করোনাক্রান্ত অর্থনীতিকে বাঁচাতে চাই ‘নিবিড় পরিচর্যা’
jugantor
করোনাক্রান্ত অর্থনীতিকে বাঁচাতে চাই ‘নিবিড় পরিচর্যা’

  খন্দকার হাসনাত করিম  

১৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সর্বনাশা করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে কেবল লাখ লাখ মানুষের প্রাণই হরণ করেনি, সেইসঙ্গে হরণ করেছে জীবিত ও অবরুদ্ধ কোটি কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন নিয়ে বাঁচার আশাও।

এ ব্যাধির প্রকোপ বিগত শতাব্দীগুলোর প্লেগ, গুটিবসন্ত, কলেরা, ম্যালেরিয়ার মতো রোগগুলোর আঘাতকেও ছাপিয়ে গেছে। অর্থনীতিতেও এ অসুখের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সব আভাস-অনুমানকে ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পিছিয়ে থাকা এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতিগুলোর। বিদেশে চলছে লকডাউন। তাই ক্রেতা কমে গেছে। কমে গেছে তাদের আমদানিও।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের দুর্দশা তাই ব্যাখ্যা করে বলার দরকার হয় না। দরকার হয় না পোশাকশিল্পমুখী বস্ত্র, অ্যাক্সেসরিজ, বোর্ড, জাহাজীকরণ, অভ্যন্তরীণ পরিবহণ, বিশেষ করে পোশাক খাতে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কথাও।

শুধু পোশাকশিল্পের কথাই বা বলি কেন, চা, চামড়া, মাছ, পাট ও পাটের তৈরি জিনিসপত্র, সুতা, হস্তশিল্প-এসবের রপ্তানি বাজারেও মস্ত বড় ধস নেমেছে; আরও নামবে। ইউরোপে ও উত্তর আমেরিকায় করোনার বিস্তার নতুন করে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এর দ্বিতীয় ঢেউটা প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও ভয়াল বলে মনে হচ্ছে।

মৃত্যু, সংক্রমণ এবং টিকার অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে জগৎজুড়ে মহামারি দেখা দিয়েছে। কী হয় তা কেবল মাবুদই জানেন। রপ্তানিমুখী অর্থনীতির বিপদ কীভাবে কাটবে, তা ভেবে দিশা পাচ্ছেন না গবেষক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা।

ভরা করোনাকালেও আমরা ২০২০-এ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। কেননা, হাজার বিধিনিষেধ থাকলেও লকডাউন ও ছুটির কালে কৃষি উৎপাদন, বেচা-বিক্রি, পরিবহণ, এমনকি সাবধানতা মেনে গণপরিবহণ ব্যবহারেও দেশবাসীকে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। ফলে নিত্যপণ্যের জোগান বলা চলে স্বাভাবিকই ছিল। সেই স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই নতুন বছরটা শুরু হয়েছে।

শিল্প খাতে সরকারি প্রণোদনা নিয়ে বিস্তর ঘাপলা ও জট-জটিলতা আছে, যা কাটার কোনো লক্ষণ নেই। তবে অস্বাভাবিক কষ্টসহা ও মাজা সোজা করে দাঁড়ানোর হিম্মতসম্পন্ন এ জাতিকে একেবারে সর্বস্বান্ত হতে হয়নি। বিপদে পড়েছে কেবল রপ্তানি খাত এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কায়কারবার।

সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ নেহাত কম ছিল না। ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ তো আর মুখের কথা নয়। কিন্তু কই, ক’জন সত্যিকারের ভুক্তভোগী পেয়েছেন প্রণোদনার অর্থ? সার্বিকভাবে দেশের গড় উৎপাদন, ভোগ, রপ্তানি (এবং আমদানিও), বিনিয়োগ, কাজকর্ম, ব্যাংকিং, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ-এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গতি যা থাকার কথা ছিল, নেমেছে তার অর্ধেকে।

২০২০-এর ধাক্কা অবধারিতভাবে গিয়ে লাগবে চলতি সালে এবং একত্রে তারা হানা দেবে ২০২২-এর ওপর। এ হলো যেন পরমাণু চুল্লির ‘চেইন রিঅ্যাকশন’! সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এবং হয়ে চলেছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে। স্বাস্থ্যখাত কার্যত দেউলিয়া। কী এক ভঙ্গুর বাঁশের সাঁকোর মতো নড়বড়ে অবস্থায় স্বাস্থ্যখাত ছিল, করোনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

প্রণোদনার প্রধান হকদার অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি বা মধ্যম আকারের শিল্প কারখানাগুলো। এরা কেবল দেশের ভেতরকার বেকারত্ব ঘুচিয়ে ভোক্তার চাহিদাই পূরণ করছে না; রপ্তানিমুখী শিল্পের সহযোগী জোগানদার হিসেবে এরা বরাবরই বড় ভূমিকা পালন করে চলেছে। ছোট ছোট ওয়াশ প্ল্যান্টগুলোয় ধোয়া হচ্ছে রপ্তানির তৈরি পোশাক, তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের অ্যাক্সেসরিজ।

ছোট ছোট চুল্লিতে দাহ হচ্ছে বাংলার পাটখড়ি, রপ্তানি হচ্ছে এর কোমল কয়লা ও ছাই। ছোট উদ্যোক্তারা বানাচ্ছেন পাটের থলি, ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, জুতা-স্যান্ডেল। জাহাজে করে চলে যাচ্ছে রপ্তানি গন্তব্যে। তৈরি হচ্ছে বাঁশ-বেতের শৌখিন সামগ্রী, পোরসিলিনের পাশাপাশি মাটি ও শুকনো পাতা থেকে তৈরি তৈজস, কাপ, গ্লাস, শোলা ও কাগজের মোড়ক, সেলাই করা চাদর, ফুল তোলা কাঁথা, হাড়গোড়, তেঁতুলের বিচি, মসলা, আচার-জ্যাম-জেলি-আমসত্ত্ব-শুকনো ফল ফলারি, ফুল।

বিদেশে ক্রেতা কমে গেলে এ দেশের উদ্যোক্তাদের কী হবে? আমরা কি তালিম নিচ্ছি অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ তাদের ‘এক্সপোর্ট সাল্পাই চেইন’ ধরে রাখার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? কতখানি দরদ নিয়ে ওই রাষ্ট্রগুলো উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে? কেন দাঁড়াবে না? এসব হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সম্মিলিত উৎপাদনই তো একটি দেশের রপ্তানি পণ্যের একটা বড় অংশ, বিশেষ করে অপ্রচলিত পণ্য খাতে। খেয়াল রাখতে হবে বড় কারখানা প্রণোদনা পাবে, আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যেন ‘পরিহাস’ না পায়।

তারা এমনিতেও অনেক অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য পায়। ব্যাংক তাদের ঋণ দেয় না। অনেকেরই রেহান দেওয়ার মতো সম্পদ-সম্পত্তি নেই। নেই বীমার সুরক্ষা। একটা কাভার্ড ভ্যান লুট হয়ে গেলেই তাদের ব্যবসায় লাটে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের কাঁচামাল আর উপকরণ কিনতে হয় নগদে আর পণ্য বিক্রি করতে হয় বাকিতে। মাঝখানে বিরাজ করে অনিশ্চয়তার এক বিশাল শুভংকরের ফাঁক।

অনেকে বলবেন, তাদের ওপর করের জুলুম নেই। মিথ্যা কথা। এখন তো অধিকাংশ কর উৎসে বা মূল্য সংযোজনেই ধার্য করা থাকে (ভ্যাট বা ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স)। বড় কারখানার মজুরকেও যে বেতন দিতে হয়, অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও প্রায় সমপরিমাণ বেতনই দিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে খেতমজুর বা ছোট কারখানার শ্রমিকের মজুরি বেশি পড়ে। কারণ, তাদের মজুরির সঙ্গে খাওয়াও দিতে হয়।

বড় কারখানা উপকরণ বা অ্যাক্সেসরিজ/কেমিক্যালসামগ্রী নিজেরাই আমদানি করে। তাতে তাদের খরচ কম পড়ে এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা থাকে না। ছোট উদ্যোক্তাদের সেসব জিনিসই বংশাল, চকবাজার, নবাবপুর বা চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে অনেক বেশি দামে খুচরা কিনতে হয়। এসব বিবেচনায় ছোট কারবারিদেরই রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে সুবিবেচনা পাওয়ার হক বেশি।

বিদেশ থেকে উপার্জন (রেমিটেন্স) খাতটিও বিপদের বাইরে থাকছে না। ২০২০ সালে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স এলেও এ মহামারিতে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে এবং আরও কমছে। হুন্ডি ব্যবসায় কমার কারণে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা আসায় হিসাবের অঙ্কে রেমিটেন্স বেশি দেখা যাচ্ছে। হুন্ডিতে এলে কাগজপত্রে দেখানো না গেলেও দেশে টাকা ঠিকই আসত।

কাজেই রেমিটেন্সের সুস্বাস্থ্য নিয়ে সন্তুষ্টির তেমন কোনো কারণ নেই। তাই কর্মসংস্থানের চেষ্টা আপ্রাণভাবে চালাতে হবে। বৈচিত্র্য আনতে হবে শ্রমবাজারে এবং কেবল অদক্ষ শ্রমিকের কাজে এ সুযোগ সীমিত না রেখে দক্ষ কর্মী পাঠানোর কথা ভাবতে হবে।

এ জন্য সেসব লাগসই কর্মক্ষেত্রে আপাতত ট্রেড কোর্স ভিত্তিতে এবং পরে পুরোপুরি প্রকৌশলগত প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে সুদক্ষ কর্মী বাহিনী, যেমনটা করেছে এবং এখনো করছে শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও লাওস।

২০৩৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতিতে পরিণত করার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তাকে বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের ভেতর উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে, রপ্তানি সেই তুলনায় আরও অনেক বাড়াতে হবে। তার মধ্যে যেমন রয়েছে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি বিচিত্র ও বিভিন্ন অপ্রচলিত খাতের পণ্য, তেমনি রয়েছে দক্ষ ও অর্ধদক্ষ জনশক্তি রপ্তানি।

পৃথিবীতে বহু জায়গায় এখনো শিক্ষক, নার্স, মেডিকেল টেকনিশিয়ান, আধুনিক কৃষি কর্মী, দমকল কর্মী, টেক্সটাইল মেশিন অপারেটর, অটোমোবাইল, ডকইয়ার্ড শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পাওয়ার প্ল্যান্ট টেকনিশিয়ান ইত্যাদির মতো স্পেশালাইজড খাতের কর্মী ও দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশে জনসংখ্যা প্রচুর।

তবে দক্ষ কর্মী ও শ্রমিকের সংখ্যা অনেক কম। প্রচলিত শিক্ষা খাতে বেকার শিক্ষিত যুবক সৃষ্টির চেয়ে একটু কম লেখাপড়া জানা হলেও ট্রেড কোর্সে প্রশিক্ষিত দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং এ জন্য ইংরেজি, চীনা, কোরিয়ান, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষায় মোটামুটি পারদর্শী করে এসব প্রশিক্ষিত দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মীর জন্য বিদেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে রেমিটেন্স আশাতীত পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব হবে।

দেশের উন্নয়নে আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের চেয়েও বেশি জরুরি হলো ডিএফআই বা সরাসরি-বেসরকারি খাতে যৌথ বিনিয়োগ এবং যৌথ পরিচালনা। করোনায় এমনিতেই অর্থনীতির মাজা ভেঙে গেছে। অর্থনীতির দেহে বাসা বেঁধেছে নানাবিধ বিমার। তাকে সুস্থ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হলে এ মুহূর্তে আরোগ্যের জন্য প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেডিকেশন।

খন্দকার হাসনাত করিম : সাংবাদিক

করোনাক্রান্ত অর্থনীতিকে বাঁচাতে চাই ‘নিবিড় পরিচর্যা’

 খন্দকার হাসনাত করিম 
১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সর্বনাশা করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে কেবল লাখ লাখ মানুষের প্রাণই হরণ করেনি, সেইসঙ্গে হরণ করেছে জীবিত ও অবরুদ্ধ কোটি কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন নিয়ে বাঁচার আশাও।

এ ব্যাধির প্রকোপ বিগত শতাব্দীগুলোর প্লেগ, গুটিবসন্ত, কলেরা, ম্যালেরিয়ার মতো রোগগুলোর আঘাতকেও ছাপিয়ে গেছে। অর্থনীতিতেও এ অসুখের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সব আভাস-অনুমানকে ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পিছিয়ে থাকা এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতিগুলোর। বিদেশে চলছে লকডাউন। তাই ক্রেতা কমে গেছে। কমে গেছে তাদের আমদানিও।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের দুর্দশা তাই ব্যাখ্যা করে বলার দরকার হয় না। দরকার হয় না পোশাকশিল্পমুখী বস্ত্র, অ্যাক্সেসরিজ, বোর্ড, জাহাজীকরণ, অভ্যন্তরীণ পরিবহণ, বিশেষ করে পোশাক খাতে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের কথাও।

শুধু পোশাকশিল্পের কথাই বা বলি কেন, চা, চামড়া, মাছ, পাট ও পাটের তৈরি জিনিসপত্র, সুতা, হস্তশিল্প-এসবের রপ্তানি বাজারেও মস্ত বড় ধস নেমেছে; আরও নামবে। ইউরোপে ও উত্তর আমেরিকায় করোনার বিস্তার নতুন করে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এর দ্বিতীয় ঢেউটা প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও ভয়াল বলে মনে হচ্ছে।

মৃত্যু, সংক্রমণ এবং টিকার অব্যবস্থাপনা মিলিয়ে জগৎজুড়ে মহামারি দেখা দিয়েছে। কী হয় তা কেবল মাবুদই জানেন। রপ্তানিমুখী অর্থনীতির বিপদ কীভাবে কাটবে, তা ভেবে দিশা পাচ্ছেন না গবেষক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা।

ভরা করোনাকালেও আমরা ২০২০-এ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। কেননা, হাজার বিধিনিষেধ থাকলেও লকডাউন ও ছুটির কালে কৃষি উৎপাদন, বেচা-বিক্রি, পরিবহণ, এমনকি সাবধানতা মেনে গণপরিবহণ ব্যবহারেও দেশবাসীকে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। ফলে নিত্যপণ্যের জোগান বলা চলে স্বাভাবিকই ছিল। সেই স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই নতুন বছরটা শুরু হয়েছে।

শিল্প খাতে সরকারি প্রণোদনা নিয়ে বিস্তর ঘাপলা ও জট-জটিলতা আছে, যা কাটার কোনো লক্ষণ নেই। তবে অস্বাভাবিক কষ্টসহা ও মাজা সোজা করে দাঁড়ানোর হিম্মতসম্পন্ন এ জাতিকে একেবারে সর্বস্বান্ত হতে হয়নি। বিপদে পড়েছে কেবল রপ্তানি খাত এবং রপ্তানিমুখী ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কায়কারবার।

সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ নেহাত কম ছিল না। ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ তো আর মুখের কথা নয়। কিন্তু কই, ক’জন সত্যিকারের ভুক্তভোগী পেয়েছেন প্রণোদনার অর্থ? সার্বিকভাবে দেশের গড় উৎপাদন, ভোগ, রপ্তানি (এবং আমদানিও), বিনিয়োগ, কাজকর্ম, ব্যাংকিং, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ-এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গতি যা থাকার কথা ছিল, নেমেছে তার অর্ধেকে।

২০২০-এর ধাক্কা অবধারিতভাবে গিয়ে লাগবে চলতি সালে এবং একত্রে তারা হানা দেবে ২০২২-এর ওপর। এ হলো যেন পরমাণু চুল্লির ‘চেইন রিঅ্যাকশন’! সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এবং হয়ে চলেছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে। স্বাস্থ্যখাত কার্যত দেউলিয়া। কী এক ভঙ্গুর বাঁশের সাঁকোর মতো নড়বড়ে অবস্থায় স্বাস্থ্যখাত ছিল, করোনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

প্রণোদনার প্রধান হকদার অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি বা মধ্যম আকারের শিল্প কারখানাগুলো। এরা কেবল দেশের ভেতরকার বেকারত্ব ঘুচিয়ে ভোক্তার চাহিদাই পূরণ করছে না; রপ্তানিমুখী শিল্পের সহযোগী জোগানদার হিসেবে এরা বরাবরই বড় ভূমিকা পালন করে চলেছে। ছোট ছোট ওয়াশ প্ল্যান্টগুলোয় ধোয়া হচ্ছে রপ্তানির তৈরি পোশাক, তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের অ্যাক্সেসরিজ।

ছোট ছোট চুল্লিতে দাহ হচ্ছে বাংলার পাটখড়ি, রপ্তানি হচ্ছে এর কোমল কয়লা ও ছাই। ছোট উদ্যোক্তারা বানাচ্ছেন পাটের থলি, ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, জুতা-স্যান্ডেল। জাহাজে করে চলে যাচ্ছে রপ্তানি গন্তব্যে। তৈরি হচ্ছে বাঁশ-বেতের শৌখিন সামগ্রী, পোরসিলিনের পাশাপাশি মাটি ও শুকনো পাতা থেকে তৈরি তৈজস, কাপ, গ্লাস, শোলা ও কাগজের মোড়ক, সেলাই করা চাদর, ফুল তোলা কাঁথা, হাড়গোড়, তেঁতুলের বিচি, মসলা, আচার-জ্যাম-জেলি-আমসত্ত্ব-শুকনো ফল ফলারি, ফুল।

বিদেশে ক্রেতা কমে গেলে এ দেশের উদ্যোক্তাদের কী হবে? আমরা কি তালিম নিচ্ছি অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ তাদের ‘এক্সপোর্ট সাল্পাই চেইন’ ধরে রাখার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে? কতখানি দরদ নিয়ে ওই রাষ্ট্রগুলো উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে? কেন দাঁড়াবে না? এসব হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সম্মিলিত উৎপাদনই তো একটি দেশের রপ্তানি পণ্যের একটা বড় অংশ, বিশেষ করে অপ্রচলিত পণ্য খাতে। খেয়াল রাখতে হবে বড় কারখানা প্রণোদনা পাবে, আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যেন ‘পরিহাস’ না পায়।

তারা এমনিতেও অনেক অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য পায়। ব্যাংক তাদের ঋণ দেয় না। অনেকেরই রেহান দেওয়ার মতো সম্পদ-সম্পত্তি নেই। নেই বীমার সুরক্ষা। একটা কাভার্ড ভ্যান লুট হয়ে গেলেই তাদের ব্যবসায় লাটে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের কাঁচামাল আর উপকরণ কিনতে হয় নগদে আর পণ্য বিক্রি করতে হয় বাকিতে। মাঝখানে বিরাজ করে অনিশ্চয়তার এক বিশাল শুভংকরের ফাঁক।

অনেকে বলবেন, তাদের ওপর করের জুলুম নেই। মিথ্যা কথা। এখন তো অধিকাংশ কর উৎসে বা মূল্য সংযোজনেই ধার্য করা থাকে (ভ্যাট বা ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স)। বড় কারখানার মজুরকেও যে বেতন দিতে হয়, অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও প্রায় সমপরিমাণ বেতনই দিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে খেতমজুর বা ছোট কারখানার শ্রমিকের মজুরি বেশি পড়ে। কারণ, তাদের মজুরির সঙ্গে খাওয়াও দিতে হয়।

বড় কারখানা উপকরণ বা অ্যাক্সেসরিজ/কেমিক্যালসামগ্রী নিজেরাই আমদানি করে। তাতে তাদের খরচ কম পড়ে এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা থাকে না। ছোট উদ্যোক্তাদের সেসব জিনিসই বংশাল, চকবাজার, নবাবপুর বা চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ থেকে অনেক বেশি দামে খুচরা কিনতে হয়। এসব বিবেচনায় ছোট কারবারিদেরই রাষ্ট্রের কাছে, সরকারের কাছে সুবিবেচনা পাওয়ার হক বেশি।

বিদেশ থেকে উপার্জন (রেমিটেন্স) খাতটিও বিপদের বাইরে থাকছে না। ২০২০ সালে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স এলেও এ মহামারিতে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে এবং আরও কমছে। হুন্ডি ব্যবসায় কমার কারণে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা আসায় হিসাবের অঙ্কে রেমিটেন্স বেশি দেখা যাচ্ছে। হুন্ডিতে এলে কাগজপত্রে দেখানো না গেলেও দেশে টাকা ঠিকই আসত।

কাজেই রেমিটেন্সের সুস্বাস্থ্য নিয়ে সন্তুষ্টির তেমন কোনো কারণ নেই। তাই কর্মসংস্থানের চেষ্টা আপ্রাণভাবে চালাতে হবে। বৈচিত্র্য আনতে হবে শ্রমবাজারে এবং কেবল অদক্ষ শ্রমিকের কাজে এ সুযোগ সীমিত না রেখে দক্ষ কর্মী পাঠানোর কথা ভাবতে হবে।

এ জন্য সেসব লাগসই কর্মক্ষেত্রে আপাতত ট্রেড কোর্স ভিত্তিতে এবং পরে পুরোপুরি প্রকৌশলগত প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে সুদক্ষ কর্মী বাহিনী, যেমনটা করেছে এবং এখনো করছে শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও লাওস।

২০৩৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতিতে পরিণত করার যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তাকে বাস্তবায়ন করতে হলে দেশের ভেতর উৎপাদন যেমন বাড়াতে হবে, রপ্তানি সেই তুলনায় আরও অনেক বাড়াতে হবে। তার মধ্যে যেমন রয়েছে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি বিচিত্র ও বিভিন্ন অপ্রচলিত খাতের পণ্য, তেমনি রয়েছে দক্ষ ও অর্ধদক্ষ জনশক্তি রপ্তানি।

পৃথিবীতে বহু জায়গায় এখনো শিক্ষক, নার্স, মেডিকেল টেকনিশিয়ান, আধুনিক কৃষি কর্মী, দমকল কর্মী, টেক্সটাইল মেশিন অপারেটর, অটোমোবাইল, ডকইয়ার্ড শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান, ল্যাব টেকনিশিয়ান, পাওয়ার প্ল্যান্ট টেকনিশিয়ান ইত্যাদির মতো স্পেশালাইজড খাতের কর্মী ও দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশে জনসংখ্যা প্রচুর।

তবে দক্ষ কর্মী ও শ্রমিকের সংখ্যা অনেক কম। প্রচলিত শিক্ষা খাতে বেকার শিক্ষিত যুবক সৃষ্টির চেয়ে একটু কম লেখাপড়া জানা হলেও ট্রেড কোর্সে প্রশিক্ষিত দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং এ জন্য ইংরেজি, চীনা, কোরিয়ান, ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষায় মোটামুটি পারদর্শী করে এসব প্রশিক্ষিত দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মীর জন্য বিদেশে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে রেমিটেন্স আশাতীত পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব হবে।

দেশের উন্নয়নে আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের চেয়েও বেশি জরুরি হলো ডিএফআই বা সরাসরি-বেসরকারি খাতে যৌথ বিনিয়োগ এবং যৌথ পরিচালনা। করোনায় এমনিতেই অর্থনীতির মাজা ভেঙে গেছে। অর্থনীতির দেহে বাসা বেঁধেছে নানাবিধ বিমার। তাকে সুস্থ করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হলে এ মুহূর্তে আরোগ্যের জন্য প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেডিকেশন।

খন্দকার হাসনাত করিম : সাংবাদিক