রাজনৈতিক দর্শনে আদর্শচ্যুতি
jugantor
রাজনৈতিক দর্শনে আদর্শচ্যুতি

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশার অন্ত নেই। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় আদর্শ এখন আর নির্দিষ্ট করা যায় না। ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ আর ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ ধরনের বাক্য ব্যবহার করে সত্য-মিথ্যা, অতিশয়োক্তি সবকিছু ‘মেধাবী’ রাজনীতিক জায়েজ করে নেন।

আগে মোটা দাগে কতগুলো রাজনৈতিক অঞ্চল নির্দিষ্ট করা হতো। যেমন, বাম আদর্শের রাজনীতি ডানদের সঙ্গে কখনো মিশ খাবে না। এদের মধ্যে বন্ধুত্ব, জোট কোনো কিছু গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। ডানদের ব্যাপারেও তাই। বামের সঙ্গে তেলে-জলে মিশবে না। সে সময় অবশ্য রাজনীতি একটি নিয়মের পথ ধরে এগোতো। যেভাবেই হোক ক্ষমতাপ্রাপ্তির জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামতে হবে রাজনীতিতে তেমন মরিয়াদের সে যুগে আমরা খুব একটা দেখতে পাইনি।

কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর থেকে এ দেশের রাজনৈতিক দর্শনে পরিবর্তন আসতে থাকে। রাজনীতি থেকে অপসৃত হতে থাকে আদর্শ। নীতি-আদর্শ নয়, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াই একমাত্র আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। যেসব দল আদর্শিক অবস্থান ছাড়েনি, তারা একরকম কোণঠাসা হয়ে আছে। বড় দলগুলোয় পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের কদর কমে যেতে থাকে। সে জায়গায় বড় হয়ে দাঁড়ায় অর্থ-বিচার। রাজনীতি চলে যেতে থাকে বণিক আর আমলাদের দখলে। রাতারাতি শুধু রাজনীতিক নন, দলীয় নীতিনির্ধারকও হয়ে যান তারা। এভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো আদর্শহীন হয়ে পড়তে থাকে।

১৯৯৬-এর একটি বিভ্রান্তি এখনো আওয়ামী লীগকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক আদর্শে বেড়ে ওঠা একটি ঐতিহ্যবাহী দল। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে গৌরবের পাখায় উজ্জ্বল পালক লাগিয়েছিল। অথচ সেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতাপ্রাপ্তির পথ পেরোতে অবলীলায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর কৃপা ভিক্ষা করেছিল তখন।

যদিও সেই সম্পর্ক ছিল অল্পদিন স্থায়ী। কিন্তু আদর্শের এ লাঞ্ছনার দায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বিএনপির মতো দল, যারা সামরিক অঞ্চলের আদর্শ থেকে জন্ম নিয়ে শাখা মেলেছিল, বলার অপেক্ষা রাখে না, এ দলই জামায়াতকে পুরোপুরি পুনর্বাসিত করে। বন্ধুত্ব প্রগাঢ় করতে জামায়াতের আদর্শেই নিজেকে প্রায় লীন করে দিয়েছে, সেই বিএনপি নিজেদের জামায়াত বন্ধুত্ব জায়েজ করার জন্য আওয়ামী লীগের জামায়াতসংশিষ্টতার প্রসঙ্গ টেনে আনে সুযোগ পেলেই।

মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদ আর কল্যাণ পার্টির মুক্তিযোদ্ধা নেতা বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতেই পারেন; কিন্তু জামায়াতের সংশিষ্টতা সহ্য করবেন কেন! এসব দৃশ্যও আমাদের দেখতে হয়েছে। কৈশোরে আমাদের অহংকার ছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তার ব্যক্তিগত আদর্শের যখন পরাজয় দেখি, তখন হতাশা গ্রাস করে। রাজনীতির কারণে কতটুকু আপস করা যায়? মৌলিক আদর্শের অপমৃত্যু ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয় না। ভুল পথে হেঁটে রাজনীতির মাঠে প্রায় শূন্য হয়ে গেছেন তিনি।

রাজনীতির ভুল চালে আজ অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছে বিএনপি। সেইসঙ্গে হতাশ জোটবন্ধুরা। লালন বলেছিলেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’ সাপের সঙ্গে বসবাস করা শেষ পর্যন্ত সুখের হয় না। এক সময় সাপুড়েও ছোবল খায়। বহিরাঙ্গে জামায়াত-বন্ধুত্ব না হয় একরকম মানিয়ে নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু বন্ধুত্ব অন্তরের গহিনে চলে এলে তাকে উগড়ে দেওয়া কঠিন।

খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া ও তাদের ভাবাদর্শের কয়েকজন ছাড়া জামায়াত-বন্ধুত্বের বাড়াবাড়িতে বিএনপি এবং বিশ দলের অনেক নেতাকর্মীই অস্বস্তিতে ছিলেন। এখন তো শোনা যাচ্ছে, এ সময়ের নাকি দুর্বল দশার বিএনপিতে আবার তারেক রহমান আর তারেক রহমানবিরোধী গ্রুপের ভয়ংকর টানাপোড়েন চলছে।

কিন্তু আমরা বিএনপির বিবর্ণ দশা দেখতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, রাজনীতিবিদরাই দেশ ও জাতির প্রত্যক্ষ ত্রাতা হবেন। নেতা-নেত্রীদের কূপমণ্ডূক চিন্তা এবং দায়িত্বহীন আচরণ ভবিষ্যৎকে ক্রমে তমসাচ্ছন্ন করে ফেলছে। এ অন্ধকার থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। রাজনীতিতে দরকষাকষি থাকবে। তবে তা হোক যৌক্তিক অবস্থানে থেকে।

টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থেকে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসী ও দূরদর্শী নীতি প্রয়োগ করার কারণে দেশে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে-হচ্ছে। এরপরও আমাদের হতাশ হতে হচ্ছে রাজনীতির নৈরাজ্যিক দশা দেখে। এ দেশের রাজনীতিতে কোনো দল দীর্ঘদিন একক ক্ষমতায় থাকলে সে দলের নেতাকর্মীদের অনেকে দুর্নীতিপরায়ণ ও লাগামহীন হয়ে পড়ে। আশপাশের অনেক মৌপ্রত্যাশী এসে ভিড় জমায়।

এ সময় তৃণমূল থেকে উপরের স্তর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করতে পারলে লাগাম হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের ভেতর এখন তেমন এক অন্তক্ষরণ চলছে, যা শুভবার্তা বহন করছে না। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা যদি মনে করেন, মানুষ খেয়ে পরে ভালো আছে, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটছে, আর তা দেখে তৃপ্ত জাতির গায়ে রাজনৈতিক অন্তক্ষরণের তাপ লাগবে না, তবে তা ভুল হিসাব হবে।

সম্প্রতি একটি পৌর এলাকায় গিয়েছিলাম। বাড়ি নির্মাণে আট-দশজন শ্রমিক কাজ করছিলেন। পৌর নির্বাচনের ডামাডোল তখন। একজন বয়সি রাজমিস্ত্রিকে প্রশ্ন করলাম, কাকে ভোট দেবেন আপনারা? কোনো দ্বিধা না করেই জানালেন তারা কেউ আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিশনারকে ভোট দেবেন না। কারণ হিসাবে বললেন, গতবার ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগের কমিশনার প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি তাদের চেনেনই না।

তার ছেলেরা নানাভাবে অত্যাচার করে মানুষকে। যদিও কমিশনার প্রার্থীর কোনো দলীয় প্রতীক থাকে না, সমর্থন থাকলেও মনোনয়ন দলীয় নয়, তারপরও সবাই বুঝতে পারে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অনেক মানবিক গুণের কথাও জানালেন। আমার ধারণা, সারা দেশে একই ধরনের মনোভাব ভোটারের মধ্যে কাজ করছে। এ দেশে ক্ষমতাধরদের শক্তি ও কৌশল প্রয়োগে নির্বাচনের ফলাফল গড়াপেটা করার ইতিহাস পুরোনো। কিন্তু ভ্রান্ত পথ ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের আদর্শচ্যুতি ও দুর্বলতা হিসাবেই বিবেচিত হয়।

আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এখন নিজেরা নিজেরাই ঝগড়া বিবাদ করছে। কোভিডের আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মারামারি যা হতো, এর বেশিরভাগই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতাদের দৃষ্টিকটু ঝগড়া আমাদের চিন্তিত করে তুলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক ও বর্তমান মেয়রের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের উলঙ্গ প্রকাশ দলের ভেতরের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই কাদের মির্জা নির্বাচনের আগে প্রায় প্রতিদিনই বোমা ফাটাচ্ছিলেন নিজ বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে।

জানি না এসব নির্বাচনি কৌশল কি না। তবে এ ধারার ঘটনা বলে দেয় ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের একটি ক্রান্তিকাল চলছে এখন। পৌর নির্বাচনের আগে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ২০টিরও বেশি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে জীবনহানিও। সাধারণ কর্মী-সমর্থক ছাড়াও একজন কমিশনার প্রার্থী নিহত হয়েছেন। নির্বাচনের দিনেও অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সিরাজগঞ্জে নির্বাচনে জয়ী কমিশনার প্রতিপক্ষের আঘাতে নিহত হন। এসব ঘটনা বলে দেয় তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা কতটা দুর্বল।

আমাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। না হলে নরসিংদীর লোকমান হত্যা মামলার আসামি পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পায় কেমন করে! এসব ছাড়াও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ধর্ষণ ঘটনা থেকে শুরু করে নানা নিকৃষ্ট অঘটনে ক্রমাগতভাবে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের যুক্ত থাকার ঘটনা বলে দেয় আওয়ামী লীগ আদর্শিক জায়গা থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন থেকে আমরা লক্ষ করছি, ক্ষমতায় ওঠার সিঁড়ি পেতে আওয়ামী লীগের মতো দলের নেতারাও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে দলছুট ভিন্ন দলের নেতা, ধনী ব্যবসায়ী, আর আমলাদের আওয়ামী লীগের পোশাক পরিয়ে দলে জায়গা করে দিচ্ছে। এদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক লাভ না হয় পাওয়া গেল; কিন্তু দলকে এরা অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে পারেন না। তাই দলের দুঃসময়ে মৌলোভীদের পাশে পাওয়া সহজ নয়। এসব কারণে আমরা অশনিসংকেত দেখতে পাচ্ছি।

আওয়ামী লীগ সরকার, বলা ভালো, শেখ হাসিনার সরকার দেশকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব দেখাতে পারছেন ঠিকই; কিন্তু যে রাজনৈতিক দলের ওপর ভিত্তি করে সরকার দাঁড়ানো, সে দল যদি অস্থিরতায় ভুগে আদর্শচ্যুত হয়, তবে আমাদের জন্য আরও দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে-এ কথা মানতেই হবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

রাজনৈতিক দর্শনে আদর্শচ্যুতি

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৯ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশার অন্ত নেই। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় আদর্শ এখন আর নির্দিষ্ট করা যায় না। ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ আর ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ ধরনের বাক্য ব্যবহার করে সত্য-মিথ্যা, অতিশয়োক্তি সবকিছু ‘মেধাবী’ রাজনীতিক জায়েজ করে নেন।

আগে মোটা দাগে কতগুলো রাজনৈতিক অঞ্চল নির্দিষ্ট করা হতো। যেমন, বাম আদর্শের রাজনীতি ডানদের সঙ্গে কখনো মিশ খাবে না। এদের মধ্যে বন্ধুত্ব, জোট কোনো কিছু গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। ডানদের ব্যাপারেও তাই। বামের সঙ্গে তেলে-জলে মিশবে না। সে সময় অবশ্য রাজনীতি একটি নিয়মের পথ ধরে এগোতো। যেভাবেই হোক ক্ষমতাপ্রাপ্তির জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামতে হবে রাজনীতিতে তেমন মরিয়াদের সে যুগে আমরা খুব একটা দেখতে পাইনি।

কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর থেকে এ দেশের রাজনৈতিক দর্শনে পরিবর্তন আসতে থাকে। রাজনীতি থেকে অপসৃত হতে থাকে আদর্শ। নীতি-আদর্শ নয়, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়াই একমাত্র আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। যেসব দল আদর্শিক অবস্থান ছাড়েনি, তারা একরকম কোণঠাসা হয়ে আছে। বড় দলগুলোয় পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের কদর কমে যেতে থাকে। সে জায়গায় বড় হয়ে দাঁড়ায় অর্থ-বিচার। রাজনীতি চলে যেতে থাকে বণিক আর আমলাদের দখলে। রাতারাতি শুধু রাজনীতিক নন, দলীয় নীতিনির্ধারকও হয়ে যান তারা। এভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো আদর্শহীন হয়ে পড়তে থাকে।

১৯৯৬-এর একটি বিভ্রান্তি এখনো আওয়ামী লীগকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক আদর্শে বেড়ে ওঠা একটি ঐতিহ্যবাহী দল। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে গৌরবের পাখায় উজ্জ্বল পালক লাগিয়েছিল। অথচ সেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতাপ্রাপ্তির পথ পেরোতে অবলীলায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর কৃপা ভিক্ষা করেছিল তখন।

যদিও সেই সম্পর্ক ছিল অল্পদিন স্থায়ী। কিন্তু আদর্শের এ লাঞ্ছনার দায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বিএনপির মতো দল, যারা সামরিক অঞ্চলের আদর্শ থেকে জন্ম নিয়ে শাখা মেলেছিল, বলার অপেক্ষা রাখে না, এ দলই জামায়াতকে পুরোপুরি পুনর্বাসিত করে। বন্ধুত্ব প্রগাঢ় করতে জামায়াতের আদর্শেই নিজেকে প্রায় লীন করে দিয়েছে, সেই বিএনপি নিজেদের জামায়াত বন্ধুত্ব জায়েজ করার জন্য আওয়ামী লীগের জামায়াতসংশিষ্টতার প্রসঙ্গ টেনে আনে সুযোগ পেলেই।

মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদ আর কল্যাণ পার্টির মুক্তিযোদ্ধা নেতা বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধতেই পারেন; কিন্তু জামায়াতের সংশিষ্টতা সহ্য করবেন কেন! এসব দৃশ্যও আমাদের দেখতে হয়েছে। কৈশোরে আমাদের অহংকার ছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তার ব্যক্তিগত আদর্শের যখন পরাজয় দেখি, তখন হতাশা গ্রাস করে। রাজনীতির কারণে কতটুকু আপস করা যায়? মৌলিক আদর্শের অপমৃত্যু ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয় না। ভুল পথে হেঁটে রাজনীতির মাঠে প্রায় শূন্য হয়ে গেছেন তিনি।

রাজনীতির ভুল চালে আজ অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছে বিএনপি। সেইসঙ্গে হতাশ জোটবন্ধুরা। লালন বলেছিলেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না।’ সাপের সঙ্গে বসবাস করা শেষ পর্যন্ত সুখের হয় না। এক সময় সাপুড়েও ছোবল খায়। বহিরাঙ্গে জামায়াত-বন্ধুত্ব না হয় একরকম মানিয়ে নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু বন্ধুত্ব অন্তরের গহিনে চলে এলে তাকে উগড়ে দেওয়া কঠিন।

খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া ও তাদের ভাবাদর্শের কয়েকজন ছাড়া জামায়াত-বন্ধুত্বের বাড়াবাড়িতে বিএনপি এবং বিশ দলের অনেক নেতাকর্মীই অস্বস্তিতে ছিলেন। এখন তো শোনা যাচ্ছে, এ সময়ের নাকি দুর্বল দশার বিএনপিতে আবার তারেক রহমান আর তারেক রহমানবিরোধী গ্রুপের ভয়ংকর টানাপোড়েন চলছে।

কিন্তু আমরা বিএনপির বিবর্ণ দশা দেখতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, রাজনীতিবিদরাই দেশ ও জাতির প্রত্যক্ষ ত্রাতা হবেন। নেতা-নেত্রীদের কূপমণ্ডূক চিন্তা এবং দায়িত্বহীন আচরণ ভবিষ্যৎকে ক্রমে তমসাচ্ছন্ন করে ফেলছে। এ অন্ধকার থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। রাজনীতিতে দরকষাকষি থাকবে। তবে তা হোক যৌক্তিক অবস্থানে থেকে।

টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থেকে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসী ও দূরদর্শী নীতি প্রয়োগ করার কারণে দেশে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে-হচ্ছে। এরপরও আমাদের হতাশ হতে হচ্ছে রাজনীতির নৈরাজ্যিক দশা দেখে। এ দেশের রাজনীতিতে কোনো দল দীর্ঘদিন একক ক্ষমতায় থাকলে সে দলের নেতাকর্মীদের অনেকে দুর্নীতিপরায়ণ ও লাগামহীন হয়ে পড়ে। আশপাশের অনেক মৌপ্রত্যাশী এসে ভিড় জমায়।

এ সময় তৃণমূল থেকে উপরের স্তর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করতে পারলে লাগাম হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। আমাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের ভেতর এখন তেমন এক অন্তক্ষরণ চলছে, যা শুভবার্তা বহন করছে না। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা যদি মনে করেন, মানুষ খেয়ে পরে ভালো আছে, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটছে, আর তা দেখে তৃপ্ত জাতির গায়ে রাজনৈতিক অন্তক্ষরণের তাপ লাগবে না, তবে তা ভুল হিসাব হবে।

সম্প্রতি একটি পৌর এলাকায় গিয়েছিলাম। বাড়ি নির্মাণে আট-দশজন শ্রমিক কাজ করছিলেন। পৌর নির্বাচনের ডামাডোল তখন। একজন বয়সি রাজমিস্ত্রিকে প্রশ্ন করলাম, কাকে ভোট দেবেন আপনারা? কোনো দ্বিধা না করেই জানালেন তারা কেউ আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিশনারকে ভোট দেবেন না। কারণ হিসাবে বললেন, গতবার ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগের কমিশনার প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি তাদের চেনেনই না।

তার ছেলেরা নানাভাবে অত্যাচার করে মানুষকে। যদিও কমিশনার প্রার্থীর কোনো দলীয় প্রতীক থাকে না, সমর্থন থাকলেও মনোনয়ন দলীয় নয়, তারপরও সবাই বুঝতে পারে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অনেক মানবিক গুণের কথাও জানালেন। আমার ধারণা, সারা দেশে একই ধরনের মনোভাব ভোটারের মধ্যে কাজ করছে। এ দেশে ক্ষমতাধরদের শক্তি ও কৌশল প্রয়োগে নির্বাচনের ফলাফল গড়াপেটা করার ইতিহাস পুরোনো। কিন্তু ভ্রান্ত পথ ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের আদর্শচ্যুতি ও দুর্বলতা হিসাবেই বিবেচিত হয়।

আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এখন নিজেরা নিজেরাই ঝগড়া বিবাদ করছে। কোভিডের আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মারামারি যা হতো, এর বেশিরভাগই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতাদের দৃষ্টিকটু ঝগড়া আমাদের চিন্তিত করে তুলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক ও বর্তমান মেয়রের মধ্যে বৈরী সম্পর্কের উলঙ্গ প্রকাশ দলের ভেতরের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই কাদের মির্জা নির্বাচনের আগে প্রায় প্রতিদিনই বোমা ফাটাচ্ছিলেন নিজ বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে।

জানি না এসব নির্বাচনি কৌশল কি না। তবে এ ধারার ঘটনা বলে দেয় ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের একটি ক্রান্তিকাল চলছে এখন। পৌর নির্বাচনের আগে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ২০টিরও বেশি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে জীবনহানিও। সাধারণ কর্মী-সমর্থক ছাড়াও একজন কমিশনার প্রার্থী নিহত হয়েছেন। নির্বাচনের দিনেও অনেক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সিরাজগঞ্জে নির্বাচনে জয়ী কমিশনার প্রতিপক্ষের আঘাতে নিহত হন। এসব ঘটনা বলে দেয় তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা কতটা দুর্বল।

আমাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। না হলে নরসিংদীর লোকমান হত্যা মামলার আসামি পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পায় কেমন করে! এসব ছাড়াও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ধর্ষণ ঘটনা থেকে শুরু করে নানা নিকৃষ্ট অঘটনে ক্রমাগতভাবে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের যুক্ত থাকার ঘটনা বলে দেয় আওয়ামী লীগ আদর্শিক জায়গা থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন থেকে আমরা লক্ষ করছি, ক্ষমতায় ওঠার সিঁড়ি পেতে আওয়ামী লীগের মতো দলের নেতারাও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে দলছুট ভিন্ন দলের নেতা, ধনী ব্যবসায়ী, আর আমলাদের আওয়ামী লীগের পোশাক পরিয়ে দলে জায়গা করে দিচ্ছে। এদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক লাভ না হয় পাওয়া গেল; কিন্তু দলকে এরা অন্তর দিয়ে ভালোবাসতে পারেন না। তাই দলের দুঃসময়ে মৌলোভীদের পাশে পাওয়া সহজ নয়। এসব কারণে আমরা অশনিসংকেত দেখতে পাচ্ছি।

আওয়ামী লীগ সরকার, বলা ভালো, শেখ হাসিনার সরকার দেশকে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব দেখাতে পারছেন ঠিকই; কিন্তু যে রাজনৈতিক দলের ওপর ভিত্তি করে সরকার দাঁড়ানো, সে দল যদি অস্থিরতায় ভুগে আদর্শচ্যুত হয়, তবে আমাদের জন্য আরও দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছে-এ কথা মানতেই হবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন