চাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসে কার লাভ
jugantor
চাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসে কার লাভ

  এস এম নাজের হোসাইন  

১২ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপাদান চাল। আর এ চালের বাজার অস্থির বেশ কয়েক মাস ধরেই। এ অস্থিরতার জন্য খোদ কৃষিমন্ত্রী পর্যন্ত মিলারদের কারসাজিকে দায়ী করলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ মিল মালিকরা বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকারি খাদ্য মজুতের ঘাটতিকে পুঁজি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরিসহ সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটছেন।

যদিও গত বছর এ মিলারদের কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে তা আর মাঠে গড়ায়নি। এ বছর উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় বন্যার কারণে সরকারি খাদ্য মজুত কিছুটা কম ছিল। এ সুযোগটি মিলাররা হাতছাড়া করতে রাজি হয়নি। যার কারণে চালের বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ফলে সরকার বাধ্য হয়ে চালের শুল্ক ৬২ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে আনার ঘোষণা দেয় এবং সরকারি উদ্যোগে ১০ লাখ টন আর বেসরকারি উদ্যোগে আরও ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমনের ভরা মৌসুমে চালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনার ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন আসছে, কার স্বার্থে এই শুল্ক কমানো হলো? এর ফল ভোগ করবে কে?

প্রতিবছরই আমরা লক্ষ করে থাকি, কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে রাস্তায় ফসল ফেলে প্রতিবাদ করেন। একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী কৃষকের সবটুকু লাভ শুষে নেন। কৃষকরা আগাম দাদন নিয়ে খেতে সার-বীজসহ অন্যান্য খাতে খরচ করে ফসল ফলালেও প্রকৃত লাভ নিজের ঘরে তুলতে পারেন না। আবার কিছু কৃষক অগ্রিম ফসল বিক্রি করে দেন।

আর এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা তো আছেন। অসময়ে খাদ্যশস্য বিক্রি ও অগ্রিম বিক্রি করার কারণে কৃষক সব সময় ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। কৃষকের স্বার্থরক্ষায় ও তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে প্রকৃত কৃষকের কাছে সহজ শর্তে কৃষিঋণ, শস্যগুদাম স্থাপন, ফসল গুদামজাত করার জন্য হিমাগার স্থাপনসহ নানা দাবি করা হলেও সে বিষয়ে সরকারি তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি।

অধিকন্তু একদিকে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তারা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এর মাঝে কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় প্রতিনিয়তই ভরা মৌসুমে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়। যার কারণে কৃষকরা প্রতিবছরই তাদের উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের ন্যায্য দাম পান না।

চাল নিয়ে বাজারে চালবাজির খবরটি পুরোনো হলেও চালের বাজারে এই ব্যাধির বিস্তার থেমে নেই। মিল মালিক বা আমদানিকারকদের ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার’ চর্চাটি বেশ পুরোনো। আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখীর বিষয়টি ওই অপকৌশলেরই পুনরাবৃত্তি মাত্র। ভোক্তা পর্যায়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে কম শুল্কে আমদানিকৃত চালের মুনাফার অংশও যাবে এই মধ্যস্বত্বভোগীদেরই পকেটে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে যাতে বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, এ জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ সফল করা দরকার ছিল। সরকার গত ৭ নভেম্বর থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করে। গত ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে মাত্র ১৭ হাজার টন। আমনে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে ২ লাখ টন ধান, ৩৭ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

অবশ্য চালকল মালিকদের বেশিরভাগ আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, কেজিপ্রতি ৪১ টাকা না দিলে তাদের পক্ষে চাল দেওয়া সম্ভব নয়। হাতে গোনা কিছু চালকল মালিক সরকারি গুদামে চাল দিচ্ছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সরকারি চালের মজুত দ্রুত কমছে। ২৯ ডিসেম্বর সরকারি গুদামে ৫ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল ছিল।

গত বছর একই সময়ে তা ছিল ১০ লাখ ৬৬ হাজার টন। এবার দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েক জেলায় কয়েক দফা বন্যায় আমন ধান উৎপাদনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে খুব একটা কম হয়নি। জোরদার উদ্যোগ নিলে সংগ্রহ অভিযানে সফল হওয়া যেত। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ক্ষেত্রে সফলতা দেখাতে পারেনি।

এটি সবার জানা, বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকারি গুদামে চালের মজুত যখন কমে যায়, তখন অসাধু মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের পকেট মোটা করেন। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে খাদ্য অধিদপ্তর ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সরকার ধান-চালের যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, মিল মালিকরা সেই নির্ধারিত দামে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে তা বিক্রি করতে সম্মত হননি।

সরকারের সঙ্গে মিল মালিকরা চুক্তি করলেও চুক্তি ভঙ্গের কোনো কৈফিয়তও তলব করা হয়নি। সরকার কৃষকদের থেকে সরাসরি ধান না কিনে মিল মালিক ও ফড়িয়াদের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। ফলে কৃষকও মিল মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। যদিও সরকার কৃষক থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছিলেন; কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির কারণে সরকারের সে উদ্যোগ সফল হতে পারেনি।

ভরা মৌসুমেও চড়া দামে চাল কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সব ধরনের চালের দামই কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫-১০ টাকা। তাতে, বিশেষ করে সাধারণ ও নিু আয়ের মানুষ নাকাল। এখন আবার ভরা মৌসুমে অতিরিক্ত আমদানি হলে কৃষক ধানের ন্যায্য দাম পাবেন না। করোনা দুর্যোগের কারণে বিশ্ববাজারে সব ধরনের খাদ্যশস্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ; যার মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্য ৩ কোটি ৫৫ লাখ এবং এদের মধ্যে অতি দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। এ পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দারিদ্র্যের হার কমলেও সংখ্যাগত দিক থেকে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা খুব কমেনি।

উল্লেখ্য, দৈনিক ১ হাজার ৮০৫ কিলোক্যালরি খাদ্য কিনতে পারে না, এমন জনগোষ্ঠী অতি দরিদ্র এবং দৈনিক ২ হাজার ১২২ কিলোক্যালরি খাদ্য কিনতে পারে না, এমন মানুষ দরিদ্র। প্রতিদিন প্রয়োজনীয় খাদ্য না পাওয়ার কারণে তাদের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হয় না।

কৃষিবান্ধব নীতিমালার ব্যাপারে সরকারের কৃতিত্ব থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনা কিংবা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই সুফলবঞ্চিত। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীরাই সবটুকু ফায়দা লুটছে। মধ্যস্বত্বভোগী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সহায়ক এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া অনুচিত।

ভরা মৌসুমে চাল আমদানি ও আমদানিকৃত চালের শুল্ক কমানোকে ভোক্তা স্বার্থ বিবেচনায় আমলে নেওয়া হয়নি বলে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। কারণ, শুল্ক কমানো হলেও ভোক্তারা তার সুফল পায় না। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা এর পুরোটাই পকেটস্থ করেন। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক চালের মূল্য বৃদ্ধির কারসাজি যেসব কারণে হয়ে আসছে, তা কারও অজানা নয়।

তবে এ পরিস্থিতিতে কৃষক ও ভোক্তাদের বঞ্চনা-হতাশার বিষয়গুলোর প্রতিকার আবশ্যক। একইসঙ্গে দেশীয় ধান-চাল ক্রয়ে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। মিল মালিকদের কাছ থেকে নয়, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কিনতে হবে।

সরকারি উদ্যোগে আমদানিকৃত চালের প্রথম চালান ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। আমদানিকৃত চাল খালাস ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতে বিলম্ব হলে ভোক্তারা উপকৃত হবে না। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যখনই কোনো পণ্যের দাম বাড়ে; তখন বন্দর থেকে খালাস ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণে অহেতুক বিলম্ব করে জনগণের পকেট কাটা হয়। হ্রাসকৃত শুল্কে আমদানি করা চাল নিয়ে যাতে আবার নয়ছয় পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে।

ঘাটতি বা সংকট সামাল দিতে যেসব দেশ থেকে চাল আমদানি করা হয়, তারাও সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেয়-এ অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে।

অতিরিক্ত আমদানি যেমন কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; আবার চাহিদানুযায়ী বাজারে সমভাবে জোগান না দিতে পারলে ভোক্তাদেরও বিড়ম্বনার অবসান হবে না। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা, খাদ্যপণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি যথাযথভাবে সমন্বিত নজরদারি ও তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এস এম নাজের হোসাইন : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

cabbd.nazer@gmail.com

চাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাসে কার লাভ

 এস এম নাজের হোসাইন 
১২ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপাদান চাল। আর এ চালের বাজার অস্থির বেশ কয়েক মাস ধরেই। এ অস্থিরতার জন্য খোদ কৃষিমন্ত্রী পর্যন্ত মিলারদের কারসাজিকে দায়ী করলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ মিল মালিকরা বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকারি খাদ্য মজুতের ঘাটতিকে পুঁজি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরিসহ সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটছেন।

যদিও গত বছর এ মিলারদের কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে তা আর মাঠে গড়ায়নি। এ বছর উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় বন্যার কারণে সরকারি খাদ্য মজুত কিছুটা কম ছিল। এ সুযোগটি মিলাররা হাতছাড়া করতে রাজি হয়নি। যার কারণে চালের বাজার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ফলে সরকার বাধ্য হয়ে চালের শুল্ক ৬২ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে আনার ঘোষণা দেয় এবং সরকারি উদ্যোগে ১০ লাখ টন আর বেসরকারি উদ্যোগে আরও ১০ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমনের ভরা মৌসুমে চালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনার ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন আসছে, কার স্বার্থে এই শুল্ক কমানো হলো? এর ফল ভোগ করবে কে?

প্রতিবছরই আমরা লক্ষ করে থাকি, কৃষকরা ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে রাস্তায় ফসল ফেলে প্রতিবাদ করেন। একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী কৃষকের সবটুকু লাভ শুষে নেন। কৃষকরা আগাম দাদন নিয়ে খেতে সার-বীজসহ অন্যান্য খাতে খরচ করে ফসল ফলালেও প্রকৃত লাভ নিজের ঘরে তুলতে পারেন না। আবার কিছু কৃষক অগ্রিম ফসল বিক্রি করে দেন।

আর এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ারা তো আছেন। অসময়ে খাদ্যশস্য বিক্রি ও অগ্রিম বিক্রি করার কারণে কৃষক সব সময় ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। কৃষকের স্বার্থরক্ষায় ও তাদের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে প্রকৃত কৃষকের কাছে সহজ শর্তে কৃষিঋণ, শস্যগুদাম স্থাপন, ফসল গুদামজাত করার জন্য হিমাগার স্থাপনসহ নানা দাবি করা হলেও সে বিষয়ে সরকারি তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি।

অধিকন্তু একদিকে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভোক্তারা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এর মাঝে কৃষি, খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় প্রতিনিয়তই ভরা মৌসুমে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়। যার কারণে কৃষকরা প্রতিবছরই তাদের উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের ন্যায্য দাম পান না।

চাল নিয়ে বাজারে চালবাজির খবরটি পুরোনো হলেও চালের বাজারে এই ব্যাধির বিস্তার থেমে নেই। মিল মালিক বা আমদানিকারকদের ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার’ চর্চাটি বেশ পুরোনো। আমনের ভরা মৌসুমে চালের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখীর বিষয়টি ওই অপকৌশলেরই পুনরাবৃত্তি মাত্র। ভোক্তা পর্যায়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে কম শুল্কে আমদানিকৃত চালের মুনাফার অংশও যাবে এই মধ্যস্বত্বভোগীদেরই পকেটে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে যাতে বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, এ জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ সফল করা দরকার ছিল। সরকার গত ৭ নভেম্বর থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করে। গত ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগ্রহ করেছে মাত্র ১৭ হাজার টন। আমনে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে ২ লাখ টন ধান, ৩৭ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

অবশ্য চালকল মালিকদের বেশিরভাগ আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, কেজিপ্রতি ৪১ টাকা না দিলে তাদের পক্ষে চাল দেওয়া সম্ভব নয়। হাতে গোনা কিছু চালকল মালিক সরকারি গুদামে চাল দিচ্ছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সরকারি চালের মজুত দ্রুত কমছে। ২৯ ডিসেম্বর সরকারি গুদামে ৫ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল ছিল।

গত বছর একই সময়ে তা ছিল ১০ লাখ ৬৬ হাজার টন। এবার দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েক জেলায় কয়েক দফা বন্যায় আমন ধান উৎপাদনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে খুব একটা কম হয়নি। জোরদার উদ্যোগ নিলে সংগ্রহ অভিযানে সফল হওয়া যেত। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ক্ষেত্রে সফলতা দেখাতে পারেনি।

এটি সবার জানা, বেশ কয়েক বছর ধরেই সরকারি গুদামে চালের মজুত যখন কমে যায়, তখন অসাধু মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের পকেট মোটা করেন। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে খাদ্য অধিদপ্তর ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সরকার ধান-চালের যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, মিল মালিকরা সেই নির্ধারিত দামে খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে তা বিক্রি করতে সম্মত হননি।

সরকারের সঙ্গে মিল মালিকরা চুক্তি করলেও চুক্তি ভঙ্গের কোনো কৈফিয়তও তলব করা হয়নি। সরকার কৃষকদের থেকে সরাসরি ধান না কিনে মিল মালিক ও ফড়িয়াদের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। ফলে কৃষকও মিল মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। যদিও সরকার কৃষক থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছিলেন; কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির কারণে সরকারের সে উদ্যোগ সফল হতে পারেনি।

ভরা মৌসুমেও চড়া দামে চাল কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সব ধরনের চালের দামই কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫-১০ টাকা। তাতে, বিশেষ করে সাধারণ ও নিু আয়ের মানুষ নাকাল। এখন আবার ভরা মৌসুমে অতিরিক্ত আমদানি হলে কৃষক ধানের ন্যায্য দাম পাবেন না। করোনা দুর্যোগের কারণে বিশ্ববাজারে সব ধরনের খাদ্যশস্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ; যার মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্য ৩ কোটি ৫৫ লাখ এবং এদের মধ্যে অতি দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। এ পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দারিদ্র্যের হার কমলেও সংখ্যাগত দিক থেকে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা খুব কমেনি।

উল্লেখ্য, দৈনিক ১ হাজার ৮০৫ কিলোক্যালরি খাদ্য কিনতে পারে না, এমন জনগোষ্ঠী অতি দরিদ্র এবং দৈনিক ২ হাজার ১২২ কিলোক্যালরি খাদ্য কিনতে পারে না, এমন মানুষ দরিদ্র। প্রতিদিন প্রয়োজনীয় খাদ্য না পাওয়ার কারণে তাদের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হয় না।

কৃষিবান্ধব নীতিমালার ব্যাপারে সরকারের কৃতিত্ব থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনা কিংবা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই সুফলবঞ্চিত। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীরাই সবটুকু ফায়দা লুটছে। মধ্যস্বত্বভোগী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সহায়ক এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া অনুচিত।

ভরা মৌসুমে চাল আমদানি ও আমদানিকৃত চালের শুল্ক কমানোকে ভোক্তা স্বার্থ বিবেচনায় আমলে নেওয়া হয়নি বলে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। কারণ, শুল্ক কমানো হলেও ভোক্তারা তার সুফল পায় না। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা এর পুরোটাই পকেটস্থ করেন। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক চালের মূল্য বৃদ্ধির কারসাজি যেসব কারণে হয়ে আসছে, তা কারও অজানা নয়।

তবে এ পরিস্থিতিতে কৃষক ও ভোক্তাদের বঞ্চনা-হতাশার বিষয়গুলোর প্রতিকার আবশ্যক। একইসঙ্গে দেশীয় ধান-চাল ক্রয়ে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। মিল মালিকদের কাছ থেকে নয়, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল কিনতে হবে।

সরকারি উদ্যোগে আমদানিকৃত চালের প্রথম চালান ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। আমদানিকৃত চাল খালাস ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতে বিলম্ব হলে ভোক্তারা উপকৃত হবে না। আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যখনই কোনো পণ্যের দাম বাড়ে; তখন বন্দর থেকে খালাস ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণে অহেতুক বিলম্ব করে জনগণের পকেট কাটা হয়। হ্রাসকৃত শুল্কে আমদানি করা চাল নিয়ে যাতে আবার নয়ছয় পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে।

ঘাটতি বা সংকট সামাল দিতে যেসব দেশ থেকে চাল আমদানি করা হয়, তারাও সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেয়-এ অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে।

অতিরিক্ত আমদানি যেমন কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; আবার চাহিদানুযায়ী বাজারে সমভাবে জোগান না দিতে পারলে ভোক্তাদেরও বিড়ম্বনার অবসান হবে না। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা, খাদ্যপণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি যথাযথভাবে সমন্বিত নজরদারি ও তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এস এম নাজের হোসাইন : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

cabbd.nazer@gmail.com