গার্ড অব অনার ও সংসদীয় কমিটির সুপারিশ
jugantor
গার্ড অব অনার ও সংসদীয় কমিটির সুপারিশ

  ড. আবু সাইয়িদ  

১৬ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি মহান জাতীয় সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের ক্ষেত্রে ‘চমৎকার’(!) সুপারিশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।

একজন মাননীয় সংসদ সদস্য ওই বৈঠকে বলেছেন, ‘গার্ড অব অনার নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে সমাজে অনেক প্রশ্ন আছে।’ প্রশ্ন হলো, তিনি কোন সমাজের ইজারা নিয়েছেন?

আমার এখনো মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে মিসেস ফাতেমা জিন্নাহ যখন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেছিলেন, তখন আইয়ুব-মোনায়েম আলেম-ওলামাদের প্রচারে লাগিয়ে দিয়েছিলেন-‘কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে নারীকে রাষ্ট্রীয় প্রধান পদে নির্বাচিত করা শরিয়তবিরোধী।’

এ-ও বলা হয়েছিল, ‘নারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া ইসলামবিরোধী।’ সেই একই ধরনের চেতনার অনুসঙ্গী হয়ে কেউ যদি বলেন, কোনো জেলা বা উপজেলায় নারী কর্মকর্তা ডিসি বা ইউএনও হলে তিনি ‘গার্ড অব অনারে’ অংশগ্রহণ করতে পারবেন না; তাকে কীভাবে চিহ্নিত করব?

২. সংসদীয় কমিটি এখানে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মীয় রীতিকে একাকার করে দিয়েছে। সংসদ সদস্য সংবিধানের সৃষ্টি এবং সংবিধানের উল্লিখিত শপথবাক্য পাঠ করেই সংসদে বসেছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে তার মূলনীতি এটি। রাষ্ট্র এর বাইরে যেতে পারে না।

৩. আবার অন্যদিকে সংবিধানে নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি নিশ্চিত করা হয়েছে, সেই ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।’ একই সঙ্গে ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’

২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ পারস্পরিক ধারায় ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ এবং (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ সাংবিধানিক এই মৌলিক নীতিগুলোর বাইরে যা-ই বলা হোক না কেন, তা অসামঞ্জস্য হিসাবে বিবেচিত হবে।

৪. ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন এবং ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন হলে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইনসভার কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই কমিটিগুলো গঠিত হয়।

এক্ষেত্রে আরও লক্ষণীয়, জাতীয় সংসদ তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে কতটুকু সক্ষম হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে মন্ত্রণালয় এবং জনগণের কাছে উপস্থাপন করাও উদ্দেশ্য।

সেক্ষেত্রে কতটুকু দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে? এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতির সম্মাননায় বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক ও সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ক্রেস্টে স্বর্ণ ও রুপা নির্দিষ্ট পরিমাণে না দেওয়ার ঘটনায় প্রায় ৭ কোটি ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা এবং সেই সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ ছিল।

প্রাথমিকভাবে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় অনিয়ম প্রমাণিত হয়। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি সাবেক প্রতিমন্ত্রীসহ ১৩ জন কর্মকর্তা ও সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়, যেখানে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু সংসদীয় তদন্ত কমিটি সাবেক মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা পায়নি উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। অন্যদিকে যে কর্মকর্তা অনিয়ম উদ্ঘাটনে পদক্ষেপ নেন, তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।

আরও একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিসিআইসির নিয়োগে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কমিটি পরবর্তী বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ এবং পুনরায় সুপারিশ করে এবং বৈঠকের কার্যপত্রে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য তুলে ধরা হয়।

কমিটির পুনঃসুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করা হয় এবং কোনো দুর্নীতি পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। উল্লেখ্য, জড়িত ব্যক্তিকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কমিটি বৈঠকে পুনরায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই হলো সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা।

৫. এখনো দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত করা হয়, তখন এদেশের আলেম-ওলামারা ফতোয়া দিয়েছিল- ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’।

এখন তার নেতৃত্বেই সংসদ ও সরকার চলছে। বরং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, ‘ধর্মের নাম নিয়ে বা সামাজিকতার কথা বলে নারীকে পশ্চাৎপদ করে রাখার অপচেষ্টা সমাজ থেকে দূর হয়েছে। আমাদের এই সমাজকে যদি আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

সংসদীয় কমিটির ওই সুপারিশের পর প্রধানমন্ত্রী কি বলতে পারবেন নারীকে পশ্চাৎপদ করে রাখার অপচেষ্টা দূর হয়েছে? এই সুপারিশ বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় কর্মে নারীদের ক্ষমতা খর্বিত হবে সন্দেহ নেই।

নিয়মানুযায়ী মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কফিন জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়। তবে কফিন কবরে নামানোর সময় বা সৎকারের সময় জাতীয় পতাকা খুলে ফেলা হয়। সেখানে সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তারা কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে অনুমোদিতসংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র গার্ড মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সশস্ত্র সালাম জানান এবং তখন বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে লাশ দাফন বা সৎকার তাদের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মনে জাগরুক যে, বাংলাদেশ ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

এখানে ধর্মীয় রীতি ও সংবিধান বর্ণিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সব ক্ষেত্রে এক করে দেখার অবকাশ নেই। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন নারী ও পুরুষ সমভাবে রাষ্ট্রের কর্মে নিযুক্তি পায়। জেন্ডার ব্যবধানের কারণে এখনো নারীদের রাষ্ট্রীয় কাজে সমতা আসেনি।

‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার

কেন নাহি দিবে অধিকার হে বিধাতা।’

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ : সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী, বাহাত্তরের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা

গার্ড অব অনার ও সংসদীয় কমিটির সুপারিশ

 ড. আবু সাইয়িদ 
১৬ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি মহান জাতীয় সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের ক্ষেত্রে ‘চমৎকার’(!) সুপারিশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।

একজন মাননীয় সংসদ সদস্য ওই বৈঠকে বলেছেন, ‘গার্ড অব অনার নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে সমাজে অনেক প্রশ্ন আছে।’ প্রশ্ন হলো, তিনি কোন সমাজের ইজারা নিয়েছেন?

আমার এখনো মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে মিসেস ফাতেমা জিন্নাহ যখন প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নেমেছিলেন, তখন আইয়ুব-মোনায়েম আলেম-ওলামাদের প্রচারে লাগিয়ে দিয়েছিলেন-‘কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে নারীকে রাষ্ট্রীয় প্রধান পদে নির্বাচিত করা শরিয়তবিরোধী।’

এ-ও বলা হয়েছিল, ‘নারী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া ইসলামবিরোধী।’ সেই একই ধরনের চেতনার অনুসঙ্গী হয়ে কেউ যদি বলেন, কোনো জেলা বা উপজেলায় নারী কর্মকর্তা ডিসি বা ইউএনও হলে তিনি ‘গার্ড অব অনারে’ অংশগ্রহণ করতে পারবেন না; তাকে কীভাবে চিহ্নিত করব?

২. সংসদীয় কমিটি এখানে তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মীয় রীতিকে একাকার করে দিয়েছে। সংসদ সদস্য সংবিধানের সৃষ্টি এবং সংবিধানের উল্লিখিত শপথবাক্য পাঠ করেই সংসদে বসেছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে তার মূলনীতি এটি। রাষ্ট্র এর বাইরে যেতে পারে না।

৩. আবার অন্যদিকে সংবিধানে নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি নিশ্চিত করা হয়েছে, সেই ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।’ একই সঙ্গে ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’

২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ পারস্পরিক ধারায় ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ এবং (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ সাংবিধানিক এই মৌলিক নীতিগুলোর বাইরে যা-ই বলা হোক না কেন, তা অসামঞ্জস্য হিসাবে বিবেচিত হবে।

৪. ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন এবং ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন হলে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইনসভার কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই কমিটিগুলো গঠিত হয়।

এক্ষেত্রে আরও লক্ষণীয়, জাতীয় সংসদ তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে কতটুকু সক্ষম হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে মন্ত্রণালয় এবং জনগণের কাছে উপস্থাপন করাও উদ্দেশ্য।

সেক্ষেত্রে কতটুকু দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে? এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতির সম্মাননায় বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক ও সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ক্রেস্টে স্বর্ণ ও রুপা নির্দিষ্ট পরিমাণে না দেওয়ার ঘটনায় প্রায় ৭ কোটি ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা এবং সেই সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ ছিল।

প্রাথমিকভাবে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় অনিয়ম প্রমাণিত হয়। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি সাবেক প্রতিমন্ত্রীসহ ১৩ জন কর্মকর্তা ও সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়, যেখানে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু সংসদীয় তদন্ত কমিটি সাবেক মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা পায়নি উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। অন্যদিকে যে কর্মকর্তা অনিয়ম উদ্ঘাটনে পদক্ষেপ নেন, তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়।

আরও একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বিসিআইসির নিয়োগে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় কমিটি পরবর্তী বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ এবং পুনরায় সুপারিশ করে এবং বৈঠকের কার্যপত্রে জড়িত ব্যক্তিদের তথ্য তুলে ধরা হয়।

কমিটির পুনঃসুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করা হয় এবং কোনো দুর্নীতি পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। উল্লেখ্য, জড়িত ব্যক্তিকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কমিটি বৈঠকে পুনরায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই হলো সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা।

৫. এখনো দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত করা হয়, তখন এদেশের আলেম-ওলামারা ফতোয়া দিয়েছিল- ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’।

এখন তার নেতৃত্বেই সংসদ ও সরকার চলছে। বরং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, ‘ধর্মের নাম নিয়ে বা সামাজিকতার কথা বলে নারীকে পশ্চাৎপদ করে রাখার অপচেষ্টা সমাজ থেকে দূর হয়েছে। আমাদের এই সমাজকে যদি আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

সংসদীয় কমিটির ওই সুপারিশের পর প্রধানমন্ত্রী কি বলতে পারবেন নারীকে পশ্চাৎপদ করে রাখার অপচেষ্টা দূর হয়েছে? এই সুপারিশ বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় কর্মে নারীদের ক্ষমতা খর্বিত হবে সন্দেহ নেই।

নিয়মানুযায়ী মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কফিন জাতীয় পতাকায় মোড়ানো হয়। তবে কফিন কবরে নামানোর সময় বা সৎকারের সময় জাতীয় পতাকা খুলে ফেলা হয়। সেখানে সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তারা কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে অনুমোদিতসংখ্যক পুলিশ বাহিনীর সশস্ত্র গার্ড মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সশস্ত্র সালাম জানান এবং তখন বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে লাশ দাফন বা সৎকার তাদের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়। দেশপ্রেমিক নাগরিকদের মনে জাগরুক যে, বাংলাদেশ ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

এখানে ধর্মীয় রীতি ও সংবিধান বর্ণিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সব ক্ষেত্রে এক করে দেখার অবকাশ নেই। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন নারী ও পুরুষ সমভাবে রাষ্ট্রের কর্মে নিযুক্তি পায়। জেন্ডার ব্যবধানের কারণে এখনো নারীদের রাষ্ট্রীয় কাজে সমতা আসেনি।

‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার

কেন নাহি দিবে অধিকার হে বিধাতা।’

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ : সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী, বাহাত্তরের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন