মানবতা জাগ্রত করার শিক্ষা

  মো. হামিদুল হক খান ০৭ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আর্ট অব লিভিং

আর্ট অব লিভিংয়ের জনক শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৬ সালে ভারতে। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিভাদীপ্ত। ১৯৮১ সালে তিনি আর্ট অব লিভিং ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যার মূল লক্ষ্য হল মানুষের মনোদৈহিক চাপ, সামাজিক সমস্যা ও সহিংসতা দূর করা। আধ্যাত্মিক গুরু রবিশঙ্কর হিংসামুক্ত নতুন এক সমাজের যে স্বপ্ন দেখেছেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছেন দি আর্ট অব লিভিংয়ের বিভিন্ন সেবা প্রকল্প ও নানামুখী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। রবিশঙ্কর আর্ট অব লিভিংকে আন্তর্জাতিক অলাভজনক শিক্ষা ও জ্ঞানকেন্দ্রিক এক মানবতাবাদী সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মানবিক মূল্যবোধের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান ভ্যালুজ (আইএএইচভি)। আইএএইচভি গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল দি আর্ট অব লিভিংয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের তত্ত্বাবধান, মানবিক মূল্যবোধের লালন এবং দ্বন্দ্ব^-বিক্ষোভ ও সমস্যাকীর্ণ পরিস্থিতিকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। এ প্রকল্পগুলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে- প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, আতঙ্কগ্রস্ত ও যুদ্ধে আক্রান্ত মানুষ, দারিদ্র্যের প্রান্তিক সীমায় অবস্থিত শিশুদের কল্যাণে। তার একান্ত আহ্বান স্বেচ্ছাসেবীদের অনুপ্রাণিত করেছে সেবার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের জন্যকল্যাণকর কাজ করতে। মাত্র ৩১ বছরের মধ্যে তার কাজের প্রকল্প ও উদ্যোগ পৃথিবীর ১৫২টি দেশের ৩৭ কোটির অধিক মানুষকে প্রভাবিত করেছে।

বিভিন্ন কর্মসূচি ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর মানবিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন। মানবতা আমাদের পরম সত্তা- এ কথা শ্রীশ্রীর উচ্চারণে বারবার স্বীকৃতি পেয়েছে। সর্বধর্ম সমন্বয় এবং সর্বসংস্কৃতির মেলবন্ধনের সাহায্যেই ধর্মোন্মাদনা তথা মৌলবাদ-আক্রান্ত এই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী শান্তি স্থাপিত হতে পারে- এ কথা তিনি বহুবার ব্যক্ত করেছেন। জাতি-ধর্ম এবং দেশের সীমা ছাড়িয়ে তার কর্মকাণ্ড পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রেখেছে। রবিশঙ্করের মতে, মানবিক মূল্যবোধের পুনঃজাগরণ ও নিঃস্বার্থ সেবার দ্বারা নির্ভার-নিঃশঙ্ক সমাজ যেমন গড়ে তোলা যায়, তেমনি বাহ্যিক সুখের সঙ্গে অন্তরের শান্তিও লাভ করা সম্ভব হয়।

আর্ট অব লিভিং কোর্স করার মাধ্যমে একে অপরের প্রতি একাত্মবোধ, মানবতাবোধ, নৈতিকতাবোধ ও মমত্ববোধ জেগে ওঠে। বিশ্বজুড়ে এদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। শ্রীশ্রী রবিশঙ্করের আর্ট অব লিভিং কোর্সটি মূলত যেসব সমাজসেবামূলক বিষয় নিয়ে কাজ করে তা হল- ইন্টিগ্রেটেড কমিনিউটি ডেভেলপমেন্ট, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, পরিবেশ, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু সুরক্ষা, প্রাচীন হেরিটেজ সংরক্ষণ, কারাগার পুনর্বাসন, দুর্যোগে ত্রাণ সরবরাহ ইত্যাদি। আর্ট অব লিভিং আশ্রমে আগত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধনে এক গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সেখানে থাকে না কোনো ধরনের ভেদাভেদ- কে ধনী কিংবা গরিব। আর্ট অব লিভিংয়ের আশ্রমটি এমন একটি আশ্রম যেখানে কোনো কিছুর অভাব পরিলক্ষিত হয় না। সুতরাং বলা যায়, মানবতাকে জাগ্রত করার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হল রবিশঙ্করের আর্ট অব লিভিং।

শ্রীশ্রী রবিশঙ্করের আর্ট অব লিভিংয়ের সঙ্গে আমার একটা অভিজ্ঞতা জড়িয়ে আছে। আর্ট অব লিভিং নিয়ে আমার লেখার উদ্দেশ্য মূলত সে কারণেই। সালটি ছিল ২০১৪, আর দিনটি ছিল কোনো এক জুমাবার। সারা বেলা, সপ্তাহজুড়ে কাজের মধ্যে হাবুডুবু খেতে হতো, কারণ তখন আমার পেশা ছিল ব্যাংকিং। সপ্তাহের ওই জুমাবারই ছিল আয়েশের নির্ভার সময়। যা হোক, দুপুরে খাবারের পর বিছানায় লুটানো যেন বাঙালির স্বভাব। আমিও স্ত্রীর অনুরোধে একটু বিশ্রামে এলিয়ে পড়েছিলাম। ঘরে মেয়ে, ছেলে এবং মেয়ের আদরের কন্যাটি সবেমাত্র দু’বছরের কোটায়, যার দুষ্টুমির দাপটে আমাদের সময়টা ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু বিধিবাম, খালি ঘরে হঠাৎ আমার শরীরে বিরাট এক ঝাঁকুনি, যেন ৯ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হল। কাউকে ডাকার মতো বোধশক্তি তখন আমার ছিল না। হঠাৎই যেন আমার অর্ধাঙ্গিনী আমি ঘুমিয়ে আছি কিনা দেখতে এলেন। আমি হাত উঠিয়ে ইশারা করতেই তিনি আমাকে ধরে কাঁদতে লাগলেন। ইতিমধ্যে বাড়ির সবাই এসে হাজির। একমাত্র ছেলে হাফ প্যান্ট পরা অবস্থায়ই আমাকে নিয়ে গেল স্কয়ার হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ইউনিটে। তখন শরীরের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১০৫ ডিগ্রি আর ব্লাড প্রেসারের পারদ যেন আকাশছোঁয়া। জরুরি বিভাগের ডাক্তারসহ বড় বড় ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তির দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন। পরদিন থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু, ইতিমধ্যে আমার কেমন যেন বোধ হল- আমি মনে হয় মৃত্যুর অমোঘ দুয়ারের কাছাকাছি। আত্মীয়-স্বজন সবার মুখে যেন ক্লান্তির ছাপ। শ্বাসতন্ত্রের ভেতরে নোডে যেন ক্যান্সার নামক মরণব্যাধির যন্ত্রণাদায়ক ও নারকীয় ঘাতক। বড় বড় ডাক্তারের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠিত হল। সবার একই প্রেসক্রিপশন- ক্যান্সার। এ অবস্থায় স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, মা, ভাই, বোনদের অবস্থা কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আমি নিজে ভাবতে থাকি- ব্যাংক থেকে বেনিফিট যে ৬০ লাখ টাকা পেয়েছি তাতে কি চিকিৎসা ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে নাকি আরও টাকা প্রয়োজন হবে। ছেলে সবেমাত্র প্রকৌশলী হয়েছে, তখনও চাকরিতে ঢোকেনি। মৃত্যুযন্ত্রণায় তখন আমি হাসপাতালের বেডে কঙ্কালসার। এমন মরণব্যাধির কথা তো কাউকে বলাও যায় না।

স্ত্রীর ইচ্ছায় ব্যাঙ্গালোরের নারায়ণ হৃদয়ালয়ের বড় চিকিৎসক ডা. দেবী শেঠীর শরণাপন্ন হলাম, যিনি মানবতার কল্যাণে কাজ করেন দিবারাত্রি। ডা. শেঠী তিন মাসের সময় নিলেন এবং যাবতীয় চিকিৎসাসেবা দিলেন। অবশেষে ডাক্তারের পরামর্শে ব্যাংককের বামরুনগ্রুদ হাসপাতাল হয়ে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ১৪ দিন চিকিৎসার পর শল্যবিদরা ঘোষণা করলেন আমি ক্যান্সারমুক্ত। গচ্ছিত অর্থের সবটুকু খরচ করে বেঁচে রইলাম মানুষের ভালোবাসায়, শুধুই ভালোবাসায়।

নারায়ণ হৃদয়ালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একদিন সুযোগ বুঝে হাজির হলাম শ্রীশ্রী রবিশঙ্করের আর্ট অব লিভিং আশ্রমে। নারায়ণ হৃদয়ালয় থেকে ট্যাক্সি করে ২৫-৩০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের সামান্য উচ্চতায় অবস্থিত আশ্রমে পৌঁছে গেলাম। প্রথমেই অবলোকন করলাম প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরি করা আশ্রমের অপরূপ সৌন্দর্য, যেন দেখে মনে হচ্ছিল সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে বানিয়েছেন। ফুল, ফল, গোশালা, হাসপাতাল- কী নেই সেখানে। আপনি ৭/১৫/৩০ যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারবেন। নিজের কাজ নিজে করবেন, শিষ্টাচার শিখবেন। আত্মঅহংকার, অহংবোধ নিঃশেষিত করবেন নিজের দর্শন দিয়ে আর অনুভব করতে পারবেন পারলৌকিক দিকদর্শন। আশ্রমে আগত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মেলবন্ধনের এক গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সেখানে থাকে না কোনো ধরনের ভেদাভেদ। প্রতিদিন হাজারো লোকের খাবারের যে সুশৃঙ্খল আয়োজন তা দেখলে আপনি অভিভূত হবেন। বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়ার এক অবারিত আশ্রম এটি, যেখানে কোনোকিছুর অভাব পরিলক্ষিত হয় না। নীতিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা তথা মানবতাকে জাগ্রত করার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হল রবিশঙ্করের আর্ট অব লিভিং।

সর্বোপরি, যে কথাটি না বললেই নয় সেটি হল, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি চালু করেছে আর্ট অব লিভিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোর্সটি। কোর্সটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি পেয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

মো. হামিদুল হক খান : কোষাধ্যক্ষ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter