লিঙ্গবৈষম্য রোধে নজর বাড়াতে হবে
jugantor
লিঙ্গবৈষম্য রোধে নজর বাড়াতে হবে

  মুঈদ রহমান  

২৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন শব্দটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বিষয়সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন সর্বজনজ্ঞাত একটি ধারণা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সব ধরনের উন্নয়ন ভবিষ্যতের জন্য কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে সক্ষম না-ও হতে পারে। সেই ধরনের উন্নয়ন আমাদের প্রত্যাশিত নয়। যে কারণে আমরা খুব সাধারণভাবে উন্নয়ন শব্দটি পরিহার করে এটিকে ‘টেকসই উন্নয়ন’ হিসাবে বিবেচনা করতে চাইছি।

খুব সাধারণভাবে বললে, টেকসই উন্নয়ন হলো ওই ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড, যা ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশকে সুরক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে নিরাপদ ও নিশ্চিত করে। এই টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্য হিসাবে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমলে নেওয়া হয়। এই ১৭টি পয়েন্টের ৪ নম্বরে আছে ‘সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি’ এবং ৫ নম্বরে আছে ‘জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন’।

এখানে দুটি বিষয় খুব লক্ষণীয়। একটি হলো ‘অন্তর্ভুক্তি’, অপরটি হলো ‘জেন্ডার সমতা’। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বিষয় দুটি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যদিও বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসে অনেকখানি এগিয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়, তারপরও তা আত্মতুষ্টির পর্যায়ে পড়ে না।

সার্বিক যে উন্নয়ন তা শুধুই আর্থিক বিষয় না হলেও অর্থনৈতিক ভূমিকাটি অন্যতম হিসাবে বিবেচিত হয়। কারণ, সম্পদের যে ব্যবহার, তা বৃদ্ধি করতে হলে আর্থিক সমর্থন জরুরি। তাই টেকসই উন্নয়নে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অনস্বীকার্য। আবার এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যাদের দ্বারা পরিচালিত হবে, তারা হলেন নারী ও পুরুষ। তাই অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতাবিধানের দিকে নজর দিতে হবে।

আমরা জানি, এ সময়ের বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় প্রযুক্তির দ্বারা। এখন নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইলে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের দিকেও নজর দিতে হবে। কোনো একটি পেশায় যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন তা যদি নারী, পুরুষ উভয়কেই দেওয়া না যায় তবে বৈষম্য বাড়তে বাধ্য। এ বিষয়ে গবেষক ড. নাজনীন আহমেদের পর্যবেক্ষণটি আমলে নেওয়া যেতে পারে।

তার কথায়, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, এ ধরনের অগ্রগতিতে অংশগ্রহণে পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে আছে। আর্থিক বিষয়ের জ্ঞান, আর্থিক বিষয়ের নানা ধরনের হিসাবনিকাশ, ঋণপ্রাপ্তি, নানা ধরনের আর্থিক সেবা গ্রহণ, মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন রকম ডিজিটাল আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণ ইত্যাদির সুযোগ ও ব্যবহারে নারী-পুরুষের ব্যবধান বা জেন্ডারবৈষম্য বিস্তর।’ এখানে বলে রাখা ভালো, ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর এখনো বড় জায়গা হলো ক্ষুদ্রঋণ, যা বিভিন্ন সমিতি বা এনজিওর মাধ্যমে বণ্টিত হয়।

ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণকারী নারীদের বসবাস শহরাঞ্চলে এবং তা নির্দিষ্ট একটি শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ২০০৬ সাল থেকে যে ‘বিশ্ব লিঙ্গবৈষম্য সূচক’ প্রকাশ করে আসছে, তা মূলত চারটি বিষয়কে বিবেচনা করে। বিষয়গুলো হলো-অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অর্জন, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। সেক্ষেত্রে আর্থিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আগেই বলেছি, আর্থিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এখন মোবাইল ফোন শুধু কথাবার্তা আদানপ্রদানের ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়, আর্থিক লেনদেনের অংশীদারও। ২০২০ সালের ১০ মার্চ প্রকাশিত জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট পুরুষের ৮৬ শতাংশের মোবাইল ফোনের মালিকানা আছে। অপরদিকে নারীদের বেলায় তা ৬১ শতাংশ। এক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ বের করতে চাইলে তা হবে ২৯ শতাংশ।

এখন যেহেতু সবাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করতে সক্ষম, তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে নারীরা অনেকখানি পিছিয়ে আছে। ওই প্রতিবেদনেই উল্লেখ আছে, ৩৩ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে, যেখানে নারীদের মধ্যে তা মাত্র ১৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ ৫২ শতাংশ। করোনাকালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সেজন্য তৈরি পোশাক শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী, যারা কিনা এই সেবা খাতটির সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছে। তবে এখানেও জেন্ডার গ্যাপ আছে। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জেন্ডার ব্যবধান এখনো ৪০ শতাংশের উপরে। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার উল্লেখ করার মতো নয়। কারণ দেশে নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম, যেখানে ১৪২টি দেশের গড় হিসাব ১৯ শতাংশেরও বেশি।

ব্যাংক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীদের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। কারণ হিসাবে অনেকে মনে করেন, এদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলকে আওতায় আনতে পারেনি। তবে ইদানীংকালের এজেন্ট ব্যাংকিং তা অনেকটা পুষিয়ে দিতে পেরেছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যে ৫৬ লাখ নতুন অ্যাকাউন্ট যুক্ত হয়েছে তার ৫৭ ভাগ পুরুষ এবং ৪৩ ভাগ নারী।

অ্যাকাউন্ট বিবেচনায় বৈষম্য ততখানি নয়, তবে নারীদের অ্যাকাউন্টগুলোয় আর্থিক লেনদেন হলেও তা উদ্যোক্তাসংশ্লিষ্ট ঋণসংক্রান্ত নয়। কিন্তু এই ৫৬ লাখ ছাড়া যদি সার্বিক অ্যাকাউন্ট বিবেচনা করা হয়, তাহলে চিত্রটা হবে ভিন্ন। দেশের মোট পুরুষের ৬৫ শতাংশ ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী, অন্যদিকে নারীদের মাত্র ৩৬ শতাংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। ব্যবধান হিসাব করলে প্রায় ৪৫ শতাংশ। এটা বৈশ্বিক গড় মানের চেয়ে অনেক বেশি এবং বলা চলে সর্বোচ্চ।

কিন্তু ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি সামান্যই। বড় উদ্যোক্তাদের কথা বলার মতো নয়। ২০১৯ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। এখানে কারও ওপর দোষারোপ করার কিছু নেই। আসলে ঋণ গ্রহণের যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতি আছে, এর সঙ্গে গ্রামীণ জনপদের নারীদের খুব একটা পরিচয় নেই। তারা জানেনই না কীভাবে ঋণ পেতে হয়। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের যেসব আবশ্যকতা আছে, তা অনেক নারীর ক্ষেত্রেই পূরণ করা সম্ভব নয়। সেদিকটির উন্নতি করতে হলে দেখতে হবে অপ্রয়োজনীয় কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি না। যদি থাকে তবে তা দূর করে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে।

তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয় সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং ঘাটতি থেকে উত্তরণের পথ বের করার জন্য, কোনোমতেই হতাশ হওয়ার জন্য নয়। আমাদের দেশে আর্থিক বিষয়ে নারী-পুরুষের মজুরির ক্ষেত্রে জেন্ডারবৈষম্য বিশ্বের সর্বনিু। এটা আশার কথা। সারা বিশ্বে যেখানে মজুরিতে গড় বৈষম্য প্রায় ২২ শতাংশ, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতে তা ২০ শতাংশের কম নয়, সেখানে আমাদের দেশে তা মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। কাজেই এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের আছে।

টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যগুলো কোনো কাল্পনিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারিত হয়নি। বরং আগামী দিনগুলোর বাস্তবতা বিচার করেই নিরূপণ করা হয়েছে। আমাদের কাজ হবে নিজেদেরকে এর উপযোগী হিসাবে গড়ে তোলা। তার মানে হলো-আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারিত করা। সেই আর্থিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়াতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হবে যেন তাতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে কোনো বড় ধরনের বৈষম্যের আবির্ভাব না ঘটে। প্রযুক্তিগত ব্যবহারে যদি কোনো গোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সে শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। ব্যাংক খাতসহ সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।

বৈষম্য ষোলো আনা দূরীকরণের কাজটি সহজ নয় এবং তা রাতারাতির কোনো বিষয়ও নয়, তবে তা অসম্ভবও নয় এবং বাস্তবতাবিবর্জিতও নয়। প্রয়োজন হলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তা নিরসনে আন্তরিক হওয়া। আমাদের প্রচলিত সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি নারী-পুরুষকে এক কাতারে বিবেচনা করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার উপযুক্ত করে তুলতে পারে, তবেই এর অবসান হবে। আর আমাদের তা করতে হবে, কারণ আমরা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

লিঙ্গবৈষম্য রোধে নজর বাড়াতে হবে

 মুঈদ রহমান 
২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন শব্দটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বিষয়সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন সর্বজনজ্ঞাত একটি ধারণা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সব ধরনের উন্নয়ন ভবিষ্যতের জন্য কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ভালো ফল বয়ে আনতে সক্ষম না-ও হতে পারে। সেই ধরনের উন্নয়ন আমাদের প্রত্যাশিত নয়। যে কারণে আমরা খুব সাধারণভাবে উন্নয়ন শব্দটি পরিহার করে এটিকে ‘টেকসই উন্নয়ন’ হিসাবে বিবেচনা করতে চাইছি।

খুব সাধারণভাবে বললে, টেকসই উন্নয়ন হলো ওই ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড, যা ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশকে সুরক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে নিরাপদ ও নিশ্চিত করে। এই টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্য হিসাবে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমলে নেওয়া হয়। এই ১৭টি পয়েন্টের ৪ নম্বরে আছে ‘সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি’ এবং ৫ নম্বরে আছে ‘জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন’।

এখানে দুটি বিষয় খুব লক্ষণীয়। একটি হলো ‘অন্তর্ভুক্তি’, অপরটি হলো ‘জেন্ডার সমতা’। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বিষয় দুটি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। যদিও বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসে অনেকখানি এগিয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়, তারপরও তা আত্মতুষ্টির পর্যায়ে পড়ে না।

সার্বিক যে উন্নয়ন তা শুধুই আর্থিক বিষয় না হলেও অর্থনৈতিক ভূমিকাটি অন্যতম হিসাবে বিবেচিত হয়। কারণ, সম্পদের যে ব্যবহার, তা বৃদ্ধি করতে হলে আর্থিক সমর্থন জরুরি। তাই টেকসই উন্নয়নে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অনস্বীকার্য। আবার এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যাদের দ্বারা পরিচালিত হবে, তারা হলেন নারী ও পুরুষ। তাই অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতাবিধানের দিকে নজর দিতে হবে।

আমরা জানি, এ সময়ের বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় প্রযুক্তির দ্বারা। এখন নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইলে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের দিকেও নজর দিতে হবে। কোনো একটি পেশায় যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন তা যদি নারী, পুরুষ উভয়কেই দেওয়া না যায় তবে বৈষম্য বাড়তে বাধ্য। এ বিষয়ে গবেষক ড. নাজনীন আহমেদের পর্যবেক্ষণটি আমলে নেওয়া যেতে পারে।

তার কথায়, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, এ ধরনের অগ্রগতিতে অংশগ্রহণে পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে আছে। আর্থিক বিষয়ের জ্ঞান, আর্থিক বিষয়ের নানা ধরনের হিসাবনিকাশ, ঋণপ্রাপ্তি, নানা ধরনের আর্থিক সেবা গ্রহণ, মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন রকম ডিজিটাল আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণ ইত্যাদির সুযোগ ও ব্যবহারে নারী-পুরুষের ব্যবধান বা জেন্ডারবৈষম্য বিস্তর।’ এখানে বলে রাখা ভালো, ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর এখনো বড় জায়গা হলো ক্ষুদ্রঋণ, যা বিভিন্ন সমিতি বা এনজিওর মাধ্যমে বণ্টিত হয়।

ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণকারী নারীদের বসবাস শহরাঞ্চলে এবং তা নির্দিষ্ট একটি শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ২০০৬ সাল থেকে যে ‘বিশ্ব লিঙ্গবৈষম্য সূচক’ প্রকাশ করে আসছে, তা মূলত চারটি বিষয়কে বিবেচনা করে। বিষয়গুলো হলো-অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অর্জন, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। সেক্ষেত্রে আর্থিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আগেই বলেছি, আর্থিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এখন মোবাইল ফোন শুধু কথাবার্তা আদানপ্রদানের ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়, আর্থিক লেনদেনের অংশীদারও। ২০২০ সালের ১০ মার্চ প্রকাশিত জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট পুরুষের ৮৬ শতাংশের মোবাইল ফোনের মালিকানা আছে। অপরদিকে নারীদের বেলায় তা ৬১ শতাংশ। এক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ বের করতে চাইলে তা হবে ২৯ শতাংশ।

এখন যেহেতু সবাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করতে সক্ষম, তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে নারীরা অনেকখানি পিছিয়ে আছে। ওই প্রতিবেদনেই উল্লেখ আছে, ৩৩ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে, যেখানে নারীদের মধ্যে তা মাত্র ১৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে জেন্ডার গ্যাপ ৫২ শতাংশ। করোনাকালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সেজন্য তৈরি পোশাক শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী, যারা কিনা এই সেবা খাতটির সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছে। তবে এখানেও জেন্ডার গ্যাপ আছে। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জেন্ডার ব্যবধান এখনো ৪০ শতাংশের উপরে। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার উল্লেখ করার মতো নয়। কারণ দেশে নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম, যেখানে ১৪২টি দেশের গড় হিসাব ১৯ শতাংশেরও বেশি।

ব্যাংক ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীদের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। কারণ হিসাবে অনেকে মনে করেন, এদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলকে আওতায় আনতে পারেনি। তবে ইদানীংকালের এজেন্ট ব্যাংকিং তা অনেকটা পুষিয়ে দিতে পেরেছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যে ৫৬ লাখ নতুন অ্যাকাউন্ট যুক্ত হয়েছে তার ৫৭ ভাগ পুরুষ এবং ৪৩ ভাগ নারী।

অ্যাকাউন্ট বিবেচনায় বৈষম্য ততখানি নয়, তবে নারীদের অ্যাকাউন্টগুলোয় আর্থিক লেনদেন হলেও তা উদ্যোক্তাসংশ্লিষ্ট ঋণসংক্রান্ত নয়। কিন্তু এই ৫৬ লাখ ছাড়া যদি সার্বিক অ্যাকাউন্ট বিবেচনা করা হয়, তাহলে চিত্রটা হবে ভিন্ন। দেশের মোট পুরুষের ৬৫ শতাংশ ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী, অন্যদিকে নারীদের মাত্র ৩৬ শতাংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। ব্যবধান হিসাব করলে প্রায় ৪৫ শতাংশ। এটা বৈশ্বিক গড় মানের চেয়ে অনেক বেশি এবং বলা চলে সর্বোচ্চ।

কিন্তু ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতি সামান্যই। বড় উদ্যোক্তাদের কথা বলার মতো নয়। ২০১৯ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। এখানে কারও ওপর দোষারোপ করার কিছু নেই। আসলে ঋণ গ্রহণের যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতি আছে, এর সঙ্গে গ্রামীণ জনপদের নারীদের খুব একটা পরিচয় নেই। তারা জানেনই না কীভাবে ঋণ পেতে হয়। তাছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের যেসব আবশ্যকতা আছে, তা অনেক নারীর ক্ষেত্রেই পূরণ করা সম্ভব নয়। সেদিকটির উন্নতি করতে হলে দেখতে হবে অপ্রয়োজনীয় কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি না। যদি থাকে তবে তা দূর করে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে।

তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয় সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং ঘাটতি থেকে উত্তরণের পথ বের করার জন্য, কোনোমতেই হতাশ হওয়ার জন্য নয়। আমাদের দেশে আর্থিক বিষয়ে নারী-পুরুষের মজুরির ক্ষেত্রে জেন্ডারবৈষম্য বিশ্বের সর্বনিু। এটা আশার কথা। সারা বিশ্বে যেখানে মজুরিতে গড় বৈষম্য প্রায় ২২ শতাংশ, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতে তা ২০ শতাংশের কম নয়, সেখানে আমাদের দেশে তা মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। কাজেই এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের আছে।

টেকসই উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যগুলো কোনো কাল্পনিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারিত হয়নি। বরং আগামী দিনগুলোর বাস্তবতা বিচার করেই নিরূপণ করা হয়েছে। আমাদের কাজ হবে নিজেদেরকে এর উপযোগী হিসাবে গড়ে তোলা। তার মানে হলো-আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারিত করা। সেই আর্থিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়াতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হবে যেন তাতে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে কোনো বড় ধরনের বৈষম্যের আবির্ভাব না ঘটে। প্রযুক্তিগত ব্যবহারে যদি কোনো গোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সে শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। ব্যাংক খাতসহ সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে।

বৈষম্য ষোলো আনা দূরীকরণের কাজটি সহজ নয় এবং তা রাতারাতির কোনো বিষয়ও নয়, তবে তা অসম্ভবও নয় এবং বাস্তবতাবিবর্জিতও নয়। প্রয়োজন হলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে তা নিরসনে আন্তরিক হওয়া। আমাদের প্রচলিত সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি নারী-পুরুষকে এক কাতারে বিবেচনা করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার উপযুক্ত করে তুলতে পারে, তবেই এর অবসান হবে। আর আমাদের তা করতে হবে, কারণ আমরা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়