এদেশে সাম্প্রদায়িকতা কলকে পাবে না
jugantor
এদেশে সাম্প্রদায়িকতা কলকে পাবে না

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৮ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালের প্রত্যক্ষ ভয়ংকর সংকটের সুযোগে অন্ধকারের শক্তি পরোক্ষভাবে ভিন্ন সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। আর সেটি হচ্ছে সমাজে-রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা। এ ঘাপটিমারা শক্তি মনে করছে দেশবাসী ও সরকার করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত; তাই অন্যদিকে সক্রিয় দৃষ্টি তেমনভাবে রাখতে পারবে না। ফলে এদের চেষ্টা থাকবে সংগোপনে সংগঠিত হওয়ার।

অবশ্য প্রশাসন যে খুব নির্লিপ্ত, তা বলা যাবে না। সম্প্রতি কৃতকর্মের দায় মেটাতে হেফাজতে ইসলামের অনেক উগ্রবাদী নেতা এখন কঠিন চাপে পড়েছেন। গোপন জঙ্গি সংগঠনের কর্মীদের আটকের ঘটনাও ঘটছে।

তবে সব মিলিয়ে অনেকদিন থেকে সময়টা খুব ভালো যাচ্ছে বলা যাবে না। এ উপমহাদেশে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী পক্ষ বারবার কৌশলে ধর্ম ব্যবহার করে এবং ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তৈরি করেছে সংঘাতময় পরিস্থিতি। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। অবশ্য ক্ষমতার রাজনীতি যুগ যুগ ধরেই এ দেশের মানুষকে ধর্মের মোড়কে ব্যবহার করতে চেয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, নিকট প্রতিবেশী বিশাল ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা উভয় দেশের জন্যই জরুরি। বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলমান আর ভারতে হিন্দু। এ বাস্তবতাটিকে যুগ যুগ ধরে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী সুবিধাবাদী পক্ষ। ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও মোদি সরকারের এ আমলে হিন্দুত্ববাদিতা প্রবল আকার ধারণ করেছে।

ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর গ্রাস কম নয়। এ আমলে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোয় অধিকাংশ নাটকই হচ্ছে ধর্ম প্রভাবিত। আমাদের দেশে যেমন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিজেদের সাংগঠনিক কর্মভূমিকা দিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তেমন ভূমিকা রাখেনি বা রাখছে না, একই অবস্থা ভারতের ক্ষেত্রেও। ফলে ধার্মিক মানুষের বদলে ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

খুবই সংগত যে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এদেশের মানুষ আরব থেকে উৎসারিত ও বিস্তার লাভ করা ইসলামের সরল-শান্তিময় রূপটিকেই গ্রহণ করেছে। সুবিধাবাদীদের কট্টর ধারা বজায় রাখা শেষ পর্যন্ত এ দেশে সম্ভব নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলাম ধর্ম কট্টর নয়। এ ধর্মে স্থিতিস্থাপকতার সুযোগ আছে বলেই বিশ্বজুড়ে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। আমি মনে করি, ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে এটি মুসলিম সমাজের সৌন্দর্য।

বাংলায় মরমিবাদী সুফিসাধকরা ইসলাম প্রচারে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা ছিলেন সমন্বয়বাদী। এদেশের অধিকাংশ মুসলমান ধর্মান্তরিত। তাই সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের স্বাভাবিক ধারা অস্বীকার করতে পারেনি বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতি। রাজনৈতিক কারণেই বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলার তথা ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু তা স্থায়ীভাবে বিষবাষ্প ছড়াতে পারেনি।

বাংলার মুসলমান নেতৃত্ব একবার হোঁচট খেয়েছিল ১৯০৫ সালে। যখন ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার আদেশের কারণে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। পূর্ববাংলার মুসলিম নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন দিয়েছিল অনুন্নত পূর্ববঙ্গের উন্নতির আশায়। আর কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গকে ব্রিটিশ শাসকদের কূটকৌশল হিসাবে বিবেচনা করে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।

এ সময় ভারতীয়দের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন ছিল সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কংগ্রেসকে বিবেচনা করা হতো ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন হিসাবে। তাই সংগত কারণেই পূর্ববাংলার মুসলিম নেতারা আশা করেছিলেন কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা দলটির প্রতিক্রিয়া জানাবেন মুসলিম নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর। কিন্তু সে অবকাশ না দিয়ে কংগ্রেস নেতারা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দলটির অবস্থানের কথা জানিয়ে দিল। এতে হতাশ হলেন পূর্ববাংলার মুসলিম নেতারা। তারা কংগ্রেসকে আর সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ভাবতে পারলেন না।

ফলে নিজ সম্প্রদায়ের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য নবাব স্যার সলিমুল্লাহসহ মুসলমান নেতারা ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। এসবের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বাংলায় এবং পরে ভারতে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে ফাটল ধরে। ব্রিটিশ শাসকরা ভারত ছাড়ার আগে মুসলিম নেতৃত্ব নিজ সম্প্রদায়ের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে ১৯৪০-এ লাহোর প্রস্তাব প্রস্তুত করে।

একপর্যায়ে পাকিস্তান অর্জনের জন্য আন্দোলনে নামতে হয়। এতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরও নাজুক হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা উসকে দেয় সংকট। প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৬-এ কলকাতায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তা ছড়িয়ে পড়ে বিহার, ঢাকা, নোয়াখালীসহ নানা অঞ্চলে।

কিন্তু এ দাঙ্গায় সাধারণ মানুষ তেমন সম্পৃক্ত হয়নি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাবাদীরাই বিভিন্ন সময়ে দাঙ্গা বাধায় এবং উসকে দেয়। এসব চক্র কিন্তু এখনো থেমে নেই। রাজনৈতিক উৎস থেকে এর উৎসারণ হলেও অনেকে পারস্পরিক জানা-শোনার অজ্ঞতা এবং বদ্ধবুদ্ধির কারণে সম্প্রীতির বদলে দূরত্ব তৈরি করেন।

আমি ১৯৯২-এর দিকে গবেষণার কারণে কয়েক বছর কলকাতায় ছিলাম। সেসময় কোনো কোনো সংকট আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যখন কলকাতার অনেক সুহৃদ আন্তরিকতার সঙ্গে সতর্ক করে দিতেন অমুক অমুক অঞ্চলে যখন যাবেন, তখন নিজের ধর্মপরিচয় অহেতুক না জানানোই ভালো। শুনে আমি অবাক হতাম। বাংলাদেশে তো এমন অবস্থার কথা কল্পনাও করা যায় না।

বন্ধুর মতোই সব সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করে। একে অপরে প্রত্যেকের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সামাজিক উৎসব হিসাবে গণ্য করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কোনো কোনো পক্ষ যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তৈরি করতে চেষ্টা করে না তেমন নয়; তবে তা বিচ্ছিন্ন উপদ্রব হিসাবেই বিবেচিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের সমর্থন না পেয়ে তা স্তিমিত হয়ে যায়। লোভী-দখলবাজ-টাউটরা সংখ্যালঘু মানুষের সম্পত্তির ওপর কালো থাবা দেয় না তেমন নয়; তবে এসব ঘটনা খুবই হাতেগোনা।

কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, ভার্চুয়াল মাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা চালিয়ে মূর্খ একদল মানুষকে উত্তেজিত করে ভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর হামলে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ভিন্ন ধর্মের ধর্ম মন্দিরে আক্রমণ হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে অনেকের বাড়িঘর ও সম্পদ। এসব অপতৎপরতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনো দেখাবে না।

একদল ঘাপটি মেরে থাকা শকুন বিবেক-বুদ্ধিবিবর্জিত কিছুসংখ্যক মানুষকে উসকে দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তারা এসব অপতৎপরতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের পথ ধরে অতীতে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যাবে এ মাটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে কখনো প্রশ্রয় দেয়নি। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে, ধর্মীয় ভেদবুদ্ধি ছড়িয়ে রাজনীতির মাঠ দখলে নেওয়ার অপচেষ্টা এদেশে কখনো ফলবতী হওয়ার নয়।

সব রাজনৈতিক দলের যার যার দলীয় আদর্শ থাকে। সেই আদর্শের ভিত্তিতেই লক্ষ্য স্থির করে। এ সময়ে ধর্মীয় সাইনবোর্ড দেওয়া অনেক সংগঠনের মুখে না বললেও আচরণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এগিয়ে নেওয়ার মাঠকর্মী এরা।

মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী নব্বই-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কিছুটা সহানুভূতি পেয়ে তাদের পায়ের নিচের মাটি কিছুটা শক্ত করেছিল। পরে বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ বিএনপি এ দলটিকে স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যায় প্রকাশ্যে ভূমিকা রাখা নেতাদের মন্ত্রিপরিষদে জায়গা করে দেওয়ার মহা অন্যায় করেছে বিএনপি।

জামায়াতে ইসলামীকে অনেকে ধর্মভিত্তিক দল বলে থাকে। আমি এতে ভিন্নমত পোষণ করি। ধর্মভিত্তিক দল হলে তার আদর্শ তৈরি হবে নিজ ধর্মের দর্শন অনুসরণে। বাহ্যত জামায়াতে ইসলামীকে ইসলাম অনুসারী দল বলা হয়। কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই দলটি ইসলামকে শুধু লেবাসে রেখেছে আর সরল ধর্মভীরু মানুষকে প্রতারিত করে রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছে। বলা যায়, ধর্মের নামে চরম অধর্মই করে এসেছে দলটি।

এ মুহূর্তে জামায়াত বিপন্ন দশায় রয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক দলও কিছুটা কোণঠাসা। এ দেশের সাধারণ মানুষ জামায়াতকে কখনো গ্রহণ করেনি। সব সময়ের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল দেখলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। জামায়াত এর-ওর ঘাড়ে চেপে স্বর্ণলতা হয়ে বেড়ে উঠতে চেয়েছে। কিন্তু পরগাছারা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়ানোর সুযোগ কখনো পায় না। এ ধারার স্বর্ণলতার বিষাক্ত রস মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে দিতে পারে। এদের হাতে ধর্ম হতে পারে লাঞ্ছিত। কিন্তু সত্যের কাছে পরাজয় মানতেই হয়।

ইসলামি জঙ্গিবাদীরা বিশ্বজুড়ে মানবতাবাদী ও শান্তিবাদী ইসলামকে হত্যা করেছে। বিশ্বজুড়ে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। জঙ্গিবাদীরা কিছুটা বিভ্রান্ত আদর্শের পথে হাঁটে, অন্ধত্ববরণ করে আর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থবাদীদের ইচ্ছাপূরণে মানবাত্মাকে লাঞ্ছিত করে। ধর্মভীরু মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে এরা নিজেদের একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করে।

হেফাজতে ইসলাম দীর্ঘ পরিকল্পনামতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে তাদের ভাবাদর্শের কওমি মাদ্রাসা। সরল শিক্ষার্থীদের মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে দেয়নি। বিবেকের শাসনে চালিত হতে পারছে না এরা। হুজুরদের আদেশে এরা পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আগুনে। আর এ পেশিশক্তির ওপর ভরসা করে হেফাজত নেতারা নিজেদের মহাক্ষমতাশালী ভাবতে থাকেন।

প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ সহজিয়া, মধ্যযুগে সুফি, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ও বাউল ধারা বাঙালি মানসকে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছে। এ কারণে ইতিহাসের শিক্ষা থেকেই বলব, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এদেশের মাটিতে যারা সাম্প্রদায়িক হিংসার রাজনীতি ছড়াতে চায়, তারা সফল হতে পারবে না। কারণ এদেশের মাটি ও মানুষ সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে স্বীকার করে না। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধার্মিক; কিন্তু ধর্মান্ধ নয়।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

এদেশে সাম্প্রদায়িকতা কলকে পাবে না

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৮ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালের প্রত্যক্ষ ভয়ংকর সংকটের সুযোগে অন্ধকারের শক্তি পরোক্ষভাবে ভিন্ন সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। আর সেটি হচ্ছে সমাজে-রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা। এ ঘাপটিমারা শক্তি মনে করছে দেশবাসী ও সরকার করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত; তাই অন্যদিকে সক্রিয় দৃষ্টি তেমনভাবে রাখতে পারবে না। ফলে এদের চেষ্টা থাকবে সংগোপনে সংগঠিত হওয়ার।

অবশ্য প্রশাসন যে খুব নির্লিপ্ত, তা বলা যাবে না। সম্প্রতি কৃতকর্মের দায় মেটাতে হেফাজতে ইসলামের অনেক উগ্রবাদী নেতা এখন কঠিন চাপে পড়েছেন। গোপন জঙ্গি সংগঠনের কর্মীদের আটকের ঘটনাও ঘটছে।

তবে সব মিলিয়ে অনেকদিন থেকে সময়টা খুব ভালো যাচ্ছে বলা যাবে না। এ উপমহাদেশে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী পক্ষ বারবার কৌশলে ধর্ম ব্যবহার করে এবং ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তৈরি করেছে সংঘাতময় পরিস্থিতি। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। অবশ্য ক্ষমতার রাজনীতি যুগ যুগ ধরেই এ দেশের মানুষকে ধর্মের মোড়কে ব্যবহার করতে চেয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, নিকট প্রতিবেশী বিশাল ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা উভয় দেশের জন্যই জরুরি। বিশেষ করে যেখানে বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলমান আর ভারতে হিন্দু। এ বাস্তবতাটিকে যুগ যুগ ধরে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী সুবিধাবাদী পক্ষ। ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হলেও মোদি সরকারের এ আমলে হিন্দুত্ববাদিতা প্রবল আকার ধারণ করেছে।

ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর গ্রাস কম নয়। এ আমলে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোয় অধিকাংশ নাটকই হচ্ছে ধর্ম প্রভাবিত। আমাদের দেশে যেমন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিজেদের সাংগঠনিক কর্মভূমিকা দিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তেমন ভূমিকা রাখেনি বা রাখছে না, একই অবস্থা ভারতের ক্ষেত্রেও। ফলে ধার্মিক মানুষের বদলে ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

খুবই সংগত যে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এদেশের মানুষ আরব থেকে উৎসারিত ও বিস্তার লাভ করা ইসলামের সরল-শান্তিময় রূপটিকেই গ্রহণ করেছে। সুবিধাবাদীদের কট্টর ধারা বজায় রাখা শেষ পর্যন্ত এ দেশে সম্ভব নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলাম ধর্ম কট্টর নয়। এ ধর্মে স্থিতিস্থাপকতার সুযোগ আছে বলেই বিশ্বজুড়ে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। আমি মনে করি, ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে এটি মুসলিম সমাজের সৌন্দর্য।

বাংলায় মরমিবাদী সুফিসাধকরা ইসলাম প্রচারে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন। তারা ছিলেন সমন্বয়বাদী। এদেশের অধিকাংশ মুসলমান ধর্মান্তরিত। তাই সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের স্বাভাবিক ধারা অস্বীকার করতে পারেনি বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতি। রাজনৈতিক কারণেই বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলার তথা ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু তা স্থায়ীভাবে বিষবাষ্প ছড়াতে পারেনি।

বাংলার মুসলমান নেতৃত্ব একবার হোঁচট খেয়েছিল ১৯০৫ সালে। যখন ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার আদেশের কারণে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। পূর্ববাংলার মুসলিম নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন দিয়েছিল অনুন্নত পূর্ববঙ্গের উন্নতির আশায়। আর কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গকে ব্রিটিশ শাসকদের কূটকৌশল হিসাবে বিবেচনা করে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।

এ সময় ভারতীয়দের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন ছিল সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কংগ্রেসকে বিবেচনা করা হতো ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন হিসাবে। তাই সংগত কারণেই পূর্ববাংলার মুসলিম নেতারা আশা করেছিলেন কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা দলটির প্রতিক্রিয়া জানাবেন মুসলিম নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর। কিন্তু সে অবকাশ না দিয়ে কংগ্রেস নেতারা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দলটির অবস্থানের কথা জানিয়ে দিল। এতে হতাশ হলেন পূর্ববাংলার মুসলিম নেতারা। তারা কংগ্রেসকে আর সম্প্রদায় নিরপেক্ষ ভাবতে পারলেন না।

ফলে নিজ সম্প্রদায়ের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য নবাব স্যার সলিমুল্লাহসহ মুসলমান নেতারা ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। এসবের প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে বাংলায় এবং পরে ভারতে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে ফাটল ধরে। ব্রিটিশ শাসকরা ভারত ছাড়ার আগে মুসলিম নেতৃত্ব নিজ সম্প্রদায়ের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে ১৯৪০-এ লাহোর প্রস্তাব প্রস্তুত করে।

একপর্যায়ে পাকিস্তান অর্জনের জন্য আন্দোলনে নামতে হয়। এতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরও নাজুক হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদীরা উসকে দেয় সংকট। প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৬-এ কলকাতায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তা ছড়িয়ে পড়ে বিহার, ঢাকা, নোয়াখালীসহ নানা অঞ্চলে।

কিন্তু এ দাঙ্গায় সাধারণ মানুষ তেমন সম্পৃক্ত হয়নি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাবাদীরাই বিভিন্ন সময়ে দাঙ্গা বাধায় এবং উসকে দেয়। এসব চক্র কিন্তু এখনো থেমে নেই। রাজনৈতিক উৎস থেকে এর উৎসারণ হলেও অনেকে পারস্পরিক জানা-শোনার অজ্ঞতা এবং বদ্ধবুদ্ধির কারণে সম্প্রীতির বদলে দূরত্ব তৈরি করেন।

আমি ১৯৯২-এর দিকে গবেষণার কারণে কয়েক বছর কলকাতায় ছিলাম। সেসময় কোনো কোনো সংকট আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যখন কলকাতার অনেক সুহৃদ আন্তরিকতার সঙ্গে সতর্ক করে দিতেন অমুক অমুক অঞ্চলে যখন যাবেন, তখন নিজের ধর্মপরিচয় অহেতুক না জানানোই ভালো। শুনে আমি অবাক হতাম। বাংলাদেশে তো এমন অবস্থার কথা কল্পনাও করা যায় না।

বন্ধুর মতোই সব সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করে। একে অপরে প্রত্যেকের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সামাজিক উৎসব হিসাবে গণ্য করে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কোনো কোনো পক্ষ যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তৈরি করতে চেষ্টা করে না তেমন নয়; তবে তা বিচ্ছিন্ন উপদ্রব হিসাবেই বিবেচিত হয়েছে। সাধারণ মানুষের সমর্থন না পেয়ে তা স্তিমিত হয়ে যায়। লোভী-দখলবাজ-টাউটরা সংখ্যালঘু মানুষের সম্পত্তির ওপর কালো থাবা দেয় না তেমন নয়; তবে এসব ঘটনা খুবই হাতেগোনা।

কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, ভার্চুয়াল মাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা চালিয়ে মূর্খ একদল মানুষকে উত্তেজিত করে ভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর হামলে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ভিন্ন ধর্মের ধর্ম মন্দিরে আক্রমণ হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে অনেকের বাড়িঘর ও সম্পদ। এসব অপতৎপরতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনো দেখাবে না।

একদল ঘাপটি মেরে থাকা শকুন বিবেক-বুদ্ধিবিবর্জিত কিছুসংখ্যক মানুষকে উসকে দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তারা এসব অপতৎপরতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের পথ ধরে অতীতে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যাবে এ মাটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে কখনো প্রশ্রয় দেয়নি। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে, ধর্মীয় ভেদবুদ্ধি ছড়িয়ে রাজনীতির মাঠ দখলে নেওয়ার অপচেষ্টা এদেশে কখনো ফলবতী হওয়ার নয়।

সব রাজনৈতিক দলের যার যার দলীয় আদর্শ থাকে। সেই আদর্শের ভিত্তিতেই লক্ষ্য স্থির করে। এ সময়ে ধর্মীয় সাইনবোর্ড দেওয়া অনেক সংগঠনের মুখে না বললেও আচরণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে। দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র এগিয়ে নেওয়ার মাঠকর্মী এরা।

মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী নব্বই-পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কিছুটা সহানুভূতি পেয়ে তাদের পায়ের নিচের মাটি কিছুটা শক্ত করেছিল। পরে বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ বিএনপি এ দলটিকে স্বাভাবিকভাবে রাজনীতি করার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যায় প্রকাশ্যে ভূমিকা রাখা নেতাদের মন্ত্রিপরিষদে জায়গা করে দেওয়ার মহা অন্যায় করেছে বিএনপি।

জামায়াতে ইসলামীকে অনেকে ধর্মভিত্তিক দল বলে থাকে। আমি এতে ভিন্নমত পোষণ করি। ধর্মভিত্তিক দল হলে তার আদর্শ তৈরি হবে নিজ ধর্মের দর্শন অনুসরণে। বাহ্যত জামায়াতে ইসলামীকে ইসলাম অনুসারী দল বলা হয়। কিন্তু জন্মলগ্ন থেকেই দলটি ইসলামকে শুধু লেবাসে রেখেছে আর সরল ধর্মভীরু মানুষকে প্রতারিত করে রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছে। বলা যায়, ধর্মের নামে চরম অধর্মই করে এসেছে দলটি।

এ মুহূর্তে জামায়াত বিপন্ন দশায় রয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক দলও কিছুটা কোণঠাসা। এ দেশের সাধারণ মানুষ জামায়াতকে কখনো গ্রহণ করেনি। সব সময়ের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল দেখলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। জামায়াত এর-ওর ঘাড়ে চেপে স্বর্ণলতা হয়ে বেড়ে উঠতে চেয়েছে। কিন্তু পরগাছারা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়ানোর সুযোগ কখনো পায় না। এ ধারার স্বর্ণলতার বিষাক্ত রস মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে দিতে পারে। এদের হাতে ধর্ম হতে পারে লাঞ্ছিত। কিন্তু সত্যের কাছে পরাজয় মানতেই হয়।

ইসলামি জঙ্গিবাদীরা বিশ্বজুড়ে মানবতাবাদী ও শান্তিবাদী ইসলামকে হত্যা করেছে। বিশ্বজুড়ে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। জঙ্গিবাদীরা কিছুটা বিভ্রান্ত আদর্শের পথে হাঁটে, অন্ধত্ববরণ করে আর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থবাদীদের ইচ্ছাপূরণে মানবাত্মাকে লাঞ্ছিত করে। ধর্মভীরু মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে এরা নিজেদের একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করে।

হেফাজতে ইসলাম দীর্ঘ পরিকল্পনামতো দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে তাদের ভাবাদর্শের কওমি মাদ্রাসা। সরল শিক্ষার্থীদের মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে দেয়নি। বিবেকের শাসনে চালিত হতে পারছে না এরা। হুজুরদের আদেশে এরা পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আগুনে। আর এ পেশিশক্তির ওপর ভরসা করে হেফাজত নেতারা নিজেদের মহাক্ষমতাশালী ভাবতে থাকেন।

প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ সহজিয়া, মধ্যযুগে সুফি, গৌড়ীয় বৈষ্ণব ও বাউল ধারা বাঙালি মানসকে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছে। এ কারণে ইতিহাসের শিক্ষা থেকেই বলব, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এদেশের মাটিতে যারা সাম্প্রদায়িক হিংসার রাজনীতি ছড়াতে চায়, তারা সফল হতে পারবে না। কারণ এদেশের মাটি ও মানুষ সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে স্বীকার করে না। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধার্মিক; কিন্তু ধর্মান্ধ নয়।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন