পিতার স্বপ্ন কন্যার হাতে বাস্তবায়ন
jugantor
পিতার স্বপ্ন কন্যার হাতে বাস্তবায়ন

  মেজর (অব.) সুধীর সাহা  

১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সেই ১৯৪৭-৪৮ সালেই একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। মুসলিম লীগের তরুণ একনিষ্ঠ কর্মী মাত্র তেইশ বছরের মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্রের স্রষ্টা হয়ে ওঠেন। দুই বাংলা সব সময়ই ছিল অবহেলিত। পূর্ববঙ্গ একটু বেশিই ছিল সেই মাপে। পূর্ব বাংলার কদরটি পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকদের কাছে ছিল শুধু বাজার হিসাবে। মানুষগুলোকে তারা সাব-হিউম্যান বলেই মনে করত।

সেই সাব-হিউম্যানদেরই গর্বিত এক নেতার নাম শেখ মুজিব, যিনি প্রথমে ছিলেন বাঙালি এবং তারপর মুসলমান। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী যখন করাচির ক্ষমতার অলিন্দে ভুলপথে ঘোরাফেরা করছেন, পদের মোহে কিছুটা নিমগ্ন একে ফজলুল হক, চীনের ডানায় ভর করতে চাইছেন মওলানা ভাসানী, তখন শেখ মুজিবই নেতা হয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের পাশে দাঁড়ান স্থির বিশ্বাস আর অবিচল নেতৃত্বে। জেল খেটে খেটে হয়ে ওঠেন দৃঢ়চেতা এক জননেতা।

সেই জননেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একসময় এগিয়ে এলেন তারই নিজ কন্যা শেখ হাসিনা। পিতার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর তিনি দেশে ফিরতে পারেননি যথাসময়ে। সময়ের ব্যবধানে একসময় তাকেই গ্রহণ করে নেয় তার বাবার হাতেগড়া রাজনৈতিক দলটি। চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে তাকে অনেক। ভুল-ভ্রান্তিরও পাহাড় জমা হয়েছে তার হাতে।

কিন্তু দৃঢ়তায় যেন তার কোথায় একটু মিল ছিল জাতির পিতার সঙ্গে। পিতার কন্যা হয়ে এলেও তিনি একসময় হয়ে ওঠেন শুধুই শেখ হাসিনা। ভাগ্য যেমন তার পিতার পক্ষে ছিল, তার হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক স্বাধীন দেশ, তেমনি ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল শেখ হাসিনারও।

কাঠখড় অনেক পুড়িয়েও যখন তিনি খেই ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন বিরোধী রাজনীতির ভুলের মাশুলে তিনি হয়ে দাঁড়ালেন একমাত্র ভরসার জায়গা। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াল তার সুযোগ্য নেতৃত্বে। তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হওয়া দেশটির কৃষক সন্তানরা ফসল উৎপাদনে হয়ে উঠল স্বয়ংসম্পূর্ণ।

পরিশ্রমী নারী পোশাক শ্রমিকদের কারণে ক্ষুদ্র বাংলাদেশ আজ গোটা বিশ্বেই পোশাক শিল্পে সুপার পাওয়ার। চীনের পরেই যার নাম জানে বিশ্বজুড়ে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে শিল্পায়িত। জিডিপি বেড়ে চলছে তো চলছেই। ধরাছোঁয়ার নাগালের বাইরে যেন তার অবস্থান।

ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সূচকেও দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কাঁপছে এক নতুন আত্মবিশ্বাসে। আর এ আত্মবিশ্বাসের অতুলনীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে যেদিন বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংক অর্থ না দিলেও আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু বানাব, সেদিন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি; কিন্তু আজ তা বাস্তব।

বিশাল পদ্মা নদীর চেয়েও বিশালতর এক সেতু দক্ষিণ ও মধ্যবঙ্গের দুকূল বেঁধে দিয়েছে চিরকালীন মেলবন্ধনে। বাংলার প্রতি নিদারুণ অবহেলা হয়েছে সব সময়ই। পূর্ব বাংলাকে অবহেলার চোখে দেখেছে পাকিস্তান আর পশ্চিম বাংলাকে অবহেলার চোখে দেখেছে ভারত। পশ্চিম বাংলা এ অবহেলার যথাযথ জবাব এখন পর্যন্ত না দিতে পারলেও পূর্ব বাংলা যা আজকের বিকশিত বাংলাদেশ, যেন শত শত বছরের সেসব অবজ্ঞার বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নিচ্ছে।

আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শপথ নেবেন ২০ জানুয়ারি। তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকার আত্মাকে রক্ষা করতে, জাতির মেরুদণ্ড মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে পুনর্গঠিত করতে, বিশ্বের আঙ্গিনায় আমেরিকাকে ফের সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে এবং দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি নির্বাচনে লড়েছেন।’ মুশকিল হলো, এসবই করার চেয়ে বলা ঢের সোজা।

চূড়া থেকে একবার পিছলে গেলে সেখানে আবার উঠে আসা অসম্ভব না হলেও অনেকটাই কষ্টসাধ্য। গণতন্ত্র, উদারনীতি ও সাম্যের যে মতাদর্শ নিয়ে আমেরিকা এককালে গালভরা বাণী শোনাত, এ মুহূর্তে দুনিয়াকে সেসব বিশ্বাস করানো অনেকটাই কঠিন কাজ। আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তাকে ফেরত পাওয়া সহজ কাজ নয়।

বহুকাল ধরে আমেরিকা তার এ নীতিপরায়ণ ভাবমূর্তিটি ভাঙিয়ে ভূ-রাজনীতিতে অভীষ্ট সিদ্ধির পথে এগিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের হাতে এসে আমেরিকার সেসব গল্পের গাড়ি এখন থমকে গিয়েছে। এ অবস্থায় যেখানে ইউরোপ আত্মসম্মান ফেলে অন্যের তোষামোদে ব্যস্ত, নিজের ঘরে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ও জাতিগত বিভিন্নতা নিয়ে নাজেহাল, সেখানে পৃথিবীর রোল মডেল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতার সিঁড়িতে লাফ মেরে উঠতে চাচ্ছে কিছু স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্র।

যেমন, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং রাশিয়া। কিন্তু এমন ধারা বিকাশে তাদের ভবিষ্যতের আকাশ খুব সম্ভাবনার ছবি উপহার দেবে না বলেই মনে হয়। তাদের গণতন্ত্র, আদর্শ সবকিছুতেই আছে ‘কিন্তু’র ছড়াছড়ি। তাই আজকের পৃথিবী জীর্ণ আদর্শ ও রুগ্ণ ব্যবস্থার ভিড়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। এ বিজনভূমে সত্যিকারের বিকল্প নেতা খুঁজবে আগামী দিনের পৃথিবী।

ভারতের উদয় আশ্বাসজনক। কারণ, ভারতের উদয়ে অন্যান্য শক্তি শঙ্কিত বোধ করবে না। বিশ্বাসের এ জায়গাটার সুবাদে ভারতের সামনে বিশ্বের নৈতিক নেতৃত্বভার তুলে নেওয়ার ভালো সুযোগ রয়েছে। বহুপাক্ষিক নীতি, নিয়মতান্ত্রিক আচরণ, সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভারতকে বিশ্বের সামনে চমৎকারভাবে এগিয়ে ধরতে পারে। ভারতের পাশেই আছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। তাই ভারতের তেমন বিশ্ব পরিচয়ের একটি শক্ত হাত হতে পারে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানটি যদি নড়বড়ে হয়ে না যায়, বর্তমান নেতৃত্ব যদি অক্ষুণ্ন থাকে শেখ হাসিনার মতো সর্বজনসম্মত একজন নেতার হাতে, তবে বাংলাদেশ নিয়েও আশার স্বপ্ন দেখা যায় বইকি! ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা উদারচেতা, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে বিশ্বদরবারে একটি বিশেষ অবস্থান করে নিতে পেরেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয়ই বর্তমানে সেরা রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, আদৌ কি তারা সর্বসাধারণের ‘অধিনায়ক’ হয়ে উঠতে পেরেছেন? উত্তরটা মাল্টিপল চয়েজ বা শূন্যস্থান পূরণের মতো এক কথায় দেওয়া সহজ নয়। কালের কঠিন বিচার হয়তো এমন উত্তর দিতে সহায়তা করবে মানুষকে। তবে এ দুটি দেশ, এ দুজন নেতা একটি সম্ভাবনার উৎস খুঁজে পেতে পারে বিশ্বসমাজে তাদের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে।

সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার ভিত্তিমূলে এবং আগামী পৃথিবীর গ্রহণযোগ্য সহযোগী শক্তি হয়ে আবির্ভাব করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে এবং শেখ হাসিনাকে আরও অনেক দূর যেতে হতে পারে। বাংলাদেশের সামনে স্পষ্ট একটি উদাহরণ আছে পাকিস্তানের।

একসময় পৃথিবীর মানুষ পাকিস্তান নিয়ে স্বপ্ন দেখত; কিন্তু আজকের পাকিস্তান ব্যর্থ রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে শুধু তাদের দেশের জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ আর মৌলবাদকে তারা গ্রহণ করেছিল বলে। বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশকে আরও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে।

গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, সুশাসন আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র আর সমাজ এক বিষয় নয়। পাকিস্তান সময়ে রাষ্ট্রটা ছিল সাম্প্রদায়িক; কিন্তু সমাজ ততটা সাম্প্রদায়িক ছিল না। এখন রাষ্ট্র কিছুটা অসাম্প্রদায়িক হয়েছে; কিন্তু সমাজ হয়ে পড়েছে সাম্প্রদায়িক।

এ ভুলটা করে ফেলেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমাজটাকে ভুল করে ছেড়ে দিয়েছে অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত কিছু মানুষের হাতে। ফলে ইট-কংক্রিটের কিছু উন্নতি ঘটলেও মানুষের মানবিক ও নান্দনিক উন্নতি তেমন ঘটছে না। মুক্তিযুদ্ধের সেই স্বপ্ন, বাংলাদেশ হবে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার রাষ্ট্র।

কিন্তু বাংলদেশে কেউ কেউ আজ মনে করা শুরু করেছে, বাংলাদেশ কেবল এক শ্রেণির মানুষের রাষ্ট্র। তার জন্মের সময়কার ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ থেকে বাংলাদেশের সমাজ অনেকটা সরে এসেছে আজ। সেখানে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা নিজেকে কতটুকু দায়ী ভাবতে পারবেন তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের সমাজে আবার পরিবর্তনের বাতাস বইবে কি না।

বাঙালির জিনের মধ্যেই রয়েছে এক অচিন সোনার বাংলার স্বপ্ন, যে স্বপ্ন আজন্ম তাড়িত করেছে বঙ্গবন্ধুকে। সেই স্বপ্ন স্বয়ং শেখ হাসিনাও দেখেন বইকি! তিনি বরং আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছেন।

তিনি বাবার এবং তার স্বপ্নকে বাংলাদেশের সব মানুষের মনেও ধারণ করাতে পেরেছেন। শেষ সফলতাটুকু নির্ভর করবে বাংলাদেশ মৌলবাদীদের দাপটে ঠিক পাকিস্তানের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে কি না, তার ওপরে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

পিতার স্বপ্ন কন্যার হাতে বাস্তবায়ন

 মেজর (অব.) সুধীর সাহা 
১৮ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সেই ১৯৪৭-৪৮ সালেই একটি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। মুসলিম লীগের তরুণ একনিষ্ঠ কর্মী মাত্র তেইশ বছরের মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্রের স্রষ্টা হয়ে ওঠেন। দুই বাংলা সব সময়ই ছিল অবহেলিত। পূর্ববঙ্গ একটু বেশিই ছিল সেই মাপে। পূর্ব বাংলার কদরটি পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকদের কাছে ছিল শুধু বাজার হিসাবে। মানুষগুলোকে তারা সাব-হিউম্যান বলেই মনে করত।

সেই সাব-হিউম্যানদেরই গর্বিত এক নেতার নাম শেখ মুজিব, যিনি প্রথমে ছিলেন বাঙালি এবং তারপর মুসলমান। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী যখন করাচির ক্ষমতার অলিন্দে ভুলপথে ঘোরাফেরা করছেন, পদের মোহে কিছুটা নিমগ্ন একে ফজলুল হক, চীনের ডানায় ভর করতে চাইছেন মওলানা ভাসানী, তখন শেখ মুজিবই নেতা হয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের পাশে দাঁড়ান স্থির বিশ্বাস আর অবিচল নেতৃত্বে। জেল খেটে খেটে হয়ে ওঠেন দৃঢ়চেতা এক জননেতা।

সেই জননেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একসময় এগিয়ে এলেন তারই নিজ কন্যা শেখ হাসিনা। পিতার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর তিনি দেশে ফিরতে পারেননি যথাসময়ে। সময়ের ব্যবধানে একসময় তাকেই গ্রহণ করে নেয় তার বাবার হাতেগড়া রাজনৈতিক দলটি। চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে তাকে অনেক। ভুল-ভ্রান্তিরও পাহাড় জমা হয়েছে তার হাতে।

কিন্তু দৃঢ়তায় যেন তার কোথায় একটু মিল ছিল জাতির পিতার সঙ্গে। পিতার কন্যা হয়ে এলেও তিনি একসময় হয়ে ওঠেন শুধুই শেখ হাসিনা। ভাগ্য যেমন তার পিতার পক্ষে ছিল, তার হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল এক স্বাধীন দেশ, তেমনি ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল শেখ হাসিনারও।

কাঠখড় অনেক পুড়িয়েও যখন তিনি খেই ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন বিরোধী রাজনীতির ভুলের মাশুলে তিনি হয়ে দাঁড়ালেন একমাত্র ভরসার জায়গা। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াল তার সুযোগ্য নেতৃত্বে। তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হওয়া দেশটির কৃষক সন্তানরা ফসল উৎপাদনে হয়ে উঠল স্বয়ংসম্পূর্ণ।

পরিশ্রমী নারী পোশাক শ্রমিকদের কারণে ক্ষুদ্র বাংলাদেশ আজ গোটা বিশ্বেই পোশাক শিল্পে সুপার পাওয়ার। চীনের পরেই যার নাম জানে বিশ্বজুড়ে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে শিল্পায়িত। জিডিপি বেড়ে চলছে তো চলছেই। ধরাছোঁয়ার নাগালের বাইরে যেন তার অবস্থান।

ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সূচকেও দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কাঁপছে এক নতুন আত্মবিশ্বাসে। আর এ আত্মবিশ্বাসের অতুলনীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে যেদিন বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংক অর্থ না দিলেও আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু বানাব, সেদিন অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি; কিন্তু আজ তা বাস্তব।

বিশাল পদ্মা নদীর চেয়েও বিশালতর এক সেতু দক্ষিণ ও মধ্যবঙ্গের দুকূল বেঁধে দিয়েছে চিরকালীন মেলবন্ধনে। বাংলার প্রতি নিদারুণ অবহেলা হয়েছে সব সময়ই। পূর্ব বাংলাকে অবহেলার চোখে দেখেছে পাকিস্তান আর পশ্চিম বাংলাকে অবহেলার চোখে দেখেছে ভারত। পশ্চিম বাংলা এ অবহেলার যথাযথ জবাব এখন পর্যন্ত না দিতে পারলেও পূর্ব বাংলা যা আজকের বিকশিত বাংলাদেশ, যেন শত শত বছরের সেসব অবজ্ঞার বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নিচ্ছে।

আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শপথ নেবেন ২০ জানুয়ারি। তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকার আত্মাকে রক্ষা করতে, জাতির মেরুদণ্ড মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে পুনর্গঠিত করতে, বিশ্বের আঙ্গিনায় আমেরিকাকে ফের সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে এবং দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি নির্বাচনে লড়েছেন।’ মুশকিল হলো, এসবই করার চেয়ে বলা ঢের সোজা।

চূড়া থেকে একবার পিছলে গেলে সেখানে আবার উঠে আসা অসম্ভব না হলেও অনেকটাই কষ্টসাধ্য। গণতন্ত্র, উদারনীতি ও সাম্যের যে মতাদর্শ নিয়ে আমেরিকা এককালে গালভরা বাণী শোনাত, এ মুহূর্তে দুনিয়াকে সেসব বিশ্বাস করানো অনেকটাই কঠিন কাজ। আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তাকে ফেরত পাওয়া সহজ কাজ নয়।

বহুকাল ধরে আমেরিকা তার এ নীতিপরায়ণ ভাবমূর্তিটি ভাঙিয়ে ভূ-রাজনীতিতে অভীষ্ট সিদ্ধির পথে এগিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের হাতে এসে আমেরিকার সেসব গল্পের গাড়ি এখন থমকে গিয়েছে। এ অবস্থায় যেখানে ইউরোপ আত্মসম্মান ফেলে অন্যের তোষামোদে ব্যস্ত, নিজের ঘরে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ও জাতিগত বিভিন্নতা নিয়ে নাজেহাল, সেখানে পৃথিবীর রোল মডেল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ক্ষমতার সিঁড়িতে লাফ মেরে উঠতে চাচ্ছে কিছু স্বেচ্ছাচারী রাষ্ট্র।

যেমন, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং রাশিয়া। কিন্তু এমন ধারা বিকাশে তাদের ভবিষ্যতের আকাশ খুব সম্ভাবনার ছবি উপহার দেবে না বলেই মনে হয়। তাদের গণতন্ত্র, আদর্শ সবকিছুতেই আছে ‘কিন্তু’র ছড়াছড়ি। তাই আজকের পৃথিবী জীর্ণ আদর্শ ও রুগ্ণ ব্যবস্থার ভিড়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। এ বিজনভূমে সত্যিকারের বিকল্প নেতা খুঁজবে আগামী দিনের পৃথিবী।

ভারতের উদয় আশ্বাসজনক। কারণ, ভারতের উদয়ে অন্যান্য শক্তি শঙ্কিত বোধ করবে না। বিশ্বাসের এ জায়গাটার সুবাদে ভারতের সামনে বিশ্বের নৈতিক নেতৃত্বভার তুলে নেওয়ার ভালো সুযোগ রয়েছে। বহুপাক্ষিক নীতি, নিয়মতান্ত্রিক আচরণ, সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভারতকে বিশ্বের সামনে চমৎকারভাবে এগিয়ে ধরতে পারে। ভারতের পাশেই আছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। তাই ভারতের তেমন বিশ্ব পরিচয়ের একটি শক্ত হাত হতে পারে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানটি যদি নড়বড়ে হয়ে না যায়, বর্তমান নেতৃত্ব যদি অক্ষুণ্ন থাকে শেখ হাসিনার মতো সর্বজনসম্মত একজন নেতার হাতে, তবে বাংলাদেশ নিয়েও আশার স্বপ্ন দেখা যায় বইকি! ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা উদারচেতা, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে বিশ্বদরবারে একটি বিশেষ অবস্থান করে নিতে পেরেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয়ই বর্তমানে সেরা রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, আদৌ কি তারা সর্বসাধারণের ‘অধিনায়ক’ হয়ে উঠতে পেরেছেন? উত্তরটা মাল্টিপল চয়েজ বা শূন্যস্থান পূরণের মতো এক কথায় দেওয়া সহজ নয়। কালের কঠিন বিচার হয়তো এমন উত্তর দিতে সহায়তা করবে মানুষকে। তবে এ দুটি দেশ, এ দুজন নেতা একটি সম্ভাবনার উৎস খুঁজে পেতে পারে বিশ্বসমাজে তাদের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে।

সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার ভিত্তিমূলে এবং আগামী পৃথিবীর গ্রহণযোগ্য সহযোগী শক্তি হয়ে আবির্ভাব করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে এবং শেখ হাসিনাকে আরও অনেক দূর যেতে হতে পারে। বাংলাদেশের সামনে স্পষ্ট একটি উদাহরণ আছে পাকিস্তানের।

একসময় পৃথিবীর মানুষ পাকিস্তান নিয়ে স্বপ্ন দেখত; কিন্তু আজকের পাকিস্তান ব্যর্থ রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে শুধু তাদের দেশের জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ আর মৌলবাদকে তারা গ্রহণ করেছিল বলে। বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশকে আরও অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে।

গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, ভোটের অধিকার, সুশাসন আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র আর সমাজ এক বিষয় নয়। পাকিস্তান সময়ে রাষ্ট্রটা ছিল সাম্প্রদায়িক; কিন্তু সমাজ ততটা সাম্প্রদায়িক ছিল না। এখন রাষ্ট্র কিছুটা অসাম্প্রদায়িক হয়েছে; কিন্তু সমাজ হয়ে পড়েছে সাম্প্রদায়িক।

এ ভুলটা করে ফেলেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সমাজটাকে ভুল করে ছেড়ে দিয়েছে অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত কিছু মানুষের হাতে। ফলে ইট-কংক্রিটের কিছু উন্নতি ঘটলেও মানুষের মানবিক ও নান্দনিক উন্নতি তেমন ঘটছে না। মুক্তিযুদ্ধের সেই স্বপ্ন, বাংলাদেশ হবে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার রাষ্ট্র।

কিন্তু বাংলদেশে কেউ কেউ আজ মনে করা শুরু করেছে, বাংলাদেশ কেবল এক শ্রেণির মানুষের রাষ্ট্র। তার জন্মের সময়কার ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ থেকে বাংলাদেশের সমাজ অনেকটা সরে এসেছে আজ। সেখানে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা নিজেকে কতটুকু দায়ী ভাবতে পারবেন তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের সমাজে আবার পরিবর্তনের বাতাস বইবে কি না।

বাঙালির জিনের মধ্যেই রয়েছে এক অচিন সোনার বাংলার স্বপ্ন, যে স্বপ্ন আজন্ম তাড়িত করেছে বঙ্গবন্ধুকে। সেই স্বপ্ন স্বয়ং শেখ হাসিনাও দেখেন বইকি! তিনি বরং আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছেন।

তিনি বাবার এবং তার স্বপ্নকে বাংলাদেশের সব মানুষের মনেও ধারণ করাতে পেরেছেন। শেষ সফলতাটুকু নির্ভর করবে বাংলাদেশ মৌলবাদীদের দাপটে ঠিক পাকিস্তানের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে কি না, তার ওপরে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

ceo@ilcb.net

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন