অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে হবে
jugantor
অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে হবে

  এমএ খালেক  

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা সরকারের প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যক্তি পর্যায়ে গড়ে ওঠা উৎপাদনযন্ত্রকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর ও লাগসই নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা।

তাদের মতে, দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যেসব উৎপাদনশক্তি কাজ করছে, তারা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তা জিডিপি ক্যালকুলেশনের সময় মূল্যায়িত হচ্ছে না। ফলে দেশের অর্থনীতির মোট আকার সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাচ্ছে না। বক্তারা আরও বলেন, দেশের জিডিপিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে গেছে।

একইসঙ্গে স্থানীয় ও বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের হার কমেছে ৭২ দশমিক ১৬ শতাংশ। তারা বলেন, করোনা সংক্রমণজনিত অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের প্রতিটি শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শিল্প এবং অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো।

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পুনরুজ্জীবন ও গতি ফিরিয়ে আনতে হলে এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটানোর জন্য সরকারি পর্যায় থেকে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি নীতি সাপোর্ট একান্ত প্রয়োজন। ব্যক্তি খাতকে চাঙা করতে করপোরেট ট্যাক্স কমানো, অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়ানো, কাস্টার্ড ভিলেজ সৃষ্টিকরণসহ অন্যান্য লাগসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, করোনা সংক্রমণজনিত কারণে দেশে অন্তত ১৭ লাখ যুবক কর্মচ্যুত হয়েছেন। উল্লেখ্য, দেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ উৎপাদনযন্ত্র, যেগুলো করোনা পরিস্থিতির আগে দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল, তাদের বেশিরভাগই এখনো প্রাথমিক কার্যক্রম বা উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। যারা শহরে নানাভাবে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে যুক্ত থেকে সংসার যাপন করছিলেন, তাদের বেশিরভাগই গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন সন্তান-সন্ততি নিয়ে। তারা এখনো ফিরে আসতে পারছেন না। গ্রামে ফিরে যাওয়ার কারণে গ্রাম অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

যারা প্রবাসে কর্তরত ছিলেন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামীণ জনপদ থেকে যাওয়া। তাদের মধ্যে অন্তত চার লাখ মানুষ কর্মচ্যুত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাদের অধিকাংশই নতুন করে কোনো কর্মে নিযুক্ত হতে পারছেন না। করোনাভাইরাসের কারণে জিডিপির প্রত্যাশিত আকার হ্রাস পেয়েছে। মোট জিডিপির আকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; কিন্তু এ ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে ৩৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দেশে এমন একটি সেক্টরও নেই যা করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কোনো কোনো খাত একেবারে বিপর্যস্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সর্বাÍক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেনÑএ মর্মে প্রশ্ন করেছিলাম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক ডিজি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরীকে।

তিনি বললেন, আগামী বছর আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। এ বছর আমাদের উচ্চ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে অর্থনীতিকে করোনা-পূর্বাবস্থায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অর্থাৎ, আগামী অর্থবছরে উচ্চ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল করার দিকে বেশি জোর দিতে হবে।

উল্লেখ্য, আমাদের মতো দেশের দ্রুত ও সুষম উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অতিক্ষুদ্র ও এসএমই শিল্পের ওপর জোর দেওয়া। আমাদের অবশ্যই বড় শিল্প স্থাপন করতে হবে; তবে সেটি ক্ষুদ্র শিল্পকে অবজ্ঞা করে নয়। কারণ, শিল্পে বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয়। একজন নতুন উদ্যোক্তা চাইলেই পর্যাপ্ত পরিমাণ পুঁজি সংগ্রহ করতে পারেন না। কিন্তু ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয় না। এ খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও অনেক বেশি।

বিশেষ করে যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অতিক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদন খাতের অবদান জিডিপির ৮৭ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু এটি জাতীয় অর্থনীতিতে ক্যালকুলেট করা হয় না।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যে উৎপাদন ইউনিট গড়ে উঠেছে, একে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে এসে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হলে তা দেশের অর্থনীতির চালচিত্র পালটে দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী। এমন কোনো কাজ নেই যা তারা করতে পারেন না। তাদের বিদেশি উন্নতমানের যে কোনো যন্ত্রাংশ এনে দিলে অতি অল্প সময়ে তার অনুরূপ বিকল্প তৈরি করে দিতে পারেন। বাংলাদেশিরা শুধু যে দেশের অভ্যন্তরেই দক্ষতা প্রদর্শন করছেন তা নয়, তারা বিদেশে গিয়েও সমভাবে দক্ষতা প্রদর্শন করছেন।

কোনো বাংলাদেশি বিদেশে কোনো কাজে দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এমন একটি নজিরও কি দেখানো যাবে? বরং তারা বিদেশে গিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সংশ্লিষ্টদের তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। আমি এক ভদ্রমহিলাকে চিনি। তার নাম হেনা বশির। তিনি উত্তরা এলাকায় থাকেন। প্রতিদিন খুব ভোরে রমনা পার্কের গেটে এসে ছোট একটি চাদর বিছিয়ে ঝালমুড়ি, মোড়লি, চানাচুর, নিমকি ইত্যাদি আইটেম বিক্রি করেন।

তার দোকানের সামনে একটি বিলবোর্ড টানানো, যেখানে লেখা রয়েছে, ‘প্রোডাক্টগুলো সম্পূর্ণ বাড়িতে তৈরি করা’। একদিনে পার্কে হাঁটতে গিয়ে উপযাচক হয়েই তার সঙ্গে আলাপ করি। তিনি জানালেন, তার স্বামী দেশের একটি দূতাবাসে চাকরি করতেন। সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার মধ্য দিয়ে তার সংসার ভেঙে যায়। তিনি স্বামী থেকে আলাদা থাকতে শুরু করেন। হাতে যা টাকা-পয়সা সঞ্চিত ছিল তা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়।

দুই ছেলে ভালো চাকরি করেন। তারা মাকে তাদের কাছে নিয়ে রাখতে চাইলে হেনা বশির রাজি হননি। তিনি নিজেই কিছু একটা করার চেষ্টা করেন। টুকটাক হাতের কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। এরপর একজনের কাছ থেকে মুরালি, চানাচুর, নিমকি ইত্যাদি তৈরি করার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর নিজের বাড়িতেই ছোটখাটো একটি কারখানা গড়ে তোলেন। এক সময় কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ শুরু করেন। বর্তমানে তার কারখানায় তিনজন নারী শ্রমিক কাজ করেন। এই তিনজনের মজুরি বাবদ প্রতিদিন হেনা বশিরকে এক হাজার ২০০ টাকা ব্যয় করতে হয়।

খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন তার যে মুনাফা অর্জিত হয় তা দিয়ে তার সংসার মোটামুটি চলে যাচ্ছে। হেনা বশির জানালেন, তিনি চেষ্টা করছেন কীভাবে কারখানাটি আরও বড় করা যায়। কিন্তু অর্থায়নের অভাবে কারখানা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। তিনি এ মুহূর্তে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পেলেই কারখানাটি বড় আকারে সম্প্রসারিত করতে পারবেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ধরনা দিয়েছেন; কিন্তু তারা ঋণদানে আগ্রহী হয়নি। কোনো কোনো ব্যাংক এমন সব শর্ত দিয়েছে, ঋণদানের জন্য যা তার পক্ষে পরিপালন করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েক মাস আগে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিকে একীভূত করে এএসএমই শিল্পের সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে এ খাতের নামকরণ করা হয়েছে ‘কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ’ (সিএমএসএমই)। এর ফলে এতদিন ধরে অবহেলিত অতি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প এসএমই খাতে প্রদেয় সব ধরনের আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। আগে কুটির ও অতিক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন সুবিধা পেতেন না। নারী উদ্যোক্তাদের আরও একটি বড় সমস্যা ছিল, তারা গৃহীত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানত অধিকাংশ সময়ই দিতে পারতেন না। কারণ, আমাদের দেশের সমাজ বাস্তবতায় নারীদের নামে সম্পদে তেমন একটা থাকে না।

ফলে তারা চাইলেই ঋণের বিপরীতে জামানত দিতে পারতেন না। তাই সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যাংক ঋণ নিতে পারতেন না। কিছুদিন আগে মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের ভীষণভাবে আশান্বিত করে। কিন্তু তারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের জন্য আবেদন করতে গিয়ে চমরভাবে হতাশ হন। নানা অজুহাতে তাদের ঋণবঞ্চিত রাখা হয়।

একশ্রেণির ব্যাংকার আছেন, যারা নিজেদের খুব ক্ষমতাবান মনে করেন। তারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানে মোটেও আগ্রহী নন। ভাবখানা এমন যেন নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিলে তার পৈতৃক সম্পত্তির কিছু অংশ চলে যাবে। এ ধরনের হীন মানসিকতাসম্পন্ন ব্যাংক কর্মকর্তাদের দিয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয়, এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তারা বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের চেয়েও ঋণের কিস্তি ফেরতদানের ক্ষেত্রে বেশি তৎপর। তারা সাধারণত ঋণখেলাপিতে পরিণত হন না। পল্লি কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) নারী উদ্যোক্তাদের একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিনা জামানতে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দান করে। এসব নারী উদ্যোক্তা তাদের গৃহীত ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করে চলেছেন। অনেকেই পিকেএসএফের ঋণ নিয়ে দারিদ্র্য জয় করেছেন। বাংলাদেশে হেনা বশির একজন নন, এমন হেনা বশির প্রতিটি গ্রামে হাজার হাজার পাওয়া যাবে।

তাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অগ্রযাত্রায় ব্যাপক অবদান রাখতে পারেন। সরকারের সদিচ্ছা আছে। দেশে এ সংক্রান্ত আইন আছে। প্রয়োজন শুধু আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিনিয়োগবান্ধব মানসিকতার।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঋণ কোনো অনুদান বা করুণা নয়, এটি রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের মানবিক অধিকার। তাই কোনোভাবেই তাকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ঋণের শর্ত ভঙ্গ না করেন।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে হবে

 এমএ খালেক 
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা সরকারের প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যক্তি পর্যায়ে গড়ে ওঠা উৎপাদনযন্ত্রকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর ও লাগসই নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান তারা।

তাদের মতে, দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যেসব উৎপাদনশক্তি কাজ করছে, তারা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তা জিডিপি ক্যালকুলেশনের সময় মূল্যায়িত হচ্ছে না। ফলে দেশের অর্থনীতির মোট আকার সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাচ্ছে না। বক্তারা আরও বলেন, দেশের জিডিপিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে গেছে।

একইসঙ্গে স্থানীয় ও বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের হার কমেছে ৭২ দশমিক ১৬ শতাংশ। তারা বলেন, করোনা সংক্রমণজনিত অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের প্রতিটি শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শিল্প এবং অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো।

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পুনরুজ্জীবন ও গতি ফিরিয়ে আনতে হলে এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটানোর জন্য সরকারি পর্যায় থেকে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি নীতি সাপোর্ট একান্ত প্রয়োজন। ব্যক্তি খাতকে চাঙা করতে করপোরেট ট্যাক্স কমানো, অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়ানো, কাস্টার্ড ভিলেজ সৃষ্টিকরণসহ অন্যান্য লাগসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, করোনা সংক্রমণজনিত কারণে দেশে অন্তত ১৭ লাখ যুবক কর্মচ্যুত হয়েছেন। উল্লেখ্য, দেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

দেশের অধিকাংশ উৎপাদনযন্ত্র, যেগুলো করোনা পরিস্থিতির আগে দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল, তাদের বেশিরভাগই এখনো প্রাথমিক কার্যক্রম বা উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। যারা শহরে নানাভাবে উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে যুক্ত থেকে সংসার যাপন করছিলেন, তাদের বেশিরভাগই গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন সন্তান-সন্ততি নিয়ে। তারা এখনো ফিরে আসতে পারছেন না। গ্রামে ফিরে যাওয়ার কারণে গ্রাম অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

যারা প্রবাসে কর্তরত ছিলেন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামীণ জনপদ থেকে যাওয়া। তাদের মধ্যে অন্তত চার লাখ মানুষ কর্মচ্যুত হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাদের অধিকাংশই নতুন করে কোনো কর্মে নিযুক্ত হতে পারছেন না। করোনাভাইরাসের কারণে জিডিপির প্রত্যাশিত আকার হ্রাস পেয়েছে। মোট জিডিপির আকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; কিন্তু এ ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে ৩৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দেশে এমন একটি সেক্টরও নেই যা করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কোনো কোনো খাত একেবারে বিপর্যস্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সর্বাÍক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেনÑএ মর্মে প্রশ্ন করেছিলাম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক ডিজি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরীকে।

তিনি বললেন, আগামী বছর আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। এ বছর আমাদের উচ্চ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে অর্থনীতিকে করোনা-পূর্বাবস্থায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অর্থাৎ, আগামী অর্থবছরে উচ্চ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল করার দিকে বেশি জোর দিতে হবে।

উল্লেখ্য, আমাদের মতো দেশের দ্রুত ও সুষম উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অতিক্ষুদ্র ও এসএমই শিল্পের ওপর জোর দেওয়া। আমাদের অবশ্যই বড় শিল্প স্থাপন করতে হবে; তবে সেটি ক্ষুদ্র শিল্পকে অবজ্ঞা করে নয়। কারণ, শিল্পে বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয়। একজন নতুন উদ্যোক্তা চাইলেই পর্যাপ্ত পরিমাণ পুঁজি সংগ্রহ করতে পারেন না। কিন্তু ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয় না। এ খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও অনেক বেশি।

বিশেষ করে যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে অতিক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎপাদন খাতের অবদান জিডিপির ৮৭ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু এটি জাতীয় অর্থনীতিতে ক্যালকুলেট করা হয় না।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যে উৎপাদন ইউনিট গড়ে উঠেছে, একে আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়ে এসে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হলে তা দেশের অর্থনীতির চালচিত্র পালটে দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী। এমন কোনো কাজ নেই যা তারা করতে পারেন না। তাদের বিদেশি উন্নতমানের যে কোনো যন্ত্রাংশ এনে দিলে অতি অল্প সময়ে তার অনুরূপ বিকল্প তৈরি করে দিতে পারেন। বাংলাদেশিরা শুধু যে দেশের অভ্যন্তরেই দক্ষতা প্রদর্শন করছেন তা নয়, তারা বিদেশে গিয়েও সমভাবে দক্ষতা প্রদর্শন করছেন।

কোনো বাংলাদেশি বিদেশে কোনো কাজে দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এমন একটি নজিরও কি দেখানো যাবে? বরং তারা বিদেশে গিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সংশ্লিষ্টদের তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। আমি এক ভদ্রমহিলাকে চিনি। তার নাম হেনা বশির। তিনি উত্তরা এলাকায় থাকেন। প্রতিদিন খুব ভোরে রমনা পার্কের গেটে এসে ছোট একটি চাদর বিছিয়ে ঝালমুড়ি, মোড়লি, চানাচুর, নিমকি ইত্যাদি আইটেম বিক্রি করেন।

তার দোকানের সামনে একটি বিলবোর্ড টানানো, যেখানে লেখা রয়েছে, ‘প্রোডাক্টগুলো সম্পূর্ণ বাড়িতে তৈরি করা’। একদিনে পার্কে হাঁটতে গিয়ে উপযাচক হয়েই তার সঙ্গে আলাপ করি। তিনি জানালেন, তার স্বামী দেশের একটি দূতাবাসে চাকরি করতেন। সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার মধ্য দিয়ে তার সংসার ভেঙে যায়। তিনি স্বামী থেকে আলাদা থাকতে শুরু করেন। হাতে যা টাকা-পয়সা সঞ্চিত ছিল তা প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়।

দুই ছেলে ভালো চাকরি করেন। তারা মাকে তাদের কাছে নিয়ে রাখতে চাইলে হেনা বশির রাজি হননি। তিনি নিজেই কিছু একটা করার চেষ্টা করেন। টুকটাক হাতের কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। এরপর একজনের কাছ থেকে মুরালি, চানাচুর, নিমকি ইত্যাদি তৈরি করার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর নিজের বাড়িতেই ছোটখাটো একটি কারখানা গড়ে তোলেন। এক সময় কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ শুরু করেন। বর্তমানে তার কারখানায় তিনজন নারী শ্রমিক কাজ করেন। এই তিনজনের মজুরি বাবদ প্রতিদিন হেনা বশিরকে এক হাজার ২০০ টাকা ব্যয় করতে হয়।

খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন তার যে মুনাফা অর্জিত হয় তা দিয়ে তার সংসার মোটামুটি চলে যাচ্ছে। হেনা বশির জানালেন, তিনি চেষ্টা করছেন কীভাবে কারখানাটি আরও বড় করা যায়। কিন্তু অর্থায়নের অভাবে কারখানা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। তিনি এ মুহূর্তে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পেলেই কারখানাটি বড় আকারে সম্প্রসারিত করতে পারবেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ধরনা দিয়েছেন; কিন্তু তারা ঋণদানে আগ্রহী হয়নি। কোনো কোনো ব্যাংক এমন সব শর্ত দিয়েছে, ঋণদানের জন্য যা তার পক্ষে পরিপালন করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েক মাস আগে কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিকে একীভূত করে এএসএমই শিল্পের সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে এ খাতের নামকরণ করা হয়েছে ‘কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ’ (সিএমএসএমই)। এর ফলে এতদিন ধরে অবহেলিত অতি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প এসএমই খাতে প্রদেয় সব ধরনের আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। আগে কুটির ও অতিক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন সুবিধা পেতেন না। নারী উদ্যোক্তাদের আরও একটি বড় সমস্যা ছিল, তারা গৃহীত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানত অধিকাংশ সময়ই দিতে পারতেন না। কারণ, আমাদের দেশের সমাজ বাস্তবতায় নারীদের নামে সম্পদে তেমন একটা থাকে না।

ফলে তারা চাইলেই ঋণের বিপরীতে জামানত দিতে পারতেন না। তাই সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা ব্যাংক ঋণ নিতে পারতেন না। কিছুদিন আগে মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের ভীষণভাবে আশান্বিত করে। কিন্তু তারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের জন্য আবেদন করতে গিয়ে চমরভাবে হতাশ হন। নানা অজুহাতে তাদের ঋণবঞ্চিত রাখা হয়।

একশ্রেণির ব্যাংকার আছেন, যারা নিজেদের খুব ক্ষমতাবান মনে করেন। তারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানে মোটেও আগ্রহী নন। ভাবখানা এমন যেন নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিলে তার পৈতৃক সম্পত্তির কিছু অংশ চলে যাবে। এ ধরনের হীন মানসিকতাসম্পন্ন ব্যাংক কর্মকর্তাদের দিয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে প্রতীয়মান হয়, এসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তারা বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের চেয়েও ঋণের কিস্তি ফেরতদানের ক্ষেত্রে বেশি তৎপর। তারা সাধারণত ঋণখেলাপিতে পরিণত হন না। পল্লি কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) নারী উদ্যোক্তাদের একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিনা জামানতে ঋণ ও প্রশিক্ষণ দান করে। এসব নারী উদ্যোক্তা তাদের গৃহীত ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করে চলেছেন। অনেকেই পিকেএসএফের ঋণ নিয়ে দারিদ্র্য জয় করেছেন। বাংলাদেশে হেনা বশির একজন নন, এমন হেনা বশির প্রতিটি গ্রামে হাজার হাজার পাওয়া যাবে।

তাদের সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণদানের ব্যবস্থা করা হলে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অগ্রযাত্রায় ব্যাপক অবদান রাখতে পারেন। সরকারের সদিচ্ছা আছে। দেশে এ সংক্রান্ত আইন আছে। প্রয়োজন শুধু আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিনিয়োগবান্ধব মানসিকতার।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ঋণ কোনো অনুদান বা করুণা নয়, এটি রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিকের মানবিক অধিকার। তাই কোনোভাবেই তাকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ঋণের শর্ত ভঙ্গ না করেন।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক