রাজনীতির নষ্ট সময়ে তারুণ্যে প্রত্যাশা
jugantor
রাজনীতির নষ্ট সময়ে তারুণ্যে প্রত্যাশা

  একেএম শাহনাওয়াজ  

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি-সাহিত্যিকই তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন। বলেছেন, তরুণরা জরাগ্রস্ততায় ভোগে না। এ জরা শুধু দৈহিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। তরুণরা সতেজ। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী। তরুণরা সাহসী, উদ্ভাবনী চিন্তা থাকে তাদের মধ্যে। ফলে অসুরকে তাড়িয়ে সুরের প্রতিষ্ঠা করে তারা। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ দেশের ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনে তরুণরাই নেতৃত্বে ছিল। কারণ, তরুণরা ছিল নির্লোভ-নির্ভয় দেশপ্রেমিক।

তারুণ্যের শক্তিকে খ্রিষ্টপূর্ব যুগে চীনে কনফুসিয়াস আর গ্রিসে দার্শনিক সক্রেটিস ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। তারা তরুণদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার পথ দেখাতে চেয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, তারুণ্যের শক্তি ছাড়া সুস্থ জীবন আর রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। তাই অন্যায়কারী গ্রিসের রাজা ও অভিজাতরা অনুভব করেন তারুণ্যের এ উত্থান তাদের অচলায়তন ভেঙে ফেলবে। এ কারণে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল সক্রেটিসকে।

আজ এতকাল পর কী দেখছি আমরা? আমাদের দেশে তারুণ্যের দাপুটে অংশকে সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্ধকারের গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে নিজের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে পেরেছিল। একইসঙ্গে গৌরবজনক প্রতিবাদী আন্দোলনের চারণভূমি হিসাবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অবশ্য তখন পরিপ্রেক্ষিতও ছিল আলাদা।

স্বাধীন পাকিস্তানে পরাধীন হয়ে পড়েছিল বাঙালি। তাই মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ-ভাবনাকে মনে জায়গা দেননি। দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধিকারের আন্দোলনে।

আইয়ুব খান এনএসএফ তৈরি করে এ সুন্দর পরিমণ্ডলকে বিষাক্ত করতে চেয়েছিলেন। রক্তক্ষরণ হয়েছে; কিন্তু সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সুবিধাবাদের বীজ বপন করে বৈপ্লবিক চেতনাকে নিবীর্য করে দিতে পারেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আইয়ুব খানের আরাধ্য কাজ সুচারুভাবে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখল স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতাপিয়াসী রাজনৈতিক দলগুলো।

স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বৈপ্লবিক আন্দোলনের প্রয়োজন অনেকটা ফুরিয়ে গেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে সচেতন মানুষগুলোর নির্মোহ রাজনৈতিক চেতনা হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। শিক্ষার অধিকার, সামাজিক অধিকার, সুস্থ রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ সব ক্ষেত্রে আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের। একমাত্র নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ভুবন তেমন কোনো আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করতে পারেনি।

দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মোহগ্রস্ত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেড়েছে। দলীয় সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠায় এসব দলের ক্রীড়নকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহমুক্ত ঐক্যবদ্ধ শক্তির সম্ভাবনার জায়গাটিকে ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড করে দেয়। দলীয় রাজনীতির আস্তাবল বানাতে থাকে। কিন্তু মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্রকে এভাবে দলিত-মথিত করা কঠিন।

মোহগ্রস্ত করে ছাত্রদের একটি ছোট অংশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্যাম্পাসে তাদের লেজুড় সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব লেজুড় সংগঠনগুলোর ক্ষমতার উত্থান-পতন ঘটতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই মূল দলের ইঙ্গিতে ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররা উন্মত্ত আচরণ করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার কল্যাণচিন্তার বদলে মূল দলের নির্দেশ পালনেই ব্যস্ত থাকে।

এ আসুরিক পরিবেশে নিজেদের গুটিয়ে নেয় মেধাবী মুক্তচিন্তার শিক্ষার্থীরা। সংখ্যায় সিংহভাগ হলেও এরা একাকী হয়ে যায়। বলা যায়, নিবীর্যও হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে তারুণ্যকে সুপথে পরিচালনা করার সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও আশির দশক পর্যন্ত থানা ও জেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ছিল সক্রিয়। এ সংগঠনগুলো ঘিরে তরুণদের নান্দনিক চিন্তা ও দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার একটি পথ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনীতিতে বিবদমান দলের অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

যুক্তিবুদ্ধির রাজনীতি ক্ষমতার রাজনীতিতে এসে নিজের গৌরব হারিয়ে ফেলে। গণতন্ত্র চর্চার চেয়ে শক্তির চর্চা বেশি হতে থাকে। এ পথে তারুণ্যের একটি সরব অংশ অশুভ রাজনীতিকদের ক্রীড়নকে পরিণত হতে থাকে। বেশ কয়েক বছর আগেও জামায়াতে ইসলামী সমর্থক তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায় সারা দেশে চোরাগোপ্তা বা প্রকাশ্য মিছিল নিয়ে, বিশেষ করে পুলিশের ওপর হামলে পড়েছিল। গাড়ি ভেঙেছে, আগুন দিয়েছে।

এর কারণ হিসাবে অনেকে মনে করছেন, সে সময় যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তাই বিচার বিঘ্নিত করার জন্য তৈরি করতে চেয়েছিল অরাজক অবস্থা। আমরা মনে করি, সুস্থ মেধায় ভাবলে এ দেশের বাঙালি তরুণের এ কাজ করার কথা ছিল না। অর্থ আর অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান করে এবং প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা আড়াল করে ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এদের ‘বাঁচলে গাজি মরলে শহিদ’-এর দীক্ষা দিয়ে জঙ্গি ও অমানবিক বানানো হয়েছে।

যে তরুণের সুন্দর আর ন্যায়ের পক্ষে থাকার কথা, দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার কথা তারা ঘোর অন্ধকারে নিপতিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, পাকিস্তানি হানাদারদের বাঙালি হত্যা, সম্পদ ধ্বংসকারী ও নারী ধর্ষণে সহযোগী কতিপয় মানুষকে রক্ষা করতে অধর্ম ও অমানবিক কাজ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি যুক্তিবুদ্ধিহীন কলুষিত না হলে তারুণ্যের এ পরাজয় সর্বত্র দেখতে হতো না। ফর্মুলায় আটকে থেকে কেউ কেউ বলে বেড়ান, ভবিষ্যৎ রাজনীতির শূন্যতা পূরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি অবশ্যই থাকা উচিত।

একইসঙ্গে তারা সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীনতা-পূর্ব উজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতির উদাহরণও দাঁড় করান। তাদের কী করে বোঝাই-‘ছাত্র রাজনীতি’ আর বর্তমান ধারার লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি এক কথা নয়। যার যার দলীয় আদর্শ ধারণ করা বা তা বাস্তবায়নে দোষের কিছু নেই সত্য। সংকট তখনই হয়, যখন দলীয় সমর্থনে রাজনীতি চর্চার বদলে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত হয় তারুণ্য। এরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝতে চায় না।

মূল দলের নেতৃত্বের মতো এরাও পরমতসহিষ্ণুতাকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে। মূলদল যেমন কপটতার আশ্রয় নিয়ে বলতে থাকে, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ সেদিক থেকে লেজুড় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা কপটতা না করে প্রভুদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যক্তিবন্দনাই করে। তাই এরা স্লোগানের ক্রমবিকাশ ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে নিজেদের পরিচয় দেয় এভাবে: বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, জিয়ার সৈনিক, খালেদা জিয়ার সৈনিক, শেখ হাসিনার সৈনিক আর ‘আগামীর রাষ্ট্রনায়ক’ তারেক জিয়ার সৈনিক।

এ কারণে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত তারুণ্য সাধারণ মানুষের তো নয়ই, নিজ রাজনৈতিক দলের আদর্শেরও সৈনিক হতে পারে না। মূল দলের ইচ্ছাপূরণের জন্য ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব বজায় রাখাটা প্রধান কাজ হিসাবে মনে করে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধে যুক্ত থেকে তারুণ্যের আদর্শিক ও নৈতিক মনোভূমিকে অনুর্বর করে ফেলে। যারা ভাবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি চর্চা করে এরা ভবিষ্যতের রাজনীতিক হবেন, গণতন্ত্র রক্ষা করবেন; আমি বিনয়ের সঙ্গে তাদের স্বাপ্নিক বলব।

হয়তো এখানে কিছু ব্যতিক্রম খুঁজে পাওয়া যাবে, তারপরও আমি পাঠকের কাছে একটি প্রশ্ন রাখছি: বিগত পাঁচ দশক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এমন একজনও কি পাওয়া যাবে, যারা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ছাত্রনেতাদের সামান্য গুণাবলি ধারণ করেন?

এ সময়ে ছাত্র রাজনীতি করা কেউ কেউ নিজ দল বা অঙ্গসংগঠনের কান্ডারি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যা চর্চা করেছেন; সেই অভিজ্ঞতায় দুর্নীতিবাজ হয়েছেন। সময়ের ফেরে এদের অনেকে রাজবন্দি নন, দুর্নীতির দায়ে জেল-জরিমানায় আটকে গেছেন বা গিয়েছিলেন। এখন যদি আমূল সংস্কার ছাড়া সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের দোহাইয়ে প্রচলিত ধারার ছাত্র রাজনীতিকেই অনুমোদন করি, তাহলে আকাশের কালো মেঘ আরও কালো রূপ ধারণ করবে।

নষ্ট ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত না থেকে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভবিষ্যৎ রাজনীতিক হওয়ার দীক্ষা নিতে পারবে না? তাহলে একবার চোখ ফেরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধারার সাংস্কৃতিক সংগঠনে ছাত্রছাত্রীরা কাজ করে যাচ্ছে। চর্চার সঙ্গে যুক্ত বলে তুলনামূলক বেশি রাজনৈতিক সচেতনতা থাকার কথা এদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনও আছে অনেকের।

কিন্তু সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সাধারণত কোনো জাতীয় দলের লেজুড় বা আজকালকার ভদ্রগোছের শব্দ সহযোগী বা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নয়। তাই কোনো স্বার্থবাদিতা বা উন্মত্ত আচরণ খুব কমই এদের মধ্যে দেখা যায়। এরা চাঁদাবাজি করে না; পকেটের পয়সা বাঁচিয়ে সংগঠন চালাতে চাঁদা দেয়। এরা অন্যদের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত-মত্ত সতীর্থদের হাতে মাঝেমধ্যেই লাঞ্ছিত হয়। সুতরাং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির হাল ধরতে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির দীক্ষা নেওয়া অনিবার্য হতে পারে না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আপাত নিরীহ হলেও প্রয়োজনে রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশে দ্বিধা করে না।

তবে আমরা প্রত্যাশার জায়গাটি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। রাজনীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংশ্লিষ্ট আমরা অনেকেই আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আদর্শ-এমন দাবি করতে পারব না। যত নষ্ট সময়ই যাক, তবুও আমরা মনে করি, তরুণ প্রজন্মই সুন্দরের স্বপ্ন বোনে এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম লালন করে। তারুণ্যের ইচ্ছা আর শক্তি ছাড়া সভ্যতার চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে আমরা আমাদের প্রত্যাশার জায়গা থেকে বলব, দায়িত্বশীলতার বোধ থেকে এবং সংকীর্ণ স্বার্থবাদী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বুকে যদি কিছুটা দেশপ্রেম অবশিষ্ট থাকে; তবে তার সন্ধান করতে চাই।

এর খোঁজ পেলে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে তারুণ্যকে অন্ধকার থেকে বের করে আনা। দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে সুস্থ চিন্তায় বিকশিত হতে দেওয়া। দেশের সর্বত্র সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তোলা। এসব সংগঠনে তরুণ নেতৃত্ব ও তারুণ্যের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা। ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করা। এ ছাড়া সুবাতাস প্রবাহিত হওয়ার আর কোনো পথ আছে বলে আমরা মনে করি না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnaway7b@gmail.com

রাজনীতির নষ্ট সময়ে তারুণ্যে প্রত্যাশা

 একেএম শাহনাওয়াজ 
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি-সাহিত্যিকই তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন। বলেছেন, তরুণরা জরাগ্রস্ততায় ভোগে না। এ জরা শুধু দৈহিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। তরুণরা সতেজ। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী। তরুণরা সাহসী, উদ্ভাবনী চিন্তা থাকে তাদের মধ্যে। ফলে অসুরকে তাড়িয়ে সুরের প্রতিষ্ঠা করে তারা। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ দেশের ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনে তরুণরাই নেতৃত্বে ছিল। কারণ, তরুণরা ছিল নির্লোভ-নির্ভয় দেশপ্রেমিক।

তারুণ্যের শক্তিকে খ্রিষ্টপূর্ব যুগে চীনে কনফুসিয়াস আর গ্রিসে দার্শনিক সক্রেটিস ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। তারা তরুণদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার পথ দেখাতে চেয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, তারুণ্যের শক্তি ছাড়া সুস্থ জীবন আর রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। তাই অন্যায়কারী গ্রিসের রাজা ও অভিজাতরা অনুভব করেন তারুণ্যের এ উত্থান তাদের অচলায়তন ভেঙে ফেলবে। এ কারণে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল সক্রেটিসকে।

আজ এতকাল পর কী দেখছি আমরা? আমাদের দেশে তারুণ্যের দাপুটে অংশকে সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্ধকারের গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসাবে নিজের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে পেরেছিল। একইসঙ্গে গৌরবজনক প্রতিবাদী আন্দোলনের চারণভূমি হিসাবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অবশ্য তখন পরিপ্রেক্ষিতও ছিল আলাদা।

স্বাধীন পাকিস্তানে পরাধীন হয়ে পড়েছিল বাঙালি। তাই মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ-ভাবনাকে মনে জায়গা দেননি। দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধিকারের আন্দোলনে।

আইয়ুব খান এনএসএফ তৈরি করে এ সুন্দর পরিমণ্ডলকে বিষাক্ত করতে চেয়েছিলেন। রক্তক্ষরণ হয়েছে; কিন্তু সার্বিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সুবিধাবাদের বীজ বপন করে বৈপ্লবিক চেতনাকে নিবীর্য করে দিতে পারেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আইয়ুব খানের আরাধ্য কাজ সুচারুভাবে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখল স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতাপিয়াসী রাজনৈতিক দলগুলো।

স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বৈপ্লবিক আন্দোলনের প্রয়োজন অনেকটা ফুরিয়ে গেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে সচেতন মানুষগুলোর নির্মোহ রাজনৈতিক চেতনা হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। শিক্ষার অধিকার, সামাজিক অধিকার, সুস্থ রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ সব ক্ষেত্রে আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের। একমাত্র নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ভুবন তেমন কোনো আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করতে পারেনি।

দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মোহগ্রস্ত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেড়েছে। দলীয় সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠায় এসব দলের ক্রীড়নকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহমুক্ত ঐক্যবদ্ধ শক্তির সম্ভাবনার জায়গাটিকে ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড করে দেয়। দলীয় রাজনীতির আস্তাবল বানাতে থাকে। কিন্তু মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্রকে এভাবে দলিত-মথিত করা কঠিন।

মোহগ্রস্ত করে ছাত্রদের একটি ছোট অংশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্যাম্পাসে তাদের লেজুড় সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব লেজুড় সংগঠনগুলোর ক্ষমতার উত্থান-পতন ঘটতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই মূল দলের ইঙ্গিতে ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররা উন্মত্ত আচরণ করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার কল্যাণচিন্তার বদলে মূল দলের নির্দেশ পালনেই ব্যস্ত থাকে।

এ আসুরিক পরিবেশে নিজেদের গুটিয়ে নেয় মেধাবী মুক্তচিন্তার শিক্ষার্থীরা। সংখ্যায় সিংহভাগ হলেও এরা একাকী হয়ে যায়। বলা যায়, নিবীর্যও হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে তারুণ্যকে সুপথে পরিচালনা করার সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও আশির দশক পর্যন্ত থানা ও জেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ছিল সক্রিয়। এ সংগঠনগুলো ঘিরে তরুণদের নান্দনিক চিন্তা ও দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার একটি পথ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনীতিতে বিবদমান দলের অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

যুক্তিবুদ্ধির রাজনীতি ক্ষমতার রাজনীতিতে এসে নিজের গৌরব হারিয়ে ফেলে। গণতন্ত্র চর্চার চেয়ে শক্তির চর্চা বেশি হতে থাকে। এ পথে তারুণ্যের একটি সরব অংশ অশুভ রাজনীতিকদের ক্রীড়নকে পরিণত হতে থাকে। বেশ কয়েক বছর আগেও জামায়াতে ইসলামী সমর্থক তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায় সারা দেশে চোরাগোপ্তা বা প্রকাশ্য মিছিল নিয়ে, বিশেষ করে পুলিশের ওপর হামলে পড়েছিল। গাড়ি ভেঙেছে, আগুন দিয়েছে।

এর কারণ হিসাবে অনেকে মনে করছেন, সে সময় যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তাই বিচার বিঘ্নিত করার জন্য তৈরি করতে চেয়েছিল অরাজক অবস্থা। আমরা মনে করি, সুস্থ মেধায় ভাবলে এ দেশের বাঙালি তরুণের এ কাজ করার কথা ছিল না। অর্থ আর অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান করে এবং প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা আড়াল করে ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এদের ‘বাঁচলে গাজি মরলে শহিদ’-এর দীক্ষা দিয়ে জঙ্গি ও অমানবিক বানানো হয়েছে।

যে তরুণের সুন্দর আর ন্যায়ের পক্ষে থাকার কথা, দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার কথা তারা ঘোর অন্ধকারে নিপতিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, পাকিস্তানি হানাদারদের বাঙালি হত্যা, সম্পদ ধ্বংসকারী ও নারী ধর্ষণে সহযোগী কতিপয় মানুষকে রক্ষা করতে অধর্ম ও অমানবিক কাজ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি যুক্তিবুদ্ধিহীন কলুষিত না হলে তারুণ্যের এ পরাজয় সর্বত্র দেখতে হতো না। ফর্মুলায় আটকে থেকে কেউ কেউ বলে বেড়ান, ভবিষ্যৎ রাজনীতির শূন্যতা পূরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি অবশ্যই থাকা উচিত।

একইসঙ্গে তারা সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীনতা-পূর্ব উজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতির উদাহরণও দাঁড় করান। তাদের কী করে বোঝাই-‘ছাত্র রাজনীতি’ আর বর্তমান ধারার লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি এক কথা নয়। যার যার দলীয় আদর্শ ধারণ করা বা তা বাস্তবায়নে দোষের কিছু নেই সত্য। সংকট তখনই হয়, যখন দলীয় সমর্থনে রাজনীতি চর্চার বদলে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত হয় তারুণ্য। এরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝতে চায় না।

মূল দলের নেতৃত্বের মতো এরাও পরমতসহিষ্ণুতাকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে। মূলদল যেমন কপটতার আশ্রয় নিয়ে বলতে থাকে, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ সেদিক থেকে লেজুড় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা কপটতা না করে প্রভুদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যক্তিবন্দনাই করে। তাই এরা স্লোগানের ক্রমবিকাশ ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে নিজেদের পরিচয় দেয় এভাবে: বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, জিয়ার সৈনিক, খালেদা জিয়ার সৈনিক, শেখ হাসিনার সৈনিক আর ‘আগামীর রাষ্ট্রনায়ক’ তারেক জিয়ার সৈনিক।

এ কারণে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত তারুণ্য সাধারণ মানুষের তো নয়ই, নিজ রাজনৈতিক দলের আদর্শেরও সৈনিক হতে পারে না। মূল দলের ইচ্ছাপূরণের জন্য ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব বজায় রাখাটা প্রধান কাজ হিসাবে মনে করে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধে যুক্ত থেকে তারুণ্যের আদর্শিক ও নৈতিক মনোভূমিকে অনুর্বর করে ফেলে। যারা ভাবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি চর্চা করে এরা ভবিষ্যতের রাজনীতিক হবেন, গণতন্ত্র রক্ষা করবেন; আমি বিনয়ের সঙ্গে তাদের স্বাপ্নিক বলব।

হয়তো এখানে কিছু ব্যতিক্রম খুঁজে পাওয়া যাবে, তারপরও আমি পাঠকের কাছে একটি প্রশ্ন রাখছি: বিগত পাঁচ দশক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এমন একজনও কি পাওয়া যাবে, যারা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ছাত্রনেতাদের সামান্য গুণাবলি ধারণ করেন?

এ সময়ে ছাত্র রাজনীতি করা কেউ কেউ নিজ দল বা অঙ্গসংগঠনের কান্ডারি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যা চর্চা করেছেন; সেই অভিজ্ঞতায় দুর্নীতিবাজ হয়েছেন। সময়ের ফেরে এদের অনেকে রাজবন্দি নন, দুর্নীতির দায়ে জেল-জরিমানায় আটকে গেছেন বা গিয়েছিলেন। এখন যদি আমূল সংস্কার ছাড়া সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের দোহাইয়ে প্রচলিত ধারার ছাত্র রাজনীতিকেই অনুমোদন করি, তাহলে আকাশের কালো মেঘ আরও কালো রূপ ধারণ করবে।

নষ্ট ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত না থেকে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভবিষ্যৎ রাজনীতিক হওয়ার দীক্ষা নিতে পারবে না? তাহলে একবার চোখ ফেরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধারার সাংস্কৃতিক সংগঠনে ছাত্রছাত্রীরা কাজ করে যাচ্ছে। চর্চার সঙ্গে যুক্ত বলে তুলনামূলক বেশি রাজনৈতিক সচেতনতা থাকার কথা এদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনও আছে অনেকের।

কিন্তু সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সাধারণত কোনো জাতীয় দলের লেজুড় বা আজকালকার ভদ্রগোছের শব্দ সহযোগী বা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নয়। তাই কোনো স্বার্থবাদিতা বা উন্মত্ত আচরণ খুব কমই এদের মধ্যে দেখা যায়। এরা চাঁদাবাজি করে না; পকেটের পয়সা বাঁচিয়ে সংগঠন চালাতে চাঁদা দেয়। এরা অন্যদের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত-মত্ত সতীর্থদের হাতে মাঝেমধ্যেই লাঞ্ছিত হয়। সুতরাং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির হাল ধরতে দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির দীক্ষা নেওয়া অনিবার্য হতে পারে না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা আপাত নিরীহ হলেও প্রয়োজনে রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশে দ্বিধা করে না।

তবে আমরা প্রত্যাশার জায়গাটি বাঁচিয়ে রাখতে চাই। রাজনীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সংশ্লিষ্ট আমরা অনেকেই আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আদর্শ-এমন দাবি করতে পারব না। যত নষ্ট সময়ই যাক, তবুও আমরা মনে করি, তরুণ প্রজন্মই সুন্দরের স্বপ্ন বোনে এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম লালন করে। তারুণ্যের ইচ্ছা আর শক্তি ছাড়া সভ্যতার চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে আমরা আমাদের প্রত্যাশার জায়গা থেকে বলব, দায়িত্বশীলতার বোধ থেকে এবং সংকীর্ণ স্বার্থবাদী চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বুকে যদি কিছুটা দেশপ্রেম অবশিষ্ট থাকে; তবে তার সন্ধান করতে চাই।

এর খোঁজ পেলে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে তারুণ্যকে অন্ধকার থেকে বের করে আনা। দলীয় স্বার্থে ব্যবহার না করে সুস্থ চিন্তায় বিকশিত হতে দেওয়া। দেশের সর্বত্র সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করে তোলা। এসব সংগঠনে তরুণ নেতৃত্ব ও তারুণ্যের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা। ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চার পরিবেশ তৈরি করা। এ ছাড়া সুবাতাস প্রবাহিত হওয়ার আর কোনো পথ আছে বলে আমরা মনে করি না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnaway7b@gmail.com