ক্রিকেট মাঠ, বিশ্ববিদ্যালয় আর দুর্নীতির ‘চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব’
jugantor
ক্রিকেট মাঠ, বিশ্ববিদ্যালয় আর দুর্নীতির ‘চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব’

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

১৭ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভুল আউটের প্রতিবাদ জানিয়ে ব্যাটসম্যান উইকেটের ওপর বসে আছেন। খেলা বন্ধ। আম্পায়ার খেলোয়াড়কে অনুনয় করে বলছেন, ‘আমার কিছু করার নেই। আজ তোমাদের হারাতেই হবে। নইলে আমি আর ম্যাচ পাব না।’ বছর দুয়েক আগে ফতুল্লা স্টেডিয়ামে এমন দৃশ্যেরও অবতারণা হয়েছিল। অসহায় ম্যাচ রেফারি সাংবাদিকের হাত ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছেন, ‘এই কাজ ছাড়া আর কোনো রোজগার নেই। ওদের পক্ষে সিদ্ধান্ত না দিলে ম্যাচ পাব না। খাব কী? প্লিজ আপনি কিছু লেইখেন না।’

এ অনুচ্ছেদটি আমি কপি করেছি একটি পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। রিপোর্টটির ব্যাকগ্রাউন্ড সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের মাঠের উচ্ছৃঙ্খল অক্রিকেটীয় আচরণ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাকিবের পক্ষে-বিপক্ষে দুই রকম মতামত এসেছে।

এক পক্ষ যে কোনো পরিস্থিতিতেই তার এমন আচরণ করার বিপক্ষে কথা বলেছেন, বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড়টির আরও দায়িত্ববোধ থাকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আবার কেউ বা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যাচ্ছেতাই অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে সাকিবের এ প্রতিক্রিয়াকে মানবীয় হিসাবে দেখতে চান।

কেউ কেউ এটিও মনে করেন, এ ঘটনাটি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যাচ্ছেতাই অবস্থার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং শেষ পর্যন্ত এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ ধারণাকে খুব ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ স্বয়ং বিসিবি সভাপতি বলেছেন, বাইরে থেকে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মুখে আছেন এবং প্রয়োজনে সেই লীগের খোলনলচে পালটে ফেলার জন্য লীগ সাময়িকভাবে বন্ধ করেও দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন।

দেশের ক্রিকেট এখন কোন পর্যায়ে আছে সেটুকু বোঝার জন্য শুরুতে দেওয়া দুটি অনুচ্ছেদই যথেষ্ট। এ সময় এ দেশের অনেক মূলধারার মিডিয়ায় ক্রিকেট নিয়ে যেসব খবর এসেছে, সেগুলো পড়লে যে কেউ খুব স্পষ্টভাবে বুঝে যাবেন অনিয়ম আর দুর্নীতি কী ভয়ংকরভাবে জেঁকে বসেছে সেখানে। বহু বছর ক্রিকেট খেলা দেখি না, ক্রিকেটের খবরও রাখি না, দেখলাম যারা রাখেন তারা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের এ যাচ্ছেতাই অবস্থার কথা জানেন।

যখন খেলার মাঠে এ ঘটনা ঘটছে, মোটামুটি একই সময়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ আবার আলোচনায় এলেন। ভিসি থাকাকালীন প্রায় পুরোটা সময় তিনি তুমুল আলোচনায় ছিলেন। তার শেষ কর্মদিবসে রাত সাড়ে ৩টায় ক্লাস নিয়ে আমাদের চমকে দিয়েছেন।

মেয়াদের চার বছর অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ থাকলেও তাকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল ঢাকায় থেকে রংপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা নিয়ে। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার উপস্থিতির বিস্তারিত তথ্য বোর্ডে টানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে দেখা যায়, নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর নিয়োগ হয় ২০১৭ সালের ১ জুন এবং তার মেয়াদ পূর্ণ হয় ২০২১ সালের ৩১ মে।

এতে চার বছরে উপাচার্য ১৪৪৭ দিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন ২৪০ দিন। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়ার নানা ব্যাখ্যা তিনি দিতেন, তিনি নাকি ঢাকা থেকেই ২০-২২ ঘণ্টা কাজ করে সব ম্যানেজ করে ফেলেন। এ উপাচার্য দেশের মানুষের সমালোচনা, পত্রিকায় একের পর এক রিপোর্ট, সামাজিক মাধ্যমে ট্রল বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ণ করতে পেরেছেন তার মেয়াদ। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারসমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন সর্বোচ্চ বিরোধিতা করেও তাকে তার পদ থেকে সরাতে পারেনি।

এর ঠিক আগেই আলোচনায় এসেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম আবদুস সোবহান। শেষ কার্যদিবসের আগের রাতে ৯ জন শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন পদে মোট ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, সারা দেশেই তুমুল সমালোচনার জন্ম দেন। এর আগে তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করে শিক্ষক হওয়ার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা নিজের মেয়ে, মেয়ে-জামাতাসহ অবৈধ উপায়ে আরও ৩৪ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, যা এসব নিয়োগকে অবৈধ অ্যাখ্যা দিয়ে বাতিলের সুপারিশ করে। সবকিছুর পর পরিস্থিতি এখন এতটাই ঘোলাটে যে, অবসরের পর পুলিশি প্রহরায় আছেন তিনি।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একের পর এক ভিসি আমাদের সামনে নানা উদ্ভট কাণ্ডকীর্তির জন্য আলোচনায় এসেছেন। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বাংলোয় স্কুল ও বিউটি পার্লার বানিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। এ উপাচার্য নাকি নিজেই সেই পার্লারের ক্লায়েন্টদের সিরিয়াল মেইন্টেইনের দায়িত্ব পালন করতেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজের কমিশনের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সংঘাতের কথা ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়েছিল। এর জেরে রীতিমতো পদচ্যুত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের ওই দুই কেন্দ্রীয় নেতা। অন্যান্য উপাচার্যের বিরুদ্ধে চাকরির যোগ্যতা কমিয়ে নিজের ছেলেকে শিক্ষক বানানো, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি, নিজের একটি গাড়ি ব্যবহার করার পর ছেলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে কোটি টাকা দিয়ে আরও একটি গাড়ি কিনে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তালিকাটা অনেক দীর্ঘ, আর বড় করছি না।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং ২০২২ প্রকাশ করেছে। তাতে প্রথম ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নেই। গত বছরের মতো এ বছরের তালিকায়ও দেশের শীর্ষ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে রয়েছে।

কিউএস তাদের তালিকায় ৫০০-এর পরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ভারতের আটটি ও পাকিস্তানের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশের মতো পুরো তালিকা বিবেচনায় নিলে এ দেশ দুটির বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা অনেক বাড়ত।

টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর সর্বশেষ র‌্যাংকিংয়ে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা দেখা যাক। বিশ্বের সেরা ১৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আছে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। অথচ এ তালিকায় ভারতের ৫৬টি, পাকিস্তানের ১৪টি, মালয়েশিয়ার ১৩টি, শ্রীলংকার দুটি ও নেপালের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। আমাদের অনেকের জেনে অবাক লাগবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১ হাজারের বাইরে, কিন্তু নানা কারণে সমালোচিত দেশ পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১ হাজারের মধ্যেই। এর মধ্যে কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪০০ থেকে ৫০০-এর মধ্যে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং না হলেও আরেকটি র‌্যাংকিং আমাদের জাতির অবস্থা বোঝানোর জন্য খুবই জরুরি, তাই এটার ব্যাপারে আমরা মনোযোগ দেব। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ২০২০ সালের গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স (জিকেআই) প্রকাশ করে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১১২তম। এখানেও আমাদের জন্য খুবই হতাশার খবর হলো, এ সূচকে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান এমনকি পাকিস্তানও আছে আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে।

অর্থনীতিতে ‘ট্রিকল ডাউন’ বলে একটা তত্ত্ব প্রচলিত আছে খুব। এ তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্র যদি নানা নীতি এবং ঋণ সহায়তার মাধ্যমে ধনীর হাতে অর্থ তুলে দেয়, তাহলে ধনীর নানা ব্যবসার সূত্রে সেই অর্থ ধীরে ধীরে ট্রিকল ডাউন করে অর্থাৎ চুঁইয়ে পড়ে গরিব মানুষ পর্যন্ত সবার কাছে পৌঁছাবে। তাই গরিব মানুষের কাছে সরাসরি আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কোনো দরকার নেই। একটা সিরিয়াস অর্থনৈতিক তত্ত্ব হিসাবে একসময় প্রতিষ্ঠিত থাকলেও অর্থ-সম্পদ আসলে ট্রিকল ডাউন করে না, এটি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে কয়েক বছর আগেই; কিন্তু তবুও আমাদের অনেকেই না জেনে এটি ব্যবহার করেন।

আমরা যারা ক্রিকেটের দুর্নীতি নিয়ে তুমুল সমালোচনা করছি কিংবা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের অদক্ষতা-দুর্নীতি নিয়ে খুব সিরিয়াস আলোচনা করছি, তখনো ভেবে দেখছি না শুধু তাদের দুর্নীতি নিয়ে আলাপ করে আসলে কিছু করা যাবে কিনা। সমালোচিত উপাচার্যরা সরে গিয়ে নতুন যারা আসবেন তারাও কি আদৌ ভালোভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলবেন? কিংবা সাকিবের অতি আলোচিত ঘটনার পর কিছুদিন যদি কিছুটা ঠিকঠাক থাকেও, দেশের ঘরোয়া লীগ কি আসলেই তার মান ঠিক করে ভবিষ্যতে চলবে? আমি বিশ্বাস করি, কোনো ক্ষেত্রেই এটি হবে না।

ট্রিকল ডাউন বা চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে কাজ করে না, এটি এখন নিশ্চিত; কিন্তু এ তত্ত্ব দুর্নীতির ক্ষেত্রে কাজ করে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। দেশের নিম্ন পর্যায়ে দুর্নীতি আসলে চুঁইয়ে পড়ে সরকারের উপরের পর্যায় থেকে। নিম্ন পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে উপরের পর্যায়ের দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে। সেটি করা না হলে আমরা যাই বলি না কেন, সেটি হবে স্রেফ অর্থহীন।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

ক্রিকেট মাঠ, বিশ্ববিদ্যালয় আর দুর্নীতির ‘চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব’

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
১৭ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভুল আউটের প্রতিবাদ জানিয়ে ব্যাটসম্যান উইকেটের ওপর বসে আছেন। খেলা বন্ধ। আম্পায়ার খেলোয়াড়কে অনুনয় করে বলছেন, ‘আমার কিছু করার নেই। আজ তোমাদের হারাতেই হবে। নইলে আমি আর ম্যাচ পাব না।’ বছর দুয়েক আগে ফতুল্লা স্টেডিয়ামে এমন দৃশ্যেরও অবতারণা হয়েছিল। অসহায় ম্যাচ রেফারি সাংবাদিকের হাত ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছেন, ‘এই কাজ ছাড়া আর কোনো রোজগার নেই। ওদের পক্ষে সিদ্ধান্ত না দিলে ম্যাচ পাব না। খাব কী? প্লিজ আপনি কিছু লেইখেন না।’

এ অনুচ্ছেদটি আমি কপি করেছি একটি পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। রিপোর্টটির ব্যাকগ্রাউন্ড সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের মাঠের উচ্ছৃঙ্খল অক্রিকেটীয় আচরণ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাকিবের পক্ষে-বিপক্ষে দুই রকম মতামত এসেছে।

এক পক্ষ যে কোনো পরিস্থিতিতেই তার এমন আচরণ করার বিপক্ষে কথা বলেছেন, বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং বিশ্ববিখ্যাত খেলোয়াড়টির আরও দায়িত্ববোধ থাকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আবার কেউ বা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যাচ্ছেতাই অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে সাকিবের এ প্রতিক্রিয়াকে মানবীয় হিসাবে দেখতে চান।

কেউ কেউ এটিও মনে করেন, এ ঘটনাটি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের যাচ্ছেতাই অবস্থার প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং শেষ পর্যন্ত এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ ধারণাকে খুব ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ স্বয়ং বিসিবি সভাপতি বলেছেন, বাইরে থেকে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে প্রচণ্ড চাপের মুখে আছেন এবং প্রয়োজনে সেই লীগের খোলনলচে পালটে ফেলার জন্য লীগ সাময়িকভাবে বন্ধ করেও দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন।

দেশের ক্রিকেট এখন কোন পর্যায়ে আছে সেটুকু বোঝার জন্য শুরুতে দেওয়া দুটি অনুচ্ছেদই যথেষ্ট। এ সময় এ দেশের অনেক মূলধারার মিডিয়ায় ক্রিকেট নিয়ে যেসব খবর এসেছে, সেগুলো পড়লে যে কেউ খুব স্পষ্টভাবে বুঝে যাবেন অনিয়ম আর দুর্নীতি কী ভয়ংকরভাবে জেঁকে বসেছে সেখানে। বহু বছর ক্রিকেট খেলা দেখি না, ক্রিকেটের খবরও রাখি না, দেখলাম যারা রাখেন তারা দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের এ যাচ্ছেতাই অবস্থার কথা জানেন।

যখন খেলার মাঠে এ ঘটনা ঘটছে, মোটামুটি একই সময়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ আবার আলোচনায় এলেন। ভিসি থাকাকালীন প্রায় পুরোটা সময় তিনি তুমুল আলোচনায় ছিলেন। তার শেষ কর্মদিবসে রাত সাড়ে ৩টায় ক্লাস নিয়ে আমাদের চমকে দিয়েছেন।

মেয়াদের চার বছর অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ থাকলেও তাকে নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল ঢাকায় থেকে রংপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা নিয়ে। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার উপস্থিতির বিস্তারিত তথ্য বোর্ডে টানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে দেখা যায়, নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর নিয়োগ হয় ২০১৭ সালের ১ জুন এবং তার মেয়াদ পূর্ণ হয় ২০২১ সালের ৩১ মে।

এতে চার বছরে উপাচার্য ১৪৪৭ দিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন ২৪০ দিন। তার বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়ার নানা ব্যাখ্যা তিনি দিতেন, তিনি নাকি ঢাকা থেকেই ২০-২২ ঘণ্টা কাজ করে সব ম্যানেজ করে ফেলেন। এ উপাচার্য দেশের মানুষের সমালোচনা, পত্রিকায় একের পর এক রিপোর্ট, সামাজিক মাধ্যমে ট্রল বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ণ করতে পেরেছেন তার মেয়াদ। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারসমর্থক শিক্ষকদের সংগঠন সর্বোচ্চ বিরোধিতা করেও তাকে তার পদ থেকে সরাতে পারেনি।

এর ঠিক আগেই আলোচনায় এসেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম আবদুস সোবহান। শেষ কার্যদিবসের আগের রাতে ৯ জন শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন পদে মোট ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, সারা দেশেই তুমুল সমালোচনার জন্ম দেন। এর আগে তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা সংশোধন করে শিক্ষক হওয়ার জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা নিজের মেয়ে, মেয়ে-জামাতাসহ অবৈধ উপায়ে আরও ৩৪ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, যা এসব নিয়োগকে অবৈধ অ্যাখ্যা দিয়ে বাতিলের সুপারিশ করে। সবকিছুর পর পরিস্থিতি এখন এতটাই ঘোলাটে যে, অবসরের পর পুলিশি প্রহরায় আছেন তিনি।

গত কয়েক বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একের পর এক ভিসি আমাদের সামনে নানা উদ্ভট কাণ্ডকীর্তির জন্য আলোচনায় এসেছেন। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বাংলোয় স্কুল ও বিউটি পার্লার বানিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন। এ উপাচার্য নাকি নিজেই সেই পার্লারের ক্লায়েন্টদের সিরিয়াল মেইন্টেইনের দায়িত্ব পালন করতেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজের কমিশনের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সংঘাতের কথা ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়েছিল। এর জেরে রীতিমতো পদচ্যুত হয়েছিলেন ছাত্রলীগের ওই দুই কেন্দ্রীয় নেতা। অন্যান্য উপাচার্যের বিরুদ্ধে চাকরির যোগ্যতা কমিয়ে নিজের ছেলেকে শিক্ষক বানানো, দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি, নিজের একটি গাড়ি ব্যবহার করার পর ছেলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে কোটি টাকা দিয়ে আরও একটি গাড়ি কিনে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তালিকাটা অনেক দীর্ঘ, আর বড় করছি না।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং ২০২২ প্রকাশ করেছে। তাতে প্রথম ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নেই। গত বছরের মতো এ বছরের তালিকায়ও দেশের শীর্ষ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে রয়েছে।

কিউএস তাদের তালিকায় ৫০০-এর পরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ভারতের আটটি ও পাকিস্তানের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশের মতো পুরো তালিকা বিবেচনায় নিলে এ দেশ দুটির বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা অনেক বাড়ত।

টাইমস হায়ার এডুকেশন-এর সর্বশেষ র‌্যাংকিংয়ে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা দেখা যাক। বিশ্বের সেরা ১৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আছে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। অথচ এ তালিকায় ভারতের ৫৬টি, পাকিস্তানের ১৪টি, মালয়েশিয়ার ১৩টি, শ্রীলংকার দুটি ও নেপালের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে। আমাদের অনেকের জেনে অবাক লাগবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১ হাজারের বাইরে, কিন্তু নানা কারণে সমালোচিত দেশ পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১ হাজারের মধ্যেই। এর মধ্যে কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪০০ থেকে ৫০০-এর মধ্যে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং না হলেও আরেকটি র‌্যাংকিং আমাদের জাতির অবস্থা বোঝানোর জন্য খুবই জরুরি, তাই এটার ব্যাপারে আমরা মনোযোগ দেব। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ২০২০ সালের গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স (জিকেআই) প্রকাশ করে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১১২তম। এখানেও আমাদের জন্য খুবই হতাশার খবর হলো, এ সূচকে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান এমনকি পাকিস্তানও আছে আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে।

অর্থনীতিতে ‘ট্রিকল ডাউন’ বলে একটা তত্ত্ব প্রচলিত আছে খুব। এ তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্র যদি নানা নীতি এবং ঋণ সহায়তার মাধ্যমে ধনীর হাতে অর্থ তুলে দেয়, তাহলে ধনীর নানা ব্যবসার সূত্রে সেই অর্থ ধীরে ধীরে ট্রিকল ডাউন করে অর্থাৎ চুঁইয়ে পড়ে গরিব মানুষ পর্যন্ত সবার কাছে পৌঁছাবে। তাই গরিব মানুষের কাছে সরাসরি আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কোনো দরকার নেই। একটা সিরিয়াস অর্থনৈতিক তত্ত্ব হিসাবে একসময় প্রতিষ্ঠিত থাকলেও অর্থ-সম্পদ আসলে ট্রিকল ডাউন করে না, এটি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে কয়েক বছর আগেই; কিন্তু তবুও আমাদের অনেকেই না জেনে এটি ব্যবহার করেন।

আমরা যারা ক্রিকেটের দুর্নীতি নিয়ে তুমুল সমালোচনা করছি কিংবা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের অদক্ষতা-দুর্নীতি নিয়ে খুব সিরিয়াস আলোচনা করছি, তখনো ভেবে দেখছি না শুধু তাদের দুর্নীতি নিয়ে আলাপ করে আসলে কিছু করা যাবে কিনা। সমালোচিত উপাচার্যরা সরে গিয়ে নতুন যারা আসবেন তারাও কি আদৌ ভালোভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলবেন? কিংবা সাকিবের অতি আলোচিত ঘটনার পর কিছুদিন যদি কিছুটা ঠিকঠাক থাকেও, দেশের ঘরোয়া লীগ কি আসলেই তার মান ঠিক করে ভবিষ্যতে চলবে? আমি বিশ্বাস করি, কোনো ক্ষেত্রেই এটি হবে না।

ট্রিকল ডাউন বা চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে কাজ করে না, এটি এখন নিশ্চিত; কিন্তু এ তত্ত্ব দুর্নীতির ক্ষেত্রে কাজ করে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। দেশের নিম্ন পর্যায়ে দুর্নীতি আসলে চুঁইয়ে পড়ে সরকারের উপরের পর্যায় থেকে। নিম্ন পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে উপরের পর্যায়ের দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে। সেটি করা না হলে আমরা যাই বলি না কেন, সেটি হবে স্রেফ অর্থহীন।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন