শিক্ষার মানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে: এ কে আজাদ চৌধুরী
jugantor
সাক্ষাৎকার
শিক্ষার মানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে: এ কে আজাদ চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. এ কে আজাদ চৌধুরী সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গত পঞ্চাশ বছরে শিক্ষাখাতে আমাদের দেশের যে অর্জন, এ খাতে বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনা; সংকট উত্তরণে করণীয়, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির উপায়, শিক্ষাখাতে করোনার প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-

  মোহাম্মদ কবীর আহমদ  

১৩ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ড. এ কে আজাদ চৌধুরী

যুগান্তর : গত পঞ্চাশ বছরে শিক্ষাখাতে আমাদের দেশের যে অর্জন, তা বিদ্যমান বাস্তবতায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সহায়ক হবে। এসডিজির লক্ষ্য অর্জনসহ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল বেশি মাত্রায় পেতে কী করণীয়?

এ কে আজাদ চৌধুরী : স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের মধ্যেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারি করার পদক্ষেপ নেন। এর ফলে প্রাথমিকে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম হয়েছে। পরে সব সরকারের আমলেই এ ধারা রক্ষা করা হয়েছে। প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মান আশাব্যঞ্জক নয়। বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত অনেকে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে না। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র শিক্ষক সংকট বিরাজমান। এ অবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার মান বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণের পর একজন চাকরিপ্রত্যাশী যাতে দ্রুত কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, এটি নিশ্চিত করা দরকার। শিক্ষিত হয়ে কাউকে যাতে বেকার থাকতে না-হয়, তা নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থানের সঙ্গে মিল রেখে পাঠ্যসূচিতে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয়কে যদি উচ্চশিক্ষায় যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হয়, শিক্ষকদের অব্যাহত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যায়; শিক্ষার পুরো প্রক্রিয়াকে যদি সমৃদ্ধ করা যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার হারের উল্লম্ফনের সুফল আমরা পাব। শিক্ষার মান বাড়াতে যা যা করণীয়, সময়মতো প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর : বিদ্যালয় শিক্ষায় নতুন শিক্ষাক্রমের খসড়া ঘোষিত হয়েছে, যা চূড়ান্ত করে ২০২২ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত চালু করার কথা রয়েছে। শিক্ষাক্রমের খসড়ায় এক ‘মহাবাস্তবায়ন পরিকল্পনার’ কথা বলা হয়েছে। কোন লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের এগোতে হবে?

এ কে আজাদ চৌধুরী : কয়েক বছর পরপর শিক্ষাক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হয়, এটি চলমান এক প্রক্রিয়া। তবে এ পরিবর্তন যেন অর্থবহ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না-পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে আগামীতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে, সেভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে। তা না-হলে উচ্চ আয়ের যে লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সে লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছাতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যুগান্তর : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নৈতিক শিক্ষার ওপর কতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার?

এ কে আজাদ চৌধুরী : নৈতিকতাবিষয়ক সংকট-এটি এখন সমগ্র বিশ্বেই এক বড় সমস্যা হিসাবে বিবেচিত। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নৈতিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ, ভারতসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উন্নত নৈতিকতা চর্চার ঐতিহ্য রয়েছে, এটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের প্রবণতা বেড়েছে। নানা কারণে নৈতিকতার চর্চায় অনেকের আগ্রহ কমছে। এটা চিন্তার বিষয়। উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের সঙ্গে শিশুরা যাতে ভালোভাবে পরিচিত হতে পারে, সে জন্য প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হওয়ার আগেই শিশু যাতে উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সে জন্য বাবা-মাসহ পরিবারের অগ্রজ সব সদস্যকে সতর্ক থাকতে হবে।

যুগান্তর : শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে কম্পিউটার প্রযুক্তির ওপর কতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার?

এ কে আজাদ চৌধুরী : শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রযুক্তির সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আশার কথা হলো, ইতোমধ্যে এ-বিষয়ক অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক জীবনযাপনের অপরিহার্য অন্যান্য প্রযুক্তির সঙ্গেও শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরেই পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত দেশের শিশুরা একেবারে শৈশবে স্কুলে যাওয়ার আগে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পরিবারেই পেয়ে থাকে। আমাদের দেশে তেমনটি না-হলেও আজকাল অনেক সচ্ছল পরিবার ও জ্ঞানের দিক থেকে অগ্রসর মানুষ শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু এ ধরনের সুযোগ সীমিতসংখ্যক পরিবারের শিশুরা পেয়ে থাকে। এটি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর : জানা গেছে, নতুন কারিকুলামে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কলা-এ রকম কোনো বিভাজন থাকছে না। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

এ কে আজাদ চৌধুরী : এককথায় বলতে গেলে, সিদ্ধান্তটি ভালো। আগে যখন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা ছিল, তখনও মাধ্যমিকে কোনো বিভাগ-বিভাজন ছিল না। কারণ, এসএসসির আগেই শিক্ষার্থীদের আলাদা স্ট্রিমে নিয়ে পড়ানোর কারণে কিছু কমন সাবজেক্ট-যেগুলো একজন শিক্ষার্থীর স্কুল লেভেলে পড়া উচিত-সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পড়া হতো না। যেমন: বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ ও সভ্যতার ইতিহাস, দেশসহ সারা বিশ্বের ভূগোল এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে হতো না। আবার সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে হতো না। তাতে দেখা গেল, মাধ্যমিকের এ বিভাগ বিভাজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট স্ট্রিমে পাঠানোটা খুব আগে হয়ে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, নতুন নিয়ম চালু হলে শিক্ষার্থীরা সাহিত্য, ইংরেজি, বাংলা ভাষা, গণিত, ভূগোল, সামাজিক বিজ্ঞান, দর্শন-সব বিষয়ে সমান গুরুত্ব দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে তো দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্তই কোনো বিভাজন নেই। নতুন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিবেদিতপ্রাণ ও যোগ্য শিক্ষকও যোগ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর : সার্বিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি, উচ্চ আয়ের দেশে উত্তরণ এবং এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় শিক্ষায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কারিকুলাম কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

এ কে আজাদ চৌধুরী : যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় STEM-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। S মানে সায়েন্স, T মানে টেকনোলজি, E মানে ইংলিশ, M মানে ম্যাথমেটিকস। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী যে বিভাগেই অধ্যয়ন করুক-না কেন, তাকে এ চারটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আত্মস্থ করতে হয়। আজকের যুগে প্রযুক্তি ছাড়া জীবন ধারণের কথা কল্পনাই করা যায় না। সেজন্য কম্পিউটার সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এসব বিষয়ের মৌলিক দিকগুলো সম্পর্কেও অল্প বয়সি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ধারণা থাকা দরকার।

আজকের যুগে একজন শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন কেন প্রয়োজন তা সবারই জানা। মাতৃভাষা হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ইংরেজি শেখায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীন, জাপান, কোরিয়া এসব দেশে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বহুল আলোচিত। আমরা মাতৃভাষায় চিন্তা করব, কল্পনা করব, স্বপ্ন দেখব; তবে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে যেসব ভাষায় দক্ষতা বাড়ানো দরকার, সেসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলে চলবে না।

গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের জননী। শুধু তাই নয়, গণিত দর্শনেরও জননী। ২৫০০ বছর আগে প্লেটোর স্কুলে বিজ্ঞান অধ্যয়নের ভালো ব্যবস্থা ছিল; সেখানে গণিতের চর্চাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ৫ হাজার বছর আগে গণিতের চর্চায় বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে ভারতবর্ষের কথা উল্লেখ করা যায়।

যুগান্তর : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা যুক্তিযুক্ত কি না?

এ কে আজাদ চৌধুরী : কে কতটা গ্রহণ করতে পারবে, আগে থেকে তা চিন্তা করা অনুচিত। মূলত কোনো কোনো শিক্ষকের অদক্ষতার কারণেই অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত চাপ অনুভব করে। জ্ঞান বিতরণ কাজে শিক্ষক যথাযথ দক্ষতা অর্জন করতে পারলে শিক্ষার্থীরা আনন্দচিত্তে সেই জ্ঞান গ্রহণ করবে।

যুগান্তর : শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞানের কোন স্তরের আলোচনা বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার? জটিল বিষয়গুলো পাঠসূচির অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা তা আত্মস্থ করতে পারবে কি?

এ কে আজাদ চৌধুরী : সময়ের দাবি মেটাতে আগামী দিনগুলোয় মানুষের জীবনে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাবে। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এতটাই অনিবার্য হয়ে পড়বে যে, একে আমাদের জীবনের অংশ বিবেচনা না-করলে পিছিয়ে পড়ব। আমরা জ্ঞানসমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণ করতে চাই। কাজেই এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। জ্ঞানের আলোচনার পরিবর্তে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করলে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়। এজন্য সব পর্যায়ের শিক্ষকের অদক্ষতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

যুগান্তর : কেউ কেউ বলতে পারেন, কিছু বিষয় উচ্চতর গবেষণার বিষয় হিসাবে নির্ধারণ করা হোক। আপনার মতামত জানতে চাই।

এ কে আজাদ চৌধুরী : বিজ্ঞানের গবেষণা বর্তমানে এমন উচ্চপর্যায়ে চলে গেছে যে, মানুষের মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যৌথভাবে কাজ করে কোনো সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া খুঁজে বের করে। কাজেই এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শিশুর কাছে আড়াল করতে হবে কেন? এসব বিষয় শিশুশিক্ষার্থীদের উপযোগী করে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। বয়স অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক তথ্য শিশুদের সামনে তুলে ধরা না-হলে তারা পিছিয়ে পড়বে। অতি শৈশবেই একটি শিশু আকাশের নক্ষত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়। শিশুদের সামনে মহাকাশের বিভিন্ন তথ্য গল্পচ্ছলে তুলে ধরা হলে এরাই বড় হয়ে মহাকাশবিষয়ক গবেষণায় বেশি আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে।

যুগান্তর : চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞান কোন স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সিলেবাসভুক্ত করা উচিত বলে মনে করেন?

এ কে আজাদ চৌধুরী : চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনা এখন উচ্চশিক্ষার স্তরেই সীমিত রয়েছে। এ প্রবণতা আরও কিছুদিন চলমান থাকবে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এসব আলোচনা আর উচ্চশিক্ষার স্তরে সীমিত থাকবে না। এ-বিষয়ক অনেক তথ্যকে সাধারণ জ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করা হবে। আমরা যদি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল বেশি মাত্রায় পেতে চাই, তাহলে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই সে সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রাসঙ্গিক আলোচনা শুরু করতে হবে। এ সম্পর্কিত জ্ঞানের আলোচনার অন্যতম প্রধান বার্তাটি হলো, জ্ঞানচর্চায় কোনো বিভাজন থাকা অনুচিত। জ্ঞানের সমন্বিত চর্চা ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল পাওয়ার কথা চিন্তা করা যায় না। এসব আলোচনা শিশুশিক্ষার্থীরা কতটা বুঝতে সক্ষম, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব আলোচনার প্রেক্ষাপটে শিশুশিক্ষার্থীদের যে ভিত্তিটা তৈরি হবে, তা পরবর্তী সময়ে তাদের অনেক উপকারে আসবে।

যুগান্তর : লক্ষ করা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়াতে কী করণীয়?

এ কে আজাদ চৌধুরী : এজন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতিও কিছুটা দায়ী। একটি সমস্যার কথা উল্লেখ করতে চাই। শিক্ষার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। আরও যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোও বহুল আলোচিত।

যুগান্তর : আমাদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বহুল আলোচিত।

এ কে আজাদ চৌধুরী : শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধির পরিবেশও সৃষ্টি করা দরকার। শিক্ষকদের জীবন মানে পরিবর্তন এলে আত্মমর্যাদা বোধেও পরিবর্তন আসবে। যথাযথ পরিবেশের অভাবেও শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

যুগান্তর : সব শিক্ষার্থীর পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এটি বিবেচনায় রেখে একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কী কী মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করানো জরুরি?

এ কে আজাদ চৌধুরী : পরিপূর্ণ নাগরিক হতে প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলোর সঙ্গে একজন শিক্ষার্থী যাতে শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সে মাধ্যমিক পর্যায়ে একই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হবে। কিছুটা সহযোগিতা পেলে অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত উদ্যোগেই বিস্ময়কর সাফল্যের পরিচয় দিতে সক্ষম, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।

যুগান্তর : করোনার কারণে সৃষ্ট শিক্ষা খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কী করণীয়?

এ কে আজাদ চৌধুরী : করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাখাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বিকল্প উপায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান থাকলেও, সেসব ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সারা দেশে করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কখন এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসবে, সেদিকেই সবার দৃষ্টি। করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে টিকা নেওয়ার পাশাপাশি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে। আমরা এখন মহামারি নিয়ন্ত্রণের দিনক্ষণ গুনছি। বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটির ব্যাপক হারে মিউটেশনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটিই বড় উদ্বেগের বিষয়। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানে যে কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অবশ্যই মানতে হবে।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

এ কে আজাদ চৌধুরী : ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার

শিক্ষার মানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে: এ কে আজাদ চৌধুরী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. এ কে আজাদ চৌধুরী সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গত পঞ্চাশ বছরে শিক্ষাখাতে আমাদের দেশের যে অর্জন, এ খাতে বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাবনা; সংকট উত্তরণে করণীয়, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির উপায়, শিক্ষাখাতে করোনার প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-
 মোহাম্মদ কবীর আহমদ 
১৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ড. এ কে আজাদ চৌধুরী
ড. এ কে আজাদ চৌধুরী

যুগান্তর : গত পঞ্চাশ বছরে শিক্ষাখাতে আমাদের দেশের যে অর্জন, তা বিদ্যমান বাস্তবতায় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সহায়ক হবে। এসডিজির লক্ষ্য অর্জনসহ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল বেশি মাত্রায় পেতে কী করণীয়?

এ কে আজাদ চৌধুরী : স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের মধ্যেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষাকে সরকারি করার পদক্ষেপ নেন। এর ফলে প্রাথমিকে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারের পথ সুগম হয়েছে। পরে সব সরকারের আমলেই এ ধারা রক্ষা করা হয়েছে। প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মান আশাব্যঞ্জক নয়। বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত অনেকে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে না। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু কটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে, এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র শিক্ষক সংকট বিরাজমান। এ অবস্থায় বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার মান বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণের পর একজন চাকরিপ্রত্যাশী যাতে দ্রুত কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, এটি নিশ্চিত করা দরকার। শিক্ষিত হয়ে কাউকে যাতে বেকার থাকতে না-হয়, তা নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থানের সঙ্গে মিল রেখে পাঠ্যসূচিতে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয়কে যদি উচ্চশিক্ষায় যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হয়, শিক্ষকদের অব্যাহত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যায়; শিক্ষার পুরো প্রক্রিয়াকে যদি সমৃদ্ধ করা যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার হারের উল্লম্ফনের সুফল আমরা পাব। শিক্ষার মান বাড়াতে যা যা করণীয়, সময়মতো প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর : বিদ্যালয় শিক্ষায় নতুন শিক্ষাক্রমের খসড়া ঘোষিত হয়েছে, যা চূড়ান্ত করে ২০২২ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত চালু করার কথা রয়েছে। শিক্ষাক্রমের খসড়ায় এক ‘মহাবাস্তবায়ন পরিকল্পনার’ কথা বলা হয়েছে। কোন লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের এগোতে হবে?

এ কে আজাদ চৌধুরী : কয়েক বছর পরপর শিক্ষাক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে হয়, এটি চলমান এক প্রক্রিয়া। তবে এ পরিবর্তন যেন অর্থবহ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে পিছিয়ে না-পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে আগামীতে জ্ঞানের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে, সেভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে। তা না-হলে উচ্চ আয়ের যে লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সে লক্ষ্যে কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছাতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যুগান্তর : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নৈতিক শিক্ষার ওপর কতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার?

এ কে আজাদ চৌধুরী : নৈতিকতাবিষয়ক সংকট-এটি এখন সমগ্র বিশ্বেই এক বড় সমস্যা হিসাবে বিবেচিত। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নৈতিক শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বাংলাদেশ, ভারতসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উন্নত নৈতিকতা চর্চার ঐতিহ্য রয়েছে, এটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের প্রবণতা বেড়েছে। নানা কারণে নৈতিকতার চর্চায় অনেকের আগ্রহ কমছে। এটা চিন্তার বিষয়। উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের সঙ্গে শিশুরা যাতে ভালোভাবে পরিচিত হতে পারে, সে জন্য প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হওয়ার আগেই শিশু যাতে উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সে জন্য বাবা-মাসহ পরিবারের অগ্রজ সব সদস্যকে সতর্ক থাকতে হবে।

যুগান্তর : শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে কম্পিউটার প্রযুক্তির ওপর কতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার?

এ কে আজাদ চৌধুরী : শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার প্রযুক্তির সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আশার কথা হলো, ইতোমধ্যে এ-বিষয়ক অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক জীবনযাপনের অপরিহার্য অন্যান্য প্রযুক্তির সঙ্গেও শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরেই পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত দেশের শিশুরা একেবারে শৈশবে স্কুলে যাওয়ার আগে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পরিবারেই পেয়ে থাকে। আমাদের দেশে তেমনটি না-হলেও আজকাল অনেক সচ্ছল পরিবার ও জ্ঞানের দিক থেকে অগ্রসর মানুষ শিশুদের আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু এ ধরনের সুযোগ সীমিতসংখ্যক পরিবারের শিশুরা পেয়ে থাকে। এটি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর : জানা গেছে, নতুন কারিকুলামে মাধ্যমিকে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কলা-এ রকম কোনো বিভাজন থাকছে না। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

এ কে আজাদ চৌধুরী : এককথায় বলতে গেলে, সিদ্ধান্তটি ভালো। আগে যখন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা ছিল, তখনও মাধ্যমিকে কোনো বিভাগ-বিভাজন ছিল না। কারণ, এসএসসির আগেই শিক্ষার্থীদের আলাদা স্ট্রিমে নিয়ে পড়ানোর কারণে কিছু কমন সাবজেক্ট-যেগুলো একজন শিক্ষার্থীর স্কুল লেভেলে পড়া উচিত-সেগুলো যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পড়া হতো না। যেমন: বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশ ও সভ্যতার ইতিহাস, দেশসহ সারা বিশ্বের ভূগোল এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে হতো না। আবার সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়তে হতো না। তাতে দেখা গেল, মাধ্যমিকের এ বিভাগ বিভাজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট স্ট্রিমে পাঠানোটা খুব আগে হয়ে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, নতুন নিয়ম চালু হলে শিক্ষার্থীরা সাহিত্য, ইংরেজি, বাংলা ভাষা, গণিত, ভূগোল, সামাজিক বিজ্ঞান, দর্শন-সব বিষয়ে সমান গুরুত্ব দেবে। যুক্তরাষ্ট্রে তো দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্তই কোনো বিভাজন নেই। নতুন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি নিবেদিতপ্রাণ ও যোগ্য শিক্ষকও যোগ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

যুগান্তর : সার্বিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি, উচ্চ আয়ের দেশে উত্তরণ এবং এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় শিক্ষায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কারিকুলাম কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

এ কে আজাদ চৌধুরী : যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় STEM-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। S মানে সায়েন্স, T মানে টেকনোলজি, E মানে ইংলিশ, M মানে ম্যাথমেটিকস। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী যে বিভাগেই অধ্যয়ন করুক-না কেন, তাকে এ চারটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আত্মস্থ করতে হয়। আজকের যুগে প্রযুক্তি ছাড়া জীবন ধারণের কথা কল্পনাই করা যায় না। সেজন্য কম্পিউটার সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এসব বিষয়ের মৌলিক দিকগুলো সম্পর্কেও অল্প বয়সি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ধারণা থাকা দরকার।

আজকের যুগে একজন শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন কেন প্রয়োজন তা সবারই জানা। মাতৃভাষা হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ইংরেজি শেখায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীন, জাপান, কোরিয়া এসব দেশে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বহুল আলোচিত। আমরা মাতৃভাষায় চিন্তা করব, কল্পনা করব, স্বপ্ন দেখব; তবে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে যেসব ভাষায় দক্ষতা বাড়ানো দরকার, সেসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলে চলবে না।

গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের জননী। শুধু তাই নয়, গণিত দর্শনেরও জননী। ২৫০০ বছর আগে প্লেটোর স্কুলে বিজ্ঞান অধ্যয়নের ভালো ব্যবস্থা ছিল; সেখানে গণিতের চর্চাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ৫ হাজার বছর আগে গণিতের চর্চায় বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে ভারতবর্ষের কথা উল্লেখ করা যায়।

যুগান্তর : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ালেখার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা যুক্তিযুক্ত কি না?

এ কে আজাদ চৌধুরী : কে কতটা গ্রহণ করতে পারবে, আগে থেকে তা চিন্তা করা অনুচিত। মূলত কোনো কোনো শিক্ষকের অদক্ষতার কারণেই অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত চাপ অনুভব করে। জ্ঞান বিতরণ কাজে শিক্ষক যথাযথ দক্ষতা অর্জন করতে পারলে শিক্ষার্থীরা আনন্দচিত্তে সেই জ্ঞান গ্রহণ করবে।

যুগান্তর : শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞানের কোন স্তরের আলোচনা বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার? জটিল বিষয়গুলো পাঠসূচির অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা তা আত্মস্থ করতে পারবে কি?

এ কে আজাদ চৌধুরী : সময়ের দাবি মেটাতে আগামী দিনগুলোয় মানুষের জীবনে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাবে। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এতটাই অনিবার্য হয়ে পড়বে যে, একে আমাদের জীবনের অংশ বিবেচনা না-করলে পিছিয়ে পড়ব। আমরা জ্ঞানসমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণ করতে চাই। কাজেই এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। জ্ঞানের আলোচনার পরিবর্তে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করলে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়। এজন্য সব পর্যায়ের শিক্ষকের অদক্ষতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

যুগান্তর : কেউ কেউ বলতে পারেন, কিছু বিষয় উচ্চতর গবেষণার বিষয় হিসাবে নির্ধারণ করা হোক। আপনার মতামত জানতে চাই।

এ কে আজাদ চৌধুরী : বিজ্ঞানের গবেষণা বর্তমানে এমন উচ্চপর্যায়ে চলে গেছে যে, মানুষের মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যৌথভাবে কাজ করে কোনো সমস্যা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া খুঁজে বের করে। কাজেই এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শিশুর কাছে আড়াল করতে হবে কেন? এসব বিষয় শিশুশিক্ষার্থীদের উপযোগী করে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। বয়স অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক তথ্য শিশুদের সামনে তুলে ধরা না-হলে তারা পিছিয়ে পড়বে। অতি শৈশবেই একটি শিশু আকাশের নক্ষত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়। শিশুদের সামনে মহাকাশের বিভিন্ন তথ্য গল্পচ্ছলে তুলে ধরা হলে এরাই বড় হয়ে মহাকাশবিষয়ক গবেষণায় বেশি আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে।

যুগান্তর : চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞান কোন স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সিলেবাসভুক্ত করা উচিত বলে মনে করেন?

এ কে আজাদ চৌধুরী : চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনা এখন উচ্চশিক্ষার স্তরেই সীমিত রয়েছে। এ প্রবণতা আরও কিছুদিন চলমান থাকবে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এসব আলোচনা আর উচ্চশিক্ষার স্তরে সীমিত থাকবে না। এ-বিষয়ক অনেক তথ্যকে সাধারণ জ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করা হবে। আমরা যদি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল বেশি মাত্রায় পেতে চাই, তাহলে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই সে সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রাসঙ্গিক আলোচনা শুরু করতে হবে। এ সম্পর্কিত জ্ঞানের আলোচনার অন্যতম প্রধান বার্তাটি হলো, জ্ঞানচর্চায় কোনো বিভাজন থাকা অনুচিত। জ্ঞানের সমন্বিত চর্চা ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল পাওয়ার কথা চিন্তা করা যায় না। এসব আলোচনা শিশুশিক্ষার্থীরা কতটা বুঝতে সক্ষম, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব আলোচনার প্রেক্ষাপটে শিশুশিক্ষার্থীদের যে ভিত্তিটা তৈরি হবে, তা পরবর্তী সময়ে তাদের অনেক উপকারে আসবে।

যুগান্তর : লক্ষ করা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়াতে কী করণীয়?

এ কে আজাদ চৌধুরী : এজন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতিও কিছুটা দায়ী। একটি সমস্যার কথা উল্লেখ করতে চাই। শিক্ষার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। আরও যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোও বহুল আলোচিত।

যুগান্তর : আমাদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষক সংকটের বিষয়টি বহুল আলোচিত।

এ কে আজাদ চৌধুরী : শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধির পরিবেশও সৃষ্টি করা দরকার। শিক্ষকদের জীবন মানে পরিবর্তন এলে আত্মমর্যাদা বোধেও পরিবর্তন আসবে। যথাযথ পরিবেশের অভাবেও শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

যুগান্তর : সব শিক্ষার্থীর পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এটি বিবেচনায় রেখে একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কী কী মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করানো জরুরি?

এ কে আজাদ চৌধুরী : পরিপূর্ণ নাগরিক হতে প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলোর সঙ্গে একজন শিক্ষার্থী যাতে শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সে মাধ্যমিক পর্যায়ে একই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হবে। কিছুটা সহযোগিতা পেলে অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত উদ্যোগেই বিস্ময়কর সাফল্যের পরিচয় দিতে সক্ষম, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই।

যুগান্তর : করোনার কারণে সৃষ্ট শিক্ষা খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কী করণীয়?

এ কে আজাদ চৌধুরী : করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাখাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বিকল্প উপায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান থাকলেও, সেসব ক্ষেত্রে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সারা দেশে করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কখন এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসবে, সেদিকেই সবার দৃষ্টি। করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে টিকা নেওয়ার পাশাপাশি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে। আমরা এখন মহামারি নিয়ন্ত্রণের দিনক্ষণ গুনছি। বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটির ব্যাপক হারে মিউটেশনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এটিই বড় উদ্বেগের বিষয়। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানে যে কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অবশ্যই মানতে হবে।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

এ কে আজাদ চৌধুরী : ধন্যবাদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন