দারিদ্র্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা অবদান রাখছে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
দারিদ্র্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা অবদান রাখছে

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

০৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কর্তৃক জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে বেড়েছে উপকারভোগীর সংখ্যা। গত কয়েক অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে একই দৃশ্য দেখা গেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পন্থা। তবে বাংলাদেশে এ কর্মসূচি এখন পর্যন্ত দারিদ্র্য হ্রাসে কাক্সিক্ষত সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। এর কারণগুলো চিহ্নিত করে করণীয় নির্ধারণ করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

২০০৫ সালে পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত ‘Poverty Reduction Strategy Paper (PRSP)’ বা দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রে (পিআরএসপি) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, Social Safety-Nets is defined as actions, policies and programmes that attempt to reduce poverty through direct transfer of resources to the poor, যার অর্থ দাঁড়ায়-সামাজিক নিরাপত্তা বলতে দারিদ্র্য হ্রাসে গরিবদের কাছে সরাসরি সম্পদ হস্তান্তরে গৃহীত কার‌্যাবলি, নীতি ও কর্মসূচিকে বোঝায়।

দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যারা সরাসরি উপকারভোগী তাদের মধ্যে রয়েছেন-গরিব/অতি গরিব প্রবীণ ব্যক্তি, গরিব/অতি গরিব বিধবা/স্বামী নিগৃহীতা মহিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রী, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, চা শ্রমিক, ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগী এবং কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার।

উপর্যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির উপকারভোগীদের মধ্যে প্রবীণ ভাতাভোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন : ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত গরিব/অতি গরিব প্রবীণের সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বৃদ্ধি পায় ৪৪ লাখে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির নতুন ৫ লাখ জনকে এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত করায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ লাখে।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে ৮ লাখ প্রবীণকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করায় তাদের সংখ্যা দাঁড়াল ৫৭ লাখে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এ শ্রেণির ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ৩ লাখ বেড়ে ১৭ লাখে দাঁড়ায়।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির ৩ লাখ ৫০ হাজার জনকে কর্মসূচির আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্তে ভাতাভোগীর সংখ্যা উন্নীত হয় ২০ লাখ ৫০ হাজারে। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির ৪ লাখ ২৫ হাজার জনকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে ভাতাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৪ লাখ ৭৫ হাজারে।

এখন দেখা যাক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লেও দেশে দারিদ্র্যহার কমছে না কেন। তবে সে বিষয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে দেশে সাম্প্রতিককালে দারিদ্র্যহারের ওপর কিছুটা নজর দেওয়া যাক। সরকারি হিসাবে ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর দারিদ্র্য ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কমলেও ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়কালে তা কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে।

২০১৬ সাল-পরবর্তী দুবছরে দারিদ্র্য হ্রাসে পূর্ববর্তী ৬ বছরের গতি (১ দশমিক ২ শতাংশ) বহাল থাকলেও ২০২০ সালে করোনার প্রাদুর্ভাবে এবং সরকারি লকডাউনের কারণে অনেকের চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্যহার বেড়েছে। সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডি, সানেম ইত্যাদি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ওই বছর দেশে দারিদ্র্যহার বেড়ে ৩৫ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশে দাঁড়ায়।

আর বিশ্বব্যাংকের মতে, করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের দারিদ্র্যহার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে (ডেইলি স্টার, ৫ জুন)। এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৬ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

সরকার দারিদ্র্যহার বৃদ্ধির ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বিশ্বব্যাংকের ফাইন্ডিংসের প্রতিবাদ করেছে বলে জানা যায়নি। তাছাড়া বিবিএসের গত সেপ্টেম্বরের এক জরিপে স্বীকার করা হয়েছে, করোনা মহামারির প্রভাবে মানুষের মাসিক আয় ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যহার নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার।’

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে কাক্সিক্ষত সাফল্য বয়ে আনতে না পারার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. সুবিধাভোগীর তুলনায় অর্থ বরাদ্দের স্বল্পতা। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে পরবর্তী ৩ অর্থবছরে গরিব/অতি গরিব প্রবীণ উপকারভোগীর সংখ্যা ১৭ লাখ বৃদ্ধি করা হলেও সে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ শ্রেণির উপকারভোগীর সংখ্যা ৪ লাখ বাড়ানো হলেও তাদের জন্য নতুন করে বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে এ শ্রেণির ৫ লাখ উপকারভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ কোটি টাকা।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে গরিব/অতি গরিব ৮ লাখ প্রবীণ ব্যক্তিকে নতুন করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর আওতাভুক্ত করা হলেও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৮১ কোটি টাকা। এতে তাদের মাথাপিছু মাসিক ভাতার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০১ টাকা। এই শ্রেণির পুরোনো ভাতাভোগীরাও কমবেশি এ হারে মাসিক ভাতা পেয়ে আসছেন। অনুরূপভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গরিব/অতি গরিব বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩ লাখ বাড়িয়ে ১৪ লাখ থেকে ১৭ লাখে উন্নীত করা হলেও এ শ্রেণির ভাতাভোগীদের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ৩ লাখ ৫০ হাজার জনকে এ শ্রেণিতে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে মোট সংখ্যা ২০ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়ায়। নতুন অন্তর্ভুক্ত ৩ লাখ ৫০ হাজার ভাতাভোগীর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২১০ কোটি টাকা। সদ্য ঘোষিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির ৪ লাখ ২৫ হাজার জন নতুন উপকারভোগীর জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ২৫৫ কোটি টাকা।

উপকারভোগীদের, বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের মাথাপিছু বরাদ্দকৃত অর্থ তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম উপকরণের চাহিদা মেটাতে সমর্থ না হওয়ায় তারা ‘দারিদ্র্যচক্র’ থেকে বের হতে পারছেন না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তায় তারা কোনো রকমে বেঁচে থাকছেন। জীবন মানের উন্নতি না হওয়ায় তাদের শ্রেণিগত পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা দরিদ্র্রই থেকে যাচ্ছেন। ফলে দারিদ্র্যহার হ্রাসে তাদের কোনো ভূমিকা থাকছে না।

দুই. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। তারা ভোট, ভোটারের চিন্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি মাথায় রেখে তালিকা তৈরি করেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিরা তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়েন, যার ফলে তারা কর্মসূচির সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভিজিডি কর্মসূচির ২৭ শতাংশ উপকারভোগী গরিব নয়।

প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বৃত্তির সুবিধাপ্রাপ্ত ৪৭ শতাংশ গরিব নয় এবং ত্রুটিপূর্ণ স্বেচ্ছাচারী নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়, অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ছাত্রীদের বৃত্তির প্রায় ২০-৪০ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায় না। সরকারি সমীক্ষার বরাত দিয়ে কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনিয়মের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।

এতে বলা হয়, বয়স্ক ভাতার শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ৫৯ শতাংশ; বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতার ভূমিহীন শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৩ শতাংশ; গরিব না হয়েও ত্রাণ পায় এমন সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৫৬ শতাংশ; ভিজিডির ক্ষেত্রে ভূমিহীন বা সামান্য জমির অধিকারী হওয়ার শর্ত পূরণ করে না এমন উপকারভোগীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ। কর্মসূচির অধীনে সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয় এমন ব্যক্তিরা সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দারিদ্র্যহার হ্রাসে তারা ভূমিকা রাখছেন না।

তিন. দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় হয়। ভিজিডি, ভিজিএফ, টিআর ইত্যাদি কর্মসূচিতে দুর্নীতির খবর প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এসব দুর্নীতি অব্যাহত থাকার কারণে সুবিধাভোগীরা তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থের পুরোটা পান না। এতে জীবনধারণের ন্যূনতম উপকরণাদি সংগ্রহ করতে না পেরে উপকারভোগীরা অনেক সময় খাদ্যনিরাপত্তার হুমকির সম্মুখীন হন, যা দারিদ্র্যহার হ্রাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

দেশে করোনা মহামারির সময়ে দারিদ্র্যহার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এ কর্মসূচির সুফল পেতে এবং দারিদ্র্যহার হ্রাসে এর অবদান বৃদ্ধিতে যা দরকার তা হলো-ক. কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, যাতে একসময় সুবিধাভোগীদের শ্রেণিগত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং গরিবদের কাতার থেকে তাদের উত্তরণ ঘটে। দারিদ্র্য হ্রাসে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

খ. উপকারভোগী বাছাইয়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা, যাতে প্রকৃত গরিব/অতি গরিব ব্যক্তিরাই এ কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। গ. একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হওয়ায় মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় জোরদার করা এবং ঘ. কর্মসূচি বাস্তবায়নে চিহ্নিত দুর্নীতি হ্রাসে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

দারিদ্র্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা অবদান রাখছে

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
০৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কর্তৃক জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে বেড়েছে উপকারভোগীর সংখ্যা। গত কয়েক অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে একই দৃশ্য দেখা গেছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পন্থা। তবে বাংলাদেশে এ কর্মসূচি এখন পর্যন্ত দারিদ্র্য হ্রাসে কাক্সিক্ষত সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। এর কারণগুলো চিহ্নিত করে করণীয় নির্ধারণ করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

২০০৫ সালে পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত ‘Poverty Reduction Strategy Paper (PRSP)’ বা দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রে (পিআরএসপি) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, Social Safety-Nets is defined as actions, policies and programmes that attempt to reduce poverty through direct transfer of resources to the poor, যার অর্থ দাঁড়ায়-সামাজিক নিরাপত্তা বলতে দারিদ্র্য হ্রাসে গরিবদের কাছে সরাসরি সম্পদ হস্তান্তরে গৃহীত কার‌্যাবলি, নীতি ও কর্মসূচিকে বোঝায়।

দেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যারা সরাসরি উপকারভোগী তাদের মধ্যে রয়েছেন-গরিব/অতি গরিব প্রবীণ ব্যক্তি, গরিব/অতি গরিব বিধবা/স্বামী নিগৃহীতা মহিলা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রী, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, চা শ্রমিক, ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগী এবং কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার।

উপর্যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণির উপকারভোগীদের মধ্যে প্রবীণ ভাতাভোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন : ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত গরিব/অতি গরিব প্রবীণের সংখ্যা ছিল ৪০ লাখ, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বৃদ্ধি পায় ৪৪ লাখে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির নতুন ৫ লাখ জনকে এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত করায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ লাখে।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে ৮ লাখ প্রবীণকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করায় তাদের সংখ্যা দাঁড়াল ৫৭ লাখে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এ শ্রেণির ভাতাভোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ৩ লাখ বেড়ে ১৭ লাখে দাঁড়ায়।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির ৩ লাখ ৫০ হাজার জনকে কর্মসূচির আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্তে ভাতাভোগীর সংখ্যা উন্নীত হয় ২০ লাখ ৫০ হাজারে। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির ৪ লাখ ২৫ হাজার জনকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে ভাতাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২৪ লাখ ৭৫ হাজারে।

এখন দেখা যাক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লেও দেশে দারিদ্র্যহার কমছে না কেন। তবে সে বিষয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে দেশে সাম্প্রতিককালে দারিদ্র্যহারের ওপর কিছুটা নজর দেওয়া যাক। সরকারি হিসাবে ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর দারিদ্র্য ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কমলেও ২০১০ থেকে ২০১৬ সময়কালে তা কমেছে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে।

২০১৬ সাল-পরবর্তী দুবছরে দারিদ্র্য হ্রাসে পূর্ববর্তী ৬ বছরের গতি (১ দশমিক ২ শতাংশ) বহাল থাকলেও ২০২০ সালে করোনার প্রাদুর্ভাবে এবং সরকারি লকডাউনের কারণে অনেকের চাকরিচ্যুতি, বেতন/মজুরি হ্রাস, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে মানুষের আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্যহার বেড়েছে। সিপিডি, পিপিআরসি, বিআইজিডি, সানেম ইত্যাদি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ওই বছর দেশে দারিদ্র্যহার বেড়ে ৩৫ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশে দাঁড়ায়।

আর বিশ্বব্যাংকের মতে, করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের দারিদ্র্যহার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশে (ডেইলি স্টার, ৫ জুন)। এদিকে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৬ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

সরকার দারিদ্র্যহার বৃদ্ধির ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বিশ্বব্যাংকের ফাইন্ডিংসের প্রতিবাদ করেছে বলে জানা যায়নি। তাছাড়া বিবিএসের গত সেপ্টেম্বরের এক জরিপে স্বীকার করা হয়েছে, করোনা মহামারির প্রভাবে মানুষের মাসিক আয় ২০ দশমিক ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দেশে বিদ্যমান দারিদ্র্যহার নিয়ে কোনো বক্তব্য রাখেননি, যদিও তিনি বলেছেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে এবং অতি দারিদ্র্যের হার ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার।’

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে কাক্সিক্ষত সাফল্য বয়ে আনতে না পারার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. সুবিধাভোগীর তুলনায় অর্থ বরাদ্দের স্বল্পতা। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে পরবর্তী ৩ অর্থবছরে গরিব/অতি গরিব প্রবীণ উপকারভোগীর সংখ্যা ১৭ লাখ বৃদ্ধি করা হলেও সে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ শ্রেণির উপকারভোগীর সংখ্যা ৪ লাখ বাড়ানো হলেও তাদের জন্য নতুন করে বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে এ শ্রেণির ৫ লাখ উপকারভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ৩০০ কোটি টাকা।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে গরিব/অতি গরিব ৮ লাখ প্রবীণ ব্যক্তিকে নতুন করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীর আওতাভুক্ত করা হলেও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৮১ কোটি টাকা। এতে তাদের মাথাপিছু মাসিক ভাতার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০১ টাকা। এই শ্রেণির পুরোনো ভাতাভোগীরাও কমবেশি এ হারে মাসিক ভাতা পেয়ে আসছেন। অনুরূপভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে গরিব/অতি গরিব বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩ লাখ বাড়িয়ে ১৪ লাখ থেকে ১৭ লাখে উন্নীত করা হলেও এ শ্রেণির ভাতাভোগীদের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ৩ লাখ ৫০ হাজার জনকে এ শ্রেণিতে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তে মোট সংখ্যা ২০ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়ায়। নতুন অন্তর্ভুক্ত ৩ লাখ ৫০ হাজার ভাতাভোগীর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২১০ কোটি টাকা। সদ্য ঘোষিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ শ্রেণির ৪ লাখ ২৫ হাজার জন নতুন উপকারভোগীর জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ২৫৫ কোটি টাকা।

উপকারভোগীদের, বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের মাথাপিছু বরাদ্দকৃত অর্থ তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম উপকরণের চাহিদা মেটাতে সমর্থ না হওয়ায় তারা ‘দারিদ্র্যচক্র’ থেকে বের হতে পারছেন না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তায় তারা কোনো রকমে বেঁচে থাকছেন। জীবন মানের উন্নতি না হওয়ায় তাদের শ্রেণিগত পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা দরিদ্র্রই থেকে যাচ্ছেন। ফলে দারিদ্র্যহার হ্রাসে তাদের কোনো ভূমিকা থাকছে না।

দুই. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। তারা ভোট, ভোটারের চিন্তা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি মাথায় রেখে তালিকা তৈরি করেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিরা তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়েন, যার ফলে তারা কর্মসূচির সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভিজিডি কর্মসূচির ২৭ শতাংশ উপকারভোগী গরিব নয়।

প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে বৃত্তির সুবিধাপ্রাপ্ত ৪৭ শতাংশ গরিব নয় এবং ত্রুটিপূর্ণ স্বেচ্ছাচারী নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়, অন্যদিকে মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে ছাত্রীদের বৃত্তির প্রায় ২০-৪০ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায় না। সরকারি সমীক্ষার বরাত দিয়ে কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনিয়মের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।

এতে বলা হয়, বয়স্ক ভাতার শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ৫৯ শতাংশ; বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতার ভূমিহীন শর্ত পূরণ করে না এমন ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৩ শতাংশ; গরিব না হয়েও ত্রাণ পায় এমন সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৫৬ শতাংশ; ভিজিডির ক্ষেত্রে ভূমিহীন বা সামান্য জমির অধিকারী হওয়ার শর্ত পূরণ করে না এমন উপকারভোগীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ। কর্মসূচির অধীনে সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয় এমন ব্যক্তিরা সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দারিদ্র্যহার হ্রাসে তারা ভূমিকা রাখছেন না।

তিন. দুর্নীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় হয়। ভিজিডি, ভিজিএফ, টিআর ইত্যাদি কর্মসূচিতে দুর্নীতির খবর প্রায়ই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এসব দুর্নীতি অব্যাহত থাকার কারণে সুবিধাভোগীরা তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থের পুরোটা পান না। এতে জীবনধারণের ন্যূনতম উপকরণাদি সংগ্রহ করতে না পেরে উপকারভোগীরা অনেক সময় খাদ্যনিরাপত্তার হুমকির সম্মুখীন হন, যা দারিদ্র্যহার হ্রাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

দেশে করোনা মহামারির সময়ে দারিদ্র্যহার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এ কর্মসূচির সুফল পেতে এবং দারিদ্র্যহার হ্রাসে এর অবদান বৃদ্ধিতে যা দরকার তা হলো-ক. কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, যাতে একসময় সুবিধাভোগীদের শ্রেণিগত অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং গরিবদের কাতার থেকে তাদের উত্তরণ ঘটে। দারিদ্র্য হ্রাসে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

খ. উপকারভোগী বাছাইয়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করা, যাতে প্রকৃত গরিব/অতি গরিব ব্যক্তিরাই এ কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। গ. একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হওয়ায় মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় জোরদার করা এবং ঘ. কর্মসূচি বাস্তবায়নে চিহ্নিত দুর্নীতি হ্রাসে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন