গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলুক
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলুক

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

২০ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের চলতি মেয়াদের দুবছর পূর্তিতে ৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভাষণে বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের দুবছরসহ টানা এক যুগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে প্রণোদনা প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলায় পরিকল্পনা গ্রহণ, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সমাধানের লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগ, অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন, অনুসৃত বৈদেশিক নীতির বৈশিষ্ট্যাবলিসহ আরও কিছু বিষয় স্থান পায়। তবে দেশে গণতন্ত্র পিছিয়ে পড়াসহ অন্য কোনো বিষয়ে ব্যর্থতার উল্লেখ ভাষণে নেই।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুর ৮২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর এই স্বপ্নের সেতু যানবাহন ও রেল চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে।

অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পের কাজও পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে ২০০৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে জাতীয় গ্রিডে ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে যা ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৪৫৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে। আরও ৬৬১ কিলোমিটার মহাসড়ক চার এবং তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে।

দেশের প্রায় সব গ্রামে পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকায় বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ২০২৩ সাল নাগাদ শেষ হবে। ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ এবং ১ হাজার ১৮১ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন করা হয়েছে। ৪২৮টি নতুন রেলসেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

যমুনা নদীর ওপর ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু রেলসেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। লোকোমোটিভ যাত্রীবাহী ক্যারেজ এবং মালবাহী ওয়াগন সংগ্রহ করা হয়েছে এক হাজার ৪০টি। এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১৩৭টি নতুন ট্রেন চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের বিমানবহরে ১২টি নতুন অত্যাধুনিক বোয়িং এবং ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ সংযোজিত হয়েছে।

খাদ্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্য উৎপাদনে দেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং গুণগত মানোন্নয়নের ফলে মানুষের গড় আয়ু ২০১৯-২০ বছরে ৭২ দশমিক ৬ বছরে উন্নীত হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সি শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮ ও অনূর্ধ্ব এক বছর বয়সি শিশুমৃত্যুর হার ১৫-তে হ্রাস পেয়েছে। মাতৃমৃত্যু হার কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি লাখে ১৬৫ জনে।

করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখার। আশার কথা, বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯-এর টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকার দ্রুত টিকা নিয়ে আসার সব ধরনের চেষ্টা করছে।

করোনায় ক্ষতি কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তবে বিভিন্ন নীতিসহায়তা এবং বিভিন্ন উদারনৈতিক আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের মাধ্যমে সরকার অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকার এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা মোট জিডিপির ৪.৩ শতাংশ। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সে প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে।

এটি অনস্বীকার্য যে, বিগত ১২ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে বেশ কয়েকটি বৃহৎ আকারের এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য হাতে নিয়েছে, যা এর আগের সরকারগুলোর কাছে গুরুত্ব পায়নি। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে-পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট, ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার এবং রামু-ঘুমদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প।

তা ছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়নে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ, সড়কপথে দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও দ্রুত গতিসম্পন্ন করতে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের যানজটপূর্ণ ঢাকা-টাঙ্গাইল অংশকে চার লেনে উন্নীতকরণ, এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্যের অধিকারী হলেও এ সময়ে জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পিছিয়ে পড়েছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যে আওয়ামী লীগ ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তারাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সরকারকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোট এবং সমমনা কয়েকটি দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণহীন সে নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আসে। এতে দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে দেশে গণতন্ত্র চর্চার অনুকূল পরিবেশের অভাব দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানে নানারকম বাধা প্রদান করা হয়। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হয়। তাদের অনেকে কারাগারে অন্তরিন থাকেন। শত বাধা-বিপত্তির মুখে বিএনপিসহ বিভিন্ন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও সে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শাসক দল আওয়ামী লীগের অধীন নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের ফলাফল দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

শুধু যে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণহীন ও সুষ্ঠু হয়নি তা নয়, এ দুটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যবর্তী এবং একাদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০১৫, পৌরসভা নির্বাচন ২০১৫, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২০ এবং চলমান পৌরসভা নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বিগত কয়েক বছরে নির্ভেজাল গণতন্ত্রের বিকাশে সরকারসৃষ্ট বাধাগুলো উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যকে অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং এর বিকাশ। গণতন্ত্রের বিকাশে সরকারসৃষ্ট বাধাগুলো জনগণকে হতাশ করেছে। তারা উন্নয়নের নামে দুর্বল গণতন্ত্র দেখতে চান না। তারা চান গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একইসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলুক। আওয়ামী লীগ জনগণের এ মনোভাব যত শিগগির উপলব্ধি করতে পারবে, ততই তা তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একইসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চললে তা বাংলাদেশকে পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাতারে নিয়ে আসবে, যা হবে দেশের জন্য সম্মানজনক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলুক

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
২০ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের চলতি মেয়াদের দুবছর পূর্তিতে ৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভাষণে বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের দুবছরসহ টানা এক যুগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে প্রণোদনা প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলায় পরিকল্পনা গ্রহণ, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সমাধানের লক্ষ্যে চলমান উদ্যোগ, অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন, অনুসৃত বৈদেশিক নীতির বৈশিষ্ট্যাবলিসহ আরও কিছু বিষয় স্থান পায়। তবে দেশে গণতন্ত্র পিছিয়ে পড়াসহ অন্য কোনো বিষয়ে ব্যর্থতার উল্লেখ ভাষণে নেই।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুর ৮২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছর এই স্বপ্নের সেতু যানবাহন ও রেল চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে।

অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পের কাজও পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে ২০০৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে জাতীয় গ্রিডে ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে যা ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৪৫৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে। আরও ৬৬১ কিলোমিটার মহাসড়ক চার এবং তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে।

দেশের প্রায় সব গ্রামে পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকায় বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ২০২৩ সাল নাগাদ শেষ হবে। ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ এবং ১ হাজার ১৮১ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন করা হয়েছে। ৪২৮টি নতুন রেলসেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

যমুনা নদীর ওপর ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু রেলসেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। লোকোমোটিভ যাত্রীবাহী ক্যারেজ এবং মালবাহী ওয়াগন সংগ্রহ করা হয়েছে এক হাজার ৪০টি। এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১৩৭টি নতুন ট্রেন চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের বিমানবহরে ১২টি নতুন অত্যাধুনিক বোয়িং এবং ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ সংযোজিত হয়েছে।

খাদ্য পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্য উৎপাদনে দেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং গুণগত মানোন্নয়নের ফলে মানুষের গড় আয়ু ২০১৯-২০ বছরে ৭২ দশমিক ৬ বছরে উন্নীত হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সি শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৮ ও অনূর্ধ্ব এক বছর বয়সি শিশুমৃত্যুর হার ১৫-তে হ্রাস পেয়েছে। মাতৃমৃত্যু হার কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি লাখে ১৬৫ জনে।

করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখার। আশার কথা, বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯-এর টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও সরকার দ্রুত টিকা নিয়ে আসার সব ধরনের চেষ্টা করছে।

করোনায় ক্ষতি কাটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তবে বিভিন্ন নীতিসহায়তা এবং বিভিন্ন উদারনৈতিক আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের মাধ্যমে সরকার অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকার এক লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা মোট জিডিপির ৪.৩ শতাংশ। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সে প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে।

এটি অনস্বীকার্য যে, বিগত ১২ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে বেশ কয়েকটি বৃহৎ আকারের এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য হাতে নিয়েছে, যা এর আগের সরকারগুলোর কাছে গুরুত্ব পায়নি। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে-পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প, মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট, ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার এবং রামু-ঘুমদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প।

তা ছাড়া বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়নে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ, সড়কপথে দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও দ্রুত গতিসম্পন্ন করতে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের যানজটপূর্ণ ঢাকা-টাঙ্গাইল অংশকে চার লেনে উন্নীতকরণ, এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই, সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্যের অধিকারী হলেও এ সময়ে জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পিছিয়ে পড়েছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যে আওয়ামী লীগ ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তারাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সরকারকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোট এবং সমমনা কয়েকটি দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণহীন সে নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আসে। এতে দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে দেশে গণতন্ত্র চর্চার অনুকূল পরিবেশের অভাব দেখা দেয়। বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানে নানারকম বাধা প্রদান করা হয়। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হয়। তাদের অনেকে কারাগারে অন্তরিন থাকেন। শত বাধা-বিপত্তির মুখে বিএনপিসহ বিভিন্ন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও সে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শাসক দল আওয়ামী লীগের অধীন নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের ফলাফল দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।

শুধু যে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণহীন ও সুষ্ঠু হয়নি তা নয়, এ দুটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যবর্তী এবং একাদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০১৫, পৌরসভা নির্বাচন ২০১৫, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২০ এবং চলমান পৌরসভা নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বিগত কয়েক বছরে নির্ভেজাল গণতন্ত্রের বিকাশে সরকারসৃষ্ট বাধাগুলো উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যকে অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং এর বিকাশ। গণতন্ত্রের বিকাশে সরকারসৃষ্ট বাধাগুলো জনগণকে হতাশ করেছে। তারা উন্নয়নের নামে দুর্বল গণতন্ত্র দেখতে চান না। তারা চান গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একইসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলুক। আওয়ামী লীগ জনগণের এ মনোভাব যত শিগগির উপলব্ধি করতে পারবে, ততই তা তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একইসঙ্গে হাত ধরাধরি করে চললে তা বাংলাদেশকে পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কাতারে নিয়ে আসবে, যা হবে দেশের জন্য সম্মানজনক।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন