আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ও শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনা
jugantor
আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ও শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনা

  অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ  

২৫ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ও শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনা

করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী পর্যুদস্ত শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রাণ সঞ্চারের অপরিহার্যতাকে স্বীকৃতি দিয়ে আজ জাতিসংঘের শিক্ষাসংক্রান্ত বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কোর সঙ্গে সংযোগ রেখে দেশে দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উদ্যাপনের নির্ধারিত তারিখ ২৪ জানুয়ারি থাকলেও রোববার ছুটির দিন হওয়ায় ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ আজ দিনটি পালন করছে। অবশ্য বাংলাদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের কর্মসূচি অনুযায়ী গতকালই শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া এবং এসএসসি-এইচএসসির সংক্ষিপ্ত সিলেবাস নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। এ কর্মসূচির নাম ‘কোভিড ১৯-এ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা পুনরুদ্ধার এবং পুনরুজ্জীবিত শিক্ষা।’ ইতোমধ্যে শনিবার ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ইউনিসেফের সহায়তায় ৩৮ পৃষ্ঠার’ ‘কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুকরণ নির্দেশনা’ প্রকাশ করেছে। কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে নির্দিষ্ট করে বলা না হলেও ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনার যে দিকটি আমার ভালো লেগেছে তা হলো: “প্রথম পনেরো দিন ‘আনন্দঘন’ শিক্ষা, দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা নয়।” নির্দেশনাটি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে সহায়ক হিসাবে বিবেচিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে আমার জানতে ইচ্ছা করে, শুধু পনেরো দিন কেন, পুরো শিক্ষাবর্ষ ধরে আনন্দের মধ্যদিয়ে শিক্ষাদান নয় কেন? বিষয়টি আলোচনা ও বিবেচনার দাবি রাখে। অনুকরণ না করলেও বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের মনে আনন্দের অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে আমরা কি তা নিয়ে আলোচনা করতে পারি না?

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবারের দিবসটি উপলক্ষ্যে বাণীতে বলেছেন, ‘শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হলে তা প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করে, বিশেষ করে দুর্ভোগে পড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও তার পরিবার। সংক্রমণের তীব্রতার জন্য স্কুল, ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারা যে দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন, সে জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি তাদের শ্রদ্ধা জানাই। শিক্ষা ব্যাহতকারী অতিমারি শিক্ষায় উদ্ভাবনের পথ রচনা করলেও অনগ্রসর ও ক্ষয়ক্ষতিপ্রবণ জনগোষ্ঠীর উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলোকেও নস্যাৎ করে দিয়েছে।’ এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মহাসচিব ২০২১ সালে সব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের তহবিল পূর্ণ রাখতে ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে। তার বক্তব্যের পুরোটাই সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে আমার বিবেচনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য অংশ হলো: ‘আমাদের সব উদ্যোগ ও প্রয়াস সমন্বয় করে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে-শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ডিজিটাল বৈষম্য দূর এবং শিক্ষা কারিকুলাম পুনর্বিন্যাস করতে হবে। যাতে করে শিক্ষার্থীরা দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনে যথোপযুক্ত পারদর্শিতার ভিত্তিতে দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।’

২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের (সিদ্ধান্ত ৭৩/২৫) মূল লক্ষ্য ছিল সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কর্মসূচির সাফল্যসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের ১৭ লক্ষ্য, বিশেষ করে ৪ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং উল্লেখযোগ্য নানা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের মূল্যায়ন। করোনাসৃষ্ট সংকটের প্রাসঙ্গিকতায় শিক্ষায় অর্জিত নেতিবাচক ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার আলোকে প্রচলিত গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সে জন্য অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত, গৃহকোণে আবদ্ধ শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়োজিত রাখার প্রয়াস, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাতৃসম উদ্বেগ, বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। অনেকেই যখন কলকারখানা খুলে দিয়ে সরকারের আর্থিক কার্যক্রম সচল রাখার প্রশ্নে দ্বিধান্বিত ছিল, তখন তার আর্থিক কর্মতৎপরতা উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেভাবে ফলদায়ক হয়েছে, একইভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে সিলেবাস হ্রাস অথবা পরীক্ষা গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা পালনের পরও গতানুগতিক ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে সময়োপযোগী যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণই প্রত্যাশিত। দীর্ঘদিন ঘরে আবদ্ধ, সহপাঠীদের সাহচর্যবিহীন সময় পার করা শিশুশিক্ষার্থীদের মনে যে উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে পরিত্রাণে প্রচলিত সিলেবাস (সংক্ষিপ্ত হলেও) ও পাঠদান পদ্ধতি অবস্থার হেরফের ঘটাবে কি না, বলা কঠিন। সে জন্য শিক্ষার্থীদের নতুন পরিস্থিতিতে, যতদূর সম্ভব আনন্দের মধ্যদিয়ে অনুকূল পরিবেশে লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে। অবস্থার ভিন্নতার মূল্যায়ন করতে হবে। ঢাকা মহানগরে করোনা পরিস্থিতি ও ঢাকার বাইরে যে এক নয়, তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষায় ক্ষতির পরিমাপ ও প্রতিকারে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। করোনাকালীন সংকটের মধ্যেও সম্মুখ সারিতে থেকে যেসব শিক্ষক, চিকিৎসক, জরুরি সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখেছেন, শিক্ষার চাকা সচল রেখেছেন, তার মূল্যায়ন হওয়া বড় বেশি দরকার। বিশেষ করে সর্বস্তরের শিক্ষকদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা উন্নয়নে যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। অসন্তুষ্ট শিক্ষাদানকারী শিক্ষকের পক্ষে যে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখা সম্ভব নয়, তা স্বীকার করে কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত বাস্তবানুগ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এক সময় আমাদের দেশে শিক্ষার উন্নয়ন বলতে দালান-কোঠার উন্নয়ন বোঝানো হতো। স্কুলে অথবা গৃহে অথবা উভয় স্থানে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় বিদ্যমান প্রতিকূল পরিবেশ নিরানন্দ পাঠদান পদ্ধতি যেমন গ্রাহ্যের মধ্যে আসেনি, পাঠদানকারী শিক্ষকের প্রাপ্য আর্থসামজিক মর্যাদার সোপানগুলোও ছিল বিবেচনার বাইরে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয় ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তন হলেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি। তারপরও নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সময়কালেই মোটা দাগে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো এসেছে। তারপরও বলতে হয়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী ও যৎকিঞ্চিত আর্থিক সহায়তাপ্রাপ্ত অথবা পুরোপুরি বঞ্চিত শিক্ষক, যোগ্যতার সব শর্ত পূরণের পরও এক দশক বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে এমপিও থেকে বাদ পড়া শিক্ষকের ভাগ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। শিক্ষার সব ধারা ও স্তরে গতানুগতিকতা, অসংগতি ও তাৎক্ষণিকতার অপ্রতিহত দাপট লক্ষণীয়। প্রাথমিক শিক্ষকরা পদায়ন ও পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতার শিকার। এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নতুন করে আশার সঞ্চার করে; একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েও এমপিও থেকে বঞ্চিত ১২৭০ শিক্ষককে নতুন করে শূন্যপদে প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ভুলের কারণে, ভুল পদে সুপারিশ পাওয়ায় এসব শিক্ষক দীর্ঘদিন এমপিওবঞ্চিত রয়েছেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ এনটিআরসিএ তুলে দিয়ে পাবলিক সার্ভিস অনুরূপ ব্যবস্থায় শিক্ষক নিয়োগের কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি। অথচ এ শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে পাশকৃত। নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনীহা শিক্ষার উন্নয়নে নতুন নতুন উপসর্গের সৃষ্টি করেছে। করোনার আগে থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজিত এসব অসংগতি ও ভুল সিদ্ধান্ত শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে দিয়েছে।

এতৎসত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ করে শেখ হাসিনার নির্দেশনায় অর্জনগুলো উল্লেখ করার মতো। তবে করোনার কারণে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রাণ সঞ্চারের যে অপরিহার্যতা আজ শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে তা সক্রিয় বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের উপলব্ধি ও প্রস্তাবনা সেদিক থেকে নির্ভুল পথনির্দেশ করছে। আমাদের দেশে ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে দশকের পর দশক। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে ৩ বছর ধরে। দেশের শিক্ষা দিবসের সরকারি স্বীকৃতি আজও মেলেনি। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস সে বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণে পূর্ণ জাতীয় মর্যাদা পাবে-কায়মনোবাক্যে তাই প্রার্থনা করি।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর অন্যতম প্রণেতা

principalqfahmed@yahoo.com

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ও শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনা

 অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ 
২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ও শিক্ষা নিয়ে নতুন ভাবনা
ফাইল ছবি

করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী পর্যুদস্ত শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রাণ সঞ্চারের অপরিহার্যতাকে স্বীকৃতি দিয়ে আজ জাতিসংঘের শিক্ষাসংক্রান্ত বিশেষায়িত সংস্থা ইউনেস্কোর সঙ্গে সংযোগ রেখে দেশে দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উদ্যাপনের নির্ধারিত তারিখ ২৪ জানুয়ারি থাকলেও রোববার ছুটির দিন হওয়ায় ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ আজ দিনটি পালন করছে। অবশ্য বাংলাদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের কর্মসূচি অনুযায়ী গতকালই শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া এবং এসএসসি-এইচএসসির সংক্ষিপ্ত সিলেবাস নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। এ কর্মসূচির নাম ‘কোভিড ১৯-এ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা পুনরুদ্ধার এবং পুনরুজ্জীবিত শিক্ষা।’ ইতোমধ্যে শনিবার ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ইউনিসেফের সহায়তায় ৩৮ পৃষ্ঠার’ ‘কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুকরণ নির্দেশনা’ প্রকাশ করেছে। কবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে নির্দিষ্ট করে বলা না হলেও ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনার যে দিকটি আমার ভালো লেগেছে তা হলো: “প্রথম পনেরো দিন ‘আনন্দঘন’ শিক্ষা, দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা নয়।” নির্দেশনাটি সংশ্লিষ্ট সবার কাছে সহায়ক হিসাবে বিবেচিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে আমার জানতে ইচ্ছা করে, শুধু পনেরো দিন কেন, পুরো শিক্ষাবর্ষ ধরে আনন্দের মধ্যদিয়ে শিক্ষাদান নয় কেন? বিষয়টি আলোচনা ও বিবেচনার দাবি রাখে। অনুকরণ না করলেও বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের মনে আনন্দের অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে আমরা কি তা নিয়ে আলোচনা করতে পারি না?

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবারের দিবসটি উপলক্ষ্যে বাণীতে বলেছেন, ‘শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হলে তা প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করে, বিশেষ করে দুর্ভোগে পড়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও তার পরিবার। সংক্রমণের তীব্রতার জন্য স্কুল, ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারা যে দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিয়েছেন, সে জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি তাদের শ্রদ্ধা জানাই। শিক্ষা ব্যাহতকারী অতিমারি শিক্ষায় উদ্ভাবনের পথ রচনা করলেও অনগ্রসর ও ক্ষয়ক্ষতিপ্রবণ জনগোষ্ঠীর উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলোকেও নস্যাৎ করে দিয়েছে।’ এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মহাসচিব ২০২১ সালে সব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশনের তহবিল পূর্ণ রাখতে ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে। তার বক্তব্যের পুরোটাই সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে আমার বিবেচনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য অংশ হলো: ‘আমাদের সব উদ্যোগ ও প্রয়াস সমন্বয় করে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে-শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ডিজিটাল বৈষম্য দূর এবং শিক্ষা কারিকুলাম পুনর্বিন্যাস করতে হবে। যাতে করে শিক্ষার্থীরা দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনে যথোপযুক্ত পারদর্শিতার ভিত্তিতে দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।’

২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের (সিদ্ধান্ত ৭৩/২৫) মূল লক্ষ্য ছিল সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কর্মসূচির সাফল্যসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের ১৭ লক্ষ্য, বিশেষ করে ৪ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং উল্লেখযোগ্য নানা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের মূল্যায়ন। করোনাসৃষ্ট সংকটের প্রাসঙ্গিকতায় শিক্ষায় অর্জিত নেতিবাচক ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার আলোকে প্রচলিত গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সে জন্য অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত, গৃহকোণে আবদ্ধ শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়োজিত রাখার প্রয়াস, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাতৃসম উদ্বেগ, বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত দিকনির্দেশনা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। অনেকেই যখন কলকারখানা খুলে দিয়ে সরকারের আর্থিক কার্যক্রম সচল রাখার প্রশ্নে দ্বিধান্বিত ছিল, তখন তার আর্থিক কর্মতৎপরতা উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেভাবে ফলদায়ক হয়েছে, একইভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে সিলেবাস হ্রাস অথবা পরীক্ষা গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা পালনের পরও গতানুগতিক ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে সময়োপযোগী যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণই প্রত্যাশিত। দীর্ঘদিন ঘরে আবদ্ধ, সহপাঠীদের সাহচর্যবিহীন সময় পার করা শিশুশিক্ষার্থীদের মনে যে উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে পরিত্রাণে প্রচলিত সিলেবাস (সংক্ষিপ্ত হলেও) ও পাঠদান পদ্ধতি অবস্থার হেরফের ঘটাবে কি না, বলা কঠিন। সে জন্য শিক্ষার্থীদের নতুন পরিস্থিতিতে, যতদূর সম্ভব আনন্দের মধ্যদিয়ে অনুকূল পরিবেশে লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে। অবস্থার ভিন্নতার মূল্যায়ন করতে হবে। ঢাকা মহানগরে করোনা পরিস্থিতি ও ঢাকার বাইরে যে এক নয়, তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে শিক্ষায় ক্ষতির পরিমাপ ও প্রতিকারে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। করোনাকালীন সংকটের মধ্যেও সম্মুখ সারিতে থেকে যেসব শিক্ষক, চিকিৎসক, জরুরি সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখেছেন, শিক্ষার চাকা সচল রেখেছেন, তার মূল্যায়ন হওয়া বড় বেশি দরকার। বিশেষ করে সর্বস্তরের শিক্ষকদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা উন্নয়নে যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। অসন্তুষ্ট শিক্ষাদানকারী শিক্ষকের পক্ষে যে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখা সম্ভব নয়, তা স্বীকার করে কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত বাস্তবানুগ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এক সময় আমাদের দেশে শিক্ষার উন্নয়ন বলতে দালান-কোঠার উন্নয়ন বোঝানো হতো। স্কুলে অথবা গৃহে অথবা উভয় স্থানে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় বিদ্যমান প্রতিকূল পরিবেশ নিরানন্দ পাঠদান পদ্ধতি যেমন গ্রাহ্যের মধ্যে আসেনি, পাঠদানকারী শিক্ষকের প্রাপ্য আর্থসামজিক মর্যাদার সোপানগুলোও ছিল বিবেচনার বাইরে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয় ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তন হলেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসেনি। তারপরও নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সময়কালেই মোটা দাগে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো এসেছে। তারপরও বলতে হয়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী ও যৎকিঞ্চিত আর্থিক সহায়তাপ্রাপ্ত অথবা পুরোপুরি বঞ্চিত শিক্ষক, যোগ্যতার সব শর্ত পূরণের পরও এক দশক বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে এমপিও থেকে বাদ পড়া শিক্ষকের ভাগ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। শিক্ষার সব ধারা ও স্তরে গতানুগতিকতা, অসংগতি ও তাৎক্ষণিকতার অপ্রতিহত দাপট লক্ষণীয়। প্রাথমিক শিক্ষকরা পদায়ন ও পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতার শিকার। এর মধ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নতুন করে আশার সঞ্চার করে; একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েও এমপিও থেকে বঞ্চিত ১২৭০ শিক্ষককে নতুন করে শূন্যপদে প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ভুলের কারণে, ভুল পদে সুপারিশ পাওয়ায় এসব শিক্ষক দীর্ঘদিন এমপিওবঞ্চিত রয়েছেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ এনটিআরসিএ তুলে দিয়ে পাবলিক সার্ভিস অনুরূপ ব্যবস্থায় শিক্ষক নিয়োগের কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি। অথচ এ শিক্ষানীতি জাতীয় সংসদে পাশকৃত। নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনীহা শিক্ষার উন্নয়নে নতুন নতুন উপসর্গের সৃষ্টি করেছে। করোনার আগে থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজিত এসব অসংগতি ও ভুল সিদ্ধান্ত শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকে অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে দিয়েছে।

এতৎসত্ত্বেও শিক্ষাক্ষেত্রে এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশেষ করে শেখ হাসিনার নির্দেশনায় অর্জনগুলো উল্লেখ করার মতো। তবে করোনার কারণে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রাণ সঞ্চারের যে অপরিহার্যতা আজ শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে তা সক্রিয় বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের উপলব্ধি ও প্রস্তাবনা সেদিক থেকে নির্ভুল পথনির্দেশ করছে। আমাদের দেশে ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে দশকের পর দশক। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে ৩ বছর ধরে। দেশের শিক্ষা দিবসের সরকারি স্বীকৃতি আজও মেলেনি। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস সে বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণে পূর্ণ জাতীয় মর্যাদা পাবে-কায়মনোবাক্যে তাই প্রার্থনা করি।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর অন্যতম প্রণেতা

principalqfahmed@yahoo.com