হাসান শাহরিয়ারও বাঁচলেন না
jugantor
হাসান শাহরিয়ারও বাঁচলেন না

  মুহম্মদ শফিকুর রহমান  

১১ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউনে ঘরে বসে একটা প্রবন্ধ লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম জানালেন, আমাদের ক্লাবেরই আরেক সাবেক সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।

হাসান শাহরিয়ার দৈনিক ইত্তেফাকে স্বাধীনতার পর থেকে আমার সিনিয়র সহকর্মী এবং চিফ রিপোর্টার ছিলেন। বলা ভালো, হাসান শাহরিয়ার ইত্তেফাকে আমাদের রিপোর্টিংয়ের টিম লিডার এবং অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে নিজের একটি অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

আমাদের চারপাশে এ যেন এক মৃত্যুর মিছিল। একের পর এক আমাদের সহকর্মীরা চলে যাচ্ছেন। যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন একেবারে সেরা সাংবাদিকরাই। প্রেস ক্লাবের নিচতলার দক্ষিণ লাউঞ্জের পাশে কোণের টেবিলটি ছিল আমাদের বন্ধুদের দীর্ঘদিনের আড্ডাস্থল। এখানে আমরা যারা বসতাম-সত্তরোর্ধ্ব যেমন: আতিয়ার রহমান, খন্দকার মোজাম্মেল হোসেন গেদু চাচা, সৈয়দ লুৎফুল হক, কবি মাশুক চৌধুরী-অল্প ক’দিনের ব্যবধানে এই মানুষগুলো চলে গেছেন। আল্লাহপাক তাদের শান্তি দিন, কবরকে বেহেশতের দরজা বানিয়ে দিন। অবশ্য এখনো বেশ কজন কোভিড-১৯ আক্রান্ত রয়েছেন। দোয়া করি সবাই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন।

হাসান শাহরিয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা

স্বাধীনতার পর থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে আমাদের একটি বিশাল টিম ছিল মরহুম আসাফ-উদ-দৌলা রেজা-আমাদের রেজা ভাইয়ের নেতৃত্বে। রেজা ভাইয়ের ইন্তেকালের পর মরহুম গোলাম সারওয়ার, মরহুম হাসান শাহরিয়ার এবং সম্পাদকীয় বিভাগের মরহুম রাহাত খান, মরহুম হাবিবুর রহমান মিলনের নেতৃত্বে দৈনিক ইত্তেফাক সত্তরের দশকে এই দেশের সেরা কাগজে উন্নীত হয়েছিল। সবার উপরে ছিলেন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ২০০১ সালের পর থেকে এক এক করে আমরা ইত্তেফাক ছেড়ে দিলাম।

হাসান শাহরিয়ার বয়সে আমার ততটা বড় না-হলেও পেশায় সিনিয়র এবং সে কারণেই তাকে বস বলে ডাকতাম। শাহরিয়ার সাহেব ১৯৬৩ সালের দিকে ইত্তেফাক-এর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলেন এবং ওই বছর আইএ পাশ করে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, অপরদিকে সাংবাদিকতা-দুটোই সমানতালে চালিয়ে যান। করাচিতেই তিনি যোগ দেন ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’, ‘ডেইলি ডন’ এবং তখনই ‘ইত্তেফাক’-এর পাকিস্তান করেসপন্ডেন্ট। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা ফেরেন এবং ১৯৭৪-এর পহেলা জানুয়ারি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ যোগ দেন। মূলত হাসান শাহরিয়ারের রক্তেই ছিল সাংবাদিকতা। তার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন একাধারে সাংবাদিক ও রাজনীতিক। তিনি তদানীন্তন প্রথম মুসলমান সম্পাদক ছিলেন। তার সম্পাদনায় কলকাতা থেকে দৈনিক ‘ছোলতান’ (সুলতান), সিলেটের সাপ্তাহিক ‘যুগবাণী’, ‘যুগভেরী’ ও ‘সিলেট’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। হাসান শাহরিয়ারের বড় ভাই তৌফিক চৌধুরী (পরে আইনজীবী) দৈনিক ‘পূর্বদেশ’-এর রিপোর্টার ছিলেন।

বহির্বিশ্বের কাগজেও হাসান শাহরিয়ার সুনামের সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন-আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাপ্তাহিক ‘নিউজ উইক’, ‘দৈনিক ডেকান হেরাল্ড’-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তার বাবা আসামের এমএলএ ছিলেন। হাসান শাহরিয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি।

সাংগঠনিক তৎপরতার দিক থেকে বলা যায়, তিনি দু-দুবার কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ২০১২ সালে তিনি CTA-এর ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস নির্বাচিত হন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন (১৯৯৩-১৯৯৪)।

সাংবাদিকতার শুরুতে যে কজন সিনিয়রের কাছে আমার ঋণ রয়েছে তাদের মধ্যে হাসান শাহরিয়ার অন্যতম। চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব আমাদের মতো শিক্ষানবিশ তরুণ রিপোর্টারদের গাইড করা। হাসান শাহরিয়ার সে কাজটি করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে। তার মধ্যে ক্লান্তি দেখিনি। কখনো নিউজ অ্যান্ড এক্সিকিউটিভ এডিটর আসাফ-উদ-দৌলা রেজা-রেজা ভাইয়ের সঙ্গে নিউজ বৈঠক করছেন আবার কখনো গোলাম সারওয়ারসহ তিনতলায় মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন। বেশিরভাগ সময় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে। কারণ, তার মধ্যে বা তার মনোজগতে সাংবাদিকতার একটা জায়গা ছিল। মানিক মিয়ার সন্তান হিসাবে তার একটা দায়বদ্ধতাও ছিল ‘ইত্তেফাক’ প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের ব্যাপারে।

আমাদের সময় ‘ইত্তেফাক’ ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠান হিসাবে আবির্ভূত হয় এবং প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। সেই সুবাদে মালিকরা যেমন প্রচুর ডিভিডেন্ড পেতেন আবার সাংবাদিক-কর্মচারীরাও অনেক সুবিধার মধ্যে বছরে দুই ঈদে ছয় বোনাস পেতাম। অমুসলিমরাও সমভাবে পেতেন। ওয়েজবোর্ডের বাইরে বাড়িভাড়া খাতে ৩০ ভাগ বেশি পেয়েছি। সব সুযোগ-সুবিধার দরবার আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গেই হতো।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে যখন আবার ‘ইত্তেফাক’-এ স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে জয়েন করি তখন রেজা ভাই আমাকে রাজনীতি, কূটনীতি ও পার্লামেন্ট কাভার করতে সুযোগ করে দেন। হাসান শাহরিয়ার তখন পার্লামেন্টের মেইন রিপোর্ট করতেন। অবশ্য প্রথমদিকে মরহুম খায়রুল আনাম ও শাহরিয়ার সাহেবের সঙ্গে পার্লামেন্ট কাভার করতে যেতাম। তারা দুজনই আমাকে খুব সাহায্য করেছেন, গাইড করেছেন এবং অল্পদিনেই আমি পার্লামেন্ট প্রসিডিংস কাভার করা রপ্ত করতে সমর্থ হই। দুজনের কাছেই আমার কৃতজ্ঞতা।

পার্লামেন্ট কাভার করতে হলে দুটো ব্যাপার খুব জরুরি-প্রথমত, ট্রেজারি বেঞ্চ ও অপজিশনের পলিটিক্স এবং ম্যানিফেস্টো জানতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, পার্লামেন্টের রুলস অব প্রসিডিউর জানতেই হবে, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সংবিধান। মনে পড়ে এই লক্ষ্যে আমি দিনের পর দিন পার্লামেন্ট লাইব্রেরিতে পড়ালেখা করেছি। যে কারণে রাজনীতির পাশাপাশি পার্লামেন্ট রিপোর্টার হিসাবে অফিসে এবং অফিসের বাইরেও আমার একটা অবস্থান ছিল।

হাসান শাহরিয়ার একজন রাজনীতিসচেতন সাংবাদিক, বিশেষ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা তথা অসাম্প্রদায়িক আধুনিক মানুষ। তার কাছ থেকে শুনেছি (পশ্চিম) পাকিস্তানে থাকতে বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে।

সর্বশেষ যে বিষয়টি আলোচনা করতে চাই, এই ভদ্রলোক আমার বিয়েতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন; কিন্তু বার্ধক্যে এসেও নিজে কুমার-ব্যাচেলর। অবশ্য বিষয়টি তার একান্ত ব্যক্তিগত এবং এতই স্পর্শকাতর যে, এক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকাই ভালো।

তবে আমাদের মধ্যে যে কজন সাংবাদিকের পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা, চালচলন, আচার-আচরণে আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে, এক কথায় এলিট সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, হাসান শাহরিয়ার তাদের অল্প কয়েকজনের মধ্যে একজন। বাংলা, ইংরেজি দু-ভাষায়ই তুখোড় রিপোর্টার হিসাবে তিনি আমাদের কমিউনিটিতে পরিচিত। বিশ্বাসের সঙ্গে খুব কমই আপস করেছেন তিনি। যেমন, একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে জয়েন করার পরও শুধু নীতিগত কারণে ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন।

১৯৯০ থেকে ২০০০-এ সময় আমরা অনেকেই ইত্তেফাক ছেড়ে দিই। অনেকদিন আমরা কেউ আর রাজপথে, পার্লামেন্টে বা কোনো দলীয় কার্যালয়ে কাভার করতে যাই না। দেখা-সাক্ষাৎও কম হত। শাহরিয়ার সাহেব এই কমতিটা পূরণ করতেন মাঝেমধ্যে লাঞ্চ-ডিনারে আপ্যায়ন করে। একটি বিষয় আমাদেরও ভাবনার মধ্যে ফেলে দেয়। ভদ্রলোক এতটাই একা, নিজ পরিমণ্ডলে থাকতে ভালোবাসতেন। হয়তো গোপন কষ্টের কথাগুলো নিজের মধ্যেই লালন করতেন-যাপিত জীবনের গোপন কথাগুলো।

ঢাকা, ১০ এপ্রিল ২০২১

মুহম্মদ শফিকুর রহমান, এমপি এবং সাবেক সভাপতি ও সা. সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব

হাসান শাহরিয়ারও বাঁচলেন না

 মুহম্মদ শফিকুর রহমান 
১১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লকডাউনে ঘরে বসে একটা প্রবন্ধ লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম জানালেন, আমাদের ক্লাবেরই আরেক সাবেক সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)।

হাসান শাহরিয়ার দৈনিক ইত্তেফাকে স্বাধীনতার পর থেকে আমার সিনিয়র সহকর্মী এবং চিফ রিপোর্টার ছিলেন। বলা ভালো, হাসান শাহরিয়ার ইত্তেফাকে আমাদের রিপোর্টিংয়ের টিম লিডার এবং অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে নিজের একটি অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

আমাদের চারপাশে এ যেন এক মৃত্যুর মিছিল। একের পর এক আমাদের সহকর্মীরা চলে যাচ্ছেন। যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন একেবারে সেরা সাংবাদিকরাই। প্রেস ক্লাবের নিচতলার দক্ষিণ লাউঞ্জের পাশে কোণের টেবিলটি ছিল আমাদের বন্ধুদের দীর্ঘদিনের আড্ডাস্থল। এখানে আমরা যারা বসতাম-সত্তরোর্ধ্ব যেমন: আতিয়ার রহমান, খন্দকার মোজাম্মেল হোসেন গেদু চাচা, সৈয়দ লুৎফুল হক, কবি মাশুক চৌধুরী-অল্প ক’দিনের ব্যবধানে এই মানুষগুলো চলে গেছেন। আল্লাহপাক তাদের শান্তি দিন, কবরকে বেহেশতের দরজা বানিয়ে দিন। অবশ্য এখনো বেশ কজন কোভিড-১৯ আক্রান্ত রয়েছেন। দোয়া করি সবাই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন।

হাসান শাহরিয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা

স্বাধীনতার পর থেকে দৈনিক ইত্তেফাকে আমাদের একটি বিশাল টিম ছিল মরহুম আসাফ-উদ-দৌলা রেজা-আমাদের রেজা ভাইয়ের নেতৃত্বে। রেজা ভাইয়ের ইন্তেকালের পর মরহুম গোলাম সারওয়ার, মরহুম হাসান শাহরিয়ার এবং সম্পাদকীয় বিভাগের মরহুম রাহাত খান, মরহুম হাবিবুর রহমান মিলনের নেতৃত্বে দৈনিক ইত্তেফাক সত্তরের দশকে এই দেশের সেরা কাগজে উন্নীত হয়েছিল। সবার উপরে ছিলেন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ২০০১ সালের পর থেকে এক এক করে আমরা ইত্তেফাক ছেড়ে দিলাম।

হাসান শাহরিয়ার বয়সে আমার ততটা বড় না-হলেও পেশায় সিনিয়র এবং সে কারণেই তাকে বস বলে ডাকতাম। শাহরিয়ার সাহেব ১৯৬৩ সালের দিকে ইত্তেফাক-এর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি ছিলেন এবং ওই বছর আইএ পাশ করে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া, অপরদিকে সাংবাদিকতা-দুটোই সমানতালে চালিয়ে যান। করাচিতেই তিনি যোগ দেন ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’, ‘ডেইলি ডন’ এবং তখনই ‘ইত্তেফাক’-এর পাকিস্তান করেসপন্ডেন্ট। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা ফেরেন এবং ১৯৭৪-এর পহেলা জানুয়ারি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এ যোগ দেন। মূলত হাসান শাহরিয়ারের রক্তেই ছিল সাংবাদিকতা। তার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন একাধারে সাংবাদিক ও রাজনীতিক। তিনি তদানীন্তন প্রথম মুসলমান সম্পাদক ছিলেন। তার সম্পাদনায় কলকাতা থেকে দৈনিক ‘ছোলতান’ (সুলতান), সিলেটের সাপ্তাহিক ‘যুগবাণী’, ‘যুগভেরী’ ও ‘সিলেট’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। হাসান শাহরিয়ারের বড় ভাই তৌফিক চৌধুরী (পরে আইনজীবী) দৈনিক ‘পূর্বদেশ’-এর রিপোর্টার ছিলেন।

বহির্বিশ্বের কাগজেও হাসান শাহরিয়ার সুনামের সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন-আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাপ্তাহিক ‘নিউজ উইক’, ‘দৈনিক ডেকান হেরাল্ড’-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তার বাবা আসামের এমএলএ ছিলেন। হাসান শাহরিয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি।

সাংগঠনিক তৎপরতার দিক থেকে বলা যায়, তিনি দু-দুবার কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং ২০১২ সালে তিনি CTA-এর ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস নির্বাচিত হন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত সভাপতিও ছিলেন (১৯৯৩-১৯৯৪)।

সাংবাদিকতার শুরুতে যে কজন সিনিয়রের কাছে আমার ঋণ রয়েছে তাদের মধ্যে হাসান শাহরিয়ার অন্যতম। চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব আমাদের মতো শিক্ষানবিশ তরুণ রিপোর্টারদের গাইড করা। হাসান শাহরিয়ার সে কাজটি করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে। তার মধ্যে ক্লান্তি দেখিনি। কখনো নিউজ অ্যান্ড এক্সিকিউটিভ এডিটর আসাফ-উদ-দৌলা রেজা-রেজা ভাইয়ের সঙ্গে নিউজ বৈঠক করছেন আবার কখনো গোলাম সারওয়ারসহ তিনতলায় মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন। বেশিরভাগ সময় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে। কারণ, তার মধ্যে বা তার মনোজগতে সাংবাদিকতার একটা জায়গা ছিল। মানিক মিয়ার সন্তান হিসাবে তার একটা দায়বদ্ধতাও ছিল ‘ইত্তেফাক’ প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের ব্যাপারে।

আমাদের সময় ‘ইত্তেফাক’ ব্যবসাসফল প্রতিষ্ঠান হিসাবে আবির্ভূত হয় এবং প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। সেই সুবাদে মালিকরা যেমন প্রচুর ডিভিডেন্ড পেতেন আবার সাংবাদিক-কর্মচারীরাও অনেক সুবিধার মধ্যে বছরে দুই ঈদে ছয় বোনাস পেতাম। অমুসলিমরাও সমভাবে পেতেন। ওয়েজবোর্ডের বাইরে বাড়িভাড়া খাতে ৩০ ভাগ বেশি পেয়েছি। সব সুযোগ-সুবিধার দরবার আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গেই হতো।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে যখন আবার ‘ইত্তেফাক’-এ স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে জয়েন করি তখন রেজা ভাই আমাকে রাজনীতি, কূটনীতি ও পার্লামেন্ট কাভার করতে সুযোগ করে দেন। হাসান শাহরিয়ার তখন পার্লামেন্টের মেইন রিপোর্ট করতেন। অবশ্য প্রথমদিকে মরহুম খায়রুল আনাম ও শাহরিয়ার সাহেবের সঙ্গে পার্লামেন্ট কাভার করতে যেতাম। তারা দুজনই আমাকে খুব সাহায্য করেছেন, গাইড করেছেন এবং অল্পদিনেই আমি পার্লামেন্ট প্রসিডিংস কাভার করা রপ্ত করতে সমর্থ হই। দুজনের কাছেই আমার কৃতজ্ঞতা।

পার্লামেন্ট কাভার করতে হলে দুটো ব্যাপার খুব জরুরি-প্রথমত, ট্রেজারি বেঞ্চ ও অপজিশনের পলিটিক্স এবং ম্যানিফেস্টো জানতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, পার্লামেন্টের রুলস অব প্রসিডিউর জানতেই হবে, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সংবিধান। মনে পড়ে এই লক্ষ্যে আমি দিনের পর দিন পার্লামেন্ট লাইব্রেরিতে পড়ালেখা করেছি। যে কারণে রাজনীতির পাশাপাশি পার্লামেন্ট রিপোর্টার হিসাবে অফিসে এবং অফিসের বাইরেও আমার একটা অবস্থান ছিল।

হাসান শাহরিয়ার একজন রাজনীতিসচেতন সাংবাদিক, বিশেষ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা তথা অসাম্প্রদায়িক আধুনিক মানুষ। তার কাছ থেকে শুনেছি (পশ্চিম) পাকিস্তানে থাকতে বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে।

সর্বশেষ যে বিষয়টি আলোচনা করতে চাই, এই ভদ্রলোক আমার বিয়েতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন; কিন্তু বার্ধক্যে এসেও নিজে কুমার-ব্যাচেলর। অবশ্য বিষয়টি তার একান্ত ব্যক্তিগত এবং এতই স্পর্শকাতর যে, এক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকাই ভালো।

তবে আমাদের মধ্যে যে কজন সাংবাদিকের পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা, চালচলন, আচার-আচরণে আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে, এক কথায় এলিট সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, হাসান শাহরিয়ার তাদের অল্প কয়েকজনের মধ্যে একজন। বাংলা, ইংরেজি দু-ভাষায়ই তুখোড় রিপোর্টার হিসাবে তিনি আমাদের কমিউনিটিতে পরিচিত। বিশ্বাসের সঙ্গে খুব কমই আপস করেছেন তিনি। যেমন, একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে জয়েন করার পরও শুধু নীতিগত কারণে ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন।

১৯৯০ থেকে ২০০০-এ সময় আমরা অনেকেই ইত্তেফাক ছেড়ে দিই। অনেকদিন আমরা কেউ আর রাজপথে, পার্লামেন্টে বা কোনো দলীয় কার্যালয়ে কাভার করতে যাই না। দেখা-সাক্ষাৎও কম হত। শাহরিয়ার সাহেব এই কমতিটা পূরণ করতেন মাঝেমধ্যে লাঞ্চ-ডিনারে আপ্যায়ন করে। একটি বিষয় আমাদেরও ভাবনার মধ্যে ফেলে দেয়। ভদ্রলোক এতটাই একা, নিজ পরিমণ্ডলে থাকতে ভালোবাসতেন। হয়তো গোপন কষ্টের কথাগুলো নিজের মধ্যেই লালন করতেন-যাপিত জীবনের গোপন কথাগুলো।

ঢাকা, ১০ এপ্রিল ২০২১

মুহম্মদ শফিকুর রহমান, এমপি এবং সাবেক সভাপতি ও সা. সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন