মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন কেন
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন কেন

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

১৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কলাম লেখক সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল

প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নিয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন।

এ বৈঠক সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন সচিবের দেওয়া বক্তব্যে যেসব বিষয় ফুটে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: এক. কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি বৃদ্ধি।

জনপ্রশাসন সচিব বলেছেন, প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা অনেক বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। যে কারণে তাকে প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে বিভাগীয় মামলা শুনতে হচ্ছে। অনেকে আবার এসব অপরাধ থেকে বাঁচতে নানাভাবে তদবির করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও করেন।

তিনি আরও বলেন, যেসব পদে দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি, সেসব পদে পোস্টিং পাওয়া কোনো কর্মকর্তাকে কমবেশি এক বছরের মধ্যে বদলি করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এসি ল্যান্ড হিসেবে পোস্টিং পাওয়া এক কর্মকর্তাকে এক বছরের মাথায় বদলি করা হলে সেই কর্মকর্তা ফেসবুকে তার ক্ষোভের কথা লেখেন বলে সচিব উল্লেখ করেন। দুই. মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঢাকায় বদলির তদবির।

অনুমোদিত পদের তুলনায় প্রশাসনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও মাঠ প্রশাসনের অধিকাংশ কর্মকর্তা ঢাকায় থাকার জন্য তদবির করেন। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সচিব মাঠ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার উদাহরণ তুলে ধরেন। ওই কর্মকর্তার ঢাকায় পোস্টিং চাওয়ার কারণ তিনি তার ব্যাচের সভাপতি এবং তাকে তার ব্যাচের অনেক কাজ করতে হয়। তিন. আত্মপ্রচারের নেশা।

মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার আত্মপ্রচারের নেশা রয়েছে। রুটিন কাজ করে তারা তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন। এ প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তার ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শন করে ফেসবুকে ছবি দেওয়ার কথা সচিব উল্লেখ করেন। তা ছাড়া মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাকে বেসরকারি টেলিভিশনে বক্তব্য প্রদান এবং টেলিভিশন টকশোয় অংশগ্রহণে খুব আগ্রহী দেখা যায় বলে সচিব উল্লেখ করেন।

দেশে যারা সাবেক সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এবং বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, দু-চারজন বাদে তারা সবাই এসেছেন সাবেক সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি), সাবেক ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (ইপিসিএস) এবং বর্তমান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস-প্রশাসন (বিসিএস-প্রশাসন) থেকে। তারা সবাই ছিলেন মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কাজে প্রচুর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা।

বর্তমান সচিবও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা। দেশের প্রায় পাঁচ দশক সময়কালে এ মন্ত্রণালয়ের কোনো সচিব ইতঃপূর্বে নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন বলে মনে পড়ে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন কেন? সরকারি কর্মচারী বিধিমালার প্রতি তারা অবজ্ঞা প্রকাশ করছেন কেন? প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেক বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং সরকারি কর্মচারী বিধিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের একাধিক কারণ থাকলেও মূল কারণ হলো প্রশাসনের দলীয়করণ।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে প্রশাসন দলীয়করণের বীজ রোপিত হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকারের পতন হলে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয় এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।

সরকার গঠনের এক বছর পার না হতেই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করতে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের সময় তা কাজে লাগাতে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার প্রয়োজনীয় শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে সাতশর বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়।

একসঙ্গে সচিবালয়ে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদে এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে এর আগে পদোন্নতি প্রদানের নজির ছিল না। শূন্যপদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া যায় না-প্রশাসনিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত এ নিয়মটির এখানে ব্যত্যয় ঘটানো হয়।

১৯৯২ সালে বিএনপি প্রয়োজনীয় শূন্যপদ ছাড়াই দলীয় স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে গণপদোন্নতির যে নজির সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা যত্নসহকারে অনুসরণ করে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার প্রশাসনে দলীয়করণের গতিকে আরও জোরদার করে। বিএনপির আদর্শ ও ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতি প্রদানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য পদোন্নতি বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়।

২০০৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার তাদের দলের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের কারণে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি।

সেনাবাহিনী সমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয়করণে বিএনপির সৃষ্ট রেকর্ড ভেঙে ফেলে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের হয় পদোন্নতিবঞ্চিত, না হয় ওএসডি করা হয়, অথবা বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী ও দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং বিএনপির শাসনামলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো অনেক কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে পদোন্নতি প্রদানসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে বিএনপি সরকারের আমলে প্রশাসন দলীয়করণে রোপিত চারাগাছ আওয়ামী লীগের একটানা ১২ বছরের শাসনামলে (২০০৯-২০২০) বড় হয়ে এখন মহিরুহে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের বেসামরিক প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের আনুকূল্যে অপ্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে দলটির অনুরক্ত হয়ে পড়েছেন। যারা আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী নন কিংবা দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল নন, তারাও চাকরি রক্ষার খাতিরে বাহ্যত দলটির সমর্থক বনে গেছেন।

সাধারণভাবে প্রশাসন দলীয়করণ করা হলেও মাঠ প্রশাসনে দলীয়করণের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। এর মূল কারণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা। আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করলেও কমিশনের পক্ষে এ নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠ প্রশাসন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা জেলা প্রশাসককে (ডিসি) রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ প্রদান একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অবশ্য তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাই এ দায়িত্ব পালনে তাদেরকে অনেকটা অপরিহার্য করে তুলেছে। অনুরূপভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায়ও মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা মুখ্য। দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অন্তর্র্বর্তীকালীন ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের অধীন অনুষ্ঠিত ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলগুলো নির্বাচনে তাদের জয় নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনকে ব্যবহার করে থাকে।

গত এক দশকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয়। শাসক দলের স্বার্থ রক্ষার্থে মাঠ প্রশাসনের অপরিহার্যতা বুঝতে পেরে অনেক কর্মকর্তা তাদের স্বার্থ হাসিলে ক্ষমতাসীন দল ও দলের নেতাদের ব্যবহার করেন। দলবাজ কর্মকর্তারা হয়ে ওঠেন দুর্নীতিবাজ।

একজন সরকারি কর্মচারীর আচরণ ও জীবনধারা কেমন হবে, তা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এ সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক সরকারি কর্মচারী (এখানে কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) এ বিধিমালা অনুসরণে উদাসীন থাকেন। সরকারি কর্মচারী বিধিমালা পালনে সরকার থেকে মাঝে মাঝে নির্দেশ জারি করা হলেও অনেক সরকারি কর্মচারী তা তেমন আমলে নেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত রয়েছে। ‘সরকারি কর্মচারীরা যেন আচরণবিধি ভুলে না যান’ শিরোনামে আমার একটি লেখা ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই নিবন্ধে আমি বলতে চেয়েছি, অনেক সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে উচ্চ পদমর্যাদার অনেক কর্মকর্তা তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলে কীভাবে শাসক দলের রাজনৈতিক ভাবাদর্শের বাহ্যিক অনুসারী হয়ে পড়ছেন এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন।

সবশেষে বলতে চাই, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নিয়ে খোলামেলা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন প্রশাসনে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ। তবে কনিষ্ঠ সহকর্মীদের অকর্মকর্তাসুলভ আচরণ থেকে ফেরানোর দায়িত্বও তার। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মনে রাখতে হবে, দলীয় সরকার আসবে, যাবে; কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে প্রশাসন ব্যবস্থাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাদের।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন কেন

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কলাম লেখক সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল
কলাম লেখক সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল

প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নিয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন।

এ বৈঠক সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন সচিবের দেওয়া বক্তব্যে যেসব বিষয় ফুটে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: এক. কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি বৃদ্ধি।

জনপ্রশাসন সচিব বলেছেন, প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা অনেক বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। যে কারণে তাকে প্রতিদিন অস্বাভাবিক হারে বিভাগীয় মামলা শুনতে হচ্ছে। অনেকে আবার এসব অপরাধ থেকে বাঁচতে নানাভাবে তদবির করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও করেন।

তিনি আরও বলেন, যেসব পদে দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি, সেসব পদে পোস্টিং পাওয়া কোনো কর্মকর্তাকে কমবেশি এক বছরের মধ্যে বদলি করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। এসি ল্যান্ড হিসেবে পোস্টিং পাওয়া এক কর্মকর্তাকে এক বছরের মাথায় বদলি করা হলে সেই কর্মকর্তা ফেসবুকে তার ক্ষোভের কথা লেখেন বলে সচিব উল্লেখ করেন। দুই. মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঢাকায় বদলির তদবির।

অনুমোদিত পদের তুলনায় প্রশাসনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও মাঠ প্রশাসনের অধিকাংশ কর্মকর্তা ঢাকায় থাকার জন্য তদবির করেন। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সচিব মাঠ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার উদাহরণ তুলে ধরেন। ওই কর্মকর্তার ঢাকায় পোস্টিং চাওয়ার কারণ তিনি তার ব্যাচের সভাপতি এবং তাকে তার ব্যাচের অনেক কাজ করতে হয়। তিন. আত্মপ্রচারের নেশা।

মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার আত্মপ্রচারের নেশা রয়েছে। রুটিন কাজ করে তারা তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন। এ প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তার ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শন করে ফেসবুকে ছবি দেওয়ার কথা সচিব উল্লেখ করেন। তা ছাড়া মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাকে বেসরকারি টেলিভিশনে বক্তব্য প্রদান এবং টেলিভিশন টকশোয় অংশগ্রহণে খুব আগ্রহী দেখা যায় বলে সচিব উল্লেখ করেন।

দেশে যারা সাবেক সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এবং বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, দু-চারজন বাদে তারা সবাই এসেছেন সাবেক সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি), সাবেক ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (ইপিসিএস) এবং বর্তমান বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস-প্রশাসন (বিসিএস-প্রশাসন) থেকে। তারা সবাই ছিলেন মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কাজে প্রচুর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা।

বর্তমান সচিবও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ে কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা। দেশের প্রায় পাঁচ দশক সময়কালে এ মন্ত্রণালয়ের কোনো সচিব ইতঃপূর্বে নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন বলে মনে পড়ে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন কেন? সরকারি কর্মচারী বিধিমালার প্রতি তারা অবজ্ঞা প্রকাশ করছেন কেন? প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেক বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং সরকারি কর্মচারী বিধিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের একাধিক কারণ থাকলেও মূল কারণ হলো প্রশাসনের দলীয়করণ।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে প্রশাসন দলীয়করণের বীজ রোপিত হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকারের পতন হলে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয় এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে।

সরকার গঠনের এক বছর পার না হতেই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করতে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের সময় তা কাজে লাগাতে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার প্রয়োজনীয় শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে সাতশর বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়।

একসঙ্গে সচিবালয়ে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদে এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে এর আগে পদোন্নতি প্রদানের নজির ছিল না। শূন্যপদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া যায় না-প্রশাসনিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত এ নিয়মটির এখানে ব্যত্যয় ঘটানো হয়।

১৯৯২ সালে বিএনপি প্রয়োজনীয় শূন্যপদ ছাড়াই দলীয় স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে গণপদোন্নতির যে নজির সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা যত্নসহকারে অনুসরণ করে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার প্রশাসনে দলীয়করণের গতিকে আরও জোরদার করে। বিএনপির আদর্শ ও ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতি প্রদানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য পদোন্নতি বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়।

২০০৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার তাদের দলের প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের কারণে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি।

সেনাবাহিনী সমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয়করণে বিএনপির সৃষ্ট রেকর্ড ভেঙে ফেলে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের হয় পদোন্নতিবঞ্চিত, না হয় ওএসডি করা হয়, অথবা বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী ও দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং বিএনপির শাসনামলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো অনেক কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে পদোন্নতি প্রদানসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে বিএনপি সরকারের আমলে প্রশাসন দলীয়করণে রোপিত চারাগাছ আওয়ামী লীগের একটানা ১২ বছরের শাসনামলে (২০০৯-২০২০) বড় হয়ে এখন মহিরুহে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের বেসামরিক প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের আনুকূল্যে অপ্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে দলটির অনুরক্ত হয়ে পড়েছেন। যারা আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী নন কিংবা দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল নন, তারাও চাকরি রক্ষার খাতিরে বাহ্যত দলটির সমর্থক বনে গেছেন।

সাধারণভাবে প্রশাসন দলীয়করণ করা হলেও মাঠ প্রশাসনে দলীয়করণের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। এর মূল কারণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা। আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করলেও কমিশনের পক্ষে এ নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠ প্রশাসন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা জেলা প্রশাসককে (ডিসি) রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ প্রদান একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অবশ্য তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাই এ দায়িত্ব পালনে তাদেরকে অনেকটা অপরিহার্য করে তুলেছে। অনুরূপভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায়ও মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা মুখ্য। দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অন্তর্র্বর্তীকালীন ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের অধীন অনুষ্ঠিত ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলগুলো নির্বাচনে তাদের জয় নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনকে ব্যবহার করে থাকে।

গত এক দশকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয়। শাসক দলের স্বার্থ রক্ষার্থে মাঠ প্রশাসনের অপরিহার্যতা বুঝতে পেরে অনেক কর্মকর্তা তাদের স্বার্থ হাসিলে ক্ষমতাসীন দল ও দলের নেতাদের ব্যবহার করেন। দলবাজ কর্মকর্তারা হয়ে ওঠেন দুর্নীতিবাজ।

একজন সরকারি কর্মচারীর আচরণ ও জীবনধারা কেমন হবে, তা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এ সুস্পষ্টভাবে বলা আছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, অনেক সরকারি কর্মচারী (এখানে কর্মচারী বলতে কর্মকর্তাকেও বোঝাবে) এ বিধিমালা অনুসরণে উদাসীন থাকেন। সরকারি কর্মচারী বিধিমালা পালনে সরকার থেকে মাঝে মাঝে নির্দেশ জারি করা হলেও অনেক সরকারি কর্মচারী তা তেমন আমলে নেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত রয়েছে। ‘সরকারি কর্মচারীরা যেন আচরণবিধি ভুলে না যান’ শিরোনামে আমার একটি লেখা ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই নিবন্ধে আমি বলতে চেয়েছি, অনেক সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে উচ্চ পদমর্যাদার অনেক কর্মকর্তা তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলে কীভাবে শাসক দলের রাজনৈতিক ভাবাদর্শের বাহ্যিক অনুসারী হয়ে পড়ছেন এবং সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন।

সবশেষে বলতে চাই, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নিয়ে খোলামেলা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন প্রশাসনে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ। তবে কনিষ্ঠ সহকর্মীদের অকর্মকর্তাসুলভ আচরণ থেকে ফেরানোর দায়িত্বও তার। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মনে রাখতে হবে, দলীয় সরকার আসবে, যাবে; কিন্তু দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে প্রশাসন ব্যবস্থাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাদের।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com