বিশ্ব মোড়লরা নীরব কেন
jugantor
বিশ্ব মোড়লরা নীরব কেন

  ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা  

১৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্ভিক্ষ চলছে। সমাজের অস্পৃশ্য, নিম্নবিত্ত একটি পরিবারের গৃহবধূ প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। সে মুহূর্তে বাড়ির আঙিনায় বসে আলু পুড়িয়ে খাচ্ছে তার স্বামী ও শ্বশুর। বাবা-ছেলে দুজনেই পেশাগতভাবে চামার। এক ঘণ্টা কাজ করলে এক ঘণ্টা চুরুট টানে। আয় রোজগার নেই। তা নিয়ে অবশ্য ওদের খুব একটা ভাবনাও নেই। ঋণে জর্জরিত তিন প্রাণীর সংসার। ঘরের মেঝেতে গোটা তিনেক বাসন আর ছেঁড়া কাপড়ে দিব্যি চলে যায় ওদের।

আলু খাওয়া হলে দুজন গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে ঘরের দাওয়াতেই। ঘরের ভেতর থেকে আসা গৃহবধূর করুণ আর্তনাদ উপেক্ষা করেই ঘুমিয়ে যায়। সকালে উঠে দেখে, অনাগত সন্তান মাতৃগর্ভেই চিরবিদায় নিয়েছে। আর তার গর্ভধারিণীর ফ্যাকাসে মুখের ওপর ব্যস্ত হয়ে উড়তে থাকা মাছির দল দেখে স্বামী বুঝে নেয়, বিদায় নিয়েছে তার স্ত্রীও।

মা ও সন্তান মারা গেলে এলাকার হৃদয়বানদের কাছে হাত পেতে পিতা-পুত্র সৎকারের টাকা জোগাড় করে। অবশ্য সে টাকা নিয়ে তারা চলে যায় পানশালায়। মদ খেতে। যতক্ষণ হুঁশ থাকে, বাবা বলতে থাকে, বেচারি বেঁচে থাকতে একটুকরা ছেঁড়া কাপড় পেল না আর এখন মরার পর তাকে একখানা নতুন কাফন কিনে দিতে হবে?

হিন্দি ও উর্দু ভাষার জীবনবাদী সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচান্দের (প্রকৃত নাম ধনপত রায়) ‘কাফন’ (১৯৩৬) গল্পে বর্ণিত এ ঘটনাটি লোমহর্ষক বটে। কিন্তু ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডে বসবাসরত মানুষদের সঙ্গে যে বর্বরোচিত আচরণ করছে, তা কি কাফন গল্পের পিতা-পুত্রের নিমর্মতাকে ছাড়িয়ে যায়নি? ‘কাফন’ গল্পের মৃতাকে নতুন কাফনের কাপড় না পরানোর জন্য পিতা-পুত্র যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছিল দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্যের মাঝে, আর সংবাদ মাধ্যমের দপ্তর গুঁড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ঈদের কাপড় পরিহিত নিষ্পাপ শিশুদের লাশে পরিণত করার যৌক্তিকতা ইসরাইল খুঁজে পেয়েছে আত্মরক্ষার অধিকারের মাঝে।

আক্রমণকারী ও আক্রান্তের ভুয়া ছবি ও ভিডিও তথ্যপ্রযুক্তির কৃপায় ছড়িয়ে পড়লেও এবং তা জগদ্বাসীকে সাময়িক বিভ্রান্ত করলেও এ ক্ষেত্রে বিশ্ব মোড়লদের সংলাপ ও আচরণে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সেসব বক্তব্যে ‘ফেক’ বা ‘ম্যানিপুলেটেড’ কিছু নেই। এখন পর্যন্ত তারা যা বলেছেন এবং যেভাবে বলেছেন, তাতে তাদের দেশীয়, দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত রাখার ইঙ্গিতই মেলে। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের ঘটনাপ্রবাহ এবং এতে শক্তিধর রাষ্ট্রের নিপীড়কের পক্ষ অবলম্বনকারী আচরণের সঙ্গে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনা ও আরেক শক্তিধর রাষ্ট্রের নিপীড়কের পক্ষাবলম্বন করার চমৎকার সাদৃশ্য দেখা যায়। বিষয়টি কিঞ্চিৎ বিশদ করা যাক।

রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিনি- উভয়ই রাষ্ট্রহীন। রোহিঙ্গা নিপীড়ন শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে। ফিলিস্তিনিদেরও নিজ ভূমিতেই ইসরাইলিদের হাতে নিপীড়নের শিকার হতে হয়। নিজ ভূমি থেকে উৎখাতের নীতি কার্যকর করার জন্য মিয়ানমার ও ইসরাইল উভয় নিপীড়কই অত্যাচারের সব রকম কৌশল প্রয়োগ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত গণহত্যায় রূপ নিয়েছে। দুটো জাতির ক্ষেত্রেই তাদের ধর্মীয় পরিচয় একটি বিরাট ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিনিদের মুসলিম পরিচয় তাদের নিপীড়করা বরদাস্ত করতে পারেননি। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিয়ানমার সরকার আর ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে ইসরাইল সরকারের জাতিগত বিদ্বেষসূচক মন্তব্যে বোঝা যায়, নিপীড়ক সরকারের নীতি, আইন, চিন্তা ও সেগুলোর বাস্তবায়ন- সবকিছুতেই নিপীড়িতকে চিরতরে দমিয়ে রাখার সচেতন প্রয়াস রয়েছে। এ বিষয়ে উভয় নিপীড়কই আপসহীন।

দুক্ষেত্রেই সরকারি মদদে নিপীড়ন সংঘটিত হয়েছে এবং হচ্ছে। দুক্ষেত্রেই রাষ্ট্র তার নিজের নিরাপত্তা তথা আত্মরক্ষা ও কল্যাণের স্বার্থে নির্যাতনকে বৈধ হিসাবে প্রচার করেছে। মিয়ানমারের সাবেক স্টেট কাউন্সেলর খোদ আন্তর্জাতিক আদালতের ভেতর বসে বলেছিলেন, এগুলো (রোহিঙ্গা নির্যাতন) তার রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনা, মিডিয়া যা প্রচার করছে তা অসত্য। আর ইসরাইল সরকার প্রতিবারই নতুন নতুন যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। যেমন- সন্ত্রাস দমন, আত্মরক্ষা ইত্যাদি। এবার ফিলিস্তিনে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার যুক্তি হিসাবে তাদের ভাষ্য হলো- ‘রিয়েল এস্টেট ডিসপুট’র কারণে তারা হামলা করেছে।

পরিতাপের বিষয়, দুই ক্ষেত্রেই মুসলিম নিপীড়নের ঘটনায় মুসলিম বিশ্ব নীরব। আর এ নীরবতার কারণ দুক্ষেত্রেই এক। তা হলো বাণিজ্য। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো রোহিঙ্গা বিষয়ে যেমন নীরব ছিল, ফিলিস্তিন বিষয়েও তাই। ইসরাইলের ক্ষেত্রেও যেসব দেশ নীরব, তাদের কারও সঙ্গে ইসরাইলের রয়েছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কারও সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক। দুঃখজনক হলেও সত্য, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করতে ২০২০ সালে চার মুসলিম রাষ্ট্র আরব আমিরাত, সুদান, মরক্কো, বাহরাইন ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। কাজেই তাদের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধাচরণ করার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় যে মিল তা হলো, মিয়ানমার ও ইসরাইলকে মদদ দানকারী দুটি রাষ্ট্র সুপার পাওয়ার হিসাবে বিশ্বে পরিচিত। মিয়ানমারকে সমর্থন দেয় চীন আর ইসরাইলকে আমেরিকা। এ দুই সুপার পাওয়ার বিশ্ব মোড়ল হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে বলেই নিপীড়কের দোসর হওয়া সত্ত্বেও তারা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। মিয়ানমারের সঙ্গে আমেরিকার নিবিড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও অভিভাবক হিসাবে মিয়ানমার চীনকেই মেনে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের জানুয়ারি ২০১৭-এর তথ্যমতে, মিয়ানমারের মোট আমদানির ৩৪.৪২ শতাংশ আসে চীন থেকে আর মোট রপ্তানির ৪০.৮৪ শতাংশ যায় চীনে। চীন ও মিয়ানমারের মাঝে ৭০ বছরের পাকফো (paukphaw) বন্ধুত্ব মানবতার চেয়ে বড়। তাই চীনের বিআরআই প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ইত্যাদিসহ মিয়ানমারে আরও বহুবিধ লাভজনক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ জরুরি। অতএব, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের পক্ষে কখনো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে বিশ্বে চতুর্থ হীরা রপ্তানিকারক হওয়ায় ইসরাইলের কদর আমেরিকার কাছে সব সময়ই ছিল। হীরা ছাড়াও অন্যান্য পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে আমেরিকা ইসরাইলের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮-এর তথ্যমতে, রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে (১৩.৬৭ ভাগ) থাকলেও ইসরাইলের মোট রপ্তানির ১৩.৩৮ গিয়েছিল আমেরিকায় এবং মোট আমদানির ২৭.১১ ভাগ এসেছিল আমেরিকা থেকে।

সুতরাং হত্যাযজ্ঞে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্টও আগের প্রেসিডেন্টদের পদাঙ্ক অনুসরণপূর্বক ফোন করে ইসরাইলকে আশ্বস্ত করবেন এবং ইসরাইলের তার আত্মরক্ষার অধিকার থাকার ঘোষণা দেবে, এমনটাই স্বাভাবিক। চীন ও আমেরিকা যেন বড় ভাইয়ের মতো যথাক্রমে মিয়ানমার ও ইসরাইলের পিঠ চাপড়ে অভয় দেয়, চালিয়ে যা। তাতে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হোক, লাশের সংখ্যা বাড়ুক; কোনো বিষয় নয়।

আরও যে বিষয়টির সাদৃশ্যের কথা না বললেই নয় তা হলো- সম্প্র্রতি দুটি জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের দায় যাদের ওপর, তারাও নিজ নিজ দেশের সামারিক বাহিনী কিংবা বিরোধী দল কর্তৃক চাপের শিকার হয়েছেন ও ক্ষমতা হারাচ্ছেন। হয়তো এটাই প্রকৃতির প্রতিদান। আবার এও সত্য, এসব নিপীড়ককে ক্ষমতা থেকে যারা উৎখাত করছে, তারা যে আরও নির্মম হবে না, সে নিশ্চয়তা নেই।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের কোনো বিচার না হওয়া এবং ইসরাইলের ফিলিস্তিন আক্রমণে একদিকে মুসলিম বিশ্বের নীরবতা, অপরদিকে বিশ্ব মোড়লদের প্রশ্রয়ে ইসরাইলের বিচার না হওয়ায় অবধারিতভাবে যে প্রশ্নটি চলে আসে, তা হলো- রাষ্ট্র যদি এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের হোতা হয়, বিশ্ব মোড়লরা যদি সেই হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দান করে, মানবতা তাহলে কোথায়?

দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার কর্মী ডেসমন্ড টুটু বলেছিলেন, নিপীড়নের সময় নীরব থাকা মানে নিপীড়কের পক্ষ নেওয়া। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হলেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমর্থনদানে খুব বেশি উদ্যোগ বাংলাদেশে এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ২৬ মে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের (সিপিএস) ওয়েবিনারে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান পররাষ্ট্র সচিবসহ শিক্ষাবিদের উপস্থিতি অন্তত কিছু খোলাখুলি আলোচনা ও মত প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল। অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারলে নীরব থাকার চেয়ে অন্তত নিজের অবস্থান জানানোর মাধ্যমেও মানবতার পক্ষে থাকা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এক্ষেত্রে বিশ্ব মোড়লরা তাদের ব্যর্থতা প্রমাণ করেছেন।

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ব মোড়লরা নীরব কেন

 ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা 
১৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্ভিক্ষ চলছে। সমাজের অস্পৃশ্য, নিম্নবিত্ত একটি পরিবারের গৃহবধূ প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। সে মুহূর্তে বাড়ির আঙিনায় বসে আলু পুড়িয়ে খাচ্ছে তার স্বামী ও শ্বশুর। বাবা-ছেলে দুজনেই পেশাগতভাবে চামার। এক ঘণ্টা কাজ করলে এক ঘণ্টা চুরুট টানে। আয় রোজগার নেই। তা নিয়ে অবশ্য ওদের খুব একটা ভাবনাও নেই। ঋণে জর্জরিত তিন প্রাণীর সংসার। ঘরের মেঝেতে গোটা তিনেক বাসন আর ছেঁড়া কাপড়ে দিব্যি চলে যায় ওদের।

আলু খাওয়া হলে দুজন গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে ঘরের দাওয়াতেই। ঘরের ভেতর থেকে আসা গৃহবধূর করুণ আর্তনাদ উপেক্ষা করেই ঘুমিয়ে যায়। সকালে উঠে দেখে, অনাগত সন্তান মাতৃগর্ভেই চিরবিদায় নিয়েছে। আর তার গর্ভধারিণীর ফ্যাকাসে মুখের ওপর ব্যস্ত হয়ে উড়তে থাকা মাছির দল দেখে স্বামী বুঝে নেয়, বিদায় নিয়েছে তার স্ত্রীও।

মা ও সন্তান মারা গেলে এলাকার হৃদয়বানদের কাছে হাত পেতে পিতা-পুত্র সৎকারের টাকা জোগাড় করে। অবশ্য সে টাকা নিয়ে তারা চলে যায় পানশালায়। মদ খেতে। যতক্ষণ হুঁশ থাকে, বাবা বলতে থাকে, বেচারি বেঁচে থাকতে একটুকরা ছেঁড়া কাপড় পেল না আর এখন মরার পর তাকে একখানা নতুন কাফন কিনে দিতে হবে?

হিন্দি ও উর্দু ভাষার জীবনবাদী সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচান্দের (প্রকৃত নাম ধনপত রায়) ‘কাফন’ (১৯৩৬) গল্পে বর্ণিত এ ঘটনাটি লোমহর্ষক বটে। কিন্তু ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিন নামক ভূখণ্ডে বসবাসরত মানুষদের সঙ্গে যে বর্বরোচিত আচরণ করছে, তা কি কাফন গল্পের পিতা-পুত্রের নিমর্মতাকে ছাড়িয়ে যায়নি? ‘কাফন’ গল্পের মৃতাকে নতুন কাফনের কাপড় না পরানোর জন্য পিতা-পুত্র যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছিল দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্যের মাঝে, আর সংবাদ মাধ্যমের দপ্তর গুঁড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ঈদের কাপড় পরিহিত নিষ্পাপ শিশুদের লাশে পরিণত করার যৌক্তিকতা ইসরাইল খুঁজে পেয়েছে আত্মরক্ষার অধিকারের মাঝে।

আক্রমণকারী ও আক্রান্তের ভুয়া ছবি ও ভিডিও তথ্যপ্রযুক্তির কৃপায় ছড়িয়ে পড়লেও এবং তা জগদ্বাসীকে সাময়িক বিভ্রান্ত করলেও এ ক্ষেত্রে বিশ্ব মোড়লদের সংলাপ ও আচরণে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সেসব বক্তব্যে ‘ফেক’ বা ‘ম্যানিপুলেটেড’ কিছু নেই। এখন পর্যন্ত তারা যা বলেছেন এবং যেভাবে বলেছেন, তাতে তাদের দেশীয়, দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত রাখার ইঙ্গিতই মেলে। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের ঘটনাপ্রবাহ এবং এতে শক্তিধর রাষ্ট্রের নিপীড়কের পক্ষ অবলম্বনকারী আচরণের সঙ্গে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনা ও আরেক শক্তিধর রাষ্ট্রের নিপীড়কের পক্ষাবলম্বন করার চমৎকার সাদৃশ্য দেখা যায়। বিষয়টি কিঞ্চিৎ বিশদ করা যাক।

রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিনি- উভয়ই রাষ্ট্রহীন। রোহিঙ্গা নিপীড়ন শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে। ফিলিস্তিনিদেরও নিজ ভূমিতেই ইসরাইলিদের হাতে নিপীড়নের শিকার হতে হয়। নিজ ভূমি থেকে উৎখাতের নীতি কার্যকর করার জন্য মিয়ানমার ও ইসরাইল উভয় নিপীড়কই অত্যাচারের সব রকম কৌশল প্রয়োগ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত গণহত্যায় রূপ নিয়েছে। দুটো জাতির ক্ষেত্রেই তাদের ধর্মীয় পরিচয় একটি বিরাট ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিনিদের মুসলিম পরিচয় তাদের নিপীড়করা বরদাস্ত করতে পারেননি। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিয়ানমার সরকার আর ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে ইসরাইল সরকারের জাতিগত বিদ্বেষসূচক মন্তব্যে বোঝা যায়, নিপীড়ক সরকারের নীতি, আইন, চিন্তা ও সেগুলোর বাস্তবায়ন- সবকিছুতেই নিপীড়িতকে চিরতরে দমিয়ে রাখার সচেতন প্রয়াস রয়েছে। এ বিষয়ে উভয় নিপীড়কই আপসহীন।

দুক্ষেত্রেই সরকারি মদদে নিপীড়ন সংঘটিত হয়েছে এবং হচ্ছে। দুক্ষেত্রেই রাষ্ট্র তার নিজের নিরাপত্তা তথা আত্মরক্ষা ও কল্যাণের স্বার্থে নির্যাতনকে বৈধ হিসাবে প্রচার করেছে। মিয়ানমারের সাবেক স্টেট কাউন্সেলর খোদ আন্তর্জাতিক আদালতের ভেতর বসে বলেছিলেন, এগুলো (রোহিঙ্গা নির্যাতন) তার রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনা, মিডিয়া যা প্রচার করছে তা অসত্য। আর ইসরাইল সরকার প্রতিবারই নতুন নতুন যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। যেমন- সন্ত্রাস দমন, আত্মরক্ষা ইত্যাদি। এবার ফিলিস্তিনে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার যুক্তি হিসাবে তাদের ভাষ্য হলো- ‘রিয়েল এস্টেট ডিসপুট’র কারণে তারা হামলা করেছে।

পরিতাপের বিষয়, দুই ক্ষেত্রেই মুসলিম নিপীড়নের ঘটনায় মুসলিম বিশ্ব নীরব। আর এ নীরবতার কারণ দুক্ষেত্রেই এক। তা হলো বাণিজ্য। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো রোহিঙ্গা বিষয়ে যেমন নীরব ছিল, ফিলিস্তিন বিষয়েও তাই। ইসরাইলের ক্ষেত্রেও যেসব দেশ নীরব, তাদের কারও সঙ্গে ইসরাইলের রয়েছে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কারও সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক। দুঃখজনক হলেও সত্য, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করতে ২০২০ সালে চার মুসলিম রাষ্ট্র আরব আমিরাত, সুদান, মরক্কো, বাহরাইন ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতিও দিয়েছে। কাজেই তাদের পক্ষে ইসরাইলের বিরুদ্ধাচরণ করার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় যে মিল তা হলো, মিয়ানমার ও ইসরাইলকে মদদ দানকারী দুটি রাষ্ট্র সুপার পাওয়ার হিসাবে বিশ্বে পরিচিত। মিয়ানমারকে সমর্থন দেয় চীন আর ইসরাইলকে আমেরিকা। এ দুই সুপার পাওয়ার বিশ্ব মোড়ল হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে বলেই নিপীড়কের দোসর হওয়া সত্ত্বেও তারা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে। মিয়ানমারের সঙ্গে আমেরিকার নিবিড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও অভিভাবক হিসাবে মিয়ানমার চীনকেই মেনে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের জানুয়ারি ২০১৭-এর তথ্যমতে, মিয়ানমারের মোট আমদানির ৩৪.৪২ শতাংশ আসে চীন থেকে আর মোট রপ্তানির ৪০.৮৪ শতাংশ যায় চীনে। চীন ও মিয়ানমারের মাঝে ৭০ বছরের পাকফো (paukphaw) বন্ধুত্ব মানবতার চেয়ে বড়। তাই চীনের বিআরআই প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ইত্যাদিসহ মিয়ানমারে আরও বহুবিধ লাভজনক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ জরুরি। অতএব, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের পক্ষে কখনো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে বিশ্বে চতুর্থ হীরা রপ্তানিকারক হওয়ায় ইসরাইলের কদর আমেরিকার কাছে সব সময়ই ছিল। হীরা ছাড়াও অন্যান্য পণ্যের আমদানি-রপ্তানিতে আমেরিকা ইসরাইলের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮-এর তথ্যমতে, রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে (১৩.৬৭ ভাগ) থাকলেও ইসরাইলের মোট রপ্তানির ১৩.৩৮ গিয়েছিল আমেরিকায় এবং মোট আমদানির ২৭.১১ ভাগ এসেছিল আমেরিকা থেকে।

সুতরাং হত্যাযজ্ঞে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্টও আগের প্রেসিডেন্টদের পদাঙ্ক অনুসরণপূর্বক ফোন করে ইসরাইলকে আশ্বস্ত করবেন এবং ইসরাইলের তার আত্মরক্ষার অধিকার থাকার ঘোষণা দেবে, এমনটাই স্বাভাবিক। চীন ও আমেরিকা যেন বড় ভাইয়ের মতো যথাক্রমে মিয়ানমার ও ইসরাইলের পিঠ চাপড়ে অভয় দেয়, চালিয়ে যা। তাতে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হোক, লাশের সংখ্যা বাড়ুক; কোনো বিষয় নয়।

আরও যে বিষয়টির সাদৃশ্যের কথা না বললেই নয় তা হলো- সম্প্র্রতি দুটি জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের দায় যাদের ওপর, তারাও নিজ নিজ দেশের সামারিক বাহিনী কিংবা বিরোধী দল কর্তৃক চাপের শিকার হয়েছেন ও ক্ষমতা হারাচ্ছেন। হয়তো এটাই প্রকৃতির প্রতিদান। আবার এও সত্য, এসব নিপীড়ককে ক্ষমতা থেকে যারা উৎখাত করছে, তারা যে আরও নির্মম হবে না, সে নিশ্চয়তা নেই।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের কোনো বিচার না হওয়া এবং ইসরাইলের ফিলিস্তিন আক্রমণে একদিকে মুসলিম বিশ্বের নীরবতা, অপরদিকে বিশ্ব মোড়লদের প্রশ্রয়ে ইসরাইলের বিচার না হওয়ায় অবধারিতভাবে যে প্রশ্নটি চলে আসে, তা হলো- রাষ্ট্র যদি এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের হোতা হয়, বিশ্ব মোড়লরা যদি সেই হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দান করে, মানবতা তাহলে কোথায়?

দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার কর্মী ডেসমন্ড টুটু বলেছিলেন, নিপীড়নের সময় নীরব থাকা মানে নিপীড়কের পক্ষ নেওয়া। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হলেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমর্থনদানে খুব বেশি উদ্যোগ বাংলাদেশে এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ২৬ মে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের (সিপিএস) ওয়েবিনারে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান পররাষ্ট্র সচিবসহ শিক্ষাবিদের উপস্থিতি অন্তত কিছু খোলাখুলি আলোচনা ও মত প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল। অন্যায়ের প্রতিকার করতে না পারলে নীরব থাকার চেয়ে অন্তত নিজের অবস্থান জানানোর মাধ্যমেও মানবতার পক্ষে থাকা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এক্ষেত্রে বিশ্ব মোড়লরা তাদের ব্যর্থতা প্রমাণ করেছেন।

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন