স্থবিরতা নয়, চাই প্রাণের স্পন্দন
jugantor
স্থবিরতা নয়, চাই প্রাণের স্পন্দন

  ড. হারুন রশীদ  

১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এটি খুবই আশাপ্রদ যে, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব (খাল ও ড্রেনেজ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে এখন থেকে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের পুরো দায়িত্ব পেল দুই সিটি করপোরেশন। আগে এ দায়িত্বের বেশিরভাগ পালন করত ঢাকা ওয়াসা।

এর ফলে জলাবদ্ধতার দায় একে অন্যের ঘাড়ে চাপানোর সুযোগ থাকল না এবং সিটি করপোরেশনের হাতে দায়িত্ব যাওয়ায় ঢাকাবাসী জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে বলে নতুন করে আশার সঞ্চার হলো। ঢাকাকে বাস উপযোগী শহর হিসাবে গড়ে তুলতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। প্রতিটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাজ সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। সমন্বয় থাকতে হবে কাজের।

ঢাকার ইতিহাস প্রায় চারশ বছরের। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদের মতে, মোগল আমল ছাড়াও চারবার এ শহর রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। সেই সময় ঢাকা ছিল এক নয়নাভিরাম নগরী। নাগরিক অনেক সুযোগ-সুবিধাই অবারিত ছিল। বুড়িগঙ্গার তীরে বেড়ে ওঠা ঢাকা নগরী এখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীর মর্যাদা লাভের পর ঢাকার যে সমৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল, আকারে তা হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং শিল্পিত মানের দিক থেকে তা হয়নি; বরং বেড়ে ওঠা ঢাকা যেন ক্রমেই ইট-পাথরের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার নানা জরিপেও ঢাকার স্থান তলানিতে। অবশ্য ভুক্তভোগী রাজধানীবাসীর এটি বোঝার জন্য জরিপের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন দৈব-দুর্বিপাকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তারা কী এক ভয়ানক অবস্থার মধ্যে আছে। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত নগরায়ণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে। জীবনযাত্রার অনিবার্য প্রয়োজনে মানুষ এখন নগরমুখী। সে কারণেই নগরায়ণকে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও সুষম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা যায়, নগরজীবনকে স্বচ্ছন্দ, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও উন্নয়নমুখী করা এখন সময়ের দাবি।

আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি; যার সবকিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল, অফিস-আদালত, বসবাসের জায়গা সবকিছুই হবে পরিকল্পনামাফিক। পরিকল্পনামাফিক সবকিছু হলে প্রতিটি নগরেই মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্সলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এ নগরই আবার পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না।

শহরের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এর মান নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে-নগরীতে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগতমান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য এবং সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ ছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতঃপূর্বে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থায়ই এ জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। এ ছাড়া যানজট, যানবাহন এবং কলকারখানার কালো ধোঁয়া, ট্যানারি বর্জ্য, খাদ্যে ভেজাল, সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিুমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এ শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ; অথচ রাজধানী ঢাকা হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে।

এ জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এ শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে, যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে। এক জগাখিচুড়ি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য এ নগরী যেন নরকতুল্য। খেলার মাঠ নেই, নেই জলাশয়। সবুজ গাছ-গাছালির দেখা মেলাও ভার।

মানুষের হাঁটার চেয়েও গড় গতি কম যানবাহনের। এ অবস্থায় যানজট ঢাকা নগরীকে কার্যত এক অচল ও স্থবির নগরীতে পরিণত করেছে। এটি একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেওয়ায় পরিবহণ খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিন প্রচুর কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে; পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ।

যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রী চলাচলে কমপক্ষে তিন কর্মঘণ্টা অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম।

শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য পানিতে মিশে ঢাকার পরিবেশ করে তুলছে বিষাক্ত। হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে সরিয়ে নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দূষণ চলছেই। বুড়িগঙ্গাকে বলা হয় ঢাকার প্রাণ। কিন্তু দখল-দূষণে এ নদীর অবস্থা এখন বড়ই করুণ। বিশেষ করে ট্যানারির বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে।

পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে, তাতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য যাতে নদীতে আর না পড়তে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বুয়েটের মেধাবী ছাত্রী সনি হত্যার প্রতিবাদে যারা অনশন করছিলেন, কবি শামসুর রাহমান গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে। কবির বুয়েটে যাওয়ার ঘটনা ফলাও করে প্রচার হয় সব কটি দৈনিকে। ফলে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা আরও প্রত্যয়ী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিষয়টি ভালো ঠেকেনি বুয়েট ভিসির কাছে। তাই তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন: ‘উনি কবিমানুষ, আমরা ইঞ্জিনিয়ার; কবিতার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

তৎকালীন ভিসির ওই মন্তব্য দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। হাসির খোরাকও জুগিয়েছিল। সত্যি, কবিতার সঙ্গে মানুষের; বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্ক না থাকলে তার পরিণতি যে কী ভয়াবহ হতে পারে, তা যেন বলে দিচ্ছে রাজধানীর কংক্রিটের এ জঙ্গল।

প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীন ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘মান্দাই নৃ-গোষ্ঠী’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে এ জনগোষ্ঠীর মাটির ঘরের অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্যরীতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আধুনিক কালের স্থাপত্যকলায় পরিবেশের সঙ্গে গৃহনির্মাণের একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ মিলন প্রত্যাশিত। চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পাশ্চাত্যের গৃহ স্থাপত্যের সাধারণ নকশাটা আমাদের দেশের স্থাপত্যকাররা গ্রহণ করেছিলেন নির্বিচারে।

ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, রুগ্ণ গৃহস্থাপত্যের এক দিকচিহ্নহীন অভিযাত্রায় নেমেছি আমরা। সাদা চুনকাম করা দেওয়ালের সঙ্গে ঢাকা শহরের মৃত্তিকার কোনো সামঞ্জস্য নেই। যে কাঠামোকলা ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন, তাই যেন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সর্বত্র। পাশ্চাত্যে গৃহ স্থাপত্যের আঙ্গিক ও বৈচিত্র্য তাদের শিল্পায়ন ও বিজ্ঞানের ধারায় স্বাভাবিক।

আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানকার সেই নকশাই জুড়ে দিলেন এখানে। আমাদের চাঁদ, সূর্য, শীত, বর্ষা আড়ালে চলে গেল। পুথিগত বিদ্যাটাকে ধ্রুবজ্ঞানে বিশ্বাস করার যে কী ফল, তা আমাদের শহরের নানা অংশের স্থাপত্য রীতি দেখলেই বোঝা যায় অবশ্য।’

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিতাংশু রায় তার AN INTRODUCTION TO AESTHETICS গ্রন্থে স্থাপত্য অধ্যায়ে বলেছেন: ‘প্রাসাদের ছাদ থেকে বৃষ্টির জল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নালিতে নল লাগিয়ে দিলেই ব্যাবহারিক প্রয়োজন মেটে। কিন্তু নলের প্রান্তে বাঘের মুখের প্রতিকৃতি বসিয়ে দেওয়া হলো। তোরণ বা সোপানের দুপাশে নির্মিত হলো দম্ভভরে উপবিষ্ট সিংহের গম্ভীর মূর্তি। এতে করে স্থাপত্য সমগ্র নির্মিতির আদর্শ দান করে ও নির্মাণের পর সামগ্রিক দৃষ্টিতে উপযোগিতার অতিরিক্ত এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।’

রবীন্দ্রনাথ বলাকার একটি কবিতায় তাজমহল সমন্ধে বলেছেন: ‘প্রেমের করুণ কোমলতা/ফুটিল তা/সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে।’ পাষাণে প্রাণ দেওয়ার জন্য যে নান্দনিক বোধ থাকা প্রয়োজন, তার জন্য জ্ঞানের অন্য শাখাগুলোয়ও অধ্যয়ন জরুরি; আমাদের স্থাপত্যকলায় যার তীব্র অভাব পরিস্ফুট।

স্থাপত্যকলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সৌন্দর্যের অনুসন্ধান আমাদের ঐতিহ্যের কারণেই বড় বেশি প্রয়োজন। ঢাকাকে অসম্মান থেকে রক্ষার উদ্যোগ তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সক্রিয় হবেন-এমনটিই প্রত্যাশা করি।

ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

স্থবিরতা নয়, চাই প্রাণের স্পন্দন

 ড. হারুন রশীদ 
১৯ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এটি খুবই আশাপ্রদ যে, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব (খাল ও ড্রেনেজ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে এখন থেকে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের পুরো দায়িত্ব পেল দুই সিটি করপোরেশন। আগে এ দায়িত্বের বেশিরভাগ পালন করত ঢাকা ওয়াসা।

এর ফলে জলাবদ্ধতার দায় একে অন্যের ঘাড়ে চাপানোর সুযোগ থাকল না এবং সিটি করপোরেশনের হাতে দায়িত্ব যাওয়ায় ঢাকাবাসী জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে বলে নতুন করে আশার সঞ্চার হলো। ঢাকাকে বাস উপযোগী শহর হিসাবে গড়ে তুলতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। প্রতিটি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাজ সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। সমন্বয় থাকতে হবে কাজের।

ঢাকার ইতিহাস প্রায় চারশ বছরের। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদের মতে, মোগল আমল ছাড়াও চারবার এ শহর রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। সেই সময় ঢাকা ছিল এক নয়নাভিরাম নগরী। নাগরিক অনেক সুযোগ-সুবিধাই অবারিত ছিল। বুড়িগঙ্গার তীরে বেড়ে ওঠা ঢাকা নগরী এখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীর মর্যাদা লাভের পর ঢাকার যে সমৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল, আকারে তা হলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং শিল্পিত মানের দিক থেকে তা হয়নি; বরং বেড়ে ওঠা ঢাকা যেন ক্রমেই ইট-পাথরের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার নানা জরিপেও ঢাকার স্থান তলানিতে। অবশ্য ভুক্তভোগী রাজধানীবাসীর এটি বোঝার জন্য জরিপের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন দৈব-দুর্বিপাকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তারা কী এক ভয়ানক অবস্থার মধ্যে আছে। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত নগরায়ণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে। জীবনযাত্রার অনিবার্য প্রয়োজনে মানুষ এখন নগরমুখী। সে কারণেই নগরায়ণকে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও সুষম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা যায়, নগরজীবনকে স্বচ্ছন্দ, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও উন্নয়নমুখী করা এখন সময়ের দাবি।

আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি; যার সবকিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল, অফিস-আদালত, বসবাসের জায়গা সবকিছুই হবে পরিকল্পনামাফিক। পরিকল্পনামাফিক সবকিছু হলে প্রতিটি নগরেই মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফস্সলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এ নগরই আবার পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না।

শহরের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এর মান নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে-নগরীতে বসবাসের সুযোগ-সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগতমান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য এবং সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ ছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতঃপূর্বে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে, ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থায়ই এ জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। এ ছাড়া যানজট, যানবাহন এবং কলকারখানার কালো ধোঁয়া, ট্যানারি বর্জ্য, খাদ্যে ভেজাল, সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিুমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এ শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা। জনসংখ্যা বাড়ছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি নাগরিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ; অথচ রাজধানী ঢাকা হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে।

এ জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা আবাসস্থল থেকে পরিণত হয়েছে বিরাট বাজারে। বস্তুত এ শহরের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই। যত্রতত্র যে যেখানে পারছে, যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে। এক জগাখিচুড়ি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য এ নগরী যেন নরকতুল্য। খেলার মাঠ নেই, নেই জলাশয়। সবুজ গাছ-গাছালির দেখা মেলাও ভার।

মানুষের হাঁটার চেয়েও গড় গতি কম যানবাহনের। এ অবস্থায় যানজট ঢাকা নগরীকে কার্যত এক অচল ও স্থবির নগরীতে পরিণত করেছে। এটি একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেওয়ায় পরিবহণ খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিন প্রচুর কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে; পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ।

যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রী চলাচলে কমপক্ষে তিন কর্মঘণ্টা অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময়ে নানামুখী কর্মসূচি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম।

শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য পানিতে মিশে ঢাকার পরিবেশ করে তুলছে বিষাক্ত। হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে সরিয়ে নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দূষণ চলছেই। বুড়িগঙ্গাকে বলা হয় ঢাকার প্রাণ। কিন্তু দখল-দূষণে এ নদীর অবস্থা এখন বড়ই করুণ। বিশেষ করে ট্যানারির বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে।

পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে, তাতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য যাতে নদীতে আর না পড়তে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বুয়েটের মেধাবী ছাত্রী সনি হত্যার প্রতিবাদে যারা অনশন করছিলেন, কবি শামসুর রাহমান গিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে। কবির বুয়েটে যাওয়ার ঘটনা ফলাও করে প্রচার হয় সব কটি দৈনিকে। ফলে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা আরও প্রত্যয়ী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিষয়টি ভালো ঠেকেনি বুয়েট ভিসির কাছে। তাই তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন: ‘উনি কবিমানুষ, আমরা ইঞ্জিনিয়ার; কবিতার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

তৎকালীন ভিসির ওই মন্তব্য দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। হাসির খোরাকও জুগিয়েছিল। সত্যি, কবিতার সঙ্গে মানুষের; বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্ক না থাকলে তার পরিণতি যে কী ভয়াবহ হতে পারে, তা যেন বলে দিচ্ছে রাজধানীর কংক্রিটের এ জঙ্গল।

প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীন ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘মান্দাই নৃ-গোষ্ঠী’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে এ জনগোষ্ঠীর মাটির ঘরের অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্যরীতি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আধুনিক কালের স্থাপত্যকলায় পরিবেশের সঙ্গে গৃহনির্মাণের একটি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ মিলন প্রত্যাশিত। চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পাশ্চাত্যের গৃহ স্থাপত্যের সাধারণ নকশাটা আমাদের দেশের স্থাপত্যকাররা গ্রহণ করেছিলেন নির্বিচারে।

ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, রুগ্ণ গৃহস্থাপত্যের এক দিকচিহ্নহীন অভিযাত্রায় নেমেছি আমরা। সাদা চুনকাম করা দেওয়ালের সঙ্গে ঢাকা শহরের মৃত্তিকার কোনো সামঞ্জস্য নেই। যে কাঠামোকলা ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন, তাই যেন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সর্বত্র। পাশ্চাত্যে গৃহ স্থাপত্যের আঙ্গিক ও বৈচিত্র্য তাদের শিল্পায়ন ও বিজ্ঞানের ধারায় স্বাভাবিক।

আমাদের প্রকৌশলীরা সেখানকার সেই নকশাই জুড়ে দিলেন এখানে। আমাদের চাঁদ, সূর্য, শীত, বর্ষা আড়ালে চলে গেল। পুথিগত বিদ্যাটাকে ধ্রুবজ্ঞানে বিশ্বাস করার যে কী ফল, তা আমাদের শহরের নানা অংশের স্থাপত্য রীতি দেখলেই বোঝা যায় অবশ্য।’

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিতাংশু রায় তার AN INTRODUCTION TO AESTHETICS গ্রন্থে স্থাপত্য অধ্যায়ে বলেছেন: ‘প্রাসাদের ছাদ থেকে বৃষ্টির জল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নালিতে নল লাগিয়ে দিলেই ব্যাবহারিক প্রয়োজন মেটে। কিন্তু নলের প্রান্তে বাঘের মুখের প্রতিকৃতি বসিয়ে দেওয়া হলো। তোরণ বা সোপানের দুপাশে নির্মিত হলো দম্ভভরে উপবিষ্ট সিংহের গম্ভীর মূর্তি। এতে করে স্থাপত্য সমগ্র নির্মিতির আদর্শ দান করে ও নির্মাণের পর সামগ্রিক দৃষ্টিতে উপযোগিতার অতিরিক্ত এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।’

রবীন্দ্রনাথ বলাকার একটি কবিতায় তাজমহল সমন্ধে বলেছেন: ‘প্রেমের করুণ কোমলতা/ফুটিল তা/সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে।’ পাষাণে প্রাণ দেওয়ার জন্য যে নান্দনিক বোধ থাকা প্রয়োজন, তার জন্য জ্ঞানের অন্য শাখাগুলোয়ও অধ্যয়ন জরুরি; আমাদের স্থাপত্যকলায় যার তীব্র অভাব পরিস্ফুট।

স্থাপত্যকলায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সৌন্দর্যের অনুসন্ধান আমাদের ঐতিহ্যের কারণেই বড় বেশি প্রয়োজন। ঢাকাকে অসম্মান থেকে রক্ষার উদ্যোগ তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সক্রিয় হবেন-এমনটিই প্রত্যাশা করি।

ড. হারুন রশীদ : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন