মাস্ক পরা আন্দোলন ও ঈদ উপহারে মাস্ক
jugantor
মাস্ক পরা আন্দোলন ও ঈদ উপহারে মাস্ক

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

০৪ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়ংকর করোনাভাইরাস! বিশ্ববাসীর কাছে নতুন উপদ্রব। সংগত কারণেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছেও এ ভাইরাস সম্পর্কে প্রাক-ধারণা এবং গবেষণা নেই। তাই করোনা মোকাবিলায় অনেক ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পৃথিবীর যেসব শক্তিমান রাষ্ট্র তাদের মারণাস্ত্র দিয়ে যে কোনো দেশ ধ্বংস বা মানবিক বিপর্যয় ঘটানোর ক্ষমতা রাখে, তারাও ভীষণ রকম অসহায় এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের সামনে। বিশেষজ্ঞরা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন।

মাস্ক পরার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক দেশই প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেছে। টিকা গ্রহণও করছে মানুষ। তারপরও নিশ্চিন্ত না হতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকা হয়তো মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারবে; কিন্তু করোনামুক্ত করতে পারবে না। তাই তো টিকা গ্রহণের পরও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে শুনতে পাই। মারাও যাচ্ছেন কেউ কেউ।

আমি এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বিভিন্ন জার্নালে পড়ে এবং টিভি চ্যানেলে বিশেষজ্ঞদের মতামত শুনে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তাতে নিশ্চিত হয়েছি ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক টিকা নয়-মাস্ক পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা। ভাইরাস একমাত্র নাক ও মুখ দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে।

তাই প্রবেশপথ যদি বন্ধ করে দেওয়া যায়, তবে সার্থক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। শুধু করোনা কেন, দেহে যে কোনো ভাইরাস, ধুলাবালি প্রবেশ কমিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা করতে পারে মাস্ক। শুধু মহামারিকালই নয়, মাস্ক পরার অভ্যাস করতে পারলে সব সময় আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষায় একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যূহ আমরা তৈরি পেতে পারি। জীবাণুমুক্ত বাড়ির পরিবেশ বা ঘর ছাড়া বাইরে বেরোলে মাস্ক পরা জরুরি। অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা, বাজার, শপিংমল, যে কোনো জনসমাগমে মাস্ক পরাটা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

মাস্ক পরলে নিজেকে সুরক্ষায় রাখার কাজটিই যে হয় তেমন নয়-নিজেকে ভাইরাসমুক্ত রাখার পাশাপাশি পাশের মানুষের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়ানো বা তাদের কাছ থেকে সংক্রমিত হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। এভাবে নিজের, নিজ পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করা যায়।

আমরা মনে করি, একটুখানি সতর্কতার সঙ্গে এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য বিবেচনায় যদি সঠিক নিয়মে মাস্ক পরি এবং স্বাস্থ্যবিধি মান্য করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও অন্যের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পারি, তবে কোনো লকডাউন, গণপরিবহণ বন্ধসহ নানা আইন জারি করতে হয় না। প্রায় স্বাভাবিক ছন্দেই জীবন চালানো যায়। এতে হাসপাতালগুলো রোগীর ভার কমাতে পারবে। এ বাস্তবতায় কেউ আক্রান্ত হলেও হাসপাতালগুলো পারবে পূর্ণ মনোযোগে চিকিৎসাসেবা দিতে।

করোনার চলমান দ্বিতীয় ঢেউ মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই সম্ভবত কিছুটা মাস্ক-সচেতনতা বেড়েছে। তবে তা লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। গ্রামাঞ্চলে যেখানে করোনা সংক্রমণের কথা তেমন শোনা যায় না মানলাম, সেখানে মাস্ক পরায় অনীহা থাকতে পারে। কিন্তু শহরাঞ্চলে! যেখানে হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগী উপচে পড়ছে, অক্সিজেনের জন্য হাহাকার, লাশের মিছিল বড় হচ্ছে-সেখানেও কি সাধারণ মানুষ সচেতন? বাস্তব পর্যবেক্ষণে তো বটেই, প্রতিদিন টিভি চ্যানেলগুলো ভয়ংকর সত্য প্রকাশ করছে। আমাদের দায়িত্বহীনতা ও বোকামির চিত্র প্রকাশ্য হচ্ছে।

পথে, বাজারে বিচরণ করা একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মুখে এখনো মাস্ক থাকে না। যাদের মাস্ক আছে তারা সুরক্ষা করছে গলা বা থুতনির নিচে তা ঝুলিয়ে। যেখান দিয়ে ভাইরাস প্রবেশের সুযোগ নেই। নাক আর মুখ উন্মুক্ত। সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে অনেকের দ্বিধাহীন উত্তর-‘মাস্ক অবশ্যই আছে; পকেটে, বাজারের ব্যাগে, গাড়ির সিটে, দোকানে। ভাবখানা মাস্ক তার কাছে আছে এ তথ্যটি জানলে ভয়ে করোনাভাইরাস সে মুখো হবে না।

আরও হাস্যকর সরল উক্তি রয়েছে, টিভিতে দেখলাম ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে বেরোলেন তরুণগোছের এক ভদ্রলোক। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন মাস্ক নেই কেন? সদম্ভ উক্তি-‘আমি মাস্ক পরি না’, কেন? ‘মাস্ক পরতে ভালো লাগে না।’ বাজারে বিক্রেতাদের অধিকাংশের নাক-মুখ ঢাকা মাস্ক নেই। কায়িক পরিশ্রম যারা করেন-যেমন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুটে-মজুর তারা অনেকটা বাস্তব অবস্থা থেকেই বলেন এ গরমে তারা মাস্ক মুখে রাখতে পারেন না। কাঁচাবাজারের অনেক বিক্রেতার সহজ যুক্তি মাস্ক পরে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা যায় না।

আরেক শ্রেণির মানুষের মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর সরল চিন্তা। এক ধরনের বাস্তবতা মেনে দোকান মালিকদের চাপে সরকার দোকানপাট-শপিংমল খুলে দিয়েছে; কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো লক্ষণ নেই। সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে বলা কারও কারও বক্তব্যে বিস্মিত হতে হয়ে। ‘ঈদ তো বছরে একবারই আসে’, তাই (করোনায় মৃত্যুঝুঁকি থাকলেও) কেনাকাটা করতেই হবে।

সেদিন দেখলাম রাজধানীর একটি বড় শপিংমলের সামনে মল খোলার অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষের জটলা। একজন আরেকজনকে ঠেলে ঢুকছেন মলে। ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে কোলের মেয়েটিকেও কাঁধে নিতে ভুল করেননি। এমন দৃশ্য দেখে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, এখন কোভিডের ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা চলছি।

এসব দৃশ্য দেখেই মনে হচ্ছে, এ মুহূর্তে করোনাভাইরাস প্রতিহত করার জন্য আমাদের জরুরি অস্ত্র মাস্ক ব্যবহার করার বিকল্প নেই। কিন্তু মাস্ক ব্যবহার থেকে এখনো আমরা অনেকে দূরে থাকতে চাইছি বা সতর্ক হচ্ছি না। অনেকের কথার ভাবে মনে হচ্ছে, সবাই রসাতলে গেলেও তিনি নিজে বেঁচে যাবেন। তাকে করোনা আক্রান্ত করতে পারবে না। তিনি আর তার পরিবার ভালো থাকলেই হলো। এতটাই স্বার্থপরতার প্রকাশ রয়েছে আমাদের অনেকের মধ্যে। শুধু আমরা কেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের মানুষের মধ্যেও প্রথমদিকে যথেষ্ট শৈথিল্য ছিল। কোথাও কোথাও মাস্ক না পরার জন্য আন্দোলনও হয়েছে।

এর প্রতিফলন কিন্তু আমরা দেখেছি। শক্তি, ক্ষমতা ও অর্থের দাপটে দাম্ভিক এসব দেশের মানুষ কীভাবে আত্মসমর্পণ করেছে করোনাভাইরাসের কাছে। লাশের মিছিল কেবল বড় হয়েছে। আমাদের মতো শৈথিল্য প্রকাশ করেছে ভারতের মানুষও। কী ভয়াবহ মহামারির মুখে এখন দেশটি! বুঝলাম নতুন ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

কিন্তু এসব ঘাতককে নাক-মুখ দিয়ে প্রবেশ করতে না দিলে তো ভাইরাসের কিছু করার ক্ষমতা ছিল না! আবার অন্যদিকে যদি লক্ষ করি ভিন্নচিত্রও দেখব। যে চীনে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল, সেখানে কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ করে বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বৃহৎ দেশটি সাফল্যের সঙ্গে সংক্রমণ ঠেকাতে পেরেছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়ার মতো কোনো কোনো দেশ নিজেদের রক্ষা করছে অনেকটা সাফল্যের সঙ্গে।

এসব নানা বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা তো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না! ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের সবার মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। আবার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঐশ্বরিক ইচ্ছা ছাড়া এ করোনাভাইরাস সহজে বিশ্ব থেকে বিদায় নিচ্ছে না।

তাই আমাদের অধিকাংশ মানুষের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া আত্মরক্ষা সম্ভব নয়। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি ছাড়া এর বাস্তবায়ন কঠিন। সরকারি প্রশাসনের পক্ষে সহজ নয় মানুষকে বাধ্য করা। আবার সাধারণ মানুষ হঠাৎ যে সচেতন ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন হয়ে যাবেন তেমন নয়। তাই মাস্ক পরার অভ্যাস তৈরির জন্য আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি।

নগরায়ণ আমাদের অনেক আবেগ ও দায়িত্ববোধ নষ্ট করে দিয়েছে। এখন নগর জীবনে এক ফ্ল্যাটের মানুষ পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবর রাখে না। আমাদের ছেলেবেলাটা এরকম ছিল না। শহর, শহরতলি এবং গ্রামে তরুণদের অনেক ক্লাব ছিল। ক্লাবের ছেলেরা মাঝে মাঝেই সমাজকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত। এখন ক্লাব সংস্কৃতি তেমনভাবে টিকে নেই। তরুণরা এখন ঘরবন্দি। ভার্চুয়াল জগতে নিজেদের আটকে ফলেছে। আরেকটি শ্রেণি ‘কিশোর গ্যাং’ নামে নিজেদের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ করছে।

একসময় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনেক সামাজিক দায়িত্ব পালন করত। এখন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও জোটের অস্তিত্ব থাকলেও নানা রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির মধ্যে অনেকে নিজেদের আটকে ফেলেছেন। আমার মনে হয়, এ ক্রান্তিকালে সরকারের দিকে না তাকিয়ে থেকে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসা উচিত। প্রতি অঞ্চলেই নানা ক্রীড়া, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক তরুণই এখন নিজ এলাকায়।

অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে মেস করে থাকছে। এ সময়ে সবারই যার যার অবস্থানে থেকে মাস্ক পরা আন্দোলন সৃষ্টি করে এগিয়ে যাওয়া উচিত। যার যার এলাকায় দুবেলা করে পথে নেমে সাধারণ মানুষ, কর্মজীবী সবাইকে মাস্ক পরায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বোঝাতে হবে সবাই যেন মাস্ক পরার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন। সঙ্গে মাস্কের বাক্স থাকবে। মাস্কবিহীনদের মাস্ক দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। মাস্ক সরবরাহ করার জন্য এলাকার জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হবে।

তাদেরও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। আমি মনে করি, এক মাসব্যাপী এভাবে কর্মসূচি চালাতে পারলে মাস্ক ব্যবহারে গণসচেতনা তৈরি হবে। সবকিছুই অভ্যাসের ব্যাপার। প্রথম প্রথম আমাদের অনেকেরই মাস্ক ব্যবহারে অস্বস্তি হতো। মনে হতো নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গরমে মুখে রাখা যাচ্ছে না মাস্ক। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। জীবনের দায়ে তো মাস্ক ব্যবহারের কষ্টটুকু মেনে নিতেই হবে।

আজ সকালে বাসার দরজা খুলতেই একটি ছোট্ট প্যাকেট পেলাম। একটি অনলাইন কৃষিপণ্য বিক্রয়কারী গ্রুপ তাদের পরিচিতি ও পণ্য তালিকাসহ ঈদ উপহার হিসাবে একটি সুদৃশ্য মাস্ক রেখে গেছে। আমি চমৎকৃত হলাম। নতুন ভাবনা মাথায় এলো। তাইতো! মাস্ক পরা আন্দোলনের অংশ হিসাবে ঈদ উপলক্ষ্যে আমরা মাস্ক উপহার দেওয়ার স্লোগান তুলতে পারি। এতে মাস্কের প্রতি অনেকেরই সতর্কতা ও আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

মাস্ক পরা আন্দোলন ও ঈদ উপহারে মাস্ক

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
০৪ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়ংকর করোনাভাইরাস! বিশ্ববাসীর কাছে নতুন উপদ্রব। সংগত কারণেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছেও এ ভাইরাস সম্পর্কে প্রাক-ধারণা এবং গবেষণা নেই। তাই করোনা মোকাবিলায় অনেক ক্ষেত্রে অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পৃথিবীর যেসব শক্তিমান রাষ্ট্র তাদের মারণাস্ত্র দিয়ে যে কোনো দেশ ধ্বংস বা মানবিক বিপর্যয় ঘটানোর ক্ষমতা রাখে, তারাও ভীষণ রকম অসহায় এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের সামনে। বিশেষজ্ঞরা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন।

মাস্ক পরার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক দেশই প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেছে। টিকা গ্রহণও করছে মানুষ। তারপরও নিশ্চিন্ত না হতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকা হয়তো মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারবে; কিন্তু করোনামুক্ত করতে পারবে না। তাই তো টিকা গ্রহণের পরও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে শুনতে পাই। মারাও যাচ্ছেন কেউ কেউ।

আমি এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বিভিন্ন জার্নালে পড়ে এবং টিভি চ্যানেলে বিশেষজ্ঞদের মতামত শুনে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, তাতে নিশ্চিত হয়েছি ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক টিকা নয়-মাস্ক পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা। ভাইরাস একমাত্র নাক ও মুখ দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করে।

তাই প্রবেশপথ যদি বন্ধ করে দেওয়া যায়, তবে সার্থক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা যাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। শুধু করোনা কেন, দেহে যে কোনো ভাইরাস, ধুলাবালি প্রবেশ কমিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা করতে পারে মাস্ক। শুধু মহামারিকালই নয়, মাস্ক পরার অভ্যাস করতে পারলে সব সময় আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষায় একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যূহ আমরা তৈরি পেতে পারি। জীবাণুমুক্ত বাড়ির পরিবেশ বা ঘর ছাড়া বাইরে বেরোলে মাস্ক পরা জরুরি। অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা, বাজার, শপিংমল, যে কোনো জনসমাগমে মাস্ক পরাটা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

মাস্ক পরলে নিজেকে সুরক্ষায় রাখার কাজটিই যে হয় তেমন নয়-নিজেকে ভাইরাসমুক্ত রাখার পাশাপাশি পাশের মানুষের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়ানো বা তাদের কাছ থেকে সংক্রমিত হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। এভাবে নিজের, নিজ পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ ও দেশের মানুষকে রক্ষা করা যায়।

আমরা মনে করি, একটুখানি সতর্কতার সঙ্গে এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য বিবেচনায় যদি সঠিক নিয়মে মাস্ক পরি এবং স্বাস্থ্যবিধি মান্য করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও অন্যের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে পারি, তবে কোনো লকডাউন, গণপরিবহণ বন্ধসহ নানা আইন জারি করতে হয় না। প্রায় স্বাভাবিক ছন্দেই জীবন চালানো যায়। এতে হাসপাতালগুলো রোগীর ভার কমাতে পারবে। এ বাস্তবতায় কেউ আক্রান্ত হলেও হাসপাতালগুলো পারবে পূর্ণ মনোযোগে চিকিৎসাসেবা দিতে।

করোনার চলমান দ্বিতীয় ঢেউ মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার কারণেই সম্ভবত কিছুটা মাস্ক-সচেতনতা বেড়েছে। তবে তা লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। গ্রামাঞ্চলে যেখানে করোনা সংক্রমণের কথা তেমন শোনা যায় না মানলাম, সেখানে মাস্ক পরায় অনীহা থাকতে পারে। কিন্তু শহরাঞ্চলে! যেখানে হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগী উপচে পড়ছে, অক্সিজেনের জন্য হাহাকার, লাশের মিছিল বড় হচ্ছে-সেখানেও কি সাধারণ মানুষ সচেতন? বাস্তব পর্যবেক্ষণে তো বটেই, প্রতিদিন টিভি চ্যানেলগুলো ভয়ংকর সত্য প্রকাশ করছে। আমাদের দায়িত্বহীনতা ও বোকামির চিত্র প্রকাশ্য হচ্ছে।

পথে, বাজারে বিচরণ করা একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মুখে এখনো মাস্ক থাকে না। যাদের মাস্ক আছে তারা সুরক্ষা করছে গলা বা থুতনির নিচে তা ঝুলিয়ে। যেখান দিয়ে ভাইরাস প্রবেশের সুযোগ নেই। নাক আর মুখ উন্মুক্ত। সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে অনেকের দ্বিধাহীন উত্তর-‘মাস্ক অবশ্যই আছে; পকেটে, বাজারের ব্যাগে, গাড়ির সিটে, দোকানে। ভাবখানা মাস্ক তার কাছে আছে এ তথ্যটি জানলে ভয়ে করোনাভাইরাস সে মুখো হবে না।

আরও হাস্যকর সরল উক্তি রয়েছে, টিভিতে দেখলাম ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে বেরোলেন তরুণগোছের এক ভদ্রলোক। সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন মাস্ক নেই কেন? সদম্ভ উক্তি-‘আমি মাস্ক পরি না’, কেন? ‘মাস্ক পরতে ভালো লাগে না।’ বাজারে বিক্রেতাদের অধিকাংশের নাক-মুখ ঢাকা মাস্ক নেই। কায়িক পরিশ্রম যারা করেন-যেমন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুটে-মজুর তারা অনেকটা বাস্তব অবস্থা থেকেই বলেন এ গরমে তারা মাস্ক মুখে রাখতে পারেন না। কাঁচাবাজারের অনেক বিক্রেতার সহজ যুক্তি মাস্ক পরে ক্রেতার সঙ্গে কথা বলা যায় না।

আরেক শ্রেণির মানুষের মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর সরল চিন্তা। এক ধরনের বাস্তবতা মেনে দোকান মালিকদের চাপে সরকার দোকানপাট-শপিংমল খুলে দিয়েছে; কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো লক্ষণ নেই। সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে বলা কারও কারও বক্তব্যে বিস্মিত হতে হয়ে। ‘ঈদ তো বছরে একবারই আসে’, তাই (করোনায় মৃত্যুঝুঁকি থাকলেও) কেনাকাটা করতেই হবে।

সেদিন দেখলাম রাজধানীর একটি বড় শপিংমলের সামনে মল খোলার অপেক্ষায় হাজার হাজার মানুষের জটলা। একজন আরেকজনকে ঠেলে ঢুকছেন মলে। ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে কোলের মেয়েটিকেও কাঁধে নিতে ভুল করেননি। এমন দৃশ্য দেখে মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, এখন কোভিডের ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা চলছি।

এসব দৃশ্য দেখেই মনে হচ্ছে, এ মুহূর্তে করোনাভাইরাস প্রতিহত করার জন্য আমাদের জরুরি অস্ত্র মাস্ক ব্যবহার করার বিকল্প নেই। কিন্তু মাস্ক ব্যবহার থেকে এখনো আমরা অনেকে দূরে থাকতে চাইছি বা সতর্ক হচ্ছি না। অনেকের কথার ভাবে মনে হচ্ছে, সবাই রসাতলে গেলেও তিনি নিজে বেঁচে যাবেন। তাকে করোনা আক্রান্ত করতে পারবে না। তিনি আর তার পরিবার ভালো থাকলেই হলো। এতটাই স্বার্থপরতার প্রকাশ রয়েছে আমাদের অনেকের মধ্যে। শুধু আমরা কেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশের মানুষের মধ্যেও প্রথমদিকে যথেষ্ট শৈথিল্য ছিল। কোথাও কোথাও মাস্ক না পরার জন্য আন্দোলনও হয়েছে।

এর প্রতিফলন কিন্তু আমরা দেখেছি। শক্তি, ক্ষমতা ও অর্থের দাপটে দাম্ভিক এসব দেশের মানুষ কীভাবে আত্মসমর্পণ করেছে করোনাভাইরাসের কাছে। লাশের মিছিল কেবল বড় হয়েছে। আমাদের মতো শৈথিল্য প্রকাশ করেছে ভারতের মানুষও। কী ভয়াবহ মহামারির মুখে এখন দেশটি! বুঝলাম নতুন ভ্যারিয়েন্ট দ্রুত সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

কিন্তু এসব ঘাতককে নাক-মুখ দিয়ে প্রবেশ করতে না দিলে তো ভাইরাসের কিছু করার ক্ষমতা ছিল না! আবার অন্যদিকে যদি লক্ষ করি ভিন্নচিত্রও দেখব। যে চীনে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল, সেখানে কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ করে বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বৃহৎ দেশটি সাফল্যের সঙ্গে সংক্রমণ ঠেকাতে পেরেছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়ার মতো কোনো কোনো দেশ নিজেদের রক্ষা করছে অনেকটা সাফল্যের সঙ্গে।

এসব নানা বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা তো হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না! ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের সবার মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। আবার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঐশ্বরিক ইচ্ছা ছাড়া এ করোনাভাইরাস সহজে বিশ্ব থেকে বিদায় নিচ্ছে না।

তাই আমাদের অধিকাংশ মানুষের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া আত্মরক্ষা সম্ভব নয়। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি ছাড়া এর বাস্তবায়ন কঠিন। সরকারি প্রশাসনের পক্ষে সহজ নয় মানুষকে বাধ্য করা। আবার সাধারণ মানুষ হঠাৎ যে সচেতন ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন হয়ে যাবেন তেমন নয়। তাই মাস্ক পরার অভ্যাস তৈরির জন্য আমাদের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি।

নগরায়ণ আমাদের অনেক আবেগ ও দায়িত্ববোধ নষ্ট করে দিয়েছে। এখন নগর জীবনে এক ফ্ল্যাটের মানুষ পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের খবর রাখে না। আমাদের ছেলেবেলাটা এরকম ছিল না। শহর, শহরতলি এবং গ্রামে তরুণদের অনেক ক্লাব ছিল। ক্লাবের ছেলেরা মাঝে মাঝেই সমাজকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত। এখন ক্লাব সংস্কৃতি তেমনভাবে টিকে নেই। তরুণরা এখন ঘরবন্দি। ভার্চুয়াল জগতে নিজেদের আটকে ফলেছে। আরেকটি শ্রেণি ‘কিশোর গ্যাং’ নামে নিজেদের ভয়ংকর রূপ প্রকাশ করছে।

একসময় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনেক সামাজিক দায়িত্ব পালন করত। এখন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও জোটের অস্তিত্ব থাকলেও নানা রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির মধ্যে অনেকে নিজেদের আটকে ফেলেছেন। আমার মনে হয়, এ ক্রান্তিকালে সরকারের দিকে না তাকিয়ে থেকে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসা উচিত। প্রতি অঞ্চলেই নানা ক্রীড়া, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক তরুণই এখন নিজ এলাকায়।

অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে মেস করে থাকছে। এ সময়ে সবারই যার যার অবস্থানে থেকে মাস্ক পরা আন্দোলন সৃষ্টি করে এগিয়ে যাওয়া উচিত। যার যার এলাকায় দুবেলা করে পথে নেমে সাধারণ মানুষ, কর্মজীবী সবাইকে মাস্ক পরায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বোঝাতে হবে সবাই যেন মাস্ক পরার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন। সঙ্গে মাস্কের বাক্স থাকবে। মাস্কবিহীনদের মাস্ক দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। মাস্ক সরবরাহ করার জন্য এলাকার জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হবে।

তাদেরও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। আমি মনে করি, এক মাসব্যাপী এভাবে কর্মসূচি চালাতে পারলে মাস্ক ব্যবহারে গণসচেতনা তৈরি হবে। সবকিছুই অভ্যাসের ব্যাপার। প্রথম প্রথম আমাদের অনেকেরই মাস্ক ব্যবহারে অস্বস্তি হতো। মনে হতো নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গরমে মুখে রাখা যাচ্ছে না মাস্ক। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। জীবনের দায়ে তো মাস্ক ব্যবহারের কষ্টটুকু মেনে নিতেই হবে।

আজ সকালে বাসার দরজা খুলতেই একটি ছোট্ট প্যাকেট পেলাম। একটি অনলাইন কৃষিপণ্য বিক্রয়কারী গ্রুপ তাদের পরিচিতি ও পণ্য তালিকাসহ ঈদ উপহার হিসাবে একটি সুদৃশ্য মাস্ক রেখে গেছে। আমি চমৎকৃত হলাম। নতুন ভাবনা মাথায় এলো। তাইতো! মাস্ক পরা আন্দোলনের অংশ হিসাবে ঈদ উপলক্ষ্যে আমরা মাস্ক উপহার দেওয়ার স্লোগান তুলতে পারি। এতে মাস্কের প্রতি অনেকেরই সতর্কতা ও আকর্ষণ তৈরি হতে পারে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন