যেতে হবে আরও দূর
jugantor
যেতে হবে আরও দূর

  মুঈদ রহমান  

১১ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ এখন তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। এর আমেজ এ বছরের ডিসেম্বরে বিজয় দিবস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে আশা করতে পারি। তাই জন্মের পর থেকে আজতক-এই পাঁচ দশকে দেশের আর্থসামাজিক দিকগুলোর গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকছে।

অর্থনীতি ও সমাজ বিষয়ে আলোচনা কোনো মৌলিক বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না। এ বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী কিছু অনুমিত শর্তের ওপর নির্ভরশীল। বেশকিছু স্বাধীন ও অধীন চলক দ্বারা প্রভাবিত। তাই ৫০ বছর আগের অনেক অনুমানই আজ বাস্তব রূপ পায়নি। কারণ, এ ক্ষেত্রে রাজনীতির ভূমিকা অনেক বড়। রাজনীতি ও অর্থনীতি এক নয় বটে; তবে একটি অপরটির পরিপূরক। একটি ছাড়া অপরটি অচল। যদিও আমি আজকের আলোচনায় রাজনীতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

১৯৭২-৭৩ সালে স্বাধীন দেশের যাত্রাকালে আমাদের অর্থনীতি পুরো মাত্রায়ই ছিল কৃষিনির্ভর। আজকের যে বড়মাপের রপ্তানিমুখী পোশাক খাত দেখছি, তার ছিটেফোঁটাও সে সময়ে ছিল না। গত বছর আমরা প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স হিসাবে পেয়েছি প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর কোনো ক্ষুদ্র অংশও আমাদের রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে ছিল না। সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে চলতে শুরু করা এই দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০ ডলার। এ কথা ঠিক, ৫০ বছরের মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় রেখেও বলতে হবে, সেদিনের তুলনায় বর্তমান সময়ে আমরা অনেক বেশি ভোগ করার সুযোগ লাভ করেছি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বছর ৬ মাস। যে সময়ে মানুষ পূর্ণ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে সক্ষম, সে সময়টাই আমাদের মৃত্যুকাল ছিল। শিশুমৃত্যুর হারও ছিল অনেক বেশি। প্রতি হাজার এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুর মধ্যে ১৪১ শিশুই মৃত্যুবরণ করত। সে সময়ে জনসংখ্যাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ১৯৭২ সালে দেশের জিডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ছয় বিলিয়ন ডলার। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এমন নিরাশার চিত্র দেখে আমাদের ভবিষ্যৎকে পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই কোনো অবস্থানে দেখতে সক্ষম হয়নি। অনেক হতাশাব্যঞ্জক ও উপহাসবাণী আমাদের অকপটে হজম করতে হয়েছে। যেহেতু আমরা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছি, তাই পাকিস্তান সমর্থক অনেক রাষ্ট্রই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উপহাস করেছে। আমি সেদিকে না-গিয়ে বিশ্বব্যাংকের কথায় যাই। আমাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রথম প্রতিবেদন তৈরি করে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে। সেদিন তারা স্পষ্টভাবেই বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল।’ বাস্তবে কিন্তু তা হয়নি। ধরেই নেওয়া হয়েছিল, কোনো রাষ্ট্রের ৫০ বছর পর অর্থনৈতিক অবস্থা প্রকৃতপক্ষে কী হবে তা বলা সহজ কাজ নয়। তবে বাংলাদেশ যখন ২৫ বছরে পা দেয় তখন, অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে সংস্থাটি আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে কোনো হতাশার চিত্র পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগোতে গেলে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে তার সুপারিশ ছিল।

২৫ বছর পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচক কোথায় যেতে পারে, তার একটি অনুমানচিত্র বিশ্বব্যাংক ১৯৯৫ সালে এঁকেছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্বব্যাংকের অঙ্কিত অনুমানচিত্রের অনেক সূচকেই আমরা অনুমানকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি। তবে হ্যাঁ, কোনো কোনো সূচকে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। ২৫ বছর আগে বিশ্বব্যাংক অনুমান করেছিল, ২০২০ সালে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার হবে প্রতি হাজারে ৩৮ জন। কিন্তু আমরা তা ২১ জনে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। সার্বিকভাবে মৃত্যুহার অনুমান করা হয়েছিল প্রতি হাজারে ৭ দশমিক ২৫, প্রকৃতপক্ষে আমাদের মৃত্যুহার হলো প্রতি হাজারে ৪ দশমিক ৯। গড় আয়ুতেও আমরা ভালো করেছি। বিশ্বব্যাংকের অনুমান ছিল আজকের সময়ে আমাদের গড় আয়ু হবে ৬৫ দশমিক ৯ বছর। কিন্তু আমাদের অর্জিত গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৬ বছর। বিশ্বব্যাংকের অনুমান টপকে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে। তাদের ধারণা ছিল, ২০২০ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে এক হাজার ২১৫ ডলারে। বাস্তবতা হলো, আমাদের মাথাপিছু আয় এখন দুই হাজার ৬৪ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির অনুমান ৮ শতাংশকে অনেকটাই সঠিক বলা যায়। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারটা আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারিনি। বিশ্বব্যাংক অনুমান করেছিল, ২০২০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে এই হার হলো ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ বিষয়ে আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে। কারণ, জাতিসংঘের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের জনসংখ্যাকে ২১ কোটি ৮০ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তাই যদি হয়, তাহলে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ১ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের আর্থসামাজিক সূচকগুলো পাঁচ দশক আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা কোনো সমস্যার মধ্যে নেই। অথবা বলা যায়, কোনো কোনো বিপত্তি এড়াতে পারলে আমরা আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম। করোনার আক্রমণ বাদ দিয়ে এ মুহূর্তে যে ইস্যুগুলো দেশের বড় সমস্যা হয়ে আছে সেগুলো হলো : অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপরাধ, দুর্নীতি ও অসমতা বা বৈষম্য। গুরুত্বানুসারে সমস্যার কোনোটিই ছোট নয়, আবার সমাধানের বাইরেও নয়; সুশাসনের মাধ্যমে অবশ্যই সমাধান সম্ভব।

তবে আমার কাছে মনে হয়, দুর্নীতি ও আয়বৈষম্য সব সময়ের সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর প্রতিকার করতে না-পারলে কোনো অর্জনই টিকে থাকতে পারবে না কিংবা স্বীকৃতি পাবে না। জার্মানিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’ ১৯৯৫ সাল থেকে সারা বিশ্বের দেশগুলোয় দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। যে পদ্ধতিতে সংস্থাটি দুর্নীতি পরিমাপ করে থাকে তাকে বলা হচ্ছে ‘করাপশন পারসেপশন ইন্ডেক্স’ (সিপিআই)। যদি এই সূচকের মান ১০০ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেদেশ সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। আর যদি সূচকের মান ০ (শূন্য) হয়, তাহলে সেদেশ ষোলো আনা দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোনো দেশই এ দুই চরম অবস্থানে নেই। দেশগুলোয় যে মান পাওয়া যায় তা ১০০-এর কম এবং ০-এর বেশি। এর মানে হলো, যে দেশ ১০০ থেকে যত নিচে নামবে সেদেশের দুর্নীতির পরিমাণ হবে তত বেশি। সে হিসাবে ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আছে ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড। তাদের স্কোর ৮৭। আর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আছে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া এবং এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান। তাদের স্কোর ১০ থেকে ১৩। সংস্থাটি প্রকাশ করেছে, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬ আর স্কোর মাত্র ২৬। এক সময়ে দুর্নীতির শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কেউ আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারেন; কিন্তু ১০০ থেকে দেশ কতখানি নিচে অবস্থান করছে, তা ভাবলে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এর বিহিত করার জন্য কোনো বড় ধরনের কৌশলের প্রয়োজন নেই। শুধু সরকারের সদিচ্ছাই এত বড় সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম।

আরেকটি অসহনীয় সমস্যা হলো আয়বৈষম্য। আমরা দিন দিন যতই সম্পদ অর্জন করছি, বণ্টনের ক্ষেত্রে ততই বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আয়বৈষম্য পরিমাপের ক্ষেত্রে ‘গিনি’ সহগ (Gini coefficient) ব্যবহার করে থাকেন। এর মান ০ থেকে ১ পর্যন্ত। যদি কোনো দেশে গিনি সহগের মান ০ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে শতভাগ সমতা বিরাজ করছে। সম্পদের পূর্ণ সমবণ্টন হয়েছে। আর যদি মান ১ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে সব সম্পদের মালিক একজন, বাকিরা সম্পদবর্জিত। ০ থেকে ১-এর দিকে যেতে থাকলে বুঝতে হবে অসমতা বা বৈষম্য বাড়ছে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশে গিনি সহগের মান ছিল ০.৩৬ এবং পরবর্তী ১০ বছরে এ বৈষম্য বলার মতো বাড়েনি। ১৯৮৮-৮৯ সালে এই মান বেড়ে দাঁড়ায় ০.৩৮। ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে ২০০৫ সালে এর মান হয় ০.৪৭ এবং ২০১৬ সালে বৈষম্য আরও বেড়ে দাঁড়ায় ০.৪৮-এ। এটা ভালো লক্ষণ নয়। সম্পদ গুটিকয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে যাচ্ছে। দেশে এ মুহূর্তে বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে ধনীর সংখ্যা বাড়ছে এবং এই ধনিক শ্রেণির প্রবৃদ্ধির হার ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ১৯৭৩ সালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ২-এর বেশি ছিল না। এখন সরকারি হিসাবমতেই কোটিপতির সংখ্যা ৮৭ হাজার। তবে গবেষকরা বলছেন, এ সংখ্যা এক লাখ পাঁচ হাজারের কম নয়।

এর লাগাম টেনে ধরাটা জরুরি। তা না-হলে উন্নয়নের যত গল্পই বলা হোক না কেন, কেউ তা কানে তুলবে না।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যেতে হবে আরও দূর

 মুঈদ রহমান 
১১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ এখন তার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। এর আমেজ এ বছরের ডিসেম্বরে বিজয় দিবস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে আশা করতে পারি। তাই জন্মের পর থেকে আজতক-এই পাঁচ দশকে দেশের আর্থসামাজিক দিকগুলোর গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকছে।

অর্থনীতি ও সমাজ বিষয়ে আলোচনা কোনো মৌলিক বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না। এ বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী কিছু অনুমিত শর্তের ওপর নির্ভরশীল। বেশকিছু স্বাধীন ও অধীন চলক দ্বারা প্রভাবিত। তাই ৫০ বছর আগের অনেক অনুমানই আজ বাস্তব রূপ পায়নি। কারণ, এ ক্ষেত্রে রাজনীতির ভূমিকা অনেক বড়। রাজনীতি ও অর্থনীতি এক নয় বটে; তবে একটি অপরটির পরিপূরক। একটি ছাড়া অপরটি অচল। যদিও আমি আজকের আলোচনায় রাজনীতির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

১৯৭২-৭৩ সালে স্বাধীন দেশের যাত্রাকালে আমাদের অর্থনীতি পুরো মাত্রায়ই ছিল কৃষিনির্ভর। আজকের যে বড়মাপের রপ্তানিমুখী পোশাক খাত দেখছি, তার ছিটেফোঁটাও সে সময়ে ছিল না। গত বছর আমরা প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স হিসাবে পেয়েছি প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর কোনো ক্ষুদ্র অংশও আমাদের রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে ছিল না। সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে চলতে শুরু করা এই দেশটির মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০ ডলার। এ কথা ঠিক, ৫০ বছরের মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় রেখেও বলতে হবে, সেদিনের তুলনায় বর্তমান সময়ে আমরা অনেক বেশি ভোগ করার সুযোগ লাভ করেছি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বছর ৬ মাস। যে সময়ে মানুষ পূর্ণ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে সক্ষম, সে সময়টাই আমাদের মৃত্যুকাল ছিল। শিশুমৃত্যুর হারও ছিল অনেক বেশি। প্রতি হাজার এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুর মধ্যে ১৪১ শিশুই মৃত্যুবরণ করত। সে সময়ে জনসংখ্যাও নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ১৯৭২ সালে দেশের জিডিপির পরিমাণ ছিল মাত্র ছয় বিলিয়ন ডলার। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

এমন নিরাশার চিত্র দেখে আমাদের ভবিষ্যৎকে পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই কোনো অবস্থানে দেখতে সক্ষম হয়নি। অনেক হতাশাব্যঞ্জক ও উপহাসবাণী আমাদের অকপটে হজম করতে হয়েছে। যেহেতু আমরা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছি, তাই পাকিস্তান সমর্থক অনেক রাষ্ট্রই আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উপহাস করেছে। আমি সেদিকে না-গিয়ে বিশ্বব্যাংকের কথায় যাই। আমাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রথম প্রতিবেদন তৈরি করে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে। সেদিন তারা স্পষ্টভাবেই বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল।’ বাস্তবে কিন্তু তা হয়নি। ধরেই নেওয়া হয়েছিল, কোনো রাষ্ট্রের ৫০ বছর পর অর্থনৈতিক অবস্থা প্রকৃতপক্ষে কী হবে তা বলা সহজ কাজ নয়। তবে বাংলাদেশ যখন ২৫ বছরে পা দেয় তখন, অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে সংস্থাটি আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে কোনো হতাশার চিত্র পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগোতে গেলে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে তার সুপারিশ ছিল।

২৫ বছর পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সূচক কোথায় যেতে পারে, তার একটি অনুমানচিত্র বিশ্বব্যাংক ১৯৯৫ সালে এঁকেছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্বব্যাংকের অঙ্কিত অনুমানচিত্রের অনেক সূচকেই আমরা অনুমানকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি। তবে হ্যাঁ, কোনো কোনো সূচকে আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। ২৫ বছর আগে বিশ্বব্যাংক অনুমান করেছিল, ২০২০ সালে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার হবে প্রতি হাজারে ৩৮ জন। কিন্তু আমরা তা ২১ জনে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। সার্বিকভাবে মৃত্যুহার অনুমান করা হয়েছিল প্রতি হাজারে ৭ দশমিক ২৫, প্রকৃতপক্ষে আমাদের মৃত্যুহার হলো প্রতি হাজারে ৪ দশমিক ৯। গড় আয়ুতেও আমরা ভালো করেছি। বিশ্বব্যাংকের অনুমান ছিল আজকের সময়ে আমাদের গড় আয়ু হবে ৬৫ দশমিক ৯ বছর। কিন্তু আমাদের অর্জিত গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৬ বছর। বিশ্বব্যাংকের অনুমান টপকে যাওয়ার সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে। তাদের ধারণা ছিল, ২০২০ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে এক হাজার ২১৫ ডলারে। বাস্তবতা হলো, আমাদের মাথাপিছু আয় এখন দুই হাজার ৬৪ ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধির অনুমান ৮ শতাংশকে অনেকটাই সঠিক বলা যায়। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারটা আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারিনি। বিশ্বব্যাংক অনুমান করেছিল, ২০২০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে এই হার হলো ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ বিষয়ে আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে। কারণ, জাতিসংঘের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের জনসংখ্যাকে ২১ কোটি ৮০ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তাই যদি হয়, তাহলে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ১ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের আর্থসামাজিক সূচকগুলো পাঁচ দশক আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা কোনো সমস্যার মধ্যে নেই। অথবা বলা যায়, কোনো কোনো বিপত্তি এড়াতে পারলে আমরা আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম। করোনার আক্রমণ বাদ দিয়ে এ মুহূর্তে যে ইস্যুগুলো দেশের বড় সমস্যা হয়ে আছে সেগুলো হলো : অতিরিক্ত জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপরাধ, দুর্নীতি ও অসমতা বা বৈষম্য। গুরুত্বানুসারে সমস্যার কোনোটিই ছোট নয়, আবার সমাধানের বাইরেও নয়; সুশাসনের মাধ্যমে অবশ্যই সমাধান সম্ভব।

তবে আমার কাছে মনে হয়, দুর্নীতি ও আয়বৈষম্য সব সময়ের সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর প্রতিকার করতে না-পারলে কোনো অর্জনই টিকে থাকতে পারবে না কিংবা স্বীকৃতি পাবে না। জার্মানিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’ ১৯৯৫ সাল থেকে সারা বিশ্বের দেশগুলোয় দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। যে পদ্ধতিতে সংস্থাটি দুর্নীতি পরিমাপ করে থাকে তাকে বলা হচ্ছে ‘করাপশন পারসেপশন ইন্ডেক্স’ (সিপিআই)। যদি এই সূচকের মান ১০০ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেদেশ সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। আর যদি সূচকের মান ০ (শূন্য) হয়, তাহলে সেদেশ ষোলো আনা দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোনো দেশই এ দুই চরম অবস্থানে নেই। দেশগুলোয় যে মান পাওয়া যায় তা ১০০-এর কম এবং ০-এর বেশি। এর মানে হলো, যে দেশ ১০০ থেকে যত নিচে নামবে সেদেশের দুর্নীতির পরিমাণ হবে তত বেশি। সে হিসাবে ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আছে ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড। তাদের স্কোর ৮৭। আর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আছে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া এবং এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান। তাদের স্কোর ১০ থেকে ১৩। সংস্থাটি প্রকাশ করেছে, ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬ আর স্কোর মাত্র ২৬। এক সময়ে দুর্নীতির শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কেউ আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারেন; কিন্তু ১০০ থেকে দেশ কতখানি নিচে অবস্থান করছে, তা ভাবলে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এর বিহিত করার জন্য কোনো বড় ধরনের কৌশলের প্রয়োজন নেই। শুধু সরকারের সদিচ্ছাই এত বড় সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম।

আরেকটি অসহনীয় সমস্যা হলো আয়বৈষম্য। আমরা দিন দিন যতই সম্পদ অর্জন করছি, বণ্টনের ক্ষেত্রে ততই বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আয়বৈষম্য পরিমাপের ক্ষেত্রে ‘গিনি’ সহগ (Gini coefficient) ব্যবহার করে থাকেন। এর মান ০ থেকে ১ পর্যন্ত। যদি কোনো দেশে গিনি সহগের মান ০ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে শতভাগ সমতা বিরাজ করছে। সম্পদের পূর্ণ সমবণ্টন হয়েছে। আর যদি মান ১ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে সব সম্পদের মালিক একজন, বাকিরা সম্পদবর্জিত। ০ থেকে ১-এর দিকে যেতে থাকলে বুঝতে হবে অসমতা বা বৈষম্য বাড়ছে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশে গিনি সহগের মান ছিল ০.৩৬ এবং পরবর্তী ১০ বছরে এ বৈষম্য বলার মতো বাড়েনি। ১৯৮৮-৮৯ সালে এই মান বেড়ে দাঁড়ায় ০.৩৮। ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে ২০০৫ সালে এর মান হয় ০.৪৭ এবং ২০১৬ সালে বৈষম্য আরও বেড়ে দাঁড়ায় ০.৪৮-এ। এটা ভালো লক্ষণ নয়। সম্পদ গুটিকয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে যাচ্ছে। দেশে এ মুহূর্তে বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে ধনীর সংখ্যা বাড়ছে এবং এই ধনিক শ্রেণির প্রবৃদ্ধির হার ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ১৯৭৩ সালে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ২-এর বেশি ছিল না। এখন সরকারি হিসাবমতেই কোটিপতির সংখ্যা ৮৭ হাজার। তবে গবেষকরা বলছেন, এ সংখ্যা এক লাখ পাঁচ হাজারের কম নয়।

এর লাগাম টেনে ধরাটা জরুরি। তা না-হলে উন্নয়নের যত গল্পই বলা হোক না কেন, কেউ তা কানে তুলবে না।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন