ভর্তি পরীক্ষা যেন প্রহসন না হয়
jugantor
ভর্তি পরীক্ষা যেন প্রহসন না হয়

  শুভেন্দু সাহা  

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে উচ্চ মাধ্যমিক ফল প্রকাশের পরপরই শিক্ষার্থীরা নামে ভর্তিযুদ্ধে এবং বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শুরু হয় ভর্তি-উৎসব নামক বিরাট কর্মযজ্ঞের। এ বছর অবশ্য কোভিড-১৯-এর কারণে পরিস্থিতি ভিন্ন। শিক্ষার্থীরা নানা উৎকণ্ঠা ও সিদ্ধান্তের দোলাচলে পড়ে পরীক্ষা না দিয়ে অটোপ্রমোশন বা অটোপাশ লাভ করেছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে ঠাট্টা বা ট্রল, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকারও হতে হয়েছে তাদের। অথচ এ অটোপাশ বা কোভিড-১৯ পরিস্থিতির জন্য কোনোভাবেই এসব শিক্ষার্থী দায়ী নয়। বরং পূর্ণ প্রস্তুতি থাকার পরও পরীক্ষা দিতে না পারাটা তাদের জন্য ছিল কষ্টের। সেইসঙ্গে আরও একটি বিষয় বলা প্রয়োজন যে, কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় অটোপাশের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। ৩১ জানুয়ারি জেএসসি এবং এসএসসির ফলের গড় করে এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার পরপরই বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে কাজকর্ম শুরু করেছে এবং তারপরই বিভিন্ন পত্রিকাজুড়ে উঠে এসেছে আসন্ন এক ভর্তি প্রহসনের চিত্র।

ইতোমধ্যে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছপদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৬টি এবং প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৩টি। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাকি ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্রভাবে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বছর গুচ্ছপদ্ধতিতে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে আবেদন করার যোগ্যতা যথাক্রমে বিজ্ঞানের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলিয়ে জিপিএ-৭.০০, বাণিজ্য শাখার জন্য জিপিএ-৬.৫ এবং মানবিক শাখার জন্য জিপিএ-৬.০০। এটি আপাতদৃষ্টিতে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিপত্তিটা অন্য জায়গায়। অর্থাৎ, আবেদন করলেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। কেননা, গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে তারা ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করবেন না। এ সিদ্ধান্তের মতো প্রায় একইরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনটি ইউনিটে (বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক) মোট এক লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারবে। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারবে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী। এবার কথা হলো, এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫.০০ পেয়েছে এক লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন। এখন যদি জিপিএ-৫.০০ প্রাপ্তদের সংখ্যাকেই বিবেচনায় নেওয়া হয় তবে গুচ্ছপদ্ধতিতেই সব জিপিএ-৫.০০-ধারীরই অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। এতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুচ্ছপদ্ধতিতে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা থেকে প্রাথমিকভাবেই বাদ পড়ে যাবে অনেক জিপিএ-৫.০০-ধারী। জিপিএ-৫.০০-ধারীদের নিচের ফলাফলে যেসব শিক্ষার্থী আছে তাদের অবস্থা তো আরও করুণ। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয় যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত জিপিএতে আবেদন করতে পারলেও পরীক্ষায় সবাই অংশ নিতে পারবে না, এতে অনেক শিক্ষার্থীই তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে, স্বপ্নভঙ্গ হবে অসংখ্য পরিবারের। যদিও এরইমধ্যে একজন মাননীয় উপাচার্য বলেছেন, সবার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। তার এ কথাটি একদিক থেকে যৌক্তিক এ কারণে, উচ্চশিক্ষা চাকরির বাজার তৈরি করে না; বরং যেসব শিক্ষার্থী জ্ঞানের সৃজন এবং গবেষণায় ব্রতী হয়ে শিক্ষা নিতে আগ্রহী তাদেরই উচ্চশিক্ষায় অধিকার সবার আগে। কিন্তু অন্যদিক বিবেচনায় এটি নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা দরকার, শুধু জিপিএ কম থাকার কারণে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার এই যে প্রচেষ্টা, তা কী প্রকারান্তরে ভর্তি পরীক্ষা নাকি ভর্তি প্রহসন? কেননা, এর আগে আমরা ‘আই অ্যাম জিপিএ ৫.০০’-ধারীদেরও দেখেছি যাদের তুলনায় কম জিপিএপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করেছে এবং পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়েও রেখেছে মেধার স্বাক্ষর। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে না পারা এসব শিক্ষার্থী কোভিড-১৯-এর কারণে এরইমধ্যে অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি থাকার পর এবং প্রাথমিক আবেদন করেও যদি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে, তাহলে তা হবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রহসন। নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ; সুতরাং তাদের এটি অজনা নয় যে, ইতোমধ্যে এ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের গুচ্ছ পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে বলে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ যেহেতু কম, বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ বা বিষয় পছন্দ করার সুযোগও তুলনামূলক কম এবং তাদের নিয়ে অনেকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে গেছে। এই এক ব্যাচের ওপর এতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষাও যথার্থ কি না, সেটি দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয়। গুচ্ছ পরীক্ষার নীতিনির্ধারকরা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার কেন্দ্র দিয়ে প্রাথমিকভাবে আবেদন করা সব শিক্ষার্থীকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে পারে। তাতে অসংখ্য শিক্ষার্থীর লক্ষ্য যেমন পূরণ হবে, ঠিক তেমনি স্বপ্ন বেঁচে থাকবে অসংখ্য জনের। রবীন্দ্রনাথ তার একটি গানে বলেছিলেন: ‘আমি বহুবাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।’ অনেক শিক্ষার্থী বহুবাসনায় এ ভর্তি-উৎসবে অংশ নিতে চায়; কিন্তু বঞ্চিত করে বোধহয় তাদের স্বপ্নগুলোকে বাঁচানো যাবে না।

শুভেন্দু সাহা : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভর্তি পরীক্ষা যেন প্রহসন না হয়

 শুভেন্দু সাহা 
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে উচ্চ মাধ্যমিক ফল প্রকাশের পরপরই শিক্ষার্থীরা নামে ভর্তিযুদ্ধে এবং বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই স্নাতক (সম্মান) ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শুরু হয় ভর্তি-উৎসব নামক বিরাট কর্মযজ্ঞের। এ বছর অবশ্য কোভিড-১৯-এর কারণে পরিস্থিতি ভিন্ন। শিক্ষার্থীরা নানা উৎকণ্ঠা ও সিদ্ধান্তের দোলাচলে পড়ে পরীক্ষা না দিয়ে অটোপ্রমোশন বা অটোপাশ লাভ করেছে। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে ঠাট্টা বা ট্রল, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকারও হতে হয়েছে তাদের। অথচ এ অটোপাশ বা কোভিড-১৯ পরিস্থিতির জন্য কোনোভাবেই এসব শিক্ষার্থী দায়ী নয়। বরং পূর্ণ প্রস্তুতি থাকার পরও পরীক্ষা দিতে না পারাটা তাদের জন্য ছিল কষ্টের। সেইসঙ্গে আরও একটি বিষয় বলা প্রয়োজন যে, কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় অটোপাশের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। ৩১ জানুয়ারি জেএসসি এবং এসএসসির ফলের গড় করে এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার পরপরই বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে কাজকর্ম শুরু করেছে এবং তারপরই বিভিন্ন পত্রিকাজুড়ে উঠে এসেছে আসন্ন এক ভর্তি প্রহসনের চিত্র।

ইতোমধ্যে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছপদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৬টি এবং প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৩টি। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাকি ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্রভাবে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বছর গুচ্ছপদ্ধতিতে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে আবেদন করার যোগ্যতা যথাক্রমে বিজ্ঞানের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলিয়ে জিপিএ-৭.০০, বাণিজ্য শাখার জন্য জিপিএ-৬.৫ এবং মানবিক শাখার জন্য জিপিএ-৬.০০। এটি আপাতদৃষ্টিতে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিপত্তিটা অন্য জায়গায়। অর্থাৎ, আবেদন করলেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। কেননা, গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে তারা ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করবেন না। এ সিদ্ধান্তের মতো প্রায় একইরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনটি ইউনিটে (বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক) মোট এক লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারবে। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারবে ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী। এবার কথা হলো, এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫.০০ পেয়েছে এক লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন। এখন যদি জিপিএ-৫.০০ প্রাপ্তদের সংখ্যাকেই বিবেচনায় নেওয়া হয় তবে গুচ্ছপদ্ধতিতেই সব জিপিএ-৫.০০-ধারীরই অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। এতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুচ্ছপদ্ধতিতে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা থেকে প্রাথমিকভাবেই বাদ পড়ে যাবে অনেক জিপিএ-৫.০০-ধারী। জিপিএ-৫.০০-ধারীদের নিচের ফলাফলে যেসব শিক্ষার্থী আছে তাদের অবস্থা তো আরও করুণ। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয় যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত জিপিএতে আবেদন করতে পারলেও পরীক্ষায় সবাই অংশ নিতে পারবে না, এতে অনেক শিক্ষার্থীই তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে, স্বপ্নভঙ্গ হবে অসংখ্য পরিবারের। যদিও এরইমধ্যে একজন মাননীয় উপাচার্য বলেছেন, সবার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। তার এ কথাটি একদিক থেকে যৌক্তিক এ কারণে, উচ্চশিক্ষা চাকরির বাজার তৈরি করে না; বরং যেসব শিক্ষার্থী জ্ঞানের সৃজন এবং গবেষণায় ব্রতী হয়ে শিক্ষা নিতে আগ্রহী তাদেরই উচ্চশিক্ষায় অধিকার সবার আগে। কিন্তু অন্যদিক বিবেচনায় এটি নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা দরকার, শুধু জিপিএ কম থাকার কারণে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখার এই যে প্রচেষ্টা, তা কী প্রকারান্তরে ভর্তি পরীক্ষা নাকি ভর্তি প্রহসন? কেননা, এর আগে আমরা ‘আই অ্যাম জিপিএ ৫.০০’-ধারীদেরও দেখেছি যাদের তুলনায় কম জিপিএপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করেছে এবং পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়েও রেখেছে মেধার স্বাক্ষর। পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে না পারা এসব শিক্ষার্থী কোভিড-১৯-এর কারণে এরইমধ্যে অনেক বঞ্চনার শিকার হয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি থাকার পর এবং প্রাথমিক আবেদন করেও যদি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে, তাহলে তা হবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রহসন। নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ; সুতরাং তাদের এটি অজনা নয় যে, ইতোমধ্যে এ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের গুচ্ছ পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে বলে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ যেহেতু কম, বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ বা বিষয় পছন্দ করার সুযোগও তুলনামূলক কম এবং তাদের নিয়ে অনেকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে গেছে। এই এক ব্যাচের ওপর এতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষাও যথার্থ কি না, সেটি দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ রয়েছে বলে মনে হয়। গুচ্ছ পরীক্ষার নীতিনির্ধারকরা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার কেন্দ্র দিয়ে প্রাথমিকভাবে আবেদন করা সব শিক্ষার্থীকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে পারে। তাতে অসংখ্য শিক্ষার্থীর লক্ষ্য যেমন পূরণ হবে, ঠিক তেমনি স্বপ্ন বেঁচে থাকবে অসংখ্য জনের। রবীন্দ্রনাথ তার একটি গানে বলেছিলেন: ‘আমি বহুবাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।’ অনেক শিক্ষার্থী বহুবাসনায় এ ভর্তি-উৎসবে অংশ নিতে চায়; কিন্তু বঞ্চিত করে বোধহয় তাদের স্বপ্নগুলোকে বাঁচানো যাবে না।

শুভেন্দু সাহা : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়