অফিস-আদালতে জনভোগান্তি কি চলতেই থাকবে?
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
অফিস-আদালতে জনভোগান্তি কি চলতেই থাকবে?

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

১৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা দেশের অফিসপাড়াগুলোয় জনভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর আদালতগুলোয় বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি অকল্পনীয়। এসব ঘটনার অবসান কবে হবে, একমাত্র আল্লাহই তা বলতে পারেন। কারণ বিচারপ্রার্থী জনগণ যে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, সে বিষয়টি সুরাহা করার ক্ষমতা কারও আছে বলে মনে হয় না।

বিচারালয়ে ভোগান্তির বিষয়ে কারও পক্ষে কিছু বলাও সহজ নয়। কিছু বলতে হলে তথ্য-প্রমাণ হাতে রেখে তা বলতে হয়। কিন্তু তাই বলে একদম কিছু না বলে সবাই মুখ বন্ধ করে রাখলে তাতে করে অফিস-আদালত, বিচার ব্যবস্থা, সম্মানিত বিচারক, বিচারপ্রার্থী ইত্যাদি কোনো শ্রেণির জন্যই যে তা সুখকর হবে না, জনান্তিকে সে কথাটি বলে রেখে আজকের লেখাটি শুরু করছি। এখানে আমি বিচারপ্রার্থী মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনার দু-একটি উদাহরণ তুলে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করব যে, কত ব্যথা আছে, যা ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী ছাড়া কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়।

মফস্বল শহরের একখণ্ড জমির ঘটনা। যে জমিটুকু কোনোদিন, কোনোকালেও কোনো সংখ্যালঘু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন ছিল না, কিন্তু সে জমিটুকুও রেকর্ডের সময় ‘ক’ তফসিল হিসাবে সরকারি কাগজপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার সেই একই জমি, ভূমি অফিসের এসি ল্যান্ড, তহসিলদার সাহেবরা নামজারি জমাভাগ করে খাজনা গ্রহণের মাধ্যমে দাখিলা ইস্যু করে বেচাবিক্রির সুযোগও করে দিয়েছেন।

আর এভাবে কয়েক যুগ ধরে দু-তিনবার বিক্রয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে হাত বদলের পর অন্য এক ব্যক্তি জমিটি ক্রয় করে নামজারির আবেদন করলে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট তহসিলদার (বর্তমানে সহকারী ভূমি অফিসার) সে ব্যক্তির নামেও জমিটি নামজারি জমাভাগ করে দিয়ে তার নামেও দাখিলা ইস্যু করে খাজনা আদায় করেছেন। অথচ এ ঘটনার ২-৩ বছর পরে আগের এসি ল্যান্ড এবং সহকারী ভূমি অফিসার বদলি হয়ে নতুন অফিসার আসার পর, ভুক্তভোগী জমির মালিক তহসিল অফিসে পরবর্তী বছরের খাজনা দিতে গেলে বলা হয়, জমিটি ‘ক’ তফসিলভুক্ত। অর্থাৎ সরকারি অর্পিত সম্পত্তি বিধায় খাজনা গ্রহণে ঝামেলা আছে।

ভুক্তভোগী ব্যক্তিটি তখন তার নিজ নামের নামজারি খাজনার দাখিলা এবং অতীত ক্রেতা তথা মালিকদের নামে নামজারিসহ বছরের পর বছর ধরে খাজনা গ্রহণ করে দাখিলা প্রদান ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করলে তখন তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বলা হয়, এত মূল্যবান সম্পত্তি, এ সম্পত্তির খাজনা প্রদান অব্যাহত রাখতে হলে তহসিল অফিস এবং এসি ল্যান্ড অফিস দুই জায়গা ম্যানেজ করতে হবে! কিন্তু তিনি ঘুষ প্রদানে রাজি না হয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানান। সেই জেলা প্রশাসক বদলি হয়ে চলে গেলে আরেকজন সেই চেয়ারে এলেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। অবশেষে নতুন জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট তহসিলদারকে একটু দূরবর্তী স্টেশনে বদলি করে ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে বলেন, অপকর্মকারীকে বদলি করা হয়েছে। ব্যস ওইটুকুই।

বহুদিন আগে থেকেই ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা আলোচ্য জমিতে ছাড়পত্র দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নামজারি করে দাখিলা কেটে জমিটি বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন, আবার সেই একই জমি অন্য একজন কেনার পর তার নামেও নামজারি করে দাখিলা কেটে খাজনা গ্রহণ করলেন, আবার পরবর্তীকালে অফিসার বদলি হওয়ায় অন্য অফিসার এসে সেই নামজারি এবং দাখিলা গ্রহণকারীর কাছ থেকে সেই একই জমির খাজনা গ্রহণ বন্ধ করে দিলেন। অথচ এসব অপরাধের শাস্তি হলো বদলি!

যাক সে কথা। এবার ওই একই ঘটনায় বিচারালয়ে মামলা করায় সেক্ষেত্রেও হয়রানি-পেরেশানির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তো, এ অবস্থায় ভুক্তভোগী ভদ্রলোক কী করবেন ভেবে না পেয়ে, অবশেষে উকিলের শরণাপন্ন হলে উকিল মামলা করার পরামর্শ দেওয়ায় তা-ই করা হলো। মামলার আর্জিতে সবিস্তারে বলা হলো, এ সম্পত্তি কোনোদিনই সরকারি অর্পিত সম্পত্তি নয়, কারণ কোনোকালে, কোনো সময়ই সম্পত্তিটি কোনো হিন্দু ব্যক্তি, অন্য সংখ্যালঘু বা এ ধরনের কোনো জাতিগোষ্ঠী বা ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল না। এমনকি সরকারও কোনোভাবে জমিটির মালিক নয়।

কারণ সেই ১৯৬০-এর দশকে জমিটির তৎকালীন মালিক, সম্পত্তিটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কর্তৃক রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে মালিকানা প্রাপ্ত হন। সুতরাং এক্ষেত্রে জমিটি সরকারি অর্পিত সম্পত্তি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বা তা করার কোনো সুযোগই নেই। আর এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে আর্জিতে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ সংযুক্ত করে মামলা দাখিলের পরও সেক্ষেত্রে অকারণে লম্বা লম্বা তারিখ ফেলে বছরের পর বছর মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এমনকি রায়ের তারিখ ধার্য করেও ঠিক সেই দিন আদালতে উপস্থিত না হয়ে ছুটি নিয়ে পরদিন এসে নতুন করে তারিখ ফেলে আবারও এ অজুহাত সে অজুহাতে নতুন কিছু উল্লেখ করে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।

এসব কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না। মফস্বল শহরের একটি আদালতের যে চিত্রটি এখানে তুলে ধরা হলো, এসব ঘটনা দেখারই বা কে আছেন। একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থীই বা এক্ষেত্রে কী করতে পারেন, কাকে কী বলতে পারেন। উকিলের পেছনে ছোটা আর আদালতের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করা ছাড়া তার করারই বা কী আছে! সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি যদি লোপ পায়, আর তার কার্যকলাপেও যদি সন্দেহ হয় যে, তিনিও ভূমি কর্মকর্তার মতো মন-মানসিকতাসম্পন্ন, তাহলে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদবে বৈকি!

এ স্বল্প পরিসরে এসব নিয়ে আর বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই বিধায় একটি ঘটনার উল্লেখ করেই আজকের লেখাটির ইতি টানতে চাই। আমাদের সবারই জানা আছে, কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ হলে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করতে পারেন। কিন্তু সেই রিট আবেদনের পরও কোনো একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীকে কতটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বা হয়েছে, নিচের ঘটনাটি তারই জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত।

২০২০ সালে রিট করার পর ভুক্তভোগী ভদ্রলোকের পক্ষে এবং বিবাদীর বিরুদ্ধে বছরের শুরুর দিকে একটি রুল জারি করা হয়। কিন্তু বিবাদী একজন সরকারি আমলা তথা সচিব পদমর্যাদায় আসীন থেকেও তা আমলে না নিয়ে একই বিষয়ে বাদীর বিরুদ্ধে আরও কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ উচ্চ আদালত প্রদত্ত রুলিংয়ের কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বাদীর বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়! অতঃপর বাদী আবারও আদালতের শরণাপন্ন হলে দেখা যায়, আদালত যে রুল প্রদান করেছিলেন, তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং বাদীকে নতুন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় এবং অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নভেম্বরে সেই আদালতে শুনানি করানো সম্ভব হলেও নতুন আদালত একই বিষয়ে আবারও ১০ দিনের একটি শর্ট রুলিং দিয়ে বলেন, ‘শিগগির শুনানি গ্রহণ করা হবে।’ আর সেই থেকে আজ ৭ মাসে প্রায় দশবার মামলাটি মেনশন করা হলেও আজ পর্যন্ত সেই শুনানি গ্রহণ করা হয়নি! বরং ইতোমধ্যে বিবাদী বাদীর বিরুদ্ধে আরও একদফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাদীকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলেছেন। অর্থাৎ সরকারি আমলা সচিব মহোদয় উচ্চ আদালতের দ্বিতীয় দফায় জারিকৃত রুলিংও অবজ্ঞা করে বাদীর বিরুদ্ধে আবারও খড়্গহস্ত হয়েছেন।

বতর্মান অবস্থায় দেশের অফিস-আদালত নিয়ে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ একটি মফস্বল শহরের ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসন অফিস, জেলা জজ আদালত এবং রাজধানী শহরের সচিবালয়, হাইকোর্ট ইত্যাদি সব বিষয়েই কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। আর আলোচনাকালে যে দুটি ঘটনার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, সেসবের তথ্য-প্রমাণ পেয়েই তা করা হয়েছে। তবে সরকারের কোনো হাইকমান্ড বা অন্য কেউ এ লেখাটি পাঠ করে এতদসংক্রান্ত জনদুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে আসবেন তেমনটি মনে করি না। কারণ বহুদিন ধরে বহু অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অনেক কিছু লিখে তেমন কোনো ফললাভ হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। তবে লেখাটি পড়ে জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী অফিস-আদালতের কারও বিবেক জাগ্রত হলে এবং তা যদি একজনেরও হয়, সেক্ষেত্রেও আজকের লেখাটি সার্থক হয়েছে বলে মনে করব।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

অফিস-আদালতে জনভোগান্তি কি চলতেই থাকবে?

 ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
১৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা দেশের অফিসপাড়াগুলোয় জনভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর আদালতগুলোয় বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি অকল্পনীয়। এসব ঘটনার অবসান কবে হবে, একমাত্র আল্লাহই তা বলতে পারেন। কারণ বিচারপ্রার্থী জনগণ যে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, সে বিষয়টি সুরাহা করার ক্ষমতা কারও আছে বলে মনে হয় না।

বিচারালয়ে ভোগান্তির বিষয়ে কারও পক্ষে কিছু বলাও সহজ নয়। কিছু বলতে হলে তথ্য-প্রমাণ হাতে রেখে তা বলতে হয়। কিন্তু তাই বলে একদম কিছু না বলে সবাই মুখ বন্ধ করে রাখলে তাতে করে অফিস-আদালত, বিচার ব্যবস্থা, সম্মানিত বিচারক, বিচারপ্রার্থী ইত্যাদি কোনো শ্রেণির জন্যই যে তা সুখকর হবে না, জনান্তিকে সে কথাটি বলে রেখে আজকের লেখাটি শুরু করছি। এখানে আমি বিচারপ্রার্থী মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনার দু-একটি উদাহরণ তুলে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করব যে, কত ব্যথা আছে, যা ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী ছাড়া কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়।

মফস্বল শহরের একখণ্ড জমির ঘটনা। যে জমিটুকু কোনোদিন, কোনোকালেও কোনো সংখ্যালঘু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন ছিল না, কিন্তু সে জমিটুকুও রেকর্ডের সময় ‘ক’ তফসিল হিসাবে সরকারি কাগজপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার সেই একই জমি, ভূমি অফিসের এসি ল্যান্ড, তহসিলদার সাহেবরা নামজারি জমাভাগ করে খাজনা গ্রহণের মাধ্যমে দাখিলা ইস্যু করে বেচাবিক্রির সুযোগও করে দিয়েছেন।

আর এভাবে কয়েক যুগ ধরে দু-তিনবার বিক্রয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে হাত বদলের পর অন্য এক ব্যক্তি জমিটি ক্রয় করে নামজারির আবেদন করলে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট তহসিলদার (বর্তমানে সহকারী ভূমি অফিসার) সে ব্যক্তির নামেও জমিটি নামজারি জমাভাগ করে দিয়ে তার নামেও দাখিলা ইস্যু করে খাজনা আদায় করেছেন। অথচ এ ঘটনার ২-৩ বছর পরে আগের এসি ল্যান্ড এবং সহকারী ভূমি অফিসার বদলি হয়ে নতুন অফিসার আসার পর, ভুক্তভোগী জমির মালিক তহসিল অফিসে পরবর্তী বছরের খাজনা দিতে গেলে বলা হয়, জমিটি ‘ক’ তফসিলভুক্ত। অর্থাৎ সরকারি অর্পিত সম্পত্তি বিধায় খাজনা গ্রহণে ঝামেলা আছে।

ভুক্তভোগী ব্যক্তিটি তখন তার নিজ নামের নামজারি খাজনার দাখিলা এবং অতীত ক্রেতা তথা মালিকদের নামে নামজারিসহ বছরের পর বছর ধরে খাজনা গ্রহণ করে দাখিলা প্রদান ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করলে তখন তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বলা হয়, এত মূল্যবান সম্পত্তি, এ সম্পত্তির খাজনা প্রদান অব্যাহত রাখতে হলে তহসিল অফিস এবং এসি ল্যান্ড অফিস দুই জায়গা ম্যানেজ করতে হবে! কিন্তু তিনি ঘুষ প্রদানে রাজি না হয়ে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানান। সেই জেলা প্রশাসক বদলি হয়ে চলে গেলে আরেকজন সেই চেয়ারে এলেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। অবশেষে নতুন জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট তহসিলদারকে একটু দূরবর্তী স্টেশনে বদলি করে ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে বলেন, অপকর্মকারীকে বদলি করা হয়েছে। ব্যস ওইটুকুই।

বহুদিন আগে থেকেই ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা আলোচ্য জমিতে ছাড়পত্র দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নামজারি করে দাখিলা কেটে জমিটি বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন, আবার সেই একই জমি অন্য একজন কেনার পর তার নামেও নামজারি করে দাখিলা কেটে খাজনা গ্রহণ করলেন, আবার পরবর্তীকালে অফিসার বদলি হওয়ায় অন্য অফিসার এসে সেই নামজারি এবং দাখিলা গ্রহণকারীর কাছ থেকে সেই একই জমির খাজনা গ্রহণ বন্ধ করে দিলেন। অথচ এসব অপরাধের শাস্তি হলো বদলি!

যাক সে কথা। এবার ওই একই ঘটনায় বিচারালয়ে মামলা করায় সেক্ষেত্রেও হয়রানি-পেরেশানির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তো, এ অবস্থায় ভুক্তভোগী ভদ্রলোক কী করবেন ভেবে না পেয়ে, অবশেষে উকিলের শরণাপন্ন হলে উকিল মামলা করার পরামর্শ দেওয়ায় তা-ই করা হলো। মামলার আর্জিতে সবিস্তারে বলা হলো, এ সম্পত্তি কোনোদিনই সরকারি অর্পিত সম্পত্তি নয়, কারণ কোনোকালে, কোনো সময়ই সম্পত্তিটি কোনো হিন্দু ব্যক্তি, অন্য সংখ্যালঘু বা এ ধরনের কোনো জাতিগোষ্ঠী বা ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল না। এমনকি সরকারও কোনোভাবে জমিটির মালিক নয়।

কারণ সেই ১৯৬০-এর দশকে জমিটির তৎকালীন মালিক, সম্পত্তিটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কর্তৃক রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে মালিকানা প্রাপ্ত হন। সুতরাং এক্ষেত্রে জমিটি সরকারি অর্পিত সম্পত্তি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বা তা করার কোনো সুযোগই নেই। আর এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে আর্জিতে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ সংযুক্ত করে মামলা দাখিলের পরও সেক্ষেত্রে অকারণে লম্বা লম্বা তারিখ ফেলে বছরের পর বছর মামলাটি ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এমনকি রায়ের তারিখ ধার্য করেও ঠিক সেই দিন আদালতে উপস্থিত না হয়ে ছুটি নিয়ে পরদিন এসে নতুন করে তারিখ ফেলে আবারও এ অজুহাত সে অজুহাতে নতুন কিছু উল্লেখ করে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে।

এসব কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না। মফস্বল শহরের একটি আদালতের যে চিত্রটি এখানে তুলে ধরা হলো, এসব ঘটনা দেখারই বা কে আছেন। একজন সাধারণ বিচারপ্রার্থীই বা এক্ষেত্রে কী করতে পারেন, কাকে কী বলতে পারেন। উকিলের পেছনে ছোটা আর আদালতের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করা ছাড়া তার করারই বা কী আছে! সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিবেক-বুদ্ধি যদি লোপ পায়, আর তার কার্যকলাপেও যদি সন্দেহ হয় যে, তিনিও ভূমি কর্মকর্তার মতো মন-মানসিকতাসম্পন্ন, তাহলে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদবে বৈকি!

এ স্বল্প পরিসরে এসব নিয়ে আর বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই বিধায় একটি ঘটনার উল্লেখ করেই আজকের লেখাটির ইতি টানতে চাই। আমাদের সবারই জানা আছে, কোনো ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ হলে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করতে পারেন। কিন্তু সেই রিট আবেদনের পরও কোনো একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীকে কতটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বা হয়েছে, নিচের ঘটনাটি তারই জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত।

২০২০ সালে রিট করার পর ভুক্তভোগী ভদ্রলোকের পক্ষে এবং বিবাদীর বিরুদ্ধে বছরের শুরুর দিকে একটি রুল জারি করা হয়। কিন্তু বিবাদী একজন সরকারি আমলা তথা সচিব পদমর্যাদায় আসীন থেকেও তা আমলে না নিয়ে একই বিষয়ে বাদীর বিরুদ্ধে আরও কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ উচ্চ আদালত প্রদত্ত রুলিংয়ের কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বাদীর বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়! অতঃপর বাদী আবারও আদালতের শরণাপন্ন হলে দেখা যায়, আদালত যে রুল প্রদান করেছিলেন, তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

সুতরাং বাদীকে নতুন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয় এবং অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নভেম্বরে সেই আদালতে শুনানি করানো সম্ভব হলেও নতুন আদালত একই বিষয়ে আবারও ১০ দিনের একটি শর্ট রুলিং দিয়ে বলেন, ‘শিগগির শুনানি গ্রহণ করা হবে।’ আর সেই থেকে আজ ৭ মাসে প্রায় দশবার মামলাটি মেনশন করা হলেও আজ পর্যন্ত সেই শুনানি গ্রহণ করা হয়নি! বরং ইতোমধ্যে বিবাদী বাদীর বিরুদ্ধে আরও একদফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাদীকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলেছেন। অর্থাৎ সরকারি আমলা সচিব মহোদয় উচ্চ আদালতের দ্বিতীয় দফায় জারিকৃত রুলিংও অবজ্ঞা করে বাদীর বিরুদ্ধে আবারও খড়্গহস্ত হয়েছেন।

বতর্মান অবস্থায় দেশের অফিস-আদালত নিয়ে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ একটি মফস্বল শহরের ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসন অফিস, জেলা জজ আদালত এবং রাজধানী শহরের সচিবালয়, হাইকোর্ট ইত্যাদি সব বিষয়েই কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। আর আলোচনাকালে যে দুটি ঘটনার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, সেসবের তথ্য-প্রমাণ পেয়েই তা করা হয়েছে। তবে সরকারের কোনো হাইকমান্ড বা অন্য কেউ এ লেখাটি পাঠ করে এতদসংক্রান্ত জনদুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে আসবেন তেমনটি মনে করি না। কারণ বহুদিন ধরে বহু অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অনেক কিছু লিখে তেমন কোনো ফললাভ হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। তবে লেখাটি পড়ে জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী অফিস-আদালতের কারও বিবেক জাগ্রত হলে এবং তা যদি একজনেরও হয়, সেক্ষেত্রেও আজকের লেখাটি সার্থক হয়েছে বলে মনে করব।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন