বঙ্গবন্ধুর আর্থসামাজিক উন্নয়ন দর্শন
jugantor
বঙ্গবন্ধুর আর্থসামাজিক উন্নয়ন দর্শন

  ড. জাহাঙ্গীর আলম  

১৭ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল বাংলার স্বাধীনতা; জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি তার বিভিন্ন বক্তৃতায় সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন; দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে। যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে ভাত খেতে না পারে, কাপড় পরতে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তাহলে মানুষের জীবনে শান্তি ফিরে আসতে পারে না’ (১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে)। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত। ছিল অর্থের অভাব। খাদ্যের অভাব।

দেশের এ অভাব-অনটনের মধ্যেও চারপাশে ছিল দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিভেদ, বিচারহীনতা, গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাস। ছিল কালোবাজারি। তাতে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অতিষ্ঠ, দুর্বিষহ। এ অবস্থার উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু সামাজিক পরিবর্তনের কথা ভাবেন। দেশের চলমান আর্থসামাজিক অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন করে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন।

এটাকে বঙ্গবন্ধু আখ্যায়িত করেন ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ হিসাবে। এটি বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লব ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ সংগ্রামের পূর্ণতায় তার দ্বিতীয় বিপ্লবের শুরু।

বঙ্গবন্ধু এ বিপ্লবের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘পুরোনো রীতি, যেটি মানুষের মঙ্গল করে না, সেই রীতি বদলানোর মতো সৎসাহস থাকা প্রয়োজন। ...পুরোনো মত এবং পথ যদি দেশের মঙ্গল করতে না পারে, সে মত এবং পথের পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করার অধিকার বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে। নতুন বিপ্লব যখন আপনি বলছেন, তখন এ বিপ্লবের মাধ্যমে জাতির জন্য একটা নতুন জিনিস, নতুন সিস্টেম আপনাকে গড়ে তুলতে হবে। যে সিস্টেম আজকে আমরা দেখি, সেটি ব্রিটিশ কলোনিয়াল সিস্টেম। এতে দেশের মঙ্গল হতে পারে না।

এটাতে আমরা কনভিন্সড। ব্রিটিশ যে সিস্টেম করে গিয়েছিল বা যেটি আমাদের দেশে চলছিল অর্থাৎ উপনিবেশবাদীরা দেশকে শোষণ করার জন্য যে সিস্টেম দেশের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মধ্যে চালু করে গিয়েছিল সেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সেই সিস্টেম, সেই আইন, সেসব কিছু পরিবর্তন করার নামই বিপ্লব’ (১৯৭৫ সালের ৬ জুন প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে)।

স্বাধীনতার পর প্রথমে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের মূলনীতি নির্ধারণ করেন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে। এগুলো হলো : গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন শোষিতের গণতন্ত্র। তিনি সমাজতন্ত্র চেয়েছেন। সেইসঙ্গে চেয়েছেন জনগণের ভোটাধিকার। তিনি মার্কসবাদী সমাজতন্ত্র চাননি। চীনের কমিউনিস্টদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠারও পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। তিনি গণতন্ত্র রেখেছেন। সেইসঙ্গে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন। সম্পদের কেন্দ্রীয় ভবন রুখতে চেয়েছেন।

আবার সম্পদ সৃষ্টির জন্য ব্যক্তিমালিকানাকেও অটুট রেখেছেন। তিনি ব্যাংক-বিমা, বৃহৎ ও ভারী শিল্প জাতীয়করণ করেছেন। জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গ্রামভিত্তিক বহুমুখী সমবায় গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার জমির মালিকানা অক্ষুণ্ন রাখারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার মধ্যে ছিল একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম করার সংকল্প।

সেটি ছিল নিজস্ব প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নিজস্ব আঙ্গিকে। তিনি বলেছেন, ‘এখানে যে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা আমরা বলছি, সে অর্থনীতি আমাদের, সে ব্যবস্থা আমাদের। কোনো জায়গা থেকে হায়ার করে এনে, ইমপোর্ট করে এনে কোনো ইজম চলে না। এ দেশে, কোনো দেশে চলে না। আমার মাটির সঙ্গে আমার মানুষের সঙ্গে, আমার কালচারের সঙ্গে, আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে, আমার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেই আমার ইকোনমিক সিস্টেম গড়তে হবে’ (১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে)।

বঙ্গবন্ধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। তিনি দুর্নীতিকে নির্মূল করতে চেয়েছেন প্রাত্যহিক জীবন থেকে। কৃষিতে, কল ও কারখানায় তিনি উৎপাদন বাড়াতে বলেছেন। স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পাঁচটি কর্মসূচি দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে অধিক উৎপাদন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূল। এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পদক্ষেপ হিসাবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর। কলকারখানা, খেতে-খামারে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাধীনতার পর প্রতিবছর গড়ে ২০-৩০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো। কিন্তু সেই আমদানি সব সময় সহজসাধ্য ছিল না। সেজন্য তিনি কৃষির উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তার মূল লক্ষ্য ছিল খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করা। তিনি বলেছেন, ‘কী করে আমরা বাঁচব, যদি ধরুন, বছরে ২০ লাখ টন খাবার ডেফিসিট হয়? এ তিন বছর পর্যন্ত গড়ে এর চেয়ে অনেক বেশি খাবার আনতে হয়েছে। প্রথম আনতে হয়েছে ৩০ লাখ টন। ধরুন যদি প্রত্যেক বছর গড়ে ৫৪০ লাখ মন খাদ্য আনতে হয় বিদেশ থেকে, কোথায় পাওয়া যাবে, কে দেবে? জাহাজ ভাড়া কোথায়? ২০-৩০ লাখ টন প্রতিবছর আমাদের আনতে হয়েছে বিদেশ থেকে এ তিন বছর। বন্ধুরাষ্ট্রগুলো সাহায্য করেছে। গ্র্যান্ট দিয়েছে, ‘লোন’ দিয়েছে, তাই খাবার আনছি। খাবার দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে; কিন্তু বন্ধুরাষ্ট্ররা কতকাল দেবে?’

এ পরনির্ভরতা হ্রাসের জন্য বঙ্গবন্ধু আধুনিক চাষাবাদের ওপর গুরুত্ব দেন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেন। গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কৃষি সমবায় গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি ভূমি সংস্কারের নীতিমালাও ঘোষণা করেন। পর্যায়ক্রমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি ছিল স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ওই পরিকল্পনায় বিদেশি সাহায্যর ওপর নির্ভরশীলতা ৬২ শতাংশ থেকে ১৯৭৭-৭৮ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

কৃষি ও কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেক বছর ৩০ লাখ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বছরে ৩০ লাখ লোক বাড়ে, তাহলে ২৫/৩০ বছরে বাংলায় কোনো জমি থাকবে না হালচাষ করার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সেজন্য আজকে আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে।’

প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ছিল বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের মহকুমাব্যবস্থা বিলুপ্ত করে তিনি ৬১টি জেলা প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিটিতে নিয়োগ দেন একজন করে জেলা গভর্নর।

এ প্রশাসন হবে জনকল্যাণের সহায়ক। তাতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। প্রতিটি জেলায় একটি করে জেলা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল হবে। সে কাউন্সিল ডেকে আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে গভর্নরদের। এক বছর পর থানা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে থানায় যে প্রধান ব্যক্তি হবেন, তার নাম হবে থানা প্রশাসক।

বঙ্গবন্ধুর জেলা কাউন্সিল/থানা কাউন্সিল হলো উন্নয়নকামী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ হলো মূল কথা। স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করবে সরকার। সেখানে জনগণও চাঁদা দেবে। তাদের কল্যাণে তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। সুতরাং স্থানীয় উন্নয়নে সর্বসাধারণকে উদ্যোগী করতে হবে। তাদের দেশ গঠনে, রাস্তাঘাট নির্মাণে উৎসাহী করতে হবে।

দেশ গঠনে ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু সবার সহায়তা চেয়েছেন। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেজন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল নামে একটি জাতীয় দল গঠন করেন। দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব নাগরিক এ দলের সদস্যপদ লাভের যোগ্য। সব বিভেদ-দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার জন্য এ দলের সৃষ্টি। এর ৫টি শাখা।

একটি শ্রমিকদের অঙ্গদল, কৃষকদের একটি, যুবকদের একটি, ছাত্রদের একটি এবং মহিলাদের একটি। আওয়ামী মানে জনগণ। আওয়ামী লীগ মানে জনগণের দল। এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যুক্ত করেছেন কৃষক ও শ্রমিকদের নাম; যাতে দলের কমিটি সর্বজনীনতা পায়। এর সঙ্গে দেশের ছাত্র, যুবক, শিক্ষিত সমাজ ও কর্মচারীদের সংশ্লিষ্ট করে সবার কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছেন।

অনেকে তখন ভেবেছেন, এটা একদলীয় সরকার। প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক নয়। এখানে গণতন্ত্র আছে। জনগণের ভোট আছে। দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। জনগণ যাকে ভালো মনে করবেন তাকে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় বাকশাল ছিল তখনকার প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি ছিল দেশ গড়ার জন্য জাতীয় ঐক্যমঞ্চ।

উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসাবে বঙ্গবন্ধু চিহ্নিত করেন দুর্নীতিকে। এটি নির্মূল করা ছিল দ্বিতীয় বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু তার বিভিন্ন স্থানে ‘করাপশন’ উৎখাত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড এগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মোবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না এবং সেই সঙ্গে সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। ঘুণেধরা সিস্টেম দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যায় না। এ সিস্টেম করাপশন পয়দা করে এবং করাপশন চলে। এজন্য আমার দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক।’

দেশের জনগণকে উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। ... একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণ-আন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে যে, যে সুদখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিক বয়কট করতে হবে’ (১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি)।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের এজেন্ডার প্রতি জনগণের পূর্ণ সমর্থন ছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল দেশের জনগণ। তার শোষিতের গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতি আগ্রহী ছিল দেশের মানুষ। কিন্তু তা মেনে নেয়নি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। অলক্ষ্যে তারা ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুকে উৎখাতের জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা হিসাবে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র ১৩১৪ দিন।

আর দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করার জন্য তিনি পেয়েছিলেন ২৩৩ দিন। এর মধ্যে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছিল। অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল। উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমন সময় নেমে এলো ১৫ আগস্টের অমানিশা।

দেশি-বিদেশি শত্রুদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে সেনাবাহিনীর একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বুলেটের আঘাতে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাকে হত্যা করে সপরিবারে; কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করা যায়নি। তার ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি আজও প্রাসঙ্গিক। তার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ভাবনা আজও আমাদের চিত্তকে নাড়া দেয়। তার রাজনৈতিক দর্শন আজও অম্লান; থাকবে চিরকাল।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট; ২০২০ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত

বঙ্গবন্ধুর আর্থসামাজিক উন্নয়ন দর্শন

 ড. জাহাঙ্গীর আলম 
১৭ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল বাংলার স্বাধীনতা; জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি তার বিভিন্ন বক্তৃতায় সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন; দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে। যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে ভাত খেতে না পারে, কাপড় পরতে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তাহলে মানুষের জীবনে শান্তি ফিরে আসতে পারে না’ (১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে)। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত। ছিল অর্থের অভাব। খাদ্যের অভাব।

দেশের এ অভাব-অনটনের মধ্যেও চারপাশে ছিল দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিভেদ, বিচারহীনতা, গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাস। ছিল কালোবাজারি। তাতে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অতিষ্ঠ, দুর্বিষহ। এ অবস্থার উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু সামাজিক পরিবর্তনের কথা ভাবেন। দেশের চলমান আর্থসামাজিক অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন করে নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন।

এটাকে বঙ্গবন্ধু আখ্যায়িত করেন ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ হিসাবে। এটি বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লব ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ সংগ্রামের পূর্ণতায় তার দ্বিতীয় বিপ্লবের শুরু।

বঙ্গবন্ধু এ বিপ্লবের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘পুরোনো রীতি, যেটি মানুষের মঙ্গল করে না, সেই রীতি বদলানোর মতো সৎসাহস থাকা প্রয়োজন। ...পুরোনো মত এবং পথ যদি দেশের মঙ্গল করতে না পারে, সে মত এবং পথের পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন করার অধিকার বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে। নতুন বিপ্লব যখন আপনি বলছেন, তখন এ বিপ্লবের মাধ্যমে জাতির জন্য একটা নতুন জিনিস, নতুন সিস্টেম আপনাকে গড়ে তুলতে হবে। যে সিস্টেম আজকে আমরা দেখি, সেটি ব্রিটিশ কলোনিয়াল সিস্টেম। এতে দেশের মঙ্গল হতে পারে না।

এটাতে আমরা কনভিন্সড। ব্রিটিশ যে সিস্টেম করে গিয়েছিল বা যেটি আমাদের দেশে চলছিল অর্থাৎ উপনিবেশবাদীরা দেশকে শোষণ করার জন্য যে সিস্টেম দেশের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মধ্যে চালু করে গিয়েছিল সেই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সেই সিস্টেম, সেই আইন, সেসব কিছু পরিবর্তন করার নামই বিপ্লব’ (১৯৭৫ সালের ৬ জুন প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে)।

স্বাধীনতার পর প্রথমে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রের মূলনীতি নির্ধারণ করেন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে। এগুলো হলো : গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন শোষিতের গণতন্ত্র। তিনি সমাজতন্ত্র চেয়েছেন। সেইসঙ্গে চেয়েছেন জনগণের ভোটাধিকার। তিনি মার্কসবাদী সমাজতন্ত্র চাননি। চীনের কমিউনিস্টদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠারও পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। তিনি গণতন্ত্র রেখেছেন। সেইসঙ্গে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন। সম্পদের কেন্দ্রীয় ভবন রুখতে চেয়েছেন।

আবার সম্পদ সৃষ্টির জন্য ব্যক্তিমালিকানাকেও অটুট রেখেছেন। তিনি ব্যাংক-বিমা, বৃহৎ ও ভারী শিল্প জাতীয়করণ করেছেন। জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গ্রামভিত্তিক বহুমুখী সমবায় গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার জমির মালিকানা অক্ষুণ্ন রাখারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার মধ্যে ছিল একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম করার সংকল্প।

সেটি ছিল নিজস্ব প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নিজস্ব আঙ্গিকে। তিনি বলেছেন, ‘এখানে যে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা আমরা বলছি, সে অর্থনীতি আমাদের, সে ব্যবস্থা আমাদের। কোনো জায়গা থেকে হায়ার করে এনে, ইমপোর্ট করে এনে কোনো ইজম চলে না। এ দেশে, কোনো দেশে চলে না। আমার মাটির সঙ্গে আমার মানুষের সঙ্গে, আমার কালচারের সঙ্গে, আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে, আমার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেই আমার ইকোনমিক সিস্টেম গড়তে হবে’ (১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে)।

বঙ্গবন্ধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে চেয়েছেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। তিনি দুর্নীতিকে নির্মূল করতে চেয়েছেন প্রাত্যহিক জীবন থেকে। কৃষিতে, কল ও কারখানায় তিনি উৎপাদন বাড়াতে বলেছেন। স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পাঁচটি কর্মসূচি দিয়েছেন। এর মধ্যে আছে অধিক উৎপাদন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূল। এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পদক্ষেপ হিসাবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর। কলকারখানা, খেতে-খামারে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। স্বাধীনতার পর প্রতিবছর গড়ে ২০-৩০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো। কিন্তু সেই আমদানি সব সময় সহজসাধ্য ছিল না। সেজন্য তিনি কৃষির উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তার মূল লক্ষ্য ছিল খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করা। তিনি বলেছেন, ‘কী করে আমরা বাঁচব, যদি ধরুন, বছরে ২০ লাখ টন খাবার ডেফিসিট হয়? এ তিন বছর পর্যন্ত গড়ে এর চেয়ে অনেক বেশি খাবার আনতে হয়েছে। প্রথম আনতে হয়েছে ৩০ লাখ টন। ধরুন যদি প্রত্যেক বছর গড়ে ৫৪০ লাখ মন খাদ্য আনতে হয় বিদেশ থেকে, কোথায় পাওয়া যাবে, কে দেবে? জাহাজ ভাড়া কোথায়? ২০-৩০ লাখ টন প্রতিবছর আমাদের আনতে হয়েছে বিদেশ থেকে এ তিন বছর। বন্ধুরাষ্ট্রগুলো সাহায্য করেছে। গ্র্যান্ট দিয়েছে, ‘লোন’ দিয়েছে, তাই খাবার আনছি। খাবার দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে; কিন্তু বন্ধুরাষ্ট্ররা কতকাল দেবে?’

এ পরনির্ভরতা হ্রাসের জন্য বঙ্গবন্ধু আধুনিক চাষাবাদের ওপর গুরুত্ব দেন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে অগ্রাধিকার দেন। গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কৃষি সমবায় গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি ভূমি সংস্কারের নীতিমালাও ঘোষণা করেন। পর্যায়ক্রমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটি ছিল স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ওই পরিকল্পনায় বিদেশি সাহায্যর ওপর নির্ভরশীলতা ৬২ শতাংশ থেকে ১৯৭৭-৭৮ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

কৃষি ও কলকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেক বছর ৩০ লাখ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বছরে ৩০ লাখ লোক বাড়ে, তাহলে ২৫/৩০ বছরে বাংলায় কোনো জমি থাকবে না হালচাষ করার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সেজন্য আজকে আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে।’

প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ছিল বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের মহকুমাব্যবস্থা বিলুপ্ত করে তিনি ৬১টি জেলা প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিটিতে নিয়োগ দেন একজন করে জেলা গভর্নর।

এ প্রশাসন হবে জনকল্যাণের সহায়ক। তাতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে। প্রতিটি জেলায় একটি করে জেলা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল হবে। সে কাউন্সিল ডেকে আলোচনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে গভর্নরদের। এক বছর পর থানা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে থানায় যে প্রধান ব্যক্তি হবেন, তার নাম হবে থানা প্রশাসক।

বঙ্গবন্ধুর জেলা কাউন্সিল/থানা কাউন্সিল হলো উন্নয়নকামী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ হলো মূল কথা। স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করবে সরকার। সেখানে জনগণও চাঁদা দেবে। তাদের কল্যাণে তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। সুতরাং স্থানীয় উন্নয়নে সর্বসাধারণকে উদ্যোগী করতে হবে। তাদের দেশ গঠনে, রাস্তাঘাট নির্মাণে উৎসাহী করতে হবে।

দেশ গঠনে ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু সবার সহায়তা চেয়েছেন। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেজন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল নামে একটি জাতীয় দল গঠন করেন। দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব নাগরিক এ দলের সদস্যপদ লাভের যোগ্য। সব বিভেদ-দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে দেশের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার জন্য এ দলের সৃষ্টি। এর ৫টি শাখা।

একটি শ্রমিকদের অঙ্গদল, কৃষকদের একটি, যুবকদের একটি, ছাত্রদের একটি এবং মহিলাদের একটি। আওয়ামী মানে জনগণ। আওয়ামী লীগ মানে জনগণের দল। এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যুক্ত করেছেন কৃষক ও শ্রমিকদের নাম; যাতে দলের কমিটি সর্বজনীনতা পায়। এর সঙ্গে দেশের ছাত্র, যুবক, শিক্ষিত সমাজ ও কর্মচারীদের সংশ্লিষ্ট করে সবার কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছেন।

অনেকে তখন ভেবেছেন, এটা একদলীয় সরকার। প্রকৃতপক্ষে তা সঠিক নয়। এখানে গণতন্ত্র আছে। জনগণের ভোট আছে। দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। জনগণ যাকে ভালো মনে করবেন তাকে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন। একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় বাকশাল ছিল তখনকার প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি ছিল দেশ গড়ার জন্য জাতীয় ঐক্যমঞ্চ।

উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসাবে বঙ্গবন্ধু চিহ্নিত করেন দুর্নীতিকে। এটি নির্মূল করা ছিল দ্বিতীয় বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধু তার বিভিন্ন স্থানে ‘করাপশন’ উৎখাত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড এগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মোবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না এবং সেই সঙ্গে সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। ঘুণেধরা সিস্টেম দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যায় না। এ সিস্টেম করাপশন পয়দা করে এবং করাপশন চলে। এজন্য আমার দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক।’

দেশের জনগণকে উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। ... একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণ-আন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে যে, যে সুদখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিক বয়কট করতে হবে’ (১৯৭৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি)।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের এজেন্ডার প্রতি জনগণের পূর্ণ সমর্থন ছিল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিল দেশের জনগণ। তার শোষিতের গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতি আগ্রহী ছিল দেশের মানুষ। কিন্তু তা মেনে নেয়নি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র। অলক্ষ্যে তারা ষড়যন্ত্র চালিয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুকে উৎখাতের জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশের ত্রাণকর্তা হিসাবে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র ১৩১৪ দিন।

আর দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করার জন্য তিনি পেয়েছিলেন ২৩৩ দিন। এর মধ্যে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছিল। অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল। উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমন সময় নেমে এলো ১৫ আগস্টের অমানিশা।

দেশি-বিদেশি শত্রুদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে সেনাবাহিনীর একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বুলেটের আঘাতে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাকে হত্যা করে সপরিবারে; কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করা যায়নি। তার ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি আজও প্রাসঙ্গিক। তার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ভাবনা আজও আমাদের চিত্তকে নাড়া দেয়। তার রাজনৈতিক দর্শন আজও অম্লান; থাকবে চিরকাল।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট; ২০২০ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী