করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কি হেরে যাব?
jugantor
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কি হেরে যাব?

  একেএম শামসুদ্দিন  

১২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কি হেরে যাব?

ঢাকার একটি সরকারি জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত একজন চিকিৎসক করোনাভাইরাস সংক্রমণের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘গতকালের নাইট ডিউটি ছিল মুগদা হাসপাতালে। আমার কোভিড ডিউটির ভয়ংকরতম রাত। ফজর পর্যন্ত আমি এবং আমার তিন কলিগ সাত থেকে ১২তলা পর্যন্ত অবিরাম ছুটে বেরিয়েছি। অবিরাম রোগী আসছে শ্বাসকষ্ট নিয়ে। বেশিরভাগ রোগীর ফুসফুস ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ আক্রান্ত। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭০ থেকে ৮০ পার্সেন্ট। আইসিইউতে অবিরাম কল যাচ্ছে, কিন্তু ১৪ বেডের আইসিইউ খালি হচ্ছে না। পঁচিশটি আইসিইউ কল পেন্ডিং। রোগীর অ্যাটেনডেন্টের অসহায় আর্তনাদে রাতের বাতাস ভারী। তাদের কাকুতি-মিনতি যত টাকা লাগে ডক্টর একটি আইসিইউ দিন। তাদের কাছে উলটো ক্ষমা চাই; বোঝাতে পারি না ওয়ার্ডে পনেরো লিটারের বেশি অক্সিজেন দেওয়া যায় না, যেখানে পেশেন্টের দরকার ৬০ থেকে ৭০ লিটার পার মিনিট অক্সিজেন।’

চিকিৎসক নিজেদের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে আরও লিখেছেন, ‘আমাদের অক্ষমতা; আমাদের অশ্রু কেউ দেখে না। চোখের সামনে স্যাচুরেশন পঞ্চাশে নেমে আসে, এতটা অসহায় আর কখনো লাগেনি নিজেকে।

সীমিত জনবল আর লজিস্টিকস নিয়ে আমরা এ করোনাঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি! অসম এ লড়াইয়ে আমরা হারতে চাই না। তাই দুবার করোনা আক্রান্ত হয়েও ডিউটিতে ফিরেছি। অনেক সহকর্মী হারিয়েছে তার আপনজন। ১১ মাসের টানা লড়াইয়ে আমরা বিপর্যস্ত।’ মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক করোনা পরিস্থিতি নিয়ে যে বর্ণনা দিলেন তা সত্যিই ভয়ানক ও আতঙ্কজনক। এ চিত্র এখন শুধু মুগদা হাসপাতালের নয়, ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালেরও অবস্থা একই রকম। ক’দিন আগে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমদের সঙ্গে কথা বলে আমি একই চিত্র দেখতে পেয়েছি। আমার এক বন্ধুর ভাই করোনায় আক্রান্ত হলে কোভিড চিকিৎসা দিচ্ছে ঢাকার এমন হাসপাতালগুলোয় খোঁজ করে আইসিইউর একটি বেডও খালি পাওয়া যায়নি। অগত্যা আমি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলকে টেলিফোন কল দিই। হাসপাতালের পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বললেন, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। হাসপাতালের রোগী সংকুলানের জায়গা নেই। নতুন আরও একটি ওয়ার্ড চালু করতে হয়েছে। আইসিইউ বেডের সংকটে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের আইসিইউতে মাত্র ১০টি বেড আছে। অথচ ৩০ থেকে ৩৫ জন আইসিইউতে নেওয়ার মতো রোগী ওয়ার্ড এবং কেবিনে অপেক্ষা করছে। হিসাব করে দেখলাম আইসিইউ বেডের সংখ্যার অনুপাতে রোগীর সংখ্যা ১:৩ থেকে ১:৩.৫ জন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল বেশ পরোপকারী ও সজ্জন ব্যক্তি। করোনার প্রথম ধাপে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গিয়ে দিনরাত বিরামহীন খেটেছেন। শেষ পর্যায়ে তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। গত এক বছর ধরে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে আমাদের দেশের সব ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধারা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে এভাবেই নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। এ যুদ্ধ এখনো চলমান; কতদিন এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে, তা হয়তো ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। অতঃপর ব্রিগেডিয়ার জামিলের মুখে কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিউ সংকটের কথা শুনে আমি আর আমার বন্ধুর ভাইয়ের কথা তুলিনি। শেষ পর্যন্ত ধানমণ্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল হসপিটালের আইসিইউতে একজন করোনা রোগী মারা গেলে সেখানে তাকে ভর্তি করানো হয়।

বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিন আগেও আমাদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ২৪ ঘণ্টার হিসাবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। আমি যখন এ লেখা লিখছি, তখন বিগত ২৪ ঘণ্টায় ৬ হাজার ৮৩০ জন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানা গেছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় রোগী শনাক্তের হার ২৩ শতাংশেরও বেশি। অথচ মার্চের শুরুতেও পরীক্ষার তুলনায় করোনা রোগী শনাক্তের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এত বেশিসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারা বলছেন, কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে মানুষের উদাসীনতা সংক্রমণ বৃদ্ধির মূল কারণ। করোনাভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে এ দেশের মানুষ করোনার রূপান্তরিত ভাইরাস অর্থাৎ ইউকে ভেরিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং এ দেশের মানুষের মাধ্যমেই তা চারদিক ছড়াচ্ছে। গত বছর ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যে এ ভেরিয়েন্ট প্রথম চিহ্নিত হয়। আমরা তখনই শুনেছি এ ভেরিয়েন্ট খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এ ভেরিয়েন্ট এ দেশে এসেছে গত জানুয়ারিতে। এরপর থেকে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। আইইডিসিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশে এই ইউকে ভেরিয়েন্ট প্রথম শনাক্ত হয় জানুয়ারির ৫ তারিখ। যুক্তরাজ্য থেকে এ রূপান্তরিত ভাইরাস আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। অভিযোগ আছে, তখন যুক্তরাজ্য থেকে আসা যাত্রীদের কোয়ারেন্টিন বিধিসম্মতভাবে করা হয়নি। কারও কারও চার থেকে সাত দিন দায়ছাড়া গোছের কোয়ারেন্টিন করা হলেও অনেকে প্রভাব খাটিয়ে নির্ধারিত হোটেলে না-থেকে নিজ বাড়িতে চলে গেছেন। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই মানুষ সুযোগ নিয়েছে।

গত কয়েক মাসে সাধারণ নাগরিকদের ভেতরও সরকারি স্বাস্থ্যবিধিমালা লঙ্ঘনের প্রবণতা দেখা গেছে উদ্বেগজনক হারে। পুরো শীত মৌসুমজুড়ে বিয়ে-জন্মদিন উদ্যাপনসহ নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানের যেন হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এসব অনুষ্ঠানে মুখে মাস্ক পরা কিংবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে অবজ্ঞা মানুষ দেখিয়েছে করোনাভাইরাস যেন তারই প্রতিশোধ নিতে নতুন করে হাজির হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারে ২৫ লাখ মানুষ ভ্রমণ করেছে। এমনও সময় গেছে, কক্সবাজারে হোটেলে রুম বুকিং না-পেয়ে রাস্তায় ও ফুটপাতে পর্যটকরা রাত যাপন করেছেন। মানুষের সচেতনতার অভাবও আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

করোনা ভ্যাকসিন নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাস টিকা রপ্তানির ওপর ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ডোজের টিকাদান কার্যক্রম। এ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থায় ক্রয় করে আনা হয়েছে ৭০ লাখ ডোজ আর ভারতের ভ্যাকসিন কূটনীতির আওতায় উপহার হিসাবে পাওয়া গেছে আরও ৩২ লাখ ডোজ, যার মধ্যে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৫৩ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩১ জন প্রথম ডোজ নিয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ নিতে হলে সমসংখ্যক টিকার ডোজ প্রয়োজন পড়বে। সুতরাং নতুন করে টিকার ডোজের ব্যবস্থা করা না-গেলে দ্বিতীয় ডোজের ঘাটতি পড়বে। সরকারি চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে গত দুই মাসে আরও কমপক্ষে এক কোটি ডোজ টিকা দেশে আসার কথা থাকলেও আসেনি। আগামী জুনের মধ্যে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে মোট তিন কোটি ডোজ টিকা দেশে আসার কথা। অথচ ভারতে সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে আবার কবে টিকা আসবে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ নিশ্চিত হতে পারছে না। এমন পরিস্থিতি যে হতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করা গিয়েছিল। সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম চালান টিকা আসার আগেই শোনা গিয়েছিল ভারত সরকার টিকা রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। এ নিয়ে তখন হইচই পড়ে গিয়েছিল। প্রচুর আলোচনা হয়েছিল বিভিন্ন মিডিয়ায়। ভারত বাংলাদেশের জনগণের আশঙ্কাকে দূর করার জন্য টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে বিবৃতিও দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকারের উপহার ও চুক্তির অংশ হিসাবে প্রাপ্ত সব মিলিয়ে মোট এক কোটির সামান্য বেশি টিকা বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এখন চুক্তির শর্তানুযায়ী ভারত যদি বাকি দুই কোটি ডোজ টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত না করে, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে। আর যদি তাই হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভারত থেকে টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের পূর্বেকার অনুমানই সঠিক ছিল।

তবে আমাদের বিশ্বাস বাংলাদেশ সরকার ভারতের ওপর আর নির্ভর না-করে অন্য কোনো সূত্র থেকে টিকা আনার ব্যবস্থা করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনার কণ্ঠে যেন সে কথাই শুনতে পেলাম। তিনি বলেছেন, ‘চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও টিকা এসে যাবে। তখন আর সমস্যা হবে না।’

বর্তমান করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্য জটিল প্রকৃতির। নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে এ ভাইরাস মানুষের জীবনের হুমকি হয়ে হাজির হয়েছে। এ নতুন ভেরিয়েন্ট আরও বেশি শক্তিশালী ও কৌশলী। পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই রোগীর ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। জ্বর নেই, কাশিও নেই। তবে শরীরের দুর্বলতা ও জয়েন্ট জয়েন্ট ব্যথা অনুভূত হয়। খাওয়ার প্রতি অনীহাও দেখা দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। রোগী ভর্তি হওয়ার পরপরই সিটি স্ক্যান করে দেখা যাচ্ছে রোগীর ফুসফুস ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ডেমেজ হয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, করোনার নতুন ধরনটি তীব্র ও আরও বেশি মারাত্মক। তাহলে এ মারাত্মক ভাইরাস থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? পরিত্রাণের উপায় নিজেদেরই বের করে নিতে হবে। প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো, নিজেদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সবাইকে মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। সংক্রমিত স্থানে গেলে প্রয়োজনে ডাবল মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মান্য করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে করোনার টিকা নিতে হবে।

তা না-হলে সামনে যে দুর্গতি অপেক্ষা করছে, তার খেসারত হয়তো দিতে হবে। লেখাটি শেষ করব মুগদা জেনারেল হাসপাতালের সেই চিকিৎসকের উদ্ধৃতি দিয়ে, ‘সীমিত জনবল আর লজিস্টিকস নিয়ে আমরা এ করোনাঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অসম এ লড়াইয়ে আমরা হারতে চাই না।’

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কি হেরে যাব?

 একেএম শামসুদ্দিন 
১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কি হেরে যাব?
ফাইল ছবি

ঢাকার একটি সরকারি জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত একজন চিকিৎসক করোনাভাইরাস সংক্রমণের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘গতকালের নাইট ডিউটি ছিল মুগদা হাসপাতালে। আমার কোভিড ডিউটির ভয়ংকরতম রাত। ফজর পর্যন্ত আমি এবং আমার তিন কলিগ সাত থেকে ১২তলা পর্যন্ত অবিরাম ছুটে বেরিয়েছি। অবিরাম রোগী আসছে শ্বাসকষ্ট নিয়ে। বেশিরভাগ রোগীর ফুসফুস ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ আক্রান্ত। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭০ থেকে ৮০ পার্সেন্ট। আইসিইউতে অবিরাম কল যাচ্ছে, কিন্তু ১৪ বেডের আইসিইউ খালি হচ্ছে না। পঁচিশটি আইসিইউ কল পেন্ডিং। রোগীর অ্যাটেনডেন্টের অসহায় আর্তনাদে রাতের বাতাস ভারী। তাদের কাকুতি-মিনতি যত টাকা লাগে ডক্টর একটি আইসিইউ দিন। তাদের কাছে উলটো ক্ষমা চাই; বোঝাতে পারি না ওয়ার্ডে পনেরো লিটারের বেশি অক্সিজেন দেওয়া যায় না, যেখানে পেশেন্টের দরকার ৬০ থেকে ৭০ লিটার পার মিনিট অক্সিজেন।’

চিকিৎসক নিজেদের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে আরও লিখেছেন, ‘আমাদের অক্ষমতা; আমাদের অশ্রু কেউ দেখে না। চোখের সামনে স্যাচুরেশন পঞ্চাশে নেমে আসে, এতটা অসহায় আর কখনো লাগেনি নিজেকে।

সীমিত জনবল আর লজিস্টিকস নিয়ে আমরা এ করোনাঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি! অসম এ লড়াইয়ে আমরা হারতে চাই না। তাই দুবার করোনা আক্রান্ত হয়েও ডিউটিতে ফিরেছি। অনেক সহকর্মী হারিয়েছে তার আপনজন। ১১ মাসের টানা লড়াইয়ে আমরা বিপর্যস্ত।’ মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক করোনা পরিস্থিতি নিয়ে যে বর্ণনা দিলেন তা সত্যিই ভয়ানক ও আতঙ্কজনক। এ চিত্র এখন শুধু মুগদা হাসপাতালের নয়, ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালেরও অবস্থা একই রকম। ক’দিন আগে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমদের সঙ্গে কথা বলে আমি একই চিত্র দেখতে পেয়েছি। আমার এক বন্ধুর ভাই করোনায় আক্রান্ত হলে কোভিড চিকিৎসা দিচ্ছে ঢাকার এমন হাসপাতালগুলোয় খোঁজ করে আইসিইউর একটি বেডও খালি পাওয়া যায়নি। অগত্যা আমি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিলকে টেলিফোন কল দিই। হাসপাতালের পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বললেন, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। হাসপাতালের রোগী সংকুলানের জায়গা নেই। নতুন আরও একটি ওয়ার্ড চালু করতে হয়েছে। আইসিইউ বেডের সংকটে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের আইসিইউতে মাত্র ১০টি বেড আছে। অথচ ৩০ থেকে ৩৫ জন আইসিইউতে নেওয়ার মতো রোগী ওয়ার্ড এবং কেবিনে অপেক্ষা করছে। হিসাব করে দেখলাম আইসিইউ বেডের সংখ্যার অনুপাতে রোগীর সংখ্যা ১:৩ থেকে ১:৩.৫ জন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল বেশ পরোপকারী ও সজ্জন ব্যক্তি। করোনার প্রথম ধাপে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গিয়ে দিনরাত বিরামহীন খেটেছেন। শেষ পর্যায়ে তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। গত এক বছর ধরে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে আমাদের দেশের সব ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধারা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে এভাবেই নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। এ যুদ্ধ এখনো চলমান; কতদিন এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে, তা হয়তো ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। অতঃপর ব্রিগেডিয়ার জামিলের মুখে কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিউ সংকটের কথা শুনে আমি আর আমার বন্ধুর ভাইয়ের কথা তুলিনি। শেষ পর্যন্ত ধানমণ্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল হসপিটালের আইসিইউতে একজন করোনা রোগী মারা গেলে সেখানে তাকে ভর্তি করানো হয়।

বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিন আগেও আমাদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ২৪ ঘণ্টার হিসাবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। আমি যখন এ লেখা লিখছি, তখন বিগত ২৪ ঘণ্টায় ৬ হাজার ৮৩০ জন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানা গেছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় রোগী শনাক্তের হার ২৩ শতাংশেরও বেশি। অথচ মার্চের শুরুতেও পরীক্ষার তুলনায় করোনা রোগী শনাক্তের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এত বেশিসংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারা বলছেন, কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে মানুষের উদাসীনতা সংক্রমণ বৃদ্ধির মূল কারণ। করোনাভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে এ দেশের মানুষ করোনার রূপান্তরিত ভাইরাস অর্থাৎ ইউকে ভেরিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং এ দেশের মানুষের মাধ্যমেই তা চারদিক ছড়াচ্ছে। গত বছর ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যে এ ভেরিয়েন্ট প্রথম চিহ্নিত হয়। আমরা তখনই শুনেছি এ ভেরিয়েন্ট খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এ ভেরিয়েন্ট এ দেশে এসেছে গত জানুয়ারিতে। এরপর থেকে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। আইইডিসিআর জানিয়েছে, বাংলাদেশে এই ইউকে ভেরিয়েন্ট প্রথম শনাক্ত হয় জানুয়ারির ৫ তারিখ। যুক্তরাজ্য থেকে এ রূপান্তরিত ভাইরাস আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে। অভিযোগ আছে, তখন যুক্তরাজ্য থেকে আসা যাত্রীদের কোয়ারেন্টিন বিধিসম্মতভাবে করা হয়নি। কারও কারও চার থেকে সাত দিন দায়ছাড়া গোছের কোয়ারেন্টিন করা হলেও অনেকে প্রভাব খাটিয়ে নির্ধারিত হোটেলে না-থেকে নিজ বাড়িতে চলে গেছেন। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই মানুষ সুযোগ নিয়েছে।

গত কয়েক মাসে সাধারণ নাগরিকদের ভেতরও সরকারি স্বাস্থ্যবিধিমালা লঙ্ঘনের প্রবণতা দেখা গেছে উদ্বেগজনক হারে। পুরো শীত মৌসুমজুড়ে বিয়ে-জন্মদিন উদ্যাপনসহ নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানের যেন হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। এসব অনুষ্ঠানে মুখে মাস্ক পরা কিংবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে অবজ্ঞা মানুষ দেখিয়েছে করোনাভাইরাস যেন তারই প্রতিশোধ নিতে নতুন করে হাজির হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারে ২৫ লাখ মানুষ ভ্রমণ করেছে। এমনও সময় গেছে, কক্সবাজারে হোটেলে রুম বুকিং না-পেয়ে রাস্তায় ও ফুটপাতে পর্যটকরা রাত যাপন করেছেন। মানুষের সচেতনতার অভাবও আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

করোনা ভ্যাকসিন নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে। ভারতে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাস টিকা রপ্তানির ওপর ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ডোজের টিকাদান কার্যক্রম। এ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থায় ক্রয় করে আনা হয়েছে ৭০ লাখ ডোজ আর ভারতের ভ্যাকসিন কূটনীতির আওতায় উপহার হিসাবে পাওয়া গেছে আরও ৩২ লাখ ডোজ, যার মধ্যে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৫৩ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩১ জন প্রথম ডোজ নিয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ নিতে হলে সমসংখ্যক টিকার ডোজ প্রয়োজন পড়বে। সুতরাং নতুন করে টিকার ডোজের ব্যবস্থা করা না-গেলে দ্বিতীয় ডোজের ঘাটতি পড়বে। সরকারি চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে গত দুই মাসে আরও কমপক্ষে এক কোটি ডোজ টিকা দেশে আসার কথা থাকলেও আসেনি। আগামী জুনের মধ্যে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে মোট তিন কোটি ডোজ টিকা দেশে আসার কথা। অথচ ভারতে সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে আবার কবে টিকা আসবে, সে ব্যাপারে বাংলাদেশ নিশ্চিত হতে পারছে না। এমন পরিস্থিতি যে হতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করা গিয়েছিল। সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম চালান টিকা আসার আগেই শোনা গিয়েছিল ভারত সরকার টিকা রপ্তানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। এ নিয়ে তখন হইচই পড়ে গিয়েছিল। প্রচুর আলোচনা হয়েছিল বিভিন্ন মিডিয়ায়। ভারত বাংলাদেশের জনগণের আশঙ্কাকে দূর করার জন্য টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে বিবৃতিও দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকারের উপহার ও চুক্তির অংশ হিসাবে প্রাপ্ত সব মিলিয়ে মোট এক কোটির সামান্য বেশি টিকা বাংলাদেশে পাঠানো হয়। এখন চুক্তির শর্তানুযায়ী ভারত যদি বাকি দুই কোটি ডোজ টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত না করে, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে। আর যদি তাই হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, ভারত থেকে টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের পূর্বেকার অনুমানই সঠিক ছিল।

তবে আমাদের বিশ্বাস বাংলাদেশ সরকার ভারতের ওপর আর নির্ভর না-করে অন্য কোনো সূত্র থেকে টিকা আনার ব্যবস্থা করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনার কণ্ঠে যেন সে কথাই শুনতে পেলাম। তিনি বলেছেন, ‘চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও টিকা এসে যাবে। তখন আর সমস্যা হবে না।’

বর্তমান করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্য জটিল প্রকৃতির। নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে এ ভাইরাস মানুষের জীবনের হুমকি হয়ে হাজির হয়েছে। এ নতুন ভেরিয়েন্ট আরও বেশি শক্তিশালী ও কৌশলী। পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই রোগীর ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। জ্বর নেই, কাশিও নেই। তবে শরীরের দুর্বলতা ও জয়েন্ট জয়েন্ট ব্যথা অনুভূত হয়। খাওয়ার প্রতি অনীহাও দেখা দেয় বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। রোগী ভর্তি হওয়ার পরপরই সিটি স্ক্যান করে দেখা যাচ্ছে রোগীর ফুসফুস ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ডেমেজ হয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, করোনার নতুন ধরনটি তীব্র ও আরও বেশি মারাত্মক। তাহলে এ মারাত্মক ভাইরাস থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? পরিত্রাণের উপায় নিজেদেরই বের করে নিতে হবে। প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো, নিজেদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সবাইকে মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। সংক্রমিত স্থানে গেলে প্রয়োজনে ডাবল মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মান্য করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে করোনার টিকা নিতে হবে।

তা না-হলে সামনে যে দুর্গতি অপেক্ষা করছে, তার খেসারত হয়তো দিতে হবে। লেখাটি শেষ করব মুগদা জেনারেল হাসপাতালের সেই চিকিৎসকের উদ্ধৃতি দিয়ে, ‘সীমিত জনবল আর লজিস্টিকস নিয়ে আমরা এ করোনাঝড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও অসম এ লড়াইয়ে আমরা হারতে চাই না।’

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস