সংবিধানের ৭০ ধারা অপসারণ করা কেন প্রয়োজন
jugantor
সংবিধানের ৭০ ধারা অপসারণ করা কেন প্রয়োজন

  সুনীল শুভরায়  

১২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের জোরালো দাবি জানিয়ে বলে আসছেন, সংবিধানের ৭০ ধারাকে অপসারণ করে সংসদীয় একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে কোনো একটা কিছু করা হলে কিংবা কোনো কথা বলা হলে সেটা সাধারণত সমালোচনার ঝড়ের কবলে পড়ে।

কিন্তু জনাব জিএম কাদের সংবিধানের একটা ধারা অপসারণের কথাই শুধু বলেননি, অপসৃত ধারাটির বদৌলতে সংসদীয় একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থারও অবসান চেয়েছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন, ওই ধারাটি একনায়কতন্ত্র সৃষ্টির সহায়ক। নিশ্চয়ই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যের মধ্যে নিহিত আছে পার্টির নীতি ও আদর্শের প্রতিফলন।

চেয়ারম্যান মহোদয়ের এ বক্তব্য কোনো মহল থেকেই সমালোচিত হয়নি। এমনকি সরকারি দলের পক্ষ থেকেও না। সুতরাং সহজেই অনুমিত হয় যে, এটা প্রতিটি রাজনৈতিক দল কিংবা সব মহলের মানুষেরই মনের কথা।

বিষয়টির ওপর কিছুটা আলোকপাত করার জন্য, কী আছে আমাদের সংবিধানের ৭০ ধারায়, তা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে। সংবিধানের এ ধারায় বলা হয়েছে: ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মহোদয় বলতে চেয়েছেন, সংবিধানে যদি এমন একটি ধারা বহাল থাকে, তাহলে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি বা আচরণের প্রতিফলন ঘটার উপায় কোথাও থাকে না এবং এ ধারাবলে একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসা হয়। সংবিধানের এ মৌলিক পরিবর্তনের জন্য দেশে গণভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়েছিল। অর্থাৎ, ‘হ্যাঁ বা না’ ভোট। এটা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত শেষ গণভোট। প্রথম ‘হ্যাঁ বা না’ ভোট আয়োজন করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান, দ্বিতীয়বার জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তৃতীয়বার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ।

তৃতীয় ‘হ্যাঁ বা না’ ভোট-এর প্রশ্ন ছিল: ‘দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা আপনি সমর্থন করেন কি?’ ‘হ্যাঁ বা না’ ভোটের ফলাফলে যথারীতি ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণভাবে দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সংবিধানেই সাংঘর্ষিকভাবে রয়ে গেল ৭০ ধারা। যেখানে সংসদ সদস্যদের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলা কিংবা ভোট প্রদানের কোনো সুযোগই নেই। তাহলে সংসদের ক্ষমতা কোথায় থাকল?

এখানে যিনি সংসদ নেতা তিনি সংসদীয় দলেরও নেতা-তিনি সরকার প্রধান-তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি তার দলেরও প্রধান। সুতরাং দলের প্রধানের সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলা কিংবা নিজের স্বাধীনতায় কোনো কাজ করার সাহস দলের কোনো সদস্যেরই থাকে না। সেটা হয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি। আর সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তো তার সংসদ সদস্য পদই থাকে না। ফলে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।

রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা যখন এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হয়ে যায়-সেটাই হয় একনায়কতন্ত্র। যেটাকে নেতিবাচক নাম দিয়ে বলা হয় ‘স্বৈরশাসন’। দেশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফেরার আগে ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা। সেখানেও সাংবিধানিকভাবে এক ব্যক্তির হাতে শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। দেশে সর্বশেষ নির্বাহী রাষ্ট্রপতি ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

গোয়েবলসীয়ভাবে তার একনায়কতান্ত্রিক শাসন পরিচালনার কর্মকাণ্ডই ‘স্বৈরাচার’ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। এখন কে স্বৈরাচার আর কে নয়, এখানে তার তুলনামূলক আলোচনায় যেতে চাই না। আলোচনার বিষয় হতে পারে-কী চেয়েছিলাম আর কী পেয়েছি কিংবা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসনপদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে-তার ফল এখন কতটুকু ভোগ করা যাচ্ছে।

নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না যে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেননি। এটা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছেন। তার পূর্বসূরি বিচারপতি সাত্তার এবং জেনারেল জিয়াউর রহমানও এটা কায়েম করেননি। রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিএনপি এ ব্যবস্থাকে তাদের সংগঠনে গঠনতান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করেছিল। ’৯১-এর নির্বাচনেও বিএনপির ইশতাহারে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বহাল রাখার কথা ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সংসদীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের অঙ্গীকার করেই নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিল। ’

৯১-এর নির্বাচনে অকল্পনীয়ভাবে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ভোটের ফল দেখে তাদের নীতি আদর্শ ও লক্ষ্য পরিবর্তন করে ফেলে। তারা সরকার গঠনের মতো আসন লাভ করলেও প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩০.৮১ শতাংশ। এ ভোট হাতে নিয়ে বিএনপি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস পেল না। অপরদিকে এরশাদভীতি অন্যসব দলকে আরও আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ, তখনও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এরশাদপ্রীতি দৃশ্যমান।

সংসদ নির্বাচনে যার প্রতিফলন ঘটেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জেলে বসেই যদি বিনা প্রচারে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে তাকে সর্বদলীয় ঐক্য গড়েও ঠেকানো যাবে না-এটা সঠিকভাবেই উপলব্ধি করা গেছে। মূলত এ উপলব্ধি থেকেই রাষ্ট্রপতির শাসন পদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতি এসেছে। সংসদীয় পদ্ধতির প্রতি ভালোবাসা থেকে এ পদ্ধতি আসেনি।

সব দলের শাসন থেকে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, একনায়কতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার মানসিকতা কারও মধ্যেই নেই। যদি থাকত, তাহলে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ৭০ ধারার মতো গণতান্ত্রিক নীতি-আদর্শের পরিপন্থি একটা ধারা বহাল তবিয়তে থাকতে পারে না। কোন ‘তন্ত্র’ কায়েম হয়েছে, কোন মন্ত্রে দেশ চলছে, তা নিয়ে রাজনীতির ময়দানে টুঁ শব্দটিও নেই। একপক্ষ থাকার জন্য আর এক পক্ষ নামানোর মন্ত্র পাঠ করে যাচ্ছে।

মৌলিক সমস্যা সমাধানে একমাত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের সংসদীয় শাসনব্যবস্থাকে অর্থবহ এবং কার্যকর করার জন্য সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি গণতন্ত্রের স্বার্থে বিপরীতধর্মী ৭০ ধারা অপসারণ কিংবা সংশোধনের কথা বলেছেন।

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে সংবিধান আমরা অর্জন করেছি, সে সংবিধানকে নানাভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। একজন মাত্র ব্যক্তির ছয় মাসের চাকরির প্রয়োজনেও সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তাহলে সংবিধানের একটি অন্যতম স্তম্ভ গণতন্ত্রের মর্যাদা রাখতে একটি ধারার সংশোধন করে নিতে কোনো বাধা থাকার তো কথা নয়।

যদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটন করতে হয়, তাহলে সংবিধানের ওই ৭০ ধারাকে অপসারণ করতেই হবে-এটা নিশ্চয়ই সব সচেতন মানুষের মনের কথা।

সুনীল শুভরায় : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সংবিধানের ৭০ ধারা অপসারণ করা কেন প্রয়োজন

 সুনীল শুভরায় 
১২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের জোরালো দাবি জানিয়ে বলে আসছেন, সংবিধানের ৭০ ধারাকে অপসারণ করে সংসদীয় একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে কোনো একটা কিছু করা হলে কিংবা কোনো কথা বলা হলে সেটা সাধারণত সমালোচনার ঝড়ের কবলে পড়ে।

কিন্তু জনাব জিএম কাদের সংবিধানের একটা ধারা অপসারণের কথাই শুধু বলেননি, অপসৃত ধারাটির বদৌলতে সংসদীয় একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থারও অবসান চেয়েছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন, ওই ধারাটি একনায়কতন্ত্র সৃষ্টির সহায়ক। নিশ্চয়ই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যের মধ্যে নিহিত আছে পার্টির নীতি ও আদর্শের প্রতিফলন।

চেয়ারম্যান মহোদয়ের এ বক্তব্য কোনো মহল থেকেই সমালোচিত হয়নি। এমনকি সরকারি দলের পক্ষ থেকেও না। সুতরাং সহজেই অনুমিত হয় যে, এটা প্রতিটি রাজনৈতিক দল কিংবা সব মহলের মানুষেরই মনের কথা।

বিষয়টির ওপর কিছুটা আলোকপাত করার জন্য, কী আছে আমাদের সংবিধানের ৭০ ধারায়, তা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে। সংবিধানের এ ধারায় বলা হয়েছে: ‘রাজনৈতিক দল হইতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মহোদয় বলতে চেয়েছেন, সংবিধানে যদি এমন একটি ধারা বহাল থাকে, তাহলে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি বা আচরণের প্রতিফলন ঘটার উপায় কোথাও থাকে না এবং এ ধারাবলে একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসা হয়। সংবিধানের এ মৌলিক পরিবর্তনের জন্য দেশে গণভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়েছিল। অর্থাৎ, ‘হ্যাঁ বা না’ ভোট। এটা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত শেষ গণভোট। প্রথম ‘হ্যাঁ বা না’ ভোট আয়োজন করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান, দ্বিতীয়বার জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তৃতীয়বার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ।

তৃতীয় ‘হ্যাঁ বা না’ ভোট-এর প্রশ্ন ছিল: ‘দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা আপনি সমর্থন করেন কি?’ ‘হ্যাঁ বা না’ ভোটের ফলাফলে যথারীতি ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণভাবে দেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে সংবিধানেই সাংঘর্ষিকভাবে রয়ে গেল ৭০ ধারা। যেখানে সংসদ সদস্যদের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলা কিংবা ভোট প্রদানের কোনো সুযোগই নেই। তাহলে সংসদের ক্ষমতা কোথায় থাকল?

এখানে যিনি সংসদ নেতা তিনি সংসদীয় দলেরও নেতা-তিনি সরকার প্রধান-তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং তিনি তার দলেরও প্রধান। সুতরাং দলের প্রধানের সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলা কিংবা নিজের স্বাধীনতায় কোনো কাজ করার সাহস দলের কোনো সদস্যেরই থাকে না। সেটা হয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি। আর সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তো তার সংসদ সদস্য পদই থাকে না। ফলে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।

রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা যখন এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হয়ে যায়-সেটাই হয় একনায়কতন্ত্র। যেটাকে নেতিবাচক নাম দিয়ে বলা হয় ‘স্বৈরশাসন’। দেশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফেরার আগে ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা। সেখানেও সাংবিধানিকভাবে এক ব্যক্তির হাতে শাসনক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। দেশে সর্বশেষ নির্বাহী রাষ্ট্রপতি ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

গোয়েবলসীয়ভাবে তার একনায়কতান্ত্রিক শাসন পরিচালনার কর্মকাণ্ডই ‘স্বৈরাচার’ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। এখন কে স্বৈরাচার আর কে নয়, এখানে তার তুলনামূলক আলোচনায় যেতে চাই না। আলোচনার বিষয় হতে পারে-কী চেয়েছিলাম আর কী পেয়েছি কিংবা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাসনপদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়েছে-তার ফল এখন কতটুকু ভোগ করা যাচ্ছে।

নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না যে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেননি। এটা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছেন। তার পূর্বসূরি বিচারপতি সাত্তার এবং জেনারেল জিয়াউর রহমানও এটা কায়েম করেননি। রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিএনপি এ ব্যবস্থাকে তাদের সংগঠনে গঠনতান্ত্রিকভাবে গ্রহণ করেছিল। ’৯১-এর নির্বাচনেও বিএনপির ইশতাহারে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বহাল রাখার কথা ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সংসদীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তনের অঙ্গীকার করেই নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিল। ’

৯১-এর নির্বাচনে অকল্পনীয়ভাবে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ভোটের ফল দেখে তাদের নীতি আদর্শ ও লক্ষ্য পরিবর্তন করে ফেলে। তারা সরকার গঠনের মতো আসন লাভ করলেও প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ৩০.৮১ শতাংশ। এ ভোট হাতে নিয়ে বিএনপি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস পেল না। অপরদিকে এরশাদভীতি অন্যসব দলকে আরও আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ, তখনও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এরশাদপ্রীতি দৃশ্যমান।

সংসদ নির্বাচনে যার প্রতিফলন ঘটেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জেলে বসেই যদি বিনা প্রচারে পাঁচটি আসনে জয়লাভ করতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে তাকে সর্বদলীয় ঐক্য গড়েও ঠেকানো যাবে না-এটা সঠিকভাবেই উপলব্ধি করা গেছে। মূলত এ উপলব্ধি থেকেই রাষ্ট্রপতির শাসন পদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতি এসেছে। সংসদীয় পদ্ধতির প্রতি ভালোবাসা থেকে এ পদ্ধতি আসেনি।

সব দলের শাসন থেকে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, একনায়কতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার মানসিকতা কারও মধ্যেই নেই। যদি থাকত, তাহলে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ৭০ ধারার মতো গণতান্ত্রিক নীতি-আদর্শের পরিপন্থি একটা ধারা বহাল তবিয়তে থাকতে পারে না। কোন ‘তন্ত্র’ কায়েম হয়েছে, কোন মন্ত্রে দেশ চলছে, তা নিয়ে রাজনীতির ময়দানে টুঁ শব্দটিও নেই। একপক্ষ থাকার জন্য আর এক পক্ষ নামানোর মন্ত্র পাঠ করে যাচ্ছে।

মৌলিক সমস্যা সমাধানে একমাত্র জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের সংসদীয় শাসনব্যবস্থাকে অর্থবহ এবং কার্যকর করার জন্য সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি গণতন্ত্রের স্বার্থে বিপরীতধর্মী ৭০ ধারা অপসারণ কিংবা সংশোধনের কথা বলেছেন।

মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে সংবিধান আমরা অর্জন করেছি, সে সংবিধানকে নানাভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। একজন মাত্র ব্যক্তির ছয় মাসের চাকরির প্রয়োজনেও সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তাহলে সংবিধানের একটি অন্যতম স্তম্ভ গণতন্ত্রের মর্যাদা রাখতে একটি ধারার সংশোধন করে নিতে কোনো বাধা থাকার তো কথা নয়।

যদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটন করতে হয়, তাহলে সংবিধানের ওই ৭০ ধারাকে অপসারণ করতেই হবে-এটা নিশ্চয়ই সব সচেতন মানুষের মনের কথা।

সুনীল শুভরায় : সাংবাদিক ও কলামিস্ট