করোনা মোকাবিলা ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ
jugantor
করোনা মোকাবিলা ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ

  ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ  

১১ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাসান হাফিজুর রহমানের একটি কবিতার অংশবিশেষ এ রকম- ‘এখন রুদ্ধশ্বাসে বলা; কী করে এসেছি এখানে; এসেছি ঠিক, জানি না কীভাবে; জীবন একইসঙ্গে জ্বরতপ্ত আর ঊষর; অপেক্ষাই শুধু; অপেক্ষা কিছু একটার জন্য; অপেক্ষা করলেই সেটা আসবে; তারপর; কিছুই না, আবার অপেক্ষা?’

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে শেষ হওয়ার অপেক্ষায় পথ গুনছি সবাই। এ লকডাউনে ঢাকার গলি পথে বের হলেই দেখা যায়, রিকশাওয়ালার অপেক্ষা, হকারদের অপেক্ষা, ছোট্ট তরকারির দোকানদারের অপেক্ষা। করোনা মহামারি শেষের অপেক্ষা। কবে পাব মুক্তি? অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শীতকালে মনে হলো শেষ হলো, কিন্তু না। এখন আবার অপেক্ষা লকডাউন শেষের অপেক্ষা।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা জানেন না বা এখনো বলতে পারেনি কবে শেষ হবে এ মহামারি। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে। ফলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি মিলবে। প্রশ্ন হলো, চলমান মহামারির মধ্যে কীভাবে ঘটবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ?

প্রধানত, তিনটি মূল শর্ত পূরণ করতে হয় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলারের শর্ত বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পূরণ করেছে। দ্বিতীয় শর্ত, মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশে হতে লাগে ৬৬ পয়েন্ট। সেখানে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৭৫.৩ পয়েন্ট অর্জন করেছে?

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোন দেশ ৩৬-এর বেশি হলে তাকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেওয়া হয় না। ৩২-এ আসার পর থেকে নিচের দিকে যত কম হবে তত ভালো। বাংলাদেশের এ পয়েন্ট এখন প্রায় ২৫। সুতরাং করোনা মহামারির মধ্যেও এ ধারা ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

এসব উন্নয়নের কারণেই পৃথিবীর বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ষাঁড় ঊল্লেখ করেছে। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? এখানে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে আমাদের দেশের মানবসম্পদ। এটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা বাংলায় জনমিতিক লভ্যাংশ।

একটি দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ যদি কর্মহীন জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে এ অবস্থাকে জনমিতিক লভ্যাংশ বলে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে দেশটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট পাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিপোর্ট অনুসারে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ মানুষের বয়স ছিল এ সীমার মধ্যে যা ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশ। কিন্তু জনমিতিক লভ্যাংশের এ সুবিধা মাত্র ২০৩৮ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে এবং তারপর কমতে থাকবে।

সুতরাং এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে না পারলে আরও অনেক পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ইতঃপূর্বে সিঙ্গাপুর, বা দক্ষিণ কোরিয়া তাদের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। কিন্তু নাইজেরিয়া কাজে লাগাতে পারেনি। সুতরাং ভাবতে হবে কীভাবে করোনা মহামারির মধ্যেও জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানো এবং উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ধারা ধরে রাখা সম্ভব?

২.

লকডাউনের জন্ম ৫২৭-৫৬৫ খ্রি. জাস্টিয়ান যুগে প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তৎকালীন সময়ে মানুষ জানত না কীভাবে রোগটি ছড়ায়। ফলে এটাই ছিল নিরাপদ থাকার একমাত্র পদ্ধতি। কিন্তু এই পুঁজিবাদের যুগে জনমিতিক লভ্যাংশের একটি দেশে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এত কর্মক্ষম মানুষকে আটকে রাখার কাজটি বেশ কঠিন। আমাদের দেশে অনেকে করোনায় মৃত্যু বা আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে কাজ করে খেয়ে বেঁচে থাকাটাকে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করছে।

এ ছাড়াও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা যায়, ইতোমধ্যে দুই কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। ফলে লকডাউন মানতে গত বছর মানুষ যতটা আন্তরিক ছিল, এবারে তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। আমাদের আরও কিছুদিন করোনা মহামারির মধ্যে বসবাস করতে হবে-এটা ধরে নিয়েই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে অনেক দেশ সফলভাবে করোনা মোকাবিলা করেছে।

জাপানি পদ্ধতি : কেউ মনে করতে পারে, জাপান যেহেতু অনেক উন্নত; তারা যে পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশে সেটা সম্ভব নয়। জাপানে সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র তিনটি নির্দেশনা ছিল। সে দেশের মানুষ সেটা মেনে নিয়েছে এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। প্রথম নির্দেশনা ছিল মাস্ক পরা। ওই দেশের মানুষের সামান্য হাঁচি দিলেই নিয়মিত মাস্ক পরে থাকে। এ অভ্যাস তাদের গড়ে উঠেছে ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর পর থেকে। এমনিতেই তারা কমবেশি মাস্ক ব্যবহার করে থাকে।

তবে কোনোরকম জ্বর বা হাঁচির লক্ষণ দেখা দিলেই তারা বিশেষভাবে সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। জাপানে মাস্ক না-পরা রীতিমতো সামাজিক অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে। জাপানে দ্বিতীয় নিয়ম মানতে বলা হয়েছে, যথানিয়মে হাত ধুতে। অবশ্য সদ্য প্রকাশিত ল্যানসেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো বস্তু থেকে করোনা ছড়াচ্ছে না। তাই হাত ধোয়া কতটা জরুরি তা নতুন করে ভাবতে হবে।

দেশটিতে তৃতীয় নিয়ম মানতে বলা হল- ভিড় এড়িয়ে ৩ থেকে ৬ ফুট দূরত্ব মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এটিও বর্তমানে ভুল প্রমাণ করেছে আমেরিকার সাময়িকী পিএনএস। তাদের ভাষ্যমতে, এর চেয়েও দূরে যেতে পারে এ ভাইরাস। এটি নির্ভর করে বায়ু প্রবাহ ও জনঘনত্বের ওপর। অবশ্য আমাদের দেশের বাস্তবতায় দূরত্ব মেনে চলাচলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

দক্ষিণ কোরীয় পদ্ধতি : তিনটি টি-এর ওপর ভিত্তি করে তারা করোনা মোকাবিলা করেছে। টেস্ট, ট্রেস এবং ট্রিটমেন্ট। প্রতিদিন ৬০০ অধিক ল্যাবে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করেছে দেশটি। যারা আক্রান্ত তাদের দ্রুত আলাদা করা হয়েছে। এর পর যাদের অবস্থা তুলনামূলক খারাপ তাদের দ্রুত ট্রিটমেন্ট প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বাইরে থেকে আসা যাত্রীদের পরীক্ষা করে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা।

৩.

প্রশ্ন হলো, আমরা কী করতে পারি? এটা ঠিক যে, রিয়েল টাইম পিসিআর পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু এ পদ্ধতিতে সময়, অর্থ ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, অনেকেই পরীক্ষা করাতে পারছে না। ফলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। রিয়েল টাইম পিসিআর-এ সময় বেশি লাগার কারণে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয় এবং ৩৬টি জেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হয়। অ্যান্টিজেন কীট অতটা সেনসিটিভ না হলেও সময় লাগে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট; খরচ হয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মতো। এ ছাড়াও পরীক্ষা করতে তেমন অভিজ্ঞতার দরকার হয় না। ফলে থানা পর্যায়েও এটি ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি, তিন স্তরের কাপড়ের মাস্ক সবচেয়ে ভালো। এই মাস্ক এন-৯৫ এর মতো প্রায় ৯৫ শতাংশ করোনা প্রতিরোধ করে। যদিও রাস্তায়ই সার্জিকাল মাস্কই বেশি দেখা যায়। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ সত্যিকার অর্থে মানতে হবে। আমেরিকান সিডিসির তথ্যমতে, একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ১০-১৫ মিনিট মাস্কবিহীন থাকলেই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জানা গেছে, করোনা বাতাসের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে। ভালো ভেন্টিলেশন হলে কম ছড়াবে।

এতেই স্পষ্ট মাস্ক কতটা জরুরি। উপসর্গবিহীন ব্যক্তিরাই ৫৯ ভাগ রোগ ছড়ায়। সুতরাং বাতাস যে প্রধান মাধ্যম তা প্রমাণিত। তবে এটি কোনো গবেষণার তথ্য নয়। ফলে পুরাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কাজেই মাস্কই পারে পূর্ণ মোকাবিলা করতে- যদি সঠিক নিয়মে তা পরা হয়। এখনো অনেকে জানে না, নাক আর মুখই হলো করোনা শরীরে প্রবেশের প্রধান দরজা।

যেহেতু আমরা জানি না টিকা ঠিক কতদিন কাজ করবে, ফলে নিজেদের দেশে টিকা তৈরি করতে হবে। কারণ সবাইকে টিকার ব্যবস্থা করতে হবে, নতুন ধরনের করোনা এলেও যাতে আমরা সমস্যায় না পড়ি। উপসংহারে বলব, পরীক্ষা, মাস্ক আর টিকা এ তিনটি হলো বাংলাদেশের জন্য করোনা থেকে মুক্তির উত্তম উপায়।

ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ; সহযোগী পরিচালক, জেনোম সেন্টার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

করোনা মোকাবিলা ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ

 ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ 
১১ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাসান হাফিজুর রহমানের একটি কবিতার অংশবিশেষ এ রকম- ‘এখন রুদ্ধশ্বাসে বলা; কী করে এসেছি এখানে; এসেছি ঠিক, জানি না কীভাবে; জীবন একইসঙ্গে জ্বরতপ্ত আর ঊষর; অপেক্ষাই শুধু; অপেক্ষা কিছু একটার জন্য; অপেক্ষা করলেই সেটা আসবে; তারপর; কিছুই না, আবার অপেক্ষা?’

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে শেষ হওয়ার অপেক্ষায় পথ গুনছি সবাই। এ লকডাউনে ঢাকার গলি পথে বের হলেই দেখা যায়, রিকশাওয়ালার অপেক্ষা, হকারদের অপেক্ষা, ছোট্ট তরকারির দোকানদারের অপেক্ষা। করোনা মহামারি শেষের অপেক্ষা। কবে পাব মুক্তি? অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শীতকালে মনে হলো শেষ হলো, কিন্তু না। এখন আবার অপেক্ষা লকডাউন শেষের অপেক্ষা।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা জানেন না বা এখনো বলতে পারেনি কবে শেষ হবে এ মহামারি। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে। ফলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি মিলবে। প্রশ্ন হলো, চলমান মহামারির মধ্যে কীভাবে ঘটবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ?

প্রধানত, তিনটি মূল শর্ত পূরণ করতে হয় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য। তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ শর্ত পূরণ করে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশ হতে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলারের শর্ত বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পূরণ করেছে। দ্বিতীয় শর্ত, মানবসম্পদ সূচকে উন্নয়নশীল দেশে হতে লাগে ৬৬ পয়েন্ট। সেখানে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৭৫.৩ পয়েন্ট অর্জন করেছে?

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোন দেশ ৩৬-এর বেশি হলে তাকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেওয়া হয় না। ৩২-এ আসার পর থেকে নিচের দিকে যত কম হবে তত ভালো। বাংলাদেশের এ পয়েন্ট এখন প্রায় ২৫। সুতরাং করোনা মহামারির মধ্যেও এ ধারা ধরে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।

এসব উন্নয়নের কারণেই পৃথিবীর বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ষাঁড় ঊল্লেখ করেছে। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? এখানে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে আমাদের দেশের মানবসম্পদ। এটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা বাংলায় জনমিতিক লভ্যাংশ।

একটি দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ যদি কর্মহীন জনসংখ্যার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে এ অবস্থাকে জনমিতিক লভ্যাংশ বলে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ যদি কর্মক্ষম হয় তাহলে দেশটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট পাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিপোর্ট অনুসারে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ মানুষের বয়স ছিল এ সীমার মধ্যে যা ২০২০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশ। কিন্তু জনমিতিক লভ্যাংশের এ সুবিধা মাত্র ২০৩৮ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে এবং তারপর কমতে থাকবে।

সুতরাং এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে না পারলে আরও অনেক পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ইতঃপূর্বে সিঙ্গাপুর, বা দক্ষিণ কোরিয়া তাদের এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। কিন্তু নাইজেরিয়া কাজে লাগাতে পারেনি। সুতরাং ভাবতে হবে কীভাবে করোনা মহামারির মধ্যেও জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানো এবং উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ধারা ধরে রাখা সম্ভব?

২.

লকডাউনের জন্ম ৫২৭-৫৬৫ খ্রি. জাস্টিয়ান যুগে প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তৎকালীন সময়ে মানুষ জানত না কীভাবে রোগটি ছড়ায়। ফলে এটাই ছিল নিরাপদ থাকার একমাত্র পদ্ধতি। কিন্তু এই পুঁজিবাদের যুগে জনমিতিক লভ্যাংশের একটি দেশে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এত কর্মক্ষম মানুষকে আটকে রাখার কাজটি বেশ কঠিন। আমাদের দেশে অনেকে করোনায় মৃত্যু বা আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে কাজ করে খেয়ে বেঁচে থাকাটাকে বেশি প্রয়োজনীয় মনে করছে।

এ ছাড়াও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা যায়, ইতোমধ্যে দুই কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। ফলে লকডাউন মানতে গত বছর মানুষ যতটা আন্তরিক ছিল, এবারে তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। আমাদের আরও কিছুদিন করোনা মহামারির মধ্যে বসবাস করতে হবে-এটা ধরে নিয়েই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে অনেক দেশ সফলভাবে করোনা মোকাবিলা করেছে।

জাপানি পদ্ধতি : কেউ মনে করতে পারে, জাপান যেহেতু অনেক উন্নত; তারা যে পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশে সেটা সম্ভব নয়। জাপানে সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র তিনটি নির্দেশনা ছিল। সে দেশের মানুষ সেটা মেনে নিয়েছে এবং অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। প্রথম নির্দেশনা ছিল মাস্ক পরা। ওই দেশের মানুষের সামান্য হাঁচি দিলেই নিয়মিত মাস্ক পরে থাকে। এ অভ্যাস তাদের গড়ে উঠেছে ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর পর থেকে। এমনিতেই তারা কমবেশি মাস্ক ব্যবহার করে থাকে।

তবে কোনোরকম জ্বর বা হাঁচির লক্ষণ দেখা দিলেই তারা বিশেষভাবে সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। জাপানে মাস্ক না-পরা রীতিমতো সামাজিক অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে। জাপানে দ্বিতীয় নিয়ম মানতে বলা হয়েছে, যথানিয়মে হাত ধুতে। অবশ্য সদ্য প্রকাশিত ল্যানসেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো বস্তু থেকে করোনা ছড়াচ্ছে না। তাই হাত ধোয়া কতটা জরুরি তা নতুন করে ভাবতে হবে।

দেশটিতে তৃতীয় নিয়ম মানতে বলা হল- ভিড় এড়িয়ে ৩ থেকে ৬ ফুট দূরত্ব মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এটিও বর্তমানে ভুল প্রমাণ করেছে আমেরিকার সাময়িকী পিএনএস। তাদের ভাষ্যমতে, এর চেয়েও দূরে যেতে পারে এ ভাইরাস। এটি নির্ভর করে বায়ু প্রবাহ ও জনঘনত্বের ওপর। অবশ্য আমাদের দেশের বাস্তবতায় দূরত্ব মেনে চলাচলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

দক্ষিণ কোরীয় পদ্ধতি : তিনটি টি-এর ওপর ভিত্তি করে তারা করোনা মোকাবিলা করেছে। টেস্ট, ট্রেস এবং ট্রিটমেন্ট। প্রতিদিন ৬০০ অধিক ল্যাবে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করেছে দেশটি। যারা আক্রান্ত তাদের দ্রুত আলাদা করা হয়েছে। এর পর যাদের অবস্থা তুলনামূলক খারাপ তাদের দ্রুত ট্রিটমেন্ট প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বাইরে থেকে আসা যাত্রীদের পরীক্ষা করে আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা।

৩.

প্রশ্ন হলো, আমরা কী করতে পারি? এটা ঠিক যে, রিয়েল টাইম পিসিআর পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু এ পদ্ধতিতে সময়, অর্থ ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, অনেকেই পরীক্ষা করাতে পারছে না। ফলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। রিয়েল টাইম পিসিআর-এ সময় বেশি লাগার কারণে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে অ্যান্টিজেন পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয় এবং ৩৬টি জেলায় অ্যান্টিজেন পরীক্ষা শুরু হয়। অ্যান্টিজেন কীট অতটা সেনসিটিভ না হলেও সময় লাগে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট; খরচ হয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মতো। এ ছাড়াও পরীক্ষা করতে তেমন অভিজ্ঞতার দরকার হয় না। ফলে থানা পর্যায়েও এটি ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি, তিন স্তরের কাপড়ের মাস্ক সবচেয়ে ভালো। এই মাস্ক এন-৯৫ এর মতো প্রায় ৯৫ শতাংশ করোনা প্রতিরোধ করে। যদিও রাস্তায়ই সার্জিকাল মাস্কই বেশি দেখা যায়। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ সত্যিকার অর্থে মানতে হবে। আমেরিকান সিডিসির তথ্যমতে, একজন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ১০-১৫ মিনিট মাস্কবিহীন থাকলেই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জানা গেছে, করোনা বাতাসের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে। ভালো ভেন্টিলেশন হলে কম ছড়াবে।

এতেই স্পষ্ট মাস্ক কতটা জরুরি। উপসর্গবিহীন ব্যক্তিরাই ৫৯ ভাগ রোগ ছড়ায়। সুতরাং বাতাস যে প্রধান মাধ্যম তা প্রমাণিত। তবে এটি কোনো গবেষণার তথ্য নয়। ফলে পুরাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কাজেই মাস্কই পারে পূর্ণ মোকাবিলা করতে- যদি সঠিক নিয়মে তা পরা হয়। এখনো অনেকে জানে না, নাক আর মুখই হলো করোনা শরীরে প্রবেশের প্রধান দরজা।

যেহেতু আমরা জানি না টিকা ঠিক কতদিন কাজ করবে, ফলে নিজেদের দেশে টিকা তৈরি করতে হবে। কারণ সবাইকে টিকার ব্যবস্থা করতে হবে, নতুন ধরনের করোনা এলেও যাতে আমরা সমস্যায় না পড়ি। উপসংহারে বলব, পরীক্ষা, মাস্ক আর টিকা এ তিনটি হলো বাংলাদেশের জন্য করোনা থেকে মুক্তির উত্তম উপায়।

ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ; সহযোগী পরিচালক, জেনোম সেন্টার, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন