আর কত রাজীব চলে যাবে?

  সাইফুল ইসলাম ১৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব

শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশেই চলে গেলেন কলেজছাত্র রাজীব। বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের দুই বাসের চাপায় হাত হারিয়ে ১৩ দিন কোমায় থাকার পর সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি। রাজীবের মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায় আর দশটি প্রাণহানির মতো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

তার চলে যাওয়াকে যদি আমরা যারা বেঁচে আছি- তাদের ওপর অভিমান ভাবা হয়, তবে তা ভুল হবে না। শৈশবে তৃতীয় শ্রেণীতে থাকার সময় মাকে এবং কয়েক বছরের ব্যবধানে অষ্টম শ্রেণীতে উঠে বাবাকে হারানোর পর ছোট দুই ভাইকে বড় করার পাশাপাশি নিজের জীবন গোছানোর দায়ভার পড়ে কিশোর রাজীবের কাঁধে।

পড়ালেখার ফাঁকে কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করে সে দায়িত্ব সামাল দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু আকস্মিক এ দুর্ঘটনা (!) কেবল সবকিছু লণ্ডভণ্ডই করে দেয়নি, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণীতে পড়া ছোট দুই ভাই ও রাজীবের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

বেঁচে থাকলে অন্যের বোঝা হয়ে থাকতে হবে; কিন্তু কৈশোর থেকেই সংগ্রামী রাজীব সেটা মেনে নেবে কেন? আর তাই চলে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছে সে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে থাকলেও বিচ্ছিন্ন হাত ও ভবিষ্যতে শিক্ষক হয়ে আলো বিলানোর স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা থেকে রাজীব মুক্তি নিয়েছে সত্য; কিন্তু নিজের ছোট দুই ভাই, কাছের আত্মীয়স্বজনের জন্য অমোচনীয় বেদনা এবং দেশবাসীর বিবেকের কাছে রেখে গেছে একটি প্রশ্ন- সড়কে এভাবে আর কত প্রাণ ঝরবে?

শুধু রাজীব নয়, একইভাবে নিউমার্কেটের সামনে আয়েশা নামের রিকশারোহী এক নারীর মেরুদণ্ড ভেঙেছে একই কোম্পানির (বিকাশ পরিবহন) দুই বাস ড্রাইভারের পাল্লা দেয়ার মাঝখানে পড়ে। ফার্মগেটে সড়ক ডিভাইডার ও বাসের মাঝে চাপা পড়ে ভেঙেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আরেক নারীর পা। শুধু কি বাসই বেপরোয় পাল্লা দেয় একে অপরের সঙ্গে? না, অন্য পরিবহনও তা-ই করে। এই তো মাত্র দিন তিনেক আগে সদরঘাটে দুই লঞ্চের চাপায় পড়ে দুটি পা-ই ভেঙে গেছে এক ব্যক্তির। প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনার শিকার (একে দুর্ঘটনা না বলে স্বেচ্ছায় মানুষকে পঙ্গু ও হত্যা করা বলাই শ্রেয়) মানুষের জীবনযাপন নয়, বহন করে বেড়াতে হয় অন্যায়কারী মানুষগুলোরই কৃপা নিয়ে। এক্ষেত্রে রাজীবই ভালো। আজীবন অন্যের দয়া-দক্ষিণায় না থেকে শান্তির ঘুমই বেছে নিয়েছে সে।

রাজীবের মৃত্যুর পর অন্যান্য ঘটনার মতোই দু’চার দিন আমরা আফসোস করব। তারপর? হ্যাঁ কল্পনা করতে পারি তারপর কী হবে। যেহেতু রাজীবের হাত কেড়ে নেয়া চালকদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের জামিনও মঞ্জুর করা হয়নি, তাই তাদের সাজা হবে বলেই ধরে নেয়া যায়। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বেপরোয়া চালকদের আদালত দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেবে, বিবেকবান মানুষ সেটাই চায়। অন্যথায় যে সড়কে প্রাণহানির ঘটনা কমানো যাবে না। কিন্তু আশঙ্কা তো অন্যখানে। ধরুন, চালকদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা ঘোষণা করলেন আদালত।

তারপর পরিবহন শ্রমিকরা (আরও স্পষ্টভাবে বললে তাদের মালিক-শ্রমিক নেতারা) কি বসে থাকবে? নিজেদের সহকর্মী ও কর্মচারীদের ‘অন্যায়’ সাজা মালিক-শ্রমিক নেতারা মেনে নেবে বলে মনে করছেন? তাহলে আপনি ভুলের রাজত্বে বাস করছেন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবেন ‘বীর’ পরিবহন শ্রমিকরা।

যে কোনো মূল্যে নিজেদের লোকের বিরুদ্ধে দেয়া সাজা বাতিলের জন্য আন্দোলন করবেন। আর সে আন্দোলনের রসদ কী হবে তা-ও জেনে রাখুন। হ্যাঁ, তা হবে ভাগ্যগুণে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা না যাওয়া বা আহত না হওয়া হাজারও রাজীব মানে আমি ও আপনি, সহজ কথায় যাদের যাত্রীসাধারণ বলা হয়, তাদের জিম্মি করে নিজেদের ‘বীর চালকদের’ মুক্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা নেয়া হবে।

এতে যে খুব একটা বেকায়দায় তাদের পড়তে হবে, তা কিন্তু নয়। কারণ এ ধরনের আন্দোলনের আগে সরকারের শীর্ষমহল ও মন্ত্রিসভার সঙ্গে যুক্ত ‘মহান’ শ্রমিক নেতারা রাতে তাদের বাসায় বসে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত দেবেন। আর দিনের বেলায় তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাবেন তাদের ‘প্রিয়দেশবাসী’কে পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে কষ্টের শিকার হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য।

বলা হয়, চাকা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতার পথচলা শুরু। বিমান থেকে শুরু করে বাস-ট্রাক- সব পরিবহনই চাকার সাহায্যে চলে এবং সভ্যতা বা এর অনুষঙ্গগুলোকে বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। রুচির, পণ্যের, এমনকি ভিন্ন সভ্যতার নানা অনুষঙ্গের উপস্থিতি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তাদের সমৃদ্ধ করে। বৈচিত্র্যতায় ভরে তোলে দেশ-জনপদ।

নানা সভ্যতায় আকৃষ্ট হয়ে মানুষ খুঁজে নেয় তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা জীবনের অনুষঙ্গটি। এ যখন বাস্তবতা, তখন চালক থেকে শুরু করে সব ধরনের পরিবহন শ্রমিককে তো নির্দ্বিধায় সভ্যতার চালক বলাই যায়। বড় প্রশ্ন হল, সভ্যতার চালকরা কেন বারবার অসভ্যভাবে মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের অন্যায় দাবি আদায়ে বাধ্য করে।

এর জবাবটা একেবারে সহজ। আমাদের জাতীয় জীবনে শুদ্ধাচারের অভাব এক্ষেত্রে যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সর্বগ্রাসী মানসিকতা। তারা যদি ‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে। মানুষ মানুষকে জীবিকা করে। পুরনো ইতিহাস ফিরে এলে লজ্জা কি তুমি পাবে না?’- ভুপেন হাজারিকার এ গানটির মর্ম বুঝত! বুঝবে কীভাবে! শ্রমিকরা যখন অন্যায় করে, তখন যদি মালিকপক্ষ (মালিকরা কিন্তু প্রভাবশালী এবং সব সরকারের সময়ই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোক) তাদের আশকারা না দিত, তাহলে তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারত না।

বিষয়টি যদি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তবে চোখ রাখুন গত বছরের এপ্রিল-মে মাসের ক্যালেন্ডারে। সিটিং সার্ভিস থাকবে, কী থাকবে না এবং ইচ্ছা করে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যায় একজন চালকের ফাঁসির বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ওই সময় কী হয়েছিল?

আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়লেন পরিবহন শ্রমিকরা। শ্রমিক নেতা একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী নিজেদের বাসায় বসে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত দিলেন। এমনকি সিটিংয়ের নামে দ্বিগুণ যাত্রী তুলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছিল।

দুই থেকে তিনদিন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে গণপরিবহন বন্ধ করে দিলেন শ্রমিক-মালিকরা। একটি লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি করা হল। মানুষের, বিশেষত নারী ও শিশুদের ভোগান্তি আর সহ্য করতে না পেরে সিটিং থাকবে কী থাকবে না, তা নিয়ে কমিটি গঠিত হল। দুই মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা ছিল। কিন্তু সিটিং নামের লোকাল; দ্বিগুণ ভাড়া আদায়- সবই রয়ে গেছে গত প্রায় এক বছর ধরে। কিছুই হয়নি।

মন্ত্রী কাম মালিক-শ্রমিক নেতারা আছেন বহাল তবিয়তে। তাদের ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের প্রক্রিয়াটিও সচল। ফলে কতদিনে দু’মাস হয়- এমন প্রশ্ন তোলা যেতে পারে বৈকি! মাঝে কেবল এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছি আমরা, রাজীবরা। শুধু কী তা-ই, একদিকে কাটা হচ্ছে আমাদের পকেট, অন্যদিকে আরও বেশি ট্রিপ মারার জন্য বাসে বাসে ঘষাঘষি করে নেয়া হচ্ছে মানুষের জীবনও। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমির ‘এ জমি লইব কিনে’র মতো করে। বিষয়টা এমন- ভাড়া নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করিস? কেটে নেব হাত-পা!

গণপরিবহনে এমন নৈরাজ্য পৃথিবীর আর খুব কম দেশেই আছে। মাথাপিছু গাড়ির হিসেবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে এবং বেশিরভাগই চালকের ভুলে। এই তো রাজীবের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই গোপালগঞ্জে বাস ও ট্রাকের মাঝে চাপায় একহাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে হৃদয় নামের আরেক তরুণের। রাজীবের মতো তার হাতটিও বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় পড়েছিল। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন হৃদয়ের ভাগ্যে কী আছে, আল্লাহ মালুম।

বুয়েটের হিসাব মতে, দেশে চালকদের অসচেতনতায় প্রতিদিন ৬৪ জন এবং বছরে ২৩ হাজারের বেশি মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে, আহত হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। ২০১১ সালে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ফটোগ্রাফার মিশুক মুনির মানিকগঞ্জে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর চালকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য কিছু শর্তারোপের দাবি উঠে। কিন্তু এখানেও বাদ সাধেন পরিবহন খাতের সেই ‘মহান’ নেতারা। তারা বলেছিলেন, ‘মানুষ ও গরু-ছাগলের পার্থক্য বুঝতে পারলেই চালকের লাইসেন্স দেয়া যায়।’ শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত চালক নিলে যে বেশি বেতন দিতে হবে! কমে যাবে তাদের আয়।

বিশ্ব্যবাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ছয় শতাংশ। দিন দিন এ ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। তারপরও পরিবহন খাতের জন্য সুষ্ঠু নীতিমালার বদলে সেই নেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে রাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের কাজ কি নিজের ক্ষয়ক্ষতি ও জনগণের ভোগান্তি মেনে নিয়ে পেশিশক্তির তাঁবেদারি করা? এ প্রশ্ন ছাড়াও রাষ্ট্র তুমি কার, পেশিশক্তির নাকি সাধারণ মানুষের- এমন প্রশ্নও তোলা যায়।

পৃথিবীতে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে কম মৃত্যু হয় ব্রিটেনে। সেখানে বছরে লাখপ্রতি দুই দশমিক পাঁচজন মারা যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে এ সংখ্যা ১০ থেকে সামান্য বেশি। আমাদের দেশে সাড়ে ১৩ থেকে ১৪-এর মধ্যে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বন্দুকের গুলিতে মৃত্যুর চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু তারা একে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ায় তা এখন অনেক কমে গেছে। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে সরকারও উদ্যোগ নিতে পারে। এটি করতে হলে অবশ্য শাসক দলকে প্রথমেই নিজ স্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবেই এমন উদ্যোগ নেয়া যাবে, অন্যথায় নয়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিআরটিএ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যদি কঠোর হতো, যদি বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য, ভাড়া নিয়ে অনিয়মের জন্য চালকদের জরিমানা ও মালিকদের গাড়ির লাইসেন্স বাতিলের মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারত, তবে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হল, আমরা আসলে গণমানুষের কল্যাণের পরিবর্তে পেশিশক্তির কাছ থেকে ‘টুপাইস’ কামানো এবং তাদের ব্যবহার করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চাই বলেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারি না। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এমন অসহায় আত্মসমর্পণ আর কত!

সাইফুল ইসলাম : সাংবাদিক

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : হাত হারানো রাজীব

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter