থাকা যায়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল পরিবারে কোনো সদস্যের মধ্যে যখন মানসিক অবসাদগ্রস্ততা ঘটে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তার চিকিৎসা হয় না। সরকারি মেডিকেল কলেজ, পাবনার মানসিক হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য ও ব্যবস্থা থাকে না অনেকের। ফলে কাউন্সেলিং সুবিধাবঞ্চিত থাকতে থাকতে অবসাদগ্রস্ততা জেঁকে বসে। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য বা সুস্থতা ধরে রাখতে পারলে আত্মহত্যার হার কমানো সম্ভব হবে। তাই দেশের উপজেলা পর্যায়ে মানসিক চিকিৎসাসেবা প্রবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।

হতাশা, অপ্রাপ্তিতে ধৈর্যধারণ করতে হবে। কোনোভাবে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনের ইতি টানা উচিত নয়। জীবনে বিপদ আসবেই, ধৈর্য না হারিয়ে সাহসের সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে হবে। আত্মহত্যা তো মানুষের ভীরুতার চরম বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দেশের প্রায় সব পরিবারেই ধর্মের অনুশাসন পালন করা হয়ে থাকে। কোনো ধর্মই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না। ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক এটি মারাত্মক একটি অপরাধ এবং পরিণাম হল জাহান্নামের দীর্ঘস্থায়ী শাস্তি। ধর্ম পালনকারী প্রত্যেককে এ বিষয়গুলো জানাতে হবে।

দুঃখ, কষ্ট, অভাব, অভিযোগ, হতাশা-বঞ্চনার পরও জীবন কিন্তু সুন্দর। যোগ-বিয়োগের পর জীবনে সুন্দরের পাল্লাই ভারি হয়। হতাশাগ্রস্তদের স্বপ্ন দেখা শেখাতে হবে। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে যতটুকু সাহায্য-সহযোগিতা দরকার, তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের পাশে মহীরুহ হয়ে দাঁড়াতে হবে। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বর্ণিল জীবনের প্রতিশ্রুতি এবং এর ক্ষেত্র তৈরি আত্মহত্যা থেকে ফিরিয়ে আনার অন্যতম একটি পথ।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

জীবনকে ভালোবাসতে শেখাতে হবে

 সালাহ্উদ্দিন নাগরী 
০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আত্মহত্যা
প্রতীকী ছবি

বেশ কিছুদিন থেকে আত্মহত্যা আমাদের সংবাদ প্রবাহের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সুশীল সমাজকে ভাবিয়ে তুলছে। প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে তরুণ-তরুণীর ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যার ঘটনা তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। কোনটা রেখে কোনটা উল্লেখ করব তা ভেবে খেই হারাতে হচ্ছে। বছরদুয়েক আগে ভিকারুননিসা স্কুলের অরিত্রী নামের এক ছাত্রীকে টিসি প্রদান ও বাবা-মাকে তার সামনে অপমানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা দেশের মানুষের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

উইকপিডিয়া বলছে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। তুচ্ছ কারণে এর প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণত পারিবারিক ও বৈবাহিক সমস্যা, স্বামীর নির্যাতন, পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক ও গর্ভধারণ, প্রেমে ব্যর্থতা এবং আর্থিক অনটন থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। কেউ কেউ পরিবারের দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ অন্যদের হত্যা করে নিজে সুইসাইড করছে। অবসাদগ্রস্ততা, তা যে কারণেই হোক, আত্মহত্যা সংঘটনে বড় ভূমিকা রাখছে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের ৯০-৯৫ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত।

আত্মহত্যার ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন রোমে আত্মহত্যা প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত থাকলেও পরে এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ ও পাপ হিসেবে অভিহিত হয়। ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের সময় আত্মহত্যাকারীর শরীর রাস্তায় টেনে আবর্জনা দিয়ে আবৃত করা হতো এবং সব সম্পত্তি জব্দ করা হতো। ধর্ষণের ফলে লজ্জা, রোগে শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটত। বর্তমানে কোনো কোনো পশ্চিমা দেশে আত্মহত্যা অপরাধ নয়। আমেরিকার কিছু অঞ্চলে চিকিৎসকের সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের আত্মহত্যা বৈধ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যা মানুষের মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ। এখানে গড়ে প্রতিদিন ১৩৩ জন এবং বছরে ৪৮-৫০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে। আর আত্মহত্যা করার কথা ভাবে বছরে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ। জাপানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুসারে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রাথমিক থেকে হাইস্কুলের ২৫০ জন শিশু আত্মহত্যা করে যা সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলেছিল। এদের অধিকাংশ হাইস্কুল পর্যায়ের এবং ১৮ বছরের কম বয়সের। আত্মহত্যার আগে ওইসব শিশু তাদের পারিবারিক সমস্যা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং বন্ধুদের কাছ থেকে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ ব্যবহারে বিমর্ষ ছিল। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ১২৩ জন এবং এর আগের বছরও প্রায় সমসংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে।

প্রতি বছর বিশ্বে আত্মহত্যা করে ১০ লাখ মানুষ। আর বাংলাদেশে এ সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। অর্থাৎ আমাদের দেশে প্রতিদিন প্রায় ২৭ জন আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যাকারীদের বেশির ভাগের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়ায় আত্মহত্যার হার বেশি। বিশ্বে আত্মহত্যার তালিকায় পুরুষ বেশি হলেও বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা বেশি। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার কারণ আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি। বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের জনৈক অধ্যাপক বলেছেন, আত্মহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে পরিকল্পিতভাবে ও আবেগতাড়িত হয়ে। আমাদের দেশে অধিকাংশ আত্মহত্যা আবেগতাড়িত হয়ে ঘটে থাকে। এ কারণে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আত্মহত্যা করে।

শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতে নিজেকে সামলে নিতে না পেরে অথবা ঠুনকো আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেকে জীবন বিসর্জন দিয়ে থাকে। এ ধরনের অঘটনগুলোতে কোনোভাবে মনকে প্রবোধ দেয়া যায় না। আমাদের কাজ করতে হবে এ জায়গাটিতেই। সামান্য অভিমান থেকে শুরু করে পর্বতসম সমস্যা, লাঞ্ছনা-গঞ্জন- এসবের কোনোটির প্রতিষেধক আত্মহত্যা হতে পারে না। জীবনের ব্যাপ্তি, মর্যাদা, দায়িত্ব ও মাহাত্ম্য অনেক বেশি। কারও প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, অন্যায়, অনাচার ও বঞ্চনার কারণে আত্মহত্যা কখনই যৌক্তিক হয় না।

যে আত্মহত্যা করে, সে নিজে হয়তো নিষ্কৃতি চায়। কিন্তু তার এ নিষ্কৃতি পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নিয়ে আসে গ্লানি, যন্ত্রণা ও লজ্জা। ওই পরিবারের সদস্যরা অন্যদের সঙ্গে ঠিকভাবে মিশতে পারে না, মানুষ বাঁকা চোখে দেখে। সমাজে অনেক ক্ষেত্রে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে যেতে হয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে অনেকেই ওই পরিবারের কারও সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চায় না। অর্থাৎ যে চলে যায়, সে তো যায়ই; কিন্তু পরিবারের অন্যদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ পরিস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করে যায়, যা আত্মহত্যাকারীর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, নিকটজনদের জন্য অন্তহীন অমানিশার সূচনা মাত্র। এ ধরনের অঘটন যে বহুমাত্রিক সমস্যা তৈরি করে তা সমাজের প্রত্যেককে জানাতে ও বোঝাতে হবে। কারও হঠকারী সিদ্ধান্তে নিকটজনরা যে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা সবার স্মরণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য আমাদের যেসব কাজ ও আয়োজন যথাযথ নয়, তা থেকে সরে আসতে হবে। যারা আত্মহত্যা করে তাদের কেউই নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়। আত্মহত্যার ঘটনাগুলো সাধারণত ১৬-১৭ থেকে ৪০-৪৫ বছরের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর বয়সের এ ধাপটিই হল মানুষের জীবন গঠন এবং জীবনের মোড় ঘোরানোর উপযুক্ত সময়।

আমাদের দেশে যত ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়, তার বেশিরভাগই ঘটে থাকে সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে। কঠিন বিপদে অবিচল থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার প্রথম ও প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্র হল পরিবার। আমাদের পরিবারগুলোকে দৃঢ় মানসিক স্বাস্থ্য সংবলিত সন্তান ও সদস্য গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের মানসিকভাবে ম্যাচিউরড ও শক্তিশালী করার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ঘরেই করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, নৈতিকতার পাঠগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবী যে দু-চারজন মানুষ নিয়েই নয় এটাও তাদের বোঝাতে হবে, যেন তারা ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়গুলোকে অতিক্রম করতে পারে। পরিবারের যখন কোনো সদস্য মানসিক সমস্যায় ভোগে তখন অনেক ক্ষেত্রে তার বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করা হয় না, বা অন্যরা অনেক সময় বুঝতে পারে না বা বুঝলেও গুরুত্ব দেয় না; ফলে বিপদের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পরিবারের যখন কোনো সদস্য এ ধরনের সমস্যায় ভোগে তখন কালবিলম্ব না করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

আমাদের পরিবারগুলোতে ক’জন পিতা-মাতা সন্তান-সন্ততিকে পর্যাপ্ত সময় দেন? যথাযথ খোঁজখবর রাখেন? সন্তানের মধ্যে নৈতিকতা সৃষ্টির জন্য ভালো উপদেশ, বড় বড় মানুষের সাফল্যগাথা তাদের শোনাতে হবে। ধর্মীয় নীতিকথা, জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং জীবনের ব্যাপক বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। পৃথিবীতে অনেক সন্তান আছে, যারা ওসব তো দূরের কথা, তাদের কাছ থেকে কখনও কোনো স্নেহ-ভালোবাসা পায়নি। মা-বাবার কাছে আবদার করে কিছু পাওয়া যায় এ ধরনের স্মৃতি তাদের মাঝে নেই। সাধ্যের মধ্যে সন্তানের চাওয়া-পাওয়া সমন্বয়ের চেষ্টা করতে হবে। আদর্শ পিতামাতা হতে হলে সন্তানকে বুঝতে হবে। তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। পরিবারে সবার সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক অনটন, স্বামী/স্ত্রী পরস্পরের মান-অভিমান ও শারীরিক অসুস্থতা থেকে যে মৃত্যুগুলো হয় সেগুলো শুধু মোটিভেশনাল ওয়ার্কের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব। ইতিবাচক চিন্তা, ধর্মচর্চা, কর্মে নিয়োজিত থাকা, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আত্মহত্যার চিন্তা থেকে দূরে থাকা যায়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল পরিবারে কোনো সদস্যের মধ্যে যখন মানসিক অবসাদগ্রস্ততা ঘটে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তার চিকিৎসা হয় না। সরকারি মেডিকেল কলেজ, পাবনার মানসিক হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য ও ব্যবস্থা থাকে না অনেকের। ফলে কাউন্সেলিং সুবিধাবঞ্চিত থাকতে থাকতে অবসাদগ্রস্ততা জেঁকে বসে। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য বা সুস্থতা ধরে রাখতে পারলে আত্মহত্যার হার কমানো সম্ভব হবে। তাই দেশের উপজেলা পর্যায়ে মানসিক চিকিৎসাসেবা প্রবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।

হতাশা, অপ্রাপ্তিতে ধৈর্যধারণ করতে হবে। কোনোভাবে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবনের ইতি টানা উচিত নয়। জীবনে বিপদ আসবেই, ধৈর্য না হারিয়ে সাহসের সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে হবে। আত্মহত্যা তো মানুষের ভীরুতার চরম বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দেশের প্রায় সব পরিবারেই ধর্মের অনুশাসন পালন করা হয়ে থাকে। কোনো ধর্মই আত্মহত্যাকে সমর্থন করে না। ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক এটি মারাত্মক একটি অপরাধ এবং পরিণাম হল জাহান্নামের দীর্ঘস্থায়ী শাস্তি। ধর্ম পালনকারী প্রত্যেককে এ বিষয়গুলো জানাতে হবে।

দুঃখ, কষ্ট, অভাব, অভিযোগ, হতাশা-বঞ্চনার পরও জীবন কিন্তু সুন্দর। যোগ-বিয়োগের পর জীবনে সুন্দরের পাল্লাই ভারি হয়। হতাশাগ্রস্তদের স্বপ্ন দেখা শেখাতে হবে। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে যতটুকু সাহায্য-সহযোগিতা দরকার, তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের পাশে মহীরুহ হয়ে দাঁড়াতে হবে। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বর্ণিল জীবনের প্রতিশ্রুতি এবং এর ক্ষেত্র তৈরি আত্মহত্যা থেকে ফিরিয়ে আনার অন্যতম একটি পথ।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]