রমজান ও করোনার অর্থনীতি
jugantor
রমজান ও করোনার অর্থনীতি

  মনজু আরা বেগম  

১২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রমজান ও করোনার অর্থনীতি

আর ক’দিন পরই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এ মাস সিয়াম সাধনার মাস। আত্মশুদ্ধির মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অধীর আগ্রহে এ মাসটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। রমজানের ফজিলতের কথা কম-বেশি আমরা সবাই জানি; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা অর্জনের আশায় এ মাসটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কোন পণ্য রমজান মাসে বেশি ব্যবহার হবে, রোজাদাররা কোন পণ্যটি দাম বাড়লেও কিনতে চাইবে কিংবা কীভাবে ভেজাল দিয়ে পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে বেশি মুনাফা লাভ করা যায়-এজন্য তারা রোজার অনেক আগে থেকেই খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে; যাতে করে বলতে পারে সরবরাহ কম, তাই দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, রমজান মাসটা যেন খাদ্যোৎসবের মাস। এ মাসে রোজাদাররা বেশি বেশি খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত থাকে। দাম যতই বাড়ুক না কেন, বেশি দাম দিয়ে হলেও তা কিনতে হবে। ইফতার বা সেহরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার না-থাকলে রোজা যেন পূর্ণতা পায় না। কেউ কেউ রমজান মাসের কথা চিন্তা করে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ঘরে মজুদ করতে থাকে। ঈদ সামনে রেখে শুরু হয় কেনাকাটার ধুম। রমজানের প্রকৃত ফজিলত নিয়ে অনেকেই তেমনভাবে ভাবেন বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না। নিু আয়ের মানুষ এ মাসটিতে, বিশেষ করে করোনাকালে কীভাবে রোজা রাখবে বা উচ্চমূল্য দিয়ে দ্রব্যাদি কিনে কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করবে; এটি নিয়ে ভাবার সময় বা সেই মানসিকতা ব্যবসায়ীদের বা আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের আছে বলে মনে হয় না।

বিগত একটি বছর ধরে করোনার তাণ্ডব জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গত বছরের ২০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে কিছুটা কমে এলেও আমাদের আচরণগত কারণে মার্চ মাস থেকে আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমরা অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি না, মাস্ক ব্যবহার করি না। বাইরে ঘোরাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন না-করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। করোনার তীব্রতা এবং ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার আবারও লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি আবার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কে জানে। ক’দিন আগেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা হলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশেষজ্ঞরা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা চিন্তা করে শঙ্কা বাড়ছে। লকডাউনের ফলে নিু আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা আবার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল; কিন্তু বিভিন্ন হিসাবে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অর্থাৎ, করোনার কারণে নতুন করে ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সুষ্ঠু বণ্টন করা যায়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পখাতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তার মাত্র ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। অথচ স্বল্প পুঁজিতে এ খাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সবচেয়ে বেশি।

দেশের অর্থনীতি আবর্তিত হয় বিশেষ বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে। পহেলা বৈশাখ, রমজান, ঈদ ইত্যাদি উপলক্ষ্যে প্রচুর বেচাকেনা হয়। নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো চাঙা হয়ে ওঠে তাদের আয়-রোজগার বাড়ানোর জন্য। ডিজাইনাররা নতুন নতুন ডিজাইন বাজারে নিয়ে আসে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য। এককথায়, বাজার গতি পায় ও চাঙা হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারে অর্থনীতির এ চাঙা হয়ে ওঠার সময়টায় সবাই প্রায় গৃহবন্দি। এ পরিস্থিতিতে অনেকে ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন এবং অনেকে হয়তো হারাবেন। কর্মসংস্থান না-হলে মানুষের হাতে পয়সা আসবে কী করে? এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়, তাহলে সার্বিক অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। অথচ পৃথিবীজুড়ে মুসলিম দেশগুলোয় শুধু মুসলমান নয়, অনেক অমুসলিম দেশেও আমাদের দেশের ঠিক উলটোটি দেখা যায়। রোজার অনেক আগে থেকেই ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হয়। রোজাদারদের সম্মানে দ্রব্যমূল্য কমানো হয় বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থিতিশীল রাখা হয়, যাতে রোজাদাররা রোজা রেখে শারীরিক বা মানসিক কষ্টে না থাকেন। আল্লাহর অপার অনুগ্রহ লাভের আশায় তারা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে নিজেরা গুনাহগার হতে চান না।

এ দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান এবং ধর্মভীরু। আমাদের অলিতে-গলিতে মসজিদ, মাদ্রাসা। মুসল্লিরা কখনো কখনো সারা রাত জেগে ওয়াজ-নসিহত করে। ধর্মের কথা শোনায়। কাকরাইলের মসজিদে তাবলিগ জামাতের ভিড়। আবার আমাদের দেশেই মানবতা লঙ্ঘিত। ধর্মের লেবাস পরে খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে। উচ্চমূল্য দিয়ে ভেজাল খাদ্য খেয়ে অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে। দেশে ধর্মশিক্ষার স্থান মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী ধর্ষিত, লাঞ্ছিত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও প্রায় একই অবস্থা। দেশে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। পাশাপাশি এশিয়া মহাদেশের একটি দেশের উদাহরণ এখানে টানতে চাই, যে দেশটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ নয়। এরা ধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে না। এ দেশের অলিগলিতে মসজিদ-মন্দির নেই। এখানে ধর্মের কথা বলে কেউ কাউকে ঠকায় না। এখানে কেউ কারও ফাইল আটকে রেখে ঘুস দেয় না কিংবা নেয়ও না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিত বা লাঞ্ছিত হয় না। এখানে রাস্তাঘাটে কোনো ভিখারিও দেখা যায় না। যে দেশটির কথা বলছি, সেটি জাপান। এ জাতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কর্মনিষ্ঠ জাতি। ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপান। জানা যায়, ভূমিকম্পের সময় মানুষকে খাদ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য সব খাবার ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনের চেয়ে একটি রুটিও কেউ বেশি নেয়নি। ত্রাণকেন্দ্রে কোনো প্রহরী রাখার প্রয়োজন হয়নি। লাইনে দাঁড়িয়ে যে যার মতো প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নিয়েছে। কোনো চাল বা ত্রাণসামগ্রী চুরির কোনো ঘটনা ঘটার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না। সেখানে কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে মানুষকে জিম্মি করে না বা জীবন বাঁচানোর জন্য যে খাদ্য, সে খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে দেশটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সে দেশটির মানুষ কর্মনিষ্ঠ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হওয়ায় আজ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক ও মানবিক দিকগুলোর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের দেশও এগিয়ে যাবে। আর এভাবেই জাতি হিসাবে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারব। আসছে পবিত্র রমজান মাসে এটাই হোক আমাদের চেষ্টা।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com

রমজান ও করোনার অর্থনীতি

 মনজু আরা বেগম 
১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
রমজান ও করোনার অর্থনীতি
ফাইল ছবি

আর ক’দিন পরই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এ মাস সিয়াম সাধনার মাস। আত্মশুদ্ধির মাস। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অধীর আগ্রহে এ মাসটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। রমজানের ফজিলতের কথা কম-বেশি আমরা সবাই জানি; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা অর্জনের আশায় এ মাসটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কোন পণ্য রমজান মাসে বেশি ব্যবহার হবে, রোজাদাররা কোন পণ্যটি দাম বাড়লেও কিনতে চাইবে কিংবা কীভাবে ভেজাল দিয়ে পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে বেশি মুনাফা লাভ করা যায়-এজন্য তারা রোজার অনেক আগে থেকেই খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে; যাতে করে বলতে পারে সরবরাহ কম, তাই দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, রমজান মাসটা যেন খাদ্যোৎসবের মাস। এ মাসে রোজাদাররা বেশি বেশি খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত থাকে। দাম যতই বাড়ুক না কেন, বেশি দাম দিয়ে হলেও তা কিনতে হবে। ইফতার বা সেহরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার না-থাকলে রোজা যেন পূর্ণতা পায় না। কেউ কেউ রমজান মাসের কথা চিন্তা করে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ঘরে মজুদ করতে থাকে। ঈদ সামনে রেখে শুরু হয় কেনাকাটার ধুম। রমজানের প্রকৃত ফজিলত নিয়ে অনেকেই তেমনভাবে ভাবেন বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না। নিু আয়ের মানুষ এ মাসটিতে, বিশেষ করে করোনাকালে কীভাবে রোজা রাখবে বা উচ্চমূল্য দিয়ে দ্রব্যাদি কিনে কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করবে; এটি নিয়ে ভাবার সময় বা সেই মানসিকতা ব্যবসায়ীদের বা আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের আছে বলে মনে হয় না।

বিগত একটি বছর ধরে করোনার তাণ্ডব জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গত বছরের ২০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে কিছুটা কমে এলেও আমাদের আচরণগত কারণে মার্চ মাস থেকে আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমরা অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি না, মাস্ক ব্যবহার করি না। বাইরে ঘোরাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন না-করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। করোনার তীব্রতা এবং ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার আবারও লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতি আবার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কে জানে। ক’দিন আগেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করা হলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশেষজ্ঞরা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা চিন্তা করে শঙ্কা বাড়ছে। লকডাউনের ফলে নিু আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা আবার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল; কিন্তু বিভিন্ন হিসাবে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অর্থাৎ, করোনার কারণে নতুন করে ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সুষ্ঠু বণ্টন করা যায়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পখাতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল, তার মাত্র ৪০ শতাংশ বিতরণ হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। অথচ স্বল্প পুঁজিতে এ খাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সবচেয়ে বেশি।

দেশের অর্থনীতি আবর্তিত হয় বিশেষ বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে। পহেলা বৈশাখ, রমজান, ঈদ ইত্যাদি উপলক্ষ্যে প্রচুর বেচাকেনা হয়। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো চাঙা হয়ে ওঠে তাদের আয়-রোজগার বাড়ানোর জন্য। ডিজাইনাররা নতুন নতুন ডিজাইন বাজারে নিয়ে আসে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য। এককথায়, বাজার গতি পায় ও চাঙা হয়ে ওঠে। কিন্তু এবারে অর্থনীতির এ চাঙা হয়ে ওঠার সময়টায় সবাই প্রায় গৃহবন্দি। এ পরিস্থিতিতে অনেকে ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন এবং অনেকে হয়তো হারাবেন। কর্মসংস্থান না-হলে মানুষের হাতে পয়সা আসবে কী করে? এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়, তাহলে সার্বিক অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। অথচ পৃথিবীজুড়ে মুসলিম দেশগুলোয় শুধু মুসলমান নয়, অনেক অমুসলিম দেশেও আমাদের দেশের ঠিক উলটোটি দেখা যায়। রোজার অনেক আগে থেকেই ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হয়। রোজাদারদের সম্মানে দ্রব্যমূল্য কমানো হয় বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থিতিশীল রাখা হয়, যাতে রোজাদাররা রোজা রেখে শারীরিক বা মানসিক কষ্টে না থাকেন। আল্লাহর অপার অনুগ্রহ লাভের আশায় তারা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে নিজেরা গুনাহগার হতে চান না।

এ দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান এবং ধর্মভীরু। আমাদের অলিতে-গলিতে মসজিদ, মাদ্রাসা। মুসল্লিরা কখনো কখনো সারা রাত জেগে ওয়াজ-নসিহত করে। ধর্মের কথা শোনায়। কাকরাইলের মসজিদে তাবলিগ জামাতের ভিড়। আবার আমাদের দেশেই মানবতা লঙ্ঘিত। ধর্মের লেবাস পরে খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে। উচ্চমূল্য দিয়ে ভেজাল খাদ্য খেয়ে অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে। দেশে ধর্মশিক্ষার স্থান মাদ্রাসার শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী ধর্ষিত, লাঞ্ছিত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও প্রায় একই অবস্থা। দেশে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। পাশাপাশি এশিয়া মহাদেশের একটি দেশের উদাহরণ এখানে টানতে চাই, যে দেশটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ নয়। এরা ধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে না। এ দেশের অলিগলিতে মসজিদ-মন্দির নেই। এখানে ধর্মের কথা বলে কেউ কাউকে ঠকায় না। এখানে কেউ কারও ফাইল আটকে রেখে ঘুস দেয় না কিংবা নেয়ও না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষিত বা লাঞ্ছিত হয় না। এখানে রাস্তাঘাটে কোনো ভিখারিও দেখা যায় না। যে দেশটির কথা বলছি, সেটি জাপান। এ জাতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও কর্মনিষ্ঠ জাতি। ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপান। জানা যায়, ভূমিকম্পের সময় মানুষকে খাদ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য সব খাবার ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনের চেয়ে একটি রুটিও কেউ বেশি নেয়নি। ত্রাণকেন্দ্রে কোনো প্রহরী রাখার প্রয়োজন হয়নি। লাইনে দাঁড়িয়ে যে যার মতো প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নিয়েছে। কোনো চাল বা ত্রাণসামগ্রী চুরির কোনো ঘটনা ঘটার কথা তারা চিন্তাও করতে পারে না। সেখানে কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে মানুষকে জিম্মি করে না বা জীবন বাঁচানোর জন্য যে খাদ্য, সে খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে দেশটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সে দেশটির মানুষ কর্মনিষ্ঠ, সুশৃঙ্খল ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হওয়ায় আজ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক ও মানবিক দিকগুলোর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের দেশও এগিয়ে যাবে। আর এভাবেই জাতি হিসাবে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারব। আসছে পবিত্র রমজান মাসে এটাই হোক আমাদের চেষ্টা।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন